somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

তারেক_মাহমুদ
আমি লেখক নই, মাঝে মাঝে নিজের মনের ভাবনাগুলো লিখতে ভাল লাগে। যা মনে আসে তাই লিখি,নিজের ভাললাগার জন্য লিখি। বর্তমানের এই ভাবনাগুলোর সাথে ভবিষ্যতের আমাকে মেলানোর জন্যই এই টুকটাক লেখালেখি।

প্রাণের সই

১৬ ই এপ্রিল, ২০১৯ সকাল ১১:৫৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

‌মিনা আর রুমার বন্ধুত্ব প্রাইমারী স্কুল থেকে, ছেলেবেলায় ওরা ছিল দুই প্রাণ এক আত্মা। নিজেদের গাছের পাকা পেয়ারাটার অর্ধেক মিনা যেমন রুমাকে না দিয়ে কখনোই খেতো না। আবার মায়ের ভাপাপিঠা বানানো শেষ হওয়ার আগেই একখানা পিঠা তুলে দৌড়ে মিনাদের বাড়ি চলে যেতো রুমা তারপর দুই সই মিলে সেই পিঠা ভাগাভাগি করে খেতো। ওদের এই বন্ধুত্বকে ক্লাশের কেউ কেউ হিংসা করতো আবার কেউবা হাসাহাসি করতো কিন্তু  তাতে ওদের কিচ্ছু যায় আসতো না। 

মিনা ও রুমা দুজনেই গ্রামের গেরস্থ পরিবারের  মেয়ে। বনেবাদাড়ে ঘুরে বেড়ানো, অন্যের আম গাছের কাচা আমের উপর হামলাও চালাতো একসাথে। দুজনে এভাবে একসাথে হেসেখেলে বড় হতে থাকে।

মেয়ে বড় হওয়ার পর গ্রামের বাবাদের একমাত্র চিন্তা মেয়েকে সৎ পাত্রে পাত্রস্থ  করা। মিনা সুন্দরী তাই চারিদিক থেকে তার বিয়ের প্রস্তাব আসতে থাকে। ক্লাশ এইটে উঠতে না উঠতেই বিয়ে হয়ে যায়। পাত্রের নাম মিলন শেখ। মোটামুটি অবস্থাসম্পন্ন গেরস্থ পরিবারের  ছেলে। বাবা যখন মারা যায় তখন মিলনের বয়স ১৫/১৬ বছর। এরপর আর পড়াশোনা হয়নি তার,  বাবার  রেখে  যাওয়া দশ বিঘা জমি, দুটো হালের বলদ, একটি গাইগরুকে সামলানোর দায়িত্ব পড়ে তার উপর। ছেলেবেলা থেকেই মিলন কঠোর পরিশ্রমী তার বাবার রেখে যাওয়া দশ বিঘা জমির সাথে নিজ চেষ্টায় আরও তিন বিঘা কিনেছে  , বাড়ির পাশের মজা পুকুরটাকে সংস্কার করে সেখানে মাছের চাষ করেছে তা থেকেও বেশ ভালই আয় তার।   

মহা ধুমধামের সাথে মিলনের সাথে মিনার বিয়ে হয়ে যায়। গ্রামের নাক উচু জমিলা চাচীও পান চাবাতে চাবাতে বলেন 
-মিলনের বউটা সত্যি দেখার মত হয়েছে। 

বিয়ের কিছুদিনের মধ্যে মিনা বুঝতে পারে মিলন শুধু কর্মঠই নয়, বেশ সরল এবং পরোপকারী। গ্রামের যেকোনো মানুষ মারা গেলে মিলন সবার আগে কোদাল নিয়ে ভিড়ে যায় কবর খুড়তে।  আবার গ্রামের যেকারো ছেলেমেয়ের  বিয়ে,মসজিদের সিন্নি বা অন্য যেকোনো  সামাজিক অনুষ্ঠানে মিলন বিনা পারিশ্রমিকে রান্না করে দেয়। এত সমাজসেবা অবশ্য মিনার পছন্দ নয়।মিনার কাছে এটা ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর মত । বেশ সুখেই কাটতে থাকে তাদের কয়েকটি বছর। এরইমধ্যে মিনা দুটি ছেলে ও একটি মেয়ের মা হয়।   

