somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ব্রান্ডিং বাংলাদেশ

০১ লা জুন, ২০১৭ সকাল ৯:৩৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


বিশ্বায়নের এই যুগে দেশের খ্যাতি ও সুনামকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরার জন্য এখন জোরেসোরে দেশকে ব্রান্ডিং করার কাজ চলছে। এই ব্রান্ডিংয়ের মানে হচ্ছে দেশের আলোকিত দিকগুলো বিশ্বের কাছে তুলে ধরা। ব্রান্ডিংয়ের সুফল হচ্ছে, দেশের ইতিবাচক ব্র্যান্ডিং খাড়া করতে পারলে সঙ্গে সঙ্গে দেশের জনশক্তি, পর্যটন, দেশে তৈরি পণ্য, বিনিয়োগ ও অন্যান্য সেবাও মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করে এবং গ্রহণযোগ্যতা পায়। ইদানীং বিশ্বের বিভিন্ন শহরেরও একটি ব্রান্ডিং ইমেজ রয়েছে। সেই ইমেজ দেখেই মানুষ ঠিক করে কোন শহরে বেড়াতে যাবে।

বিশ্বের বেশিরভাগ দেশই ব্রান্ডিংকে গুরুত্ব দিচ্ছে রেডিও, টেলিভিশন ও সোস্যাল মিডিয়ার বিজ্ঞাপনে তা উঠে আসছে। যেমন মালয়েশিয়া “ট্রুলি এশিয়া”, ভারত ‘ইনক্রেডিবল ইন্ডিয়া’, চীন সারা বিশ্বের ‘কারখানা’ এবং শ্রীলঙ্কা ‘রিফ্রেশিংলি শ্রীলঙ্কা’ হিসেবে পরিচিত। এছাড়া থাইল্যান্ড নিজেকে তুলে ধরছে ‘অ্যামেজিং থাইল্যান্ড’ নামে। এভাবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ অন্য দেশ থেকে আলাদা করে নিজেদের পরিচয় তুলে ধরতে সমর্থ হয়েছে। ২০১৪ সালে বিদেশি এবং দেশীয় কোম্পানিগুলোকে তাদের পণ্য ভারতে তৈর করতে আগ্রহী করার জন্য “মেক ইন ইন্ডিয়া” নামের ব্র্যান্ডিংয়ের উদ্যোগ নেয় ভারত সরকার। যার ফলে ২০১৫ সালের মধ্যে আমেরিকা ও চীনকে ডিঙিয়ে ভারত বিদেশি বিনিয়োগের জন্য সেরা দেশের তকমা পায়। এ হচ্ছে ব্রান্ডিংয়ের শক্তি। যদি তা যথাযথভাবে এবং সত্যিকারের দেশপ্রেম নিয়ে করা যায়।

২০০৫ সাল থেকে চালু হয়েছে “ন্যাশন ব্র্যান্ড ইনডেক্স”। একটি দেশের পর্যটন, সংস্কৃতি, শাসন ব্যবস্থা, রপ্তানি, জনশক্তি এবং বিনিয়োগ, এই ছয়টি ক্ষেত্র বিবেচনা করে প্রতিবছর এই তালিকা প্রকাশ করে “এনহল্ট-জিএফকে রোপার” নামক একটি প্রতিষ্ঠান। গত বছর “মোস্ট ভ্যালুয়েবল কান্ট্রি” হিসাবে ব্র্যান্ড ইনডেক্স তালিকার শীর্ষে ছিল আমেরিকা। দ্বিতীয় স্থানে চীন, ভারত সপ্তম, অস্ট্রেলিয়া দশম ও নিউজিল্যান্ড ৪৩তম স্থানে। এছাড়া পর্যটকদের প্রিয় গন্তব্য স্থান হিসেবে ইন্দোনেশিয়া ২১, মালয়েশিয়া ২৯ ও থাইল্যান্ড ছিল ৩০তম স্থানে। পাকিস্তান এবং শ্রীলঙ্কার নাম নেই শীর্ষ পঞ্চাশে। সবেচেয়ে আশার কথা হলো শীর্ষ ৫০টি দেশের তালিকায় এবারে প্রথমবারের মত বাংলাদেশের নাম এসেছে। বাংলাদেশের স্থান নিউজিল্যান্ডের পর ৪৪তম স্থানে। এটা কম কিসের? মাইক্রো ক্রেডিট, ডিজিটাল বাংলাদেশ, সুন্দরবন এবং কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের ইতিবাচক প্রচারণাই এই সাফল্য এনে দিয়েছে বলে অনেকের বিশ্বাস।

