somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

অঙ্গার

১৯ শে জানুয়ারি, ২০১৬ রাত ১০:০৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

দেহের ছিন্নাংশ নাও
আমার মা’র
আমার বাবার
আর অমূল্য সম্পদ হারানো
আমার প্রিয় বোনটির;
পাঠিয়ে দাও বিশ্ববিবেকের কাছে
ওদের বলো,
আমি এখন সন্ত্রাসী…

খুব সুন্দর একটা বাড়ি আমাদের। জাঁকজমকপূর্ণ নয়। তবে সাজানো-গোছানো। এলাকায় আমাদের বাড়িটার সামনে এসেই পথিকের চোখ আটকে থাকে। হয়তো মনে মনে ভাবে, “ইশ! এরকম একটা বাড়ি যদি বানাতে পারতাম!” অথবা ভাবে, “শালা বাড়িওয়ালা নিশ্চয় বিদেশিদের দালাল। এতো টাকা পায় কোত্থেকে?”

আব্বু যথেষ্ট হিসেবী মানুষ। অপচয় করতে দেখি নি কখনও। বাজারে ভালো একটা দোকান আছে। ছোটো একটা পরিবার চালাতে কোনো বেগই পেতে হয় না। মাসশেষে কিছু সঞ্চয়। এভাবেই আব্বু করেছেন বাড়িটা। অবশ্য অনেকে সন্দেহ করে আব্বুকে নিয়ে। কথার গুঞ্জণ আমার কানেও আসে। কিন্তু কেউ সরাসরি বলতে সাহস পায় না। যদি ধরিয়ে দিই বিদেশিদের হাতে! স্বপ্ন ভেঙ্গে সব চুরমার হয়ে যাবে তাহলে। ছোট্ট শিশু থেকে শুরু করে শতবর্ষী বৃদ্ধ। কেউ বাঁচে না ওদের নির্মমতা থেকে। এই তো সেদিন। পাশের বাড়ির একমাত্র মেয়েকে ধরে নিয়ে গেলো। তার মা সহ্য করতে পারে নি। চিৎকার করে উঠেছিলো। সাথে সাথে গর্জে উঠেছিলো আগ্নেয়াস্ত্র। মায়ের লাশ পেছনে ফেলে মেয়েটা যেতে বাধ্য হলো মৃত্যুপুরিতে। তখন সবাই সন্দেহ করেছিলো, এর মূল হোতা আমার আব্বু। কিন্তু আমি দেখেছি। আমিই দেখেছি। ঘটনার সময় আব্বুর চোখে অশ্রু।

এসব আমার কিশোরমনে যথেষ্ট প্রভাব ফেলে। উচ্ছ্বল থাকার চেষ্টা করলেও প্রায়ই বেদনার কালো মেঘ আমার হৃদয়কে আচ্ছন্ন করে। বাড়ির সামনে বিশাল মাঠ। বন্ধুদের দেখি, খেলছে। হাসছে। গাইছে। ওদের মনে এতো আনন্দ কীভাবে বাসা বাঁধে?

এক দুপুরে। মা’র পাশে বসে গল্প করছি। ছোট্ট বোনটি সামনে এসে বসেছে। চুলের বেণী করে দিতে হবে তাকে। ছোটকাল থেকেই আমার কাছে ওর নানা আবদার। ফিরিয়ে দিই নি কখনও। বেণী করে দিচ্ছি। মা গল্প শোনাচ্ছেন, “ফযর পড়েই আমরা ছুটতাম মক্তবে। কী আনন্দের দিন ছিলো!” তখনই। বাবার করুণ স্বর শুনতে পেলাম। আমার কাছে খুব অপরিচিত। নাহ, এ আমার বাবার কণ্ঠ নয়! আশঙ্কায় বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হচ্ছে না। এ ভরদুপুরে বাবার কী হতে পারে? শরীর খারাপ, না…? ভাবতে ভাবতেই চমকে উঠলাম। শরীরের প্রতিটি লোম দাঁড়িয়ে গেলো। দরজায় লাথির আওয়াজ। মনে হচ্ছে, পৃথিবীটা অন্ধকার হয়ে আসছে। বিকট আওয়াজে ভেঙ্গে পড়ছে আকাশটা।

একের পর এক লাথি মেরেই যাচ্ছে। উঠতে পারছি না কেউ। শরীরের শক্তি হারিয়ে যাচ্ছে। ক্রমশ…। আবার চিৎকার করে উঠলো তারা। ভিনদেশি ভাষায় কী যেনো বলছে। তার মানে দখলদার সৈন্য! বাবা তাদের হাতে বন্দি। ভাবতে পারছি না। অজ্ঞান হয়ে যাবো মনে হচ্ছে। পৃথিবীতে যাদের চোখ আছে। যাদের কান আছে। যাদের হৃদয় আছে। তারা প্রত্যেকে জানে। পশুগুলির হাতে নিরপরাধ মানুষও নিরাপদ নয়…।