ওদিকে মিনার বান্ধবী রুমার তখনো বিয়ে হয়নি।বাবার আর্থিক অবস্থার কারণে রুমার স্কুলে যাওয়াও বন্ধ হয়। এখন বিয়ের জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া কোন কাজ নেই রুমার। মিনার মত সুন্দরী না হওয়ায় বিয়ে হচ্ছিল না তার, বাবার বড্ড দুঃচিন্তা মেয়েকে নিয়ে। একই বয়সী বান্ধবী মিনার তিন তিনটে বাচ্চা অথচ রুমার পোড়া কপাল। 


মিলনের চাচাতো ভাই খোকন বিয়ের জন্য পাত্রী খুজছিল দীর্ঘদিন ধরে। খোকন গায়ে গতরে সুপুরুষ,বাবার জমিজমাও একেবারে কম নয় কিন্তু অতিশয় অলস বাবার কাছ থেকে ভাগে পাওয়া জমিগুলো বর্গা দিয়ে যা ফসল পায় তা দিয়ে তার এবং বৃদ্ধা মায়ের মোটামুটি খাওয়া পরার অভাব হয় না। বাড়তি টাকাগুলো বিড়ি আর তাসের পিছনে খরচ করে।   মিনা প্রথমে মনে মনে চেয়েছিল বান্ধবী রুমার সাথে খোকনের বিয়ে দেবে কিন্তু খোকনের বদ অভ্যাসগুলির জন্য মিনা একটু ইতস্তত করে। শেষে বিষয়টা মিলনের সাথে আলাপ করে। মিলন বলে
-পুরুষ মানুষ ও রকম একটু আধটু বদ অভ্যাস থাকেই বিয়ে হলে ঠিক হয়ে যাবে।

অবশেষে খোকনের সাথে রুমার বিয়েটা হয়ে যায়।এই বিয়েটা অনেকের জন্যই বেশ আনন্দের। রুমার বাবা যেমন মেয়েকে পাত্রস্থ করতে পেরে খুশি, খোকন বউ পেয়ে খুশি, মিনা খুশি তার প্রিয় সইকে চোখের সামনে দেখতে পেয়ে।ছেলেবেলার মতই সংসারের কাজের ফাঁকে ফাঁকে একেঅপরের বাড়িতে নানান গল্প আর খুনসুটিতে মেতে ওঠে ওরা। ওদের গল্পে ছেলেবেলা, সংসারের সুখদুঃখ, এমনকি স্বামীর সাথে কাটানো একান্ত সময়গুলোও বাদ পড়ে না। এরই মধ্যে রুমাও দুই ছেলের মা হয়, মিনার মত রুমাও এখন সুখী রমনী।

সময়ের সাথে সাথে মিলন কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজের অবস্থার উন্নতি করতে থাকে,বাড়িতে পাকা দালান ঘর তোলে, ছেলেমেয়েরাও বড় হতে থাকে। ওদিকে খোকন বিয়ের প্রথম কয়েক বছর তাস জুয়া ছেড়ে কাজে মনোযোগ দিলেও বর্তমানে আবারও শুরু করেছে। তাই রুমার সংসারে অভাব জেকে বসেছে। মিনা যতটুকু সম্ভব সহায়তা করার চেষ্টা করে। ঘরে ভাল কিছু রান্না হলে রুমাকে একবাটি দেওয়া চাই ই চাই।