বিশ্বব্যাপী বিশেষ করে আইটি খাতে দক্ষ জনশক্তি সরবরাহকারী দেশ হিসাবে চূড়ান্ত সফলতা পেয়েছে ভারত। মাদ্রাজের ব্যাঙ্গালুরুকে বলা হয় দ্বিতীয় সিলিকন ভ্যালি। আর চেন্নাইকে বলা হয় আউট সোর্সিং-এর হাব। আইটি খাতে বিশ্বের ৩৭টি দেশে ৩৭ লক্ষ ভারতীয় কাজ করছে। গত বছরের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, কম্পিউটার খাতে এইচ-১বি ভিসাপ্রাপ্ত প্রার্থীর ৮৬ শতাংশই হলেন ভারতীয়। বিশ্বের প্রায় ৮০টি দেশে ভারতের ৬৪০টির বেশি আউটসোর্সিং ডেভেলপমেন্ট সেন্টার রয়েছে। উন্নত বিশ্বের অনেক দেশকে পিছে ফেলে আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতের শীর্ষ দশে স্থান করে নেওয়াটা আমাকে আশাবাদী করে তোলে। মনে হয় আমরাও পারবো। আমাদের দেশে মেধার অভাব নেই। উপযুক্ত ব্রান্ডিংয়ের মাধ্যমে ডিজিটাল বাংলাদেশের ইমেজ প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব কিছু নয়।

পোশাক শিল্পের পর বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পের চমকপ্রদ অগ্রগতি হয়েছে। এই খাতে প্রবৃদ্ধির হার নয় শতাংশেরও বেশি এবং বিশ্বের ১৬০টি দেশে বাংলাদেশ এখন ওষুধ রপ্তানি করছে। বাংলাদেশের অন্যতম ওষুধ উত্পাদনকারী প্রতিষ্ঠান স্কয়ার এবং বেক্সিমকো সম্প্রতি আমেরিকার বাজারে প্রবেশের অনুমোদন পেয়েছে। ওষুধ শিল্পের ব্র্যান্ডিং বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক হতে পারে।

পাটকে বলা হয় সোনালী আঁশ। এক সময় সোনালী আঁশের দেশ বলতে বাংলাদেশকেই চিনত সারাবিশ্ব। কিন্তু সেই পাট শিল্প আজ হারিয়ে গেছে বললেই চলে। পাটের ব্যবহার শুধু বস্তা, চট, দড়ি আর কার্পেটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এর ব্যবহার বহুমুখী। পাটের আঁশ অন্য অনেক আঁশের সঙ্গে মিশ্রণ করে বিভিন্ন বাণিজ্যিক পণ্য যেমন জুট কম্পোজিটস, পেপার, পেপার প্রোডাক্টস, পাল্প তৈরি করা যায়। শুধু তাই নয়, শুকনো পাটের শলা থেকে কাঠকয়লা রপ্তানি থেকেই ২০২১ সালের মধ্যে ষাট বিলিয়ন ডলারের মত বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা যাবে বলে বিশেজ্ঞদের ধারণা। এছাড়া আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, তাইওয়ান, কানাডা, মেক্সিকো, জাপান, তুরস্ক ও কোরিয়ার মতো দেশে পাটশলা থেকে উত্পাদিত সক্রিয় কার্বন রপ্তানির বিশাল বাজার রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের হুমকির মুখোমুখি আজকের বিশ্বে দূষণমুক্ত পরিবেশ গড়তে পরিবেশ বান্ধব পাটের বিকল্প নেই। মেধা ও যুগোপযোগী প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে পাটকে বাংলাদেশ ব্রান্ডিং-এর জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে।

বাংলাদেশের ইতিবাচক দিক যে নেই, তা নয়। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, বিশ্ব মিডিয়ার শিরোনামে আমাদের খারাপ দিকগুলোই বেশি প্রাধান্য পায়। যেমন মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশ একটি শ্রমিক ও গৃহপরিচারিকা (খাদ্দামা) সরবরাহকারী দেশ হিসাবেই পরিচিত। মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত বাংলাদেশি ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ারদের কটাক্ষ করে জিজ্ঞাসা করা হয়, তোমাদের দেশে আবার ডাক্তারও আছে নাকি? এটা আমাদের দুর্ভাগ্য। আমাদের দেশে প্রচুর দক্ষ জনশক্তি থাকলেও উপযুক্ত ব্র্যান্ডিংয়ের অভাবে ভারত, শ্রীলঙ্কা, ফিলিপাইন ও শ্রীলঙ্কা থেকে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে গেছে। তাই একটি দেশ হিসাবে এবং জাতি হিসাবে বাংলাদেশের ব্র্যান্ড তৈরি করার এখনই সময়।

