somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আ লিটল ফাইটার স্লিপিং উইথ আর্মস

১৭ ই জুলাই, ২০০৮ ভোর ৬:১৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

১.
অনেক না পাওয়ার বিষয়গুলো উপলব্ধি করি। অনেক স্বপ্ন ভাঙ্গার পর নতুন করে স্বপ্ন দেখি।
রোজনামচার অনেকটা অংশ জুড়েই নানরকমের রং লাগানো ভাবনা। ভাবনার তোড়জোড়ে উড়ে যায় অনেক বাস্তবতা। আদতেই কি বাস্তবতা পিছু ছাড়ে!!

কতো না পাওয়ার ভিতর দিয়ে যাওয়া আমাদের পিছু বাস্তবতা কি আদৌও ছেড়েছে? স্বাধীনতার পর এতোবছর গেল, এখনো আমাদের সেই গানের লাইনটার মতোই বলতে হচ্ছে- কি দেখার কথা কি দেখছি..........

মুক্তিযুদ্ধের এতোটা বছর পরেও বিচার হয় নি যুদ্ধাপরাধীদের.......রাজা আসে রাজা যায়.....নেতার পর নেতা নির্বাচিত হয়ে আসে.....সাধারণ এই আমরা জীবনমাত্রার মূল্য বৃদ্ধির যাঁতাকলে পড়ে স্বপ্ন দেখি কেবল......কতোসব কথার তুবড়ি আমাদের সামনে ঘুরে ফিরে........................

কোন সরকার কি বিষয়টাকে অতোটা আন্তরিকতা নিয়ে দেখেছে? তাহলে এতোটা বছরেও কেন বিচার হয় নি! কেন তবে এই দেশে একজন মুক্তিযুদ্ধাকে অপমানিত হয় স্বাধীনতাবিরোধী চিহ্নিত শক্তির একজনের কাছে?

এর বিরোদ্ধে কি প্রদক্ষেপ নিয়েছে সরকার আমার জানা নেই? কিন্তু এমনটা হলো কেন এই স্বাধীন দেশে!! মন ভাবে তা......

২.
একটা লেখা পড়ে বোধটা নড়ে গেল.....বারবার পড়ছি সেই লেখার অংশবিশেষ.....একটা রাত পোহালো এভাবে.......একটা ক্লান্ত ছেলের প্রতিচ্ছবি ভেসে উঠে চোখের সামনে .....বার বার......
১৩ বছরের সেই ছেলেটি মুক্তিযুদ্ধের সময় এসএলআর হাতে বাংকারে বাংকারে ছুটে বেড়তো। একদিন ক্লান্ত ছেলেটি ঘুমিয়ে পড়ে গোলাবারুদের স্তুপের উপর। ঘুমন্ত সেই ছেলেটির ছবি ছাপে লন্ডনের একটি কাগজ। শিরোনাম- আ লিটল ফাইটার স্লিপিং উইথ আর্মস।

এতো বছর পর সেই ছেলেটির উপলব্ধিকে আমি হৃদয় দিয়ে ধরতে যাই..............

আমার প্রয়াত বাবা স্বীকৃতিহীন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তাঁর ১৩ বছরের ছেলেটি এসএলআর হাতে বাংকারে বাংকারে ছুটে বেড়াত।একদিন বাংকারে খাবার পৌছানোর সময় এ্যাম্বুশে পড়ে গেল। সেকেন্দার নামের এক ইপিআর সদস্য ছেলেটিকে এর পর দায়িত্ব দিল আর্মস-এ্যামুনিশন টেন্টের । ক্লান্ত ছেলেটি একদিন গোলাবারুদের স্তুপের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়েছিল.....ঘুম ভাঙার পর শুনল লন্ডনের কোন সাংবাদিকরা তার ছবি তুলে নিয়েছে। ক্যাপটেন মাজহার বলেছিল 'লন্ডনের কাগজে ছবিটা ছাপা হয়েছিল....." আ লিটল ফাইটার স্লিপিং উইথ আর্মস "শিরোনামে। আরো পরে ছেলেটি মেজর জলিল,মেজর আবু ওসমানদের সংস্পর্শে এসেছিল। সেই একাত্তরের দেখা আর তার পরের ৩৫ বছরের দেখা ভীষণ ভাবে কন্ট্রাডিক্ট করেছে। ঘৃনায় কষ্টে বাবা তো মরেছে.....ছেলেটা আজো বেঁচে আছে ...তার বুকের ভেতরে উদগিরণ হওয়া গলিত লাভা গলে গলে পড়ছে কাগজের পাতায় পাতায়......স্লিপিং উইথ আর্মস এর সেই মনজুরুল হকের আর কি-ই বা করার ক্ষমতা আছে...?

