somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

জিরো আওয়ার্স প্রোগ্রাম

১০ ই মে, ২০১৪ সন্ধ্যা ৭:৫৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সম্মানিত শ্রোতাবৃন্দ ,
আমি আজ বসে আছি বাসের প্রথম সারির এই কর্ণারের সিটটিতে । গাড়ি চলছে ঘন্টায় চল্লিশ কিলোমিটার বেগে । বাসের স্বচ্ছ জানালা ভেদ করে আসা রোদ আমার নীল জিন্স আর কালো টিশার্টের তাপমাত্রা চল্লিশ ডিগ্রিতে পৌছে দিয়েছে প্রায় । আমার নাকের ডগা নিশ্চয়ই চিকচিক করছে আর , আর আমার কপালের ঘাম ফোটায় ফোটায় নিচে পরছে ।
আজ আমি শ্রান্ত ।
না না , আমি কোনো কাহিনি শোনাতে আপনাদের সাথে যোগ দেইনি । না কোনো গল্প , না কোনো অভিজ্ঞতা । আমার এই সংক্ষিপ্ত জীবনের কিছু সংক্ষিপ্ত চিত্‍কার আজ বেতার তরঙ্গের ঢেউয়ের মাঝে ছরিয়ে দেব ।
শ্রোতাবন্ধুরা , এই সবুজের নীড়ে পাখিদের গান আর নদীর কলতান শোনার জন্য এরকমই একটা বাসে যখন এসেছিলাম , ঘন্টা ত্রিশেক আগে , তখন আমি একা ছিলাম না । আমার পাসে কোনো অপরিচিত লোক বসে ছিলো না । জানালার বাইরের বাতাস , গাছপালা আর ধুলোবালিগুলো এত নির্জিব ছিলো না ।
বন্ধুগন , সেটা ছিলো একটা ফাল্গুনের সন্ধ্যা । যান্ত্রিক শহরে বৈশাখ বা মাঘের সাথে ফাল্গুনের তেমন পার্থক্য না থাকলেও সন্ধ্যাটা আমার কাছে শত বসন্তের শ্রেষ্ঠ সন্ধ্যা । আমি আমার বন্ধুর দোকানে বসে ছিলাম । ও এসেছিলো ওর কম্পিউটারের জন্য কিছু টুলস কিনতে । আমি নিতান্ত বোকা বলেই সেদিন খেয়ালই করিনি যে ও আমার প্রতিটা নড়াচরা লক্ষ্য করছে । ওকে সেদিন আমি দেখেছিলাম , ওর চেহারা , ওর উচ্চতা আর ওর সৌন্দর্য । বেশ ভালো করেই । এটা হতে পারতো আমার আর দশটা মেয়ে দেখার মতই , কিন্তু হয়নি কারন সপ্তাহ খানেক পর যখন আমি উত্তরা যাচ্ছিলাম এবং বাসে আমার পাসের সিটটা খালিও ছিলো , ও শাহবাগ থেকে বাসে উঠেছিলো । আমাকে দেখে আমার পাসেই বসে পরলো ।
বন্ধুগন , সেই বাসের শব্দ , নগরীর যানযট , হেলপার আর যাত্রিদের কোলাহল এবং সবকিছু ছাপিয়েও ওর প্রতিটা শব্দ অলংকারের মত ঝন ঝন করছিলো আমার কানে । সেই প্রথম আলাপেই মনে হয়েছিলো যে আমরা যেনো হাজার বছরের পরিচিত ।
সেই থেকে শুরু । এরপর ঢাকার অলিতে গলিতে , রিকশায় , বাসে বাদুরঝোলা হয়ে অথবা উদ্যানে ঘুরে শহর চষে বেরিয়েছি আমরা ।
বন্ধুরা , ও খুব কথা বলতো , ঘুরতেও খুব ভালোবাসত । লাজুক ছিলাম আমিই । অবাক চোখে ওর কথার ফুলঝুরি দেখতাম । রাস্তায় বা পার্কে শিশু দেখলেই ও ছুটে যেত । বলত দেখো কি সুন্দর ।
প্রিয় শ্রোতামন্ডলী , সেদিনও সূর্য পূর্ব দিকেই উঠেছিল , আর দশটা দিনের মতই ঢাকা ছিল কোলাহলপূর্ণ । আকাশও মেঘলা ছিলো না , ঝিরি ঝিরি বাতাসও বইছিলো না । তবু সেদিনের প্রতিটা মুহুর্ত আমার স্বৃতিপটের চিরস্থায়ী স্বৃতিতে অম্লান হয়ে আছে । ও খুব সেজেগুজেও আসেনি সেদিন । আর দশটা কথার মতই বললো ভালোবাসি । আরো বললো আমি একটা ভিতুর ডিম । সেইজন্য ওকেই নাকি বলতে হয়েছে । আমার আর কোনো কথাই বলতে হয়নি । ও নাকি জানে যে আমিও ওকে ভালোভাসি ।