বিশ্ব বাজারে জাপান এবং জার্মানীর তৈরি পণ্যের সুনাম রয়েছে। ওই সব দেশের তৈরি পণ্য ভালো হবেই এমন অন্ধ ধারণা পোষণ করেন অনেক ক্রেতা। আমেরিকার বৈদেশিক নীতি অনেকে ঘৃণার চোখে দেখলেও মেইড ইন আমেরিকা পণ্যকে মানুষ সমীহ করে। তবে এটা একদিনে হয়নি। দীর্ঘদিনের সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টার ফলেই এই ধরনের ইতিবাচক ইমেজ তৈরি করা সম্ভব হয়েছে।

বাংলাদেশের একটি গ্রহণযোগ্য ব্র্যান্ড ইমেজ তৈরি করতে হলে প্রয়োজন ঐক্যমত। সরকার, রাজনৈতিক দল, গণমাধ্যম, দেশ এবং প্রবাসের বাসিন্দা সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রায় এক কোটি প্রবাসী বাংলাদেশি রয়েছেন। যারা দেশে ব্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হিসাবে কাজ করতে পারেন। বিশ্বের জনশক্তির বাজারে শুধু শ্রমিক রপ্তানির কথা না ভেবে দক্ষ জনশক্তি পাঠানোর উদ্যোগ নিলে বাংলাদেশের ইমেজ বদলে যাবে।

সমস্যা আমাদের আছে ঠিকই, কিন্তু গন্তব্যস্থলে পৌঁছতে হলে নেতিবাচক দিকগুলোকে পিছনে রেখে বিশ্বের কাছে দেশকে নিয়ে একটি সুন্দর বার্তা পৌঁছে দিতে হবে। যা বাংলাদেশকে নিয়ে বিশ্বের দৃষ্টিভঙ্গি পুরোপুরি বদলে দেবে।
সুত্র
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা জুন, ২০১৭ সকাল ৯:৩৮
৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

নির্ভীক অভিযাত্রা

লিখেছেন আকিব হাসান জাভেদ, ১৭ ই আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৩৩

আমি চলি ঐ প্রান্তে,
যেখানে অসৎ থেকে মানুষ হয়েছে সৎ।
আমি চলি উড়ে উড়ে,
ডানাহীন পাখির মতো,
যেখানে দুর্বলতাকে জয় করে
হয়েছে দুঃসাহস।
আমি চলি শক্তির সাথে,
দেহ যায় না ঝুঁকে।
করি না প্রণাম,
করি না চাটুকারিতা আর... ...বাকিটুকু পড়ুন

চুপ - একদম চুপ

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ১৭ ই আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৫৭



আমরা শুধু চুপ থাকবো -
আমাদের কথা বলার মুখ নেই
আমাদের দেখার মতো চোখ নেই
আমাদের শোনার মতো কান নেই
মনে হয়, মনে হয় -
আমাদের হাত-পাও নেই।

আমাদের বিবেক নেই
আমাদের চিন্তা-চেতনাও নেই
আমরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

তবুও বেঁচে আছি

লিখেছেন সালমান মাহফুজ, ১৭ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ৯:১৫

এই নিথর নগ্ন শরীরের প্রতিটা পল্লবের করুণ আর্তচিৎকার
পৃথিবীর মাটি ভেদ করে কোনদিনও
ওই মৃত কানে পৌঁছাবে না
আমি জেনে গেছি ।

বিপন্ন আকাশের গায়ে লেপ্টে থাকা
দেবতাদের প্রতারণার ফাঁদ আর মিথ্যা প্রলোভনের গল্পগুলি
আমার শুনতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

জুলাই মিউজিয়ামঃ স্মৃতির বিরুদ্ধে বিস্মৃতির লড়াই....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১৭ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:৫৩



জুলাই মিউজিয়ামঃ স্মৃতির বিরুদ্ধে বিস্মৃতির লড়াই....

১৫ আগস্ট আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে গিয়েছিলাম জুলাই মিউজিয়ামে। সেখানে গিয়ে মনে হলো- এটি শুধু একটি জাদুঘর নয়; এটি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের এক ভয়াবহ অধ্যায়ের বিরুদ্ধে... ...বাকিটুকু পড়ুন

হিজিবিজি নদী চলে মন উদাসের দেশে !

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৮ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:০২





হিজিবিজি নদী চলে মন উদাসের দেশে !

...................................................................
মানচিত্রের আঁকাবাঁকা রেখায় তারে পাবেনা,
সে নদী তো চেনা কোনো ঠিকানায় যাবে না।
তার কোনো কূল নেই, নেই কোনো ঘাট,
সে বয়ে চলে একা, বুক জুড়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×