৩.
পরের অংশও পড়ি আমি........যুদ্ধ শেষে ফিরে এসে ছোট সেই ছেলেটি কি করেছিল ....জানতে ইচ্ছা হয় খুব।

৭২ এর জানুয়ারির প্রথম দিকে আমরা মেহেরপুর দিয়ে দেশে ফিরি । কয়েক মাস পরেই 'ফটিক" হিসেবে আমার ট্রান্সফার হয় মামার কাছে,দর্শনায় । বাবা-মা চুয়াডাঙ্গায় । তারপর ৭২ এ বাবা-মা চলে যান দিনাজপুর । আমার সঙ্গে ৫ বছরের ছাড়াছাড়ি। সেই কাগজ শুধু নয়, ওই সাংবাদিকরা আমার কান্না রেকর্ড করা একটা ছোট ওয়াকম্যান ও দিয়েছিল । সব হারিয়েছে । মা বলেন তাদেরকে ৭৬ এ আ্যালোটমেন্ট বা অনুদান পাওয়া বাড়ি থেকে যেদিন উচ্ছেদ করা হয় সে সময় নাকি বাবা কষ্টে রাগে তার-আমার সব স্মৃতিই নষ্ট করে ফেলেছিলেন ! বাবা বলতেন ...থাক কষ্ট বাড়ে । জীবন বাঁচাতে ওই সময় এত বেশী কষ্ট করতে হয়েছে যে প্রাণ ধারণের বাইরে সবকিছুই গৌণ হয়ে গেছিল ।
মুক্তিযুদ্ধ কাকে কী দিয়েছে জানি না, তবে আমাকে দিয়েছিল ম্যাচ্যুরিটি । ১২/১৩ বছর বয়সেই তিন বোন আর মা'কে বাঁচাতে অন্য এ যুদ্ধ করতে হয়েছিল । ২০টাকা ভাতা পেতাম । একাধারে পিতামাতাহীন কিশোরদের ক্যাম্প চালানো,থানা শহর তেহট্ট থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের রেশন আনা,বাংকারে রসদ পৌঁছানো ...........।


৪.
সেই ছেলেটির বুকের ভেতরে উদগিরণ হওয়া গলিত লাভা গলে গলে পড়ছে কাগজের পাতায় পাতায়......... ভাবছে- স্লিপিং উইথ আর্মস এর সেই মনজুরুল হকের আর কি-ই বা করার ক্ষমতা আছে...?
গলে গলে পড়া লাভার উত্তাপ আমাকেও স্পর্শ করে যায়। 'করার ক্ষমতা' বিষয়টা নিয়ে আবার ভাবতে বসি আমি। হায় কতো সীমাবদ্ধ আমি এবং আমরা। ভেবে যেতে আর স্বপ্ন দেখেতে হচ্ছে কেবল!!!


আ লিটল ফাইটার স্লিপিং উইথ আর্মস এর উপলব্ধিগুলো আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। ঘুমন্ত সেই বীরের ঘুম দেখে ঘুমানো হয়ে উঠে না আমার.....পাহারা দিতে ইচ্ছা হয় খুব। রাতটা বুঝি আমার নির্ঘুমই কাটলো।


সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই জুলাই, ২০০৮ ভোর ৬:১৯
৬৬টি মন্তব্য ৬০টি উত্তর পূর্বের ৫০টি মন্তব্য দেখুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

জাপান কেন বাঙালির চিরকালের নিঃস্বার্থ বন্ধু?

লিখেছেন রায়হানুল এফ রাজ, ২২ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২০ রাত ৮:৫০



জাপানী সম্রাট হিরোহিতো বাঙ্গলাদেশের প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে বলেছিলেন, ‘যতদিন জাপান থাকবে, বাঙালি খাদ্যাভাবে, অর্থকষ্টে মরবেনা। জাপান হবে বাঙালির চিরকালের নিঃস্বার্থ বন্ধু’! এটি শুধু কথার কথা ছিলো না, তার... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার লেখা প্রথম বই

লিখেছেন ফারহানা শারমিন, ২২ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২০ রাত ৯:১৩



ছোটবেলা থেকেই প্রচন্ড রকম কল্পনাপ্রবণ আমি। একটুতেই কল্পনাই হারিয়ে যাই। গল্প লেখার সময় অন্য লেখকদের মত আমিও কল্পনায় গল্প আঁকি।আমার বহু আকাংখিত বই হাতে পেয়ে প্রথমে খুবই আশাহত হয়েছি। আমার... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির আয়নায়

লিখেছেন নিভৃতা , ২২ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২০ রাত ১১:০৪





কিছুদিন আগে নস্টালজিতে আক্রান্ত হই আমার বাসার বুয়ার জীবনের একটি গল্প শুনে। স্মৃতিকাতর হয়ে সেই বিটিভি যুগে ফিরে গিয়েছিলাম।

এই বুয়া... ...বাকিটুকু পড়ুন

নতুন জীবন- নয়

লিখেছেন করুণাধারা, ২৩ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২০ দুপুর ১২:০২



আগের পর্ব: নতুন জীবন- আট

অবশেষে আনুষ্ঠানিক ভাবে আমার বোন পেট্রার জন্মকে স্বীকৃতি দেয়া হল। আমাকে জানানো হল আমার একটা বোন হয়েছে। আমি বোন দেখতে গেলাম, দেখি মায়ের পাশে ছোট একটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সর্বশ্রেষ্ঠ নবী এবং রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর ওফাতকালীন ঘটনাসমূহ (প্রথম পর্ব)

লিখেছেন নীল আকাশ, ২৩ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২০ বিকাল ৪:৩৬



[সকল প্রশংসা আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের জন্য, যিনি আমাদেরকে সর্বোত্তম দীনের অনুসারী ও সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর উম্মত হওয়ার তৌফিক দান করেছেন। সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক... ...বাকিটুকু পড়ুন

×