এক সময় দরজা ভেঙ্গে ঢুকে পড়লো তারা। চেহারায় বুনো হিংস্রতা। চেহারা দেখেই বোঝা যায়, বাবার আদর পায় নি কভু। মনুষ্যত্ব শিক্ষার কোনো ব্যবস্থা ওদের সভ্যতায় নেই। ওরা পশুর চেয়ে অধম। বাবাকে মেরে রক্তাক্ত করে ফেলেছে। চুল খামচে ধরে আছে একটা কীট। বাবা অজ্ঞান কি-না বুঝলাম না। কেমন করে যেনো তাকিয়ে আছেন। অসীম স্নেহে যে চোখ দিয়ে তাকাতেন আমার দিকে। সে চোখে আজ এ কেমন দৃষ্টি! অজান্তেই আর্তনাদ করে উঠলাম। জড়িয়ে ধরলাম মাকে।

মা-ও যেনো পাথর হয়ে গেছেন। করুণ চাহনি দেখে খুব খারাপ লাগছে। বুকের ভেতর কিছু একটা ভেঙ্গে যাওয়ার শব্দ পেলাম। এমন বেদনা, এমন যাতনা কখনও সইতে হয় নি আমাকে। মা আমাকে আর ছোটবোনকে ধরে প্রাণভিক্ষা চাচ্ছেন। পৃথিবীর বুকে আর কয়টা দিন বেঁচে থাকার একটু আকুতি। নাহ! ওদের পাষাণ হৃদয়ে মা’র আর্তনাদ কোনো রেখাপাতই করতে পারলো না। অথচ মা’র আকুতি-মিনতির প্রতিটি শব্দ আমার কলজেতে শেলের মতো বিঁধছে। বিঁধবে প্রতিটি মানুষের কলজেতে। কিন্তু ওরা বুঝলো না অন্তরের ভাষা। প্রাণের ভাষা। কারণ, ওরা যে মাকে ভালোবাসতেই শিখে নি! অমানবিক আচরণ করলো। আমার মা’র সাথে। আমার বোনের সাথে। যাদেরকে জড়িয়ে আমার হাজারও স্মৃতি। নিষ্কলুষ ভালোবাসা।

ঘোর কাটতে কাটতে অনুভব করলাম, বাড়িতে আগুন জ্বলছে। লেলিহান অগ্নি এখনই গিলে নিবে কতগুলো প্রাণী। মা নেই ধরায়। বাবাও। আদরের ছোট্ট বোনটি আহত। কাঁতড়াচ্ছে। জ্ঞান নেই বোধহয়। রক্তেমাখা পুরো শরীর। কাঁধে তুলে নিলাম। তারপর দৌড়। পা যেনো নিশ্চল হয়ে গেছে। কষ্ট করে বের করে নিয়ে এলাম। আর কিছুক্ষণ দেরি করলেই আগুনের পেটে বিকৃত হয়ে যেতাম। মা-বাবার লাশ পুড়তে থাকলো। পুড়তে থাকলো আমার অস্তিত্ব। পুড়তে থাকলো আমার সভ্যতা।

দিনের আলো ফুরিয়ে আসছে। আজ কোথায় ঘুমাবো। আমার ঘর নেই। আশ্রয় নেই। নিজ ভূমি থেকে মানুষকে এভাবে তাড়িয়ে দেয়া যায়? ছোট বোনকে জড়িয়ে ঘুমালাম রাতে। চৌরাস্তার বড়ো দোকানটার সামনে। সকালের কথা মনে পড়ছে। ওর মিষ্টি কণ্ঠটাও কানে বাজছে। “ভাইয়া, ওই যে! ওই চকোলেটটা দাও!” মা-বাবাকে হারিয়ে ও কি এখনও চকোলেট পছন্দ করবে? মনে হয় না।
সকালে উঠে চমকে গেলাম। আমার বুক খালি। চারিদিকে খুঁজতে লাগলাম আদরের বোনকে। পেলাম না। ও কি তবে কোনো দুর্ঘটনা ঘটিয়েছে? হতে পারে। লাজুক বোনটি কীভাবে মুখ দেখাবে আমাকে!

