somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বন্ধু গ্রাম খোট্টাপাড়ায় যা হয়েছিল ।

০৭ ই মার্চ, ২০২২ রাত ১১:০৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

পড়াশুনা কিম্বা অন্যকারণে এদিক সেদিক থাকা বন্ধুরা একত্র হলেই প্রথম কাজটা হতো কারো গ্রামের বাড়ি হামলা দেয়া । সবচে কাছে কুশলের বাড়ি । বাড়িতে নারকেল গাছ লিচু গাছ আম গাছ বড়ই গাছ । ওর বাসায় গেলে ওর মা আমাদের খুব আদর যত্ন করতেন । কবুতরের মাংসের ঝোলের সাথে বড়সড় মুরগীর ডিমভাজা । সব মিলিয়ে বছরে মিনিমাম দু বার হামলা দেয়া । কুশলের মা , খালামনি এই হামলার দাওয়াত শহরে এলেই দিয়ে যেতেন ।

সেই বার বছরের এমন সময়ের এক দুপুরে কুশলদের বাড়ি যাওয়া ঠিক করলো পাভেল । ঠিক করলো বলতে , আমরা দু একজন রাজি ছিলাম না । ওদের গ্রামে সকাল গিয়ে বিকেল থাকতেই বেরিয়ে আসা উত্তম মনে করতাম । বিকেলে ফিরতে গেলেই যানবাহন পাওয়া কঠিন হয়ে যেত । না পেলে মেইন রোড অব্দি হাটতে হতো , মাইল তিনেকের মতো । এবারে তেমন হলো ।

গ্রামের পথ দিয়ে হাটতে শুরু করেছি , মাইল তিনেকের মাটির পথে । চারিদিকে শেষ বিকেল ।

পাচ বন্ধু দু ভাগে হাটছি । সামনে দুই বন্ধু অনেকটা এগিয়ে । আমার দলের এক বন্ধু , মেহেদি হাতের কনে আঙ্গুলের ইশারায় জানালো তার প্রসাব পেয়েছে ।

সাথে আয় ' পথের পাশে জঙ্গলময় এক বাগানের দিকে ইশারা করে বললো ।
আমরা এখানে দাড়ায় আছি, ভয় নেই ' পশ্চিম দিক হয়ে মুতিস না ' দাড়ায় করিস না ' সন্ধায় তোর লাগলো ' ভুতে ধরবেনি'। আমাদের ফাইজলামি কানে তোলেনা সে । বাগানের দিকে যাওয়া চিকন এক রাস্তা দিয়ে হারিয়ে গেল মেহেদী । একটু পড়েই বেশ হরমরিয়ে ছুটে আসে সামনের দলে থাকা কুশল ।
মেহেদী ভাই কই গেল ?
মুততে'
হায় হায় ওদিক তো কবরস্থান'। মেহেদী ফিরে আসে একটু পর । তার কাজ শেষ। আমাদের কিছুটা অপ্রস্তুত থেকে ভীত হয়ে যাওয়া চোখ দ্যাখে । কুশল বিড়বিড় করে ...কাজটা ঠিক হলো না' !

এইসব নিয়ে ভাবনাটাকে একটু দুরে রাখার চেষ্টা করি। গ্রামের রাস্তায় সন্ধাবেলা এমনিতেই ভয় লাগছে তখন । শেষ গ্রামটা ফেলে এসেছি অনেকক্ষণ আগেই । মেইন রোডে , হাইওয়েতে উঠতে এখন প্রায় মাইল দেড়েক । পা ব্যথা করছে । একটা ভ্যানকে আসতে দেখে থামি । চালককে অনেক বুঝিয়ে রাজি করলাম হাইওয়ে পর্যন্ত আমাদের পৌছে দিতে । ভ্যানে উঠে শরীর একটু এলিয়ে দিলাম । ঠান্ডা বাতাস , ভ্যান ছুটছে ।