খোকন মিলনের কাছ থেকে নানা অজুহাতে টাকা ধার নিতে থাকে, কখনো একশো, কখনো দু'শো আবার কখনো পাচশো । কিন্তু কখনোই ধারের টাকা ফেরত দেয় না, এমনকি বেশ কয়েকবার তাগাদা দেওয়ার পরও টাকা ফেরত দেয় না। এ নিয়ে দুজনের মধ্যে মনমালিন্য হয়। খোকন তার বউকে বলে
-আর কোনদিন যদি ওই বাড়িতে যাও তবে আমার বাড়ির দরজা তোমার জন্য বন্ধ ।
মিনা বেশ কয়েকবার তরকারি রেধে পাঠালেও খোকনের হুকুমে তা ফেরত দিয়ে দেয় রুমা।



এরইমধ্যে অনেকটা সময় কেটে যায়, মিনার বড় ছেলে পড়াশোনায় ভাল না হওয়ার তাকে সৌদি আরব পাঠিয়েছে মিলন,মেঝোছেলেটা ঢাকার একটি কলেজে পড়াশোনা করছে আর মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। অন্যদিকে রুমার সংসারের অবস্থা আগের চেয়েও খারাপ,দুটোছেলের একটাও স্কুলের গন্ডি পার করে কলেজ অব্দি পৌছাতে পারেনি।

হঠাৎ করেই মিনার সংসারে ছন্দপতন ঘটে,মিলনের শরীরটা দিন দিন খারাপ হতে থাকে।স্থানীয় ডাক্তাররা মিলনের রোগ ধরতে পারেনা। ঢাকায় গিয়ে পরিক্ষানিরিক্ষার পর মিলনের শরীরে ক্যান্সারের জীবাণু পাওয়া যায়। কলকাতায় নিয়ে বড় ডাক্তার দেখানো হয় মিলনকে কিন্তু শেষ রক্ষা হয়না, মাত্র তিন মাসের মাথায় মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়ে।
বিদেশে থাকায় বাবার জানাজায়ও অংশগ্রহণ করতে পারে না মিলনের বড় ছেলে সোহাগ। গ্রামবাসী বলতে থাকে বড্ড ভাল লোক ছিল মিলন মানুষকে কত সাহায্যে করতো। স্বামীর আকস্মিক মৃত্যুতে অথৈ সাগরে পড়ে মিনা,এদিকে ছেলের শোকে সয্যাসায়ী হন মিলনের মা মরিয়ম বেগম। বিশাল বাড়িতে মিনার একমাত্র সঙ্গী শয্যাসায়ী শাশুড়ী।

মিলনের অসুখ ধরা পড়ার পর থেকে মান অভিমান ভেঙে খোকন রুমা দুজনেই এখন মিনাদের বাড়িতে আসে। খোকন মিনার বাজার সদাই, বর্গাজমিগুলো থেকে চাষীরা ঠিকমতো ফসল দিচ্ছে কিনা সবই তদারকি করতে থাকে। রুমাও অনেক খুশি স্বামী তার প্রিয় সইয়ের বিপদের মূহুর্তে পাশে দাঁড়িয়েছে দেখে।

একদিন অনেক রাতেও খোকন বাড়ি ফেরেনি,রুমা খুবই দুঃচিন্তায় পড়ে যায়। একটা টর্চ লাইট নিয়ে বেশ কিছুসময় রাস্তার পাশে দাড়িয়ে থাকে তবুও খোকনের দেখা নেই। রুমা ভাবলো
'যাই সই মিনা কি করছে একটু দেখে আসি'।
মিনাদের বাড়িতে গিয়ে দেখে সব লাইট বন্ধ, রুমা ভাবলো
'সই হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে' ডাকাডাকি না করে নিজের বাড়ির দিকে যখনই পা বাড়াতে যাবে
হঠাৎ করেই মিনার ঘরের বন্ধ দরজার ফাক দিয়ে হাসাহাসির শব্দ ভেসে আসে। একটা কন্ঠ মিনার অন্য কন্ঠটিও চিনতেও খুব একটা কষ্ট হয়না রুমার,দরজার সামনে পড়ে থাকা স্যান্ডেলটাও রুমার অতি পরিচিত।

