
এখন শুভর পড়াশুনা শেষ, ছোটখাটো একটা চাকুরীও জুটিয়ে ফেলেছে। ভ্যালেন্টাইন ডে আসছে, তাই শুভর মনটা খুব খারাপ। শুভ মনে পড়ে গেল তার হারিয়ে ফেলা ভালবাসা সুপ্তিকে। শুভর বাবা চট্টগ্রাম বদলী হওয়ার আগে ঢাকাতে ওরা ভাড়া বাসায় থাকতো। শুভ তখন ইন্টারমিডিয়েটের ছাত্র, পড়াশুনার ভিষন চাপ। মাঝেমাঝে পড়ার ফাকে বাসার ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকতো। মানুষের চলাফেরা , ফেরিওয়ালা, ভিক্ষুকদের হাকডাক দেখতো। কখন কোন ফেরিওয়ালা আসবে, কয়টার সময় দুধওয়ালা আসবে সবই শুভর মুখস্থ। মাঝেমাঝে একটা মেয়ে চুল শুকাতে সামনের বাসার ছাদে আসতো,শ্যমলা বর্ণের কিন্তু চোখদুটো কেমন যেনো মায়াভরা। মেয়েটার ছাদে উঠার রুটিনও মুটামুটি মুখস্থ হয়ে গেছে শুভর। ছুটির দিন বাদে প্রতিদিন একটা পঁয়তাল্লিশ থেকে দুটোর মধ্যে মেয়েটা ছাদে ওঠে চুল শুকাতে। শুভর কলেজ দেড়টা পর্যন্ত, কলেজ শেষ হওয়ার সাথে সাথে রাস্তায় এক মিনিটও দেরী করে না শুভ, সরাসরি বাসায় চলে আসে। এরপর ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে এমন ভাব নিয়ে মেয়েটার দিকে তাকায়, যেনো মেয়েটা নয় রাস্তার ফেরিওয়ালা, এবং ফকিরদের দেখার জন্য দাঁড়িয়ে আছে।
একদিন ভর দুপুরে শুভ কলেজ থেকে এসে দ্রুত নিজেদের বাসার ছাদে উঠলো। মেয়েটা তখন ছাদে চুল শুকাচ্ছিল। মেয়েটা কি মনে করবে সেটা ভেবে ছাদে ট্যাংকির পাশের পানির কল ঘুরাতে লাগলো। যেন মেয়েটা ভাবে বাসায় পানি নেই তাই ছাদে দেখতে এসেছে। কিছুক্ষণ পরই একটা ঢিল পড়লো তাদের ছাদে সাথে একটা কাগজ জড়ানো। কাগজে লেখা,
'আরে মশাই যতই কল ঘুরান আপনি যে আমাকে দেখতে ছাদে উঠেছেন সেটা আমি ভালই বুঝতে পারছি'।
শুভর বুকের ভিতর ৩৫০ ভোল্টের বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয়ে গেল।এটাকি স্বপ্ন নাকি সত্যি! শুভ তখন দৌড়ে বাসায় গিয়ে একটা কাগজ কলম নিয়ে এল। শুভ লিখলো,
' দেখুন সত্যি আমাদের বাসার কলে পানি ছিল না তাই দেখতে এসেছি। তবে আপনি সুন্দর সেটা মানতেই হবে। সবচেয়ে সুন্দর আপনার চোখ, কেমন যেন মায়াভরা। আমার নাম শুভ, ইন্টারমিডিয়েট ফাস্ট ইয়ার'
লেখা শেষ করে শুভ কাগজটি ইটের সাথে পেঁচিয়ে পাশের ছাদে ঢিল মারলো। মেয়েটা কুড়িয়ে নিয়ে পড়লো। এর কিছুক্ষণ পর আবার ঢিলের সাথে আর একটা চিঠি তাতে লেখা,
'আমি সুপ্তি, ক্লাস নাইনে পড়ি
অত ভনিতা করেন কেন মশাই? সরাসরি বললেই পারেন আমাকে দেখতে ছাদে উঠেছেন। আপনি ব্যালকনি থেকে আমাদের বাসার দিকে হা করে তাকিয়ে থাকেন, আমি ভালই বুঝতে পারি আপনি আমাকে দেখার জন্য ব্যালকনিতে দাঁড়ান।
এরপর শুভ সাহসী হয়ে উঠলো, এবং লিখলো 'ঠিক আছে স্বীকার করলাম আপনাকে দেখার জন্যই ছাদে উঠেছি, কোন সমস্যা?
এই চিঠি পেয়ে কোন জবাব না মিষ্টি হেসে হাত নেড়ে সুপ্তি বাসায় চলে যায়।
সুপ্তিদের বাসা এবং শুভদের বাসা সামনাসামনি, শুভর পড়ার ঘর থেকে সুপ্তির পড়ার ঘর দেখা যেতো। শুভ এখন সবসময় ঘরের জানালা খোলা রাখে, এবং পর্দা সরিয়ে রাখে যাতে মাঝেমাঝে সুপ্তিকে দেখা যায়। পরদিন আবার কলেজ থেকে ফিরেই শুভ ছাদে যায়। কিছুক্ষণ পরেই সুপ্তির চিঠি,
'আরে মশাই অমন করে আমার দিকে হা করে তাকিয়ে থাকবেন না,গালে মাছি ঢুকবে। আর পড়াশুনায় মন দিন,নইলে ফেল করবেন, ইন্টারমিডিয়েট এর পড়া শুনেছি খুব কঠিন'
শুভ এবার বাংলা সিনেমার নায়কের মত ডায়লগ লিখলো, 'ঠিকই বলেছেন ইন্টারমিডিয়েট এর পড়াশুনা খুব কঠিন, তবে আপনি পাশে থাকলে আমার কাছে কিছুই কঠিন নয়'
এরপর থেকে শুভ পড়াশুনায় খুব মনোযোগী হয়ে উঠলো। সুপ্তিও সামনে এস এস সি পরিক্ষার প্রস্তুতি নিতে থাকলো। তবে প্রতিদিন দুপুর বেলা আধাঘণ্টা বরাদ্দ ছিল সুপ্তির জন্য। এ সময় চিঠি চালাচালিও চলতে থাকলো।
(আগামী পর্বে সমাপ্ত)
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে জানুয়ারি, ২০১৮ বিকাল ৪:৫৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