আমার সাথে জ্বীন আছে ''
এক ঝটকায় ঝিমুনি কেটে গেল । দোস্ত মেহেদী ভ্যানের উপরে উঠে দাড়িয়েছে । চিত্কার করছে ।
আমার সাথে জ্বীন আছে' । হাত পশ্চিম আকাশের দিকে বাড়ানো । চোখ লাল । আমার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো ''ওই যে জ্বীন , তানিম ওই যে জ্বীন । আমাকে নিয়ে যাবে । '' আবার ধপ করে বসে পরে । আমার হাত চেপে ধরে বলে উঠলো 'আমার সাথে জ্বীন আছে বন্ধু । আমায় চেপে ধরা হাত চেপে ধরে বলি 'বন্ধু তোমার সাথে পরী থাকবে,জ্বীন না ,আর ফাইজলামি কম করো , ভ্যানওয়ালা ভয় পেলে হেটে মেইনরোড যাওয়া লাগবে'। বন্ধু এক ঝটকায় আমার হাত ছাড়িয়ে ভ্যান থেকে লাফিয়ে পরে । রাস্তার উপর দাড়িয়ে পরে 'আমার কাছে জীন আছে' । ভ্যান থামিয়ে ওকে ধরি । পানি খাবো পানি খাবো তিষ্ণা লাগছে বলে রাস্তার পাশের ধান ক্ষেতে লাফিয়ে পড়ল । ক্ষেতে সেচ দেয়া পানি তুলে খাওয়া শুরু করলো। রাস্তায় হতভম্ব হয়ে আমরা চার বন্ধু দাড়িয়ে। ভ্যানওয়ালা ভয় পেয়ে ভ্যান নিয়ে ছুট দিয়েছে ।

যিনি এই লেখাটা পড়ছেন তিনি রাস্তায় থাকলে আর পড়বেন না ।

অনেক কষ্টে মেহেদীকে নিয়ে মেইন রোডে এসে দাড়িয়েছি । সন্ধা পেরিয়েছে তখন । মনের মধ্যে সাহস আরো কমে যাবার আগেই বাড়ি ফিরতে হবে । একটা ফাকা টেম্পু পেয়ে সব দোস্তরা মিলে মেহেদীকে মাঝে নিয়ে উঠে বসলাম । ড্রাইভার আমাদের বয়সী । মেহেদির চোখ দেখে বললো 'ভায়ে কিছু খাইছে নাকি ? । হ্যা ভাই ...আপনে একটু দ্রুত চলেন ।'' হে হে করে একটা হাসি দিয়ে টেম্পু চালু করে সে ।

ওই যে আসতেছে । আমাদের সবাইরে নিয়ে যাবে । আজরাইল আসে । '' মেহেদী হাত বাড়িয়ে আঙ্গুল দিয়ে সোজা সামনের দিকে দেখায় । একটা ট্রাক আসছে । পিছনে আরেকটি বাস কিম্বা ট্রাক । অন্ধকার ভেদ করে তাদের আধ হলদে আলো আমাদের চোখে মুখে । তীব্র আলোতে আমার ভেতরের সব সাহস ধুপ করে নিভে যায় । টেম্পু ড্রাইভার হাউমাউ করে পেছন ফেরে আমাদের দিকে । ভায়ে এগুলা কি কয় '' তোমার এগুলায় কান দেয়ার দরকার নাই , তুমি রাস্তার সাইড দিয়ে চালায় নিয়ে যাও ।'

আমার সাথে জ্বীন আছে । জ্বীন বলছে '' কি বলছে 'আমি বলি । আমাদের পিসে দিবে গাড়ি , এক্সিডেন্ট হবে ,তোরা আমারে নামায় দে '' বন্ধুর হাত দুই পাশ থেকে ধরে রেখে দেই আমরা । মুখে হাত দিই । বন্ধু সুযোগ পেলেই বলে ওঠে '' ঐযে আরো একটা গাড়ি আসতেছে , আমরা সবাই মরবো , আমার সাথে জ্বীন আছে ...'' । এক একটা বাস ট্রাক হুশ করে পাশ দিয়ে বেরিয়ে যায় , আমাদের ভিতর থেকে শিওরে ওঠে । এই বুঝি মেরে দিয়ে গেলো। দুরের আরেকটা গাড়ীর আলোর দিকে তাকিয়ে দেখেই চোখ বুজে ফেলি, তাতে কি ? শব্দ তো কানে আসছে , দানবীয় খুনে শব্দ !