বাড়ি ফিরে দরজার ছিটকানি না আটকিয়ে দরজা ভিড়িয়ে রাখে শুধু হারিকেনের আলোটা টিমটিম করে জ্বালিয়ে রাখে আর স্বামীর ঘরে ফেরার প্রতীক্ষা করতে থাকে। রুমার দুচোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়তে থাকে, মনে পড়ে ছেলেবেলায় সই মিনার সাথে একটা পেয়ারা দুইভাগ করে খাওয়ার স্মৃতি।
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই এপ্রিল, ২০১৯ সকাল ১১:৫৫
১০টি মন্তব্য ১০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

তাহলে ন্যায় ও সত্যের জায়গাটি কোথায় বাংলাদেশে?

লিখেছেন হাসান কালবৈশাখী, ২২ শে অক্টোবর, ২০১৯ রাত ১:৪৩

তাহলে ন্যায় ও সত্যের জায়গাটি কোথায় বাংলাদেশে?
আইডি হ্যাক করে সাজানো মিথ্যা অভিযোগের একটি আয়োজন!
জালিয়াতি চিহ্নিত হল, উভয় পক্ষের উপস্থিতিতে। এ নিয়ে একটা জিডিও হলো।

সবকিছু জেনেশুনে প্রশাসনকে বলা হলো, যেহেতু এই... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্যাঙের বিয়ে [শিশুতোষ ছড়া]

লিখেছেন ইসিয়াক, ২২ শে অক্টোবর, ২০১৯ ভোর ৫:৫৬


কোলা ব্যাঙের বিয়ে হবে
চলছে আয়োজন ।
শত শত ব্যাঙ ব্যাঙাচি
পেলো নিমন্ত্রণ ।।

ব্যাঙ বাবাজী খুব তো রাজী ,
বসলো বিয়ের পিড়িতে
ব্যাঙের ভাইটি হোঁচট খেলো,
নামতে গিয়ে সিড়িতে ।... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রিয় অগ্রসর তরুণ প্রজন্মকে 'খোলাচিঠি'

লিখেছেন , ২২ শে অক্টোবর, ২০১৯ সকাল ৮:৫৮


প্রিয় অগ্রসর তরুণ প্রজন্ম,

তোমরা যারা ডিজিটাল যুগের অগ্রসর সমাজের প্রতিনিধি তাদের উদ্দেশ্যে দু'লাইন লিখছি। যুগের সাথে খাপ খাইয়ে ওঠতে অনেক কিছু আস্তাকুঁড়ে ফেলতে হয়। সেটা কেবলই যুগের দাবি, চেতনার চালবাজি... ...বাকিটুকু পড়ুন

পত্রিকা পড়ে জেনেছি

লিখেছেন রাজীব নুর, ২২ শে অক্টোবর, ২০১৯ দুপুর ১:২৮



খবরের কাগজে দেখলাম, বড় বড় করে লেখা ‘অভিযান চলবে, দলের লোকও রেহাই পাবে না। ভালো কথা, এরকমই হওয়া উচিত। অবশ্য শুধু বললে হবে না। ধরুন। এদের ধরুন। ধরে... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনার ভারত ভ্রমণের পর অপ-প্রচারণার ঝড়

লিখেছেন চাঁদগাজী, ২২ শে অক্টোবর, ২০১৯ সন্ধ্যা ৭:১০



বাংলাদেশের প্রতিবেশী হচ্ছে ২টি মাত্র দেশ; এই ২টি দেশকে বাংগালীরা ভালো চোখে দেখছেন না, এবং এর পেছনে হাজার কারণ আছে। এই প্রতিবেশী ২ দেশ বাংলাদেশকে কিভাবে দেখে? ভারতর... ...বাকিটুকু পড়ুন

×