বন্ধুরা , ভালোবাসা কি জিনিস আমি ঠিক জানতাম না , বুঝতামও না , কারন আমার জীবনটা ছিলো সাদা কালো । কিন্তু এরপর আমি বুঝতে শুরু করলাম । সেদিনের পর থেকে আমি ছিলাম পৃথিবীর সবচেয়ে সূখি পুরুষ ।
বন্ধুগন , দিনগুলো স্বপ্নের মতো কাটছিলো । ওর পছন্দের যায়গা ছিলো রেললাইন । রেল লাইনের উপর দিয়ে হাত ধরে হাটা আর পথশিশুদের সাথে গল্প করা । ও সব সময় সাথে চকলেট রাখতো । পথশিশুদের মুখে হাসি দেখলে ওর মুখটা উজ্জল হয়ে উঠতো ।
শ্রোতামন্ডলি , প্লানটা ছিলো আমারই । ওকে বল্লাম চলো ঢাকার বাইরে থেকে ঘুরে আসি ! ও আনন্দে লাফ দিয়ে উঠলো । কিন্তু সবকিছু ঠিকঠাক করে গতকাল সকালে যখন আসবো ও হটাত্‍ করেই বললো যে আজকে কি না গেলেই নয় ! আমি বেশ বিরক্ত আর অবাক হয়ে বল্লাম , তুমি কি অসুস্থ ? ও বললো দিনটা যেন ওর কাছে ভালো ঠেকছে না । আমি হেসেই উরিয়ে দিলাম । আমার হাসি দেখে ওও হাসলো । কিন্তু হাসিটা কেমন যেনো অন্যরকম ছিলো ।
বন্ধুরা , এরকম একটা বাসেই আময়া ঢাকা থেকে রওনা দিয়েছিলাম । সারাদিন ভবঘুরের মত ঘুরলাম । বন্দর থেকে দূরে , অনেক দূরে নদী , ধানক্ষেত আর মাটির রাস্তার পাসের গাছগুলোর ছায়ায় হাটতে হাটতে টেরই পাইনি সূর্য কখন পশ্চিমে হেলে পড়েছে ।
আমরা ফিরতে শুরু করলাম । ততক্ষনে গ্রামের সব দস্যি ছেলেগুলো কুপির আলোয় পড়তে বসেছে । ও আমার বাহুটা শক্ত করে ধরে হাটছিলো । গ্রাম প্রায় পেরিয়ে এসেছিলাম । শহরের ল্যামপোস্ট তখনও বেশ দূরে । হাটছিলাম মফস্বলের আধাপাকা ইট সিমেন্টের গলি দিয়ে । চাঁদ তখনও ওঠেনি ।
বন্ধুগন , ওরা ছিলো চারজন , চারটে দুপেয়ো হায়েনা । আমার কিছুই করার ছিলো না । যখন ও প্রথম চিত্‍কারটা দিলো , আমি জ্ঞানশুন্য মানুষের মত মারতে গেলাম । পিছন থেকে ভারি কিছুর আঘাতে নিয়ন্ত্রন হারিয়ে মাটিতে পড়ে গেলাম । আমার পাঁচটি ইন্দিয়ের সবগুলোই অবশ ছিলো শ্রবণিন্দ্রীয় ছারা । ওর অস্পষ্ট গোঙ্গানিগুলো আমার কানে আসছিলো । ও কাঁদছিলো । ওর কান্নার সূর বহু দূরের কোনো যন্ত্রনাদায়ক সূরের মত আমার কর্ণকুহরে ভেসে আসছিলো ।
এরপর কিছু মনে নেই । আজ দুপুরে আমি যখন নিজেকে হাসপাতালের বেডে আবিস্কার করলাম , তখন ও নেই । আমি ভাবতে পারছিলাম না । ওকে ওর ভাই এসে নিয়ে গেছে ।
বন্ধুগন , আমি কাঁদতে চাইনা । আমি ভুলতেও চাইনা । আমার এই কান্না-হাসির হাহাকার বেতার তরঙ্গে ছরিয়ে দেবো বলে এসেছি । আমার এ স্বৃতি সময়-স্রোতে ভাসিয়ে দিতে চাই ।
বন্ধুরা , বেচে থাকুন , সুস্থ থাকুন , ভালো থাকুন ।
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