দুঃসহ এসব স্মৃতি মুছে যাবার নয়। ক্রোধের জ্বলন্ত অঙ্গার নিভে যাবার নয়। নয় কভু শান্ত হবার। ক্ষোভ বুকে চেপে রেখেই হেঁটে চলি এখানে-ওখানে। সবখানেই শুনি বিদ্রোহীদের আওয়াজ। মানুষ এখন জীবনের চেয়েও স্বাধীনতাকে ভালোবাসে। স্বপ্ন দেখি, এসব স্বাধীনতাকামী প্রতিরোধ-যোদ্ধা বুকের তাজা রক্ত ঢেলে স্বাধীনতার মশাল জ্বালবে।

এক রাতে। আমি নিজেকেও স্বাধীনতাকামীদের মিছিলে আবিষ্কার করি। এগিয়ে যাচ্ছি ক্রমেই। বাংকার উড়িয়ে দিচ্ছি। কাঁটাতারের বেড়া ভেদ করে ছুটে যাচ্ছি শত্রুমহলে। স্বাধীনতাকে খুঁজছি সরাসরি সেনাদের মেশিনগানের নলের ভেতর তাকিয়ে। শত্রুর গাল খামচে ধরে চোখে চোখ রেখে বোঝাতে চাচ্ছি। প্রাণের ভাষা। কিন্তু ওরা বোঝে না। বুঝবে কীভাবে? ওরা তো অমানুষ! তাই মানবতার সংজ্ঞায় বারবার ভুল করে বসে। ওরা কাপুরুষ! তাই অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে নিরস্ত্র মানুষের সাথে খেলতে আসে।

আমরাও ছাড়বার পাত্র নই। আমাদের আছে হাজারও বছরের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। তাই জেগে উঠছি রক্তের টানে। তুমিও এসো! পরাধীন উপত্যকাজুড়ে অবিরত ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হোক স্বাধীনতার নাকারা। বিশ্বাস করো। ওদের তাড়াতে অস্ত্র লাগবে না। স্বাধীনতাকামীদেও চোখের বারুদ দেখলেই ছুটে পালাবে কাপুরুষের দল। এসো! উপহাস ছুড়ে দিই অসংখ্য “আবু গারিব”-এর দিকে…
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে জানুয়ারি, ২০১৬ রাত ১০:১০
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আম্লিগ যদি আসে তাহলে ....... :(

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ০৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:২৬



বিএনপি। আপনারা ১৭ বছর ঘরে থাকতে পারেন নাই কিন্তু এখন যদি আবার আম্লিগ ফিরে আনেন তাহলে আপনারা তো দূরের কথা আপনার বাড়ির মাটিও থাকবে না। আপনার ঘর-দরজা থাকবেনা। শুধু... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাঝে মাঝে তব দেখা পাই, চিরকাল কেন পাই না?

লিখেছেন ঋণাত্মক শূণ্য, ০৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:৫২

বিল গেটস এর নামে একটা কথা প্রচলতি আছে; জানি না কথাটা বিল বলেছে কি না, তবে আমার কাছে মাঝে মাঝে কথাটা সত্য মনে হয়। কথাটা এমনঃ আমি কোন কাজ করবার... ...বাকিটুকু পড়ুন

দেশের দুর্নীতি প্রতিরোধের জন্য একটি কাকতাড়ুয়া মডেল–২০২৬ নীতিপত্র প্রস্তাবনা দৃশ্যমান জবাবদিহি, নাগরিক নজরদারি ও AI প্রযুক্তিনির্ভর অনিয়ম প্রতিরোধ ব্যবস্থা

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ০৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৭:০৮


বাংলাদেশে দুর্নীতি ও অনিয়ম মোকাবিলায় প্রচলিত ব্যবস্থার একটি বড় অংশ হলো অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পরে তদন্ত ও শাস্তি।
কাকতাড়ুয়া মডেল–২০২৬-এর দর্শন হবে তার পাশাপাশি অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আগেই প্রতিরোধমূলক... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাঁধনের ওপর হামলা নিন্দনীয়- কিন্তু নীতির মাপকাঠি কি সবার জন্য এক?

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:২৩


বাঁধনের ওপর হামলা নিন্দনীয়- কিন্তু নীতির মাপকাঠি কি সবার জন্য এক?

আজমেরী হক বাঁধন ইতালিতে হেনস্তা ও হামলার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, জুলাই- আগস্টের আন্দোলনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ট্রাক্টরগাজি → চাঁদগাজী → সোনাগাজী → জেনারেশন৭১ কে নিয়ে দুটি কথা।

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ০৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:৫৯


ব্লগার গাজী সাহেব জ্ঞানী কিন্তু তিনি কট্টরপন্থী তাঁর ছেড়া টাইপের মানুষ তবে আলাপচারীতার লোক হিবেবে উনি খারাপ না। আপনি যদি ওনার সংগে হিজড়া রানূ-র মতো জ্বীহুজুর জ্বীহুজুর বলেন এবং... ...বাকিটুকু পড়ুন

×