
সময়টা তখন ২০০৯, প্রথম আলো প্রত্রিকায় শিরোনামে দেখলাম জাঁকজমক এক সেতুর নকশা তার নিচে লিখা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আরো এক ধাপ এগিয়ে স্বপ্নের সেতু। ভাবতে লাগলাম স্বপ্নের সেতু আবার কি? এমন সেতুতো কত দেখেছি । চোখের সামনেই উঠতে দেখেছি কর্ণফুলি সেতুকে। এ আবার কেমন স্বপ্ন হল! বিস্তারিত জানার জন্য খবরে চোখ দিলাম। পানি প্রবাহের দিক থেকে পদ্মার প্রবাহ বিশ্বের মধ্যে দ্বিতীয়। এই
হিসেবে বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ
পানিপ্রবাহের মধ্যে নির্মিত হবে এই মেগা স্ট্রাকচার। বিশ্বে এ ধরনের
খরস্রোতা নদীতে এর আগে সেতু
নির্মাণ হয়নি। আর এটি সম্পন্ন হলে পদ্মা
বহুমুখী সেতু ‘বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ
স্থাপনার মর্যাদা পাবে শুনে একটু নেড়ে চেড়ে বসলাম আর যখনই জানতে পারলাম এই দ্বিতল সেতুতে উপরের তলায়
চার লেনের সড়ক এবং নিচের তলায়
ট্রেন লাইন থাকবে তখন জানার আগ্রহটা আরো বেড়ে গেল। হাতের মুঠোয় তখন এত সস্তা নেট ছিল না। জানার পিপাসা মিটাতে দৈনিক প্রত্রিকা আর টিভির পাতায় চোখ বুলাতে লাগলাম নিয়মিত । সপ্নের সেতুর খোজে নিজের সপ্নটাই যেন হারানোর পথে। এভাবে হয়ত দু এক বছর কেটে গেল। হঠাৎ একদিন নিউ মার্কেট মোড়ে হাটার সময় চোখে পড়লো "পদ্মার বুকে স্বপ্ন" শিরোনামের একটি ম্যাগাজিন। উত্তেজনার চাপে থাকতে না পারে ম্যাগাজিনটা কিনেই ফেললাম। আমার জীবনে কিনা প্রথম ম্যাগাজিন। পড়ে জানতে পারলাম স্বপ্নটা আসলে আজকে কালকের নয় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৯৮ সালে পদ্মা সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেন। জানতে পারলাম গুটি গুটি পায়ে এত দূর আসার গল্প, বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে ঋণচুক্তি, আর আশার অনেক বাণী, ভাবলাম এবার হয়ত কিছু হবে । মাঝে দিয়ে কিছু সময় কেটে গেল। আর ঋণচুক্তি ও ততদিনে চুরির অভিযোগে বাতিল হল পদ্মার বুকে স্বপ্ন বাস্তবায়নের শেষ আশাটুকুও ডুবে গেল। সে সময় এক বড় ভাই সবজান্তা ভাব নিয়ে বলে উঠল এই সেতুটা হচ্ছে না করণ স্বপ্নের সেতু হয়ে গেলে সেটা আর স্বপ্নে থাকবে কি করে! ব্যপারটা পুরোপুরি অযৌক্তিক হলেও এই কথাটাকেই আপন মনে মেনে নিয়ে দীর্ঘ সময় পাড়ি দিলাম। এক সময় আশার ডাক শুনতে পেলাম, শুনতে পেলাম নিজ অর্থায়নেই সপ্নের সেতু নির্মাণের সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। তার কিছু দিনের মধ্যেই শুরু হল নির্মাণ কাজ। তখন হাতের মুঠোয় সস্তা নেট এর প্রচলন ঘটে গেছে পুরো দমে। জানার আগ্রহ মেটাতে আর টিভি, পেপার কিংবা ম্যগাজিনের উপর নির্ভর করতে হয় না একটা মুঠোফোনই যথেষ্ট। নেট এ প্রতিনিয়ত খোজ খবর নিতে লাগলাম স্বপ্নের সেতুটির । ছবিতে পানির নিচ থেকে উঠে আসা একটি পিলারের একাংশ দেখেও মনকে শান্তনা দিতে পারিনি । ঢাকার মামাতো ভাই একদিন মাওয়া পয়েন্টে গিয়ে ভিডিও কলের মাধ্যমে ও স্বপ্নের ঘোরটা কাটাতে ব্যর্থ হয়েছে । কারণ, স্বপ্নের জিনিস বাস্তবে না দেখলে স্বপ্নের ঘোর কাটে কিভাবে? তাই এই ঘোর কাটাতে গত বছরের শেষের দিকে বন্ধুদের নিয়ে ছুটে গেলাম পদ্মার পাড়ে স্বপ্নের সেতুর কাছ। ভাবতেই অবাক লাগলো ১৯ বছর ধরে যাকে নিয়ে এত জল্পনা কল্পনা যে এক সময় শুধু স্বপ্নই ছিল সে বাস্তবে এখন আমার চোখের সামনে। তবুও একটু কমতি রয়েই গেল। শুধু পিলার গুলোই দৃশ্যমান উপরে স্প্যান গুলো তখনও বসে নি। স্বপ্নের সেতুর রুপ নেনি। তখনও অনেকে অনেক কূটুক্তি করতে লাগল "ঘুম থেকে জেগো না তাহলে স্বপ্ন ভেঙ্গে যাবে" ! কিন্তু সেইবার আর হতাশ হইনি করণ জানি স্বপ্নটা বস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি মাত্র । কিন্তু একবছরের মাথায় যে বাস্তাবায়ন হবে সেটা জানা ছিল না। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে গত শনিবার সেপ্টেম্বর ৩০ তারিখ প্রথম স্প্যান স্থাপনের মধ্য দিয়েই যেন স্বপ্নটা বাস্তব রুপ নিল। সেদিন টিভির পাতায় যখন স্প্যান স্থাপনের দৃশ্যটি দেখলাম বুকের ভিতরটা কেমন হু হু করে উঠলো যেমনটা হয় মাশরাফির নেতৃত্বে বাংলাদেশ কোন ম্যাচ এ জিতলে। নিঃসন্দেহে এটি পুরো বাঙ্গালি জাতির জন্য গর্বের বিষয়। তাই আবারও ছুটে যাব পদ্মার বুকে এই দৃশ্যমান বাস্তবতাকে উপভোগ করতে। কে জানতো প্রত্রিকার শিরোনামে দেখা স্বপ্নের সেতু ৮ বছর পর বাস্তব সেতুতে রুপ নিবে !
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে ডিসেম্বর, ২০১৯ ভোর ৪:০২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