=মন বাগানে ফুটে আছে রঙবাহারী ফুল=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৩ রা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ৯:০৫



তুমি তো আর করলে না যাচাই, মন আমার মন্দ কী ভালো,
প্রেম কথনে ভরালে না মন, ভালোবেসে করলে না মনঘর আলো;
মনের শাখে শাখে ঝুলে আছে মধু মঞ্জুরী ফুল,
কী মুগ্ধতা ছড়িয়ে পাপড়ির... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজ শবে বরাত!!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৩ রা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১১:২০



ইসলামি বিশ্বাস মতে,
এই রাতে আল্লাহ তার বান্দাদেরকে বিশেষ ভাবে ক্ষমা করেন। ফারসি 'শবে বরাত' শব্দের অর্থ ভাগ্য রজনী। দুই হাত তুলে প্রার্থনা করলে আল্লাহ হয়তো সমস্ত অপরাধ... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভালোবাসা কি এরকমই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৪ ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১২:২৮

তুমি যখন বলো, আজ আর দেখা হবে না
শহরের সব বাতি একসাথে নিভে যায়।
হাতে ধরে থাকা চায়ের কাপে চিনি গলে যায়,
কিন্তু কথা গলে না।
জমতে জমতে আস্ত হিমালয় জেগে ওঠে।

তুমি... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফেলে আসা শৈশবের দিনগুলি!

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৪ ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ২:২১


চট্টগ্রামে আমার ছোটবেলা কেটেছে নানুর বাড়িতে। চট্টগ্রাম হলো সুফি আর অলি-আউলিয়াদের পবিত্র ভূমি। বেরলভী মাওলানাদের জনপ্রিয়তা বেশি এখানে। ওয়াহাবি কিংবা সালাফিদের কালচার যখন আমি চট্টগ্রামে ছিলাম তেমন চোখে পড়েনি।... ...বাকিটুকু পড়ুন

“Epstein “ বুঝতে পারেন ! কিন্তু রাজাকার,আলবদর,আলশামস আর আজকের Extension লালবদর বুঝতে পারেন না ‼️

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ০৪ ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ভোর ৬:০৮

মূলত এটি একটি ছবি ব্লগ। এক একটি ছবি একটি করে ইতিহাস। বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে কস্টের অধ্যায়।

এপস্টেইন ফাইল দেখে আপনারা যারা বিচলিত, জেনে রাখুন ভয়াবহ আরেক বর্বরতা ঘটেছিলো ৭১এ এদেশেই, আর... ...বাকিটুকু পড়ুন

×