সেই রাতে আমার জ্বর হয়েছিল । এরকম ভয় জীবনে পাই নাই । টেম্পুতে সেই আধা ঘন্টা কেপেছি শুধু । সেই কাপুনিতেই হয়তো জ্বর হয়েছিল !

বন্ধুর সাথে কি হয়েছিল ? আমাদের এলাকায় আসার পর একটু একটু কমতে থাকে ওর কথাবাত্রা । ওর বাসায় পৌছানোর পর ওর বাবা মাকে সব বললাম । মেহেদির চোখ তখনও লাল । কিন্তু চুপচাপ। ওর বাবা বললেন ওকে গোছল করিয়ে দিতে। গোছল করানোর পর এক গ্লাস পানি চাইল শান্ত ভাবে । খেয়ে নিজের বিছানায় গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল । দিন দুয়েক পর জানতে পারলাম সেদিন ভ্যানে ওঠার পর থেকে তার কিছুই মনে নেই । ভ্যানে উঠে তার ঘুম ঘুম পাচ্ছিলো , জেগে দেখে সে বাসায় , পরদিন ঘুম ভাঙ্গে বাসায় তার বিছানায় ।

এরপর আর এখনও কুশলদের বাড়ি , গ্রামের বাড়ি খোট্টাপাড়ায় যাওয়া হয়নি ।

সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই মার্চ, ২০২২ রাত ১২:৩৯
৪টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

গল্পঃ মোহাম্মদপুরে কখনও বিচ্ছেদ হয় না

লিখেছেন রাজসোহান, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১৪





আমার দোকানের নাম নিউ শাপলা কম্পিউটার ও ফটোস্ট্যাট। সাইনবোর্ডের শাপলা ফুলটা এঁকে দিয়েছিলো তাজমহল রোডের এক সাইনম্যান, দেখতে হয়েছিলো কচুরিপানার মতো। চৌদ্দ বছর ধরে ঝুলে আছে। রোদে রঙ উঠে... ...বাকিটুকু পড়ুন

২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা তার সাথে কিছু রুঢ় সত্য যা বদলে দিয়েছিলো দেশের রাজনীতি।

লিখেছেন অন্তর্জাল পরিব্রাজক, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:৩৪





২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা সম্পর্কে আমরা সবাই মোটামুটি জানি। এই হামলায় কারা জড়িত ছিল সেটাও আজকের দিনে অজানা নয় একমাত্র নিতান্ত দলকানা ছাড়া। তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধানমন্ডি ৩২ যারা ভেঙেছিল, আর যারা বিচার চাওয়ার পথ বন্ধ করে দিল- তারা কি একই?

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৯:৪৪



ধানমন্ডি ৩২ যারা ভেঙেছিল, আর যারা বিচার চাওয়ার পথ বন্ধ করে দিল- তারা কি একই?

ধানমন্ডি ৩২ ভাঙা হয়েছিল- কে দেখেনি, কে জানে না, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই।,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন থেকে যারা আওয়ামী লীগকে ভালোবাসেন এখন তাদেরকে আওয়ামী লীগের প্রয়োজন

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৩:৪০



ক্ষমতায় গেলে কোন দল যাদেরকে মনে রাখে না ক্ষমতায় গেলে তাদেরকেই তারা সবচেয়ে বেশী মিস করে। সেই নিখাঁদ দল প্রেমিকদেরকে এখন আওয়ামী লীগ খুঁজছে। তারা লগি বৈঠা নিয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

৫ই আগস্ট ছিলো আরো একটি ১৫/২১শে আগষ্টের অপচেষ্টা।

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:৫২



২১শে আগস্ট পালন করা অর্থে , আমার কাছে মনে হচ্ছে আবারো জঘন্য কোনো ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে। কারন আমরা ঐ নারকীয় হত্যাকাণ্ডের কোনো বিচার সম্পন্ন করতে পারিনি। আমরা যারা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×