somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ইরানী বিপ্লবের অথবা কুখ্যাত ব্লাক ফ্রাইডে এর ইতিহাস

১৪ ই অক্টোবর, ২০১৫ রাত ১০:৪৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



১৯৭৯ সালে ঘটা একটি যুগান্তকারী বিপ্লব যাকে ইরানী বিপ্লব বলা হয় । আর সেই ইরানকেই শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলাভীর একনায়কতন্ত্র থেকে আয়াতুল্লাহ খামেনেইর ইসলামিক গণতান্ত্রিক দেশের পরিণত করেন । একেই বলা হয় ফরাসি এবং বলশেভিক
বিপ্লবের পর ইতিহাসের তৃতীয় মহান বিপ্লব । ইরানের শেষ সম্রাট মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভী দুনিয়ার সবচেয়ে পুরোনো ঐতিহ্যবাহী আর প্রভাবশালী শাহী রক্তের ধারক ছিলেন । তারই বংশ দীর্ঘ আড়াই হাজার বছর ধরে সবচেয়ে বড় এবং শক্তিশালী সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন । শুরুটা করেছিলেন তারই পূর্বপুরুষগণ মহান কুরুশ আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে । আর সেই বংশের শেষ সম্রাট ১৯৭৯ সালের ১৬ জানুয়ারি বিপ্লবী দেশবাসীর কাছে পরাজিত হন এবং মিশর পলায়ন করেন । কিছু দশক আগে রেজা শাহ পাহলবী ছিলেন নিয়মতান্ত্রিক রাষ্ট্রপ্রধান । সর্বময় ক্ষমতা ছিলো তার পার্লামেন্টের হাতে এবং নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী সেই ক্ষমতা ভোগ করতেন । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই ইরানে ব্যাপক আকারে তেল ক্ষেত্র আবিস্কৃত হয় যার মালিক ছিলো ব্রিটিশ কোম্পানিগুলো । ঠিক এই সময়টিতেই মোসাদ্দেক নামক জনপ্রিয় একজন রাজনৈতিক নেতা দেশের সব তেল সম্পদ জাতীয়করণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে পার্লামেন্ট নির্বাচন করেন এবং সে নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন ।

ব্রিটেনে তখন উইনস্টন চার্চিল ক্ষমতায় আর যুক্তরাষ্ট্রে হেনরি ট্রুম্যান । মোসাদ্দেকের জয়লাভের ফলে দুই ক্ষমতাশালীর মাথায় বাজ পড়ে । শুরু হয় মুসাদ্দেককে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য একের পর এক নীল নকশা । মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ এবং ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এসআইএস লন্ডনে বসে যৌথ পরিকল্পনা করেন । প্রেসিডেন্ট থিউডর রুজভেল্টের নাতি কার্মিট রুজভেল্ট সে সময় ছিলেন সিআইএ প্রধান । তিনি উড়ে এলেন লন্ডন । প্রণীত হলো অপারেশন এ্যাজাক্স এর নীল নকশা । পরিকল্পনা মতে ইরানী সেনাবাহিনীতে ঘটানো হলো অভ্যুত্থান । প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মাদ মুসাদ্দেক পদচ্যুত হলেন । তার স্থানে আজ্ঞাবহ জেনারেল ফজলুল্লাহ জাহেদীকে নিয়োগ দেওয়া হলো । কিন্তু মূল ক্ষমতা রাখা হয় ইঙ্গো মার্কিন সাম্রাজ্যের অনুগত শাহ মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভীর নিকটে । এই ঘটনার একদিনের মাথায় সেনাবাহিনীতে একটি কাউন্টার অভ্যুত্থান হয় । আর অভ্যুত্থানকারীরা রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর প্রধানমন্ত্রী মোসাদ্দেককে উদ্ধার করেন । অন্যদিকে শাহ পালিয়ে গেলেন বাগদাদে এবং তারপর ইতালিতে । কিন্তু এর দুই দিন পর আরো একটি রক্তাক্ত পাল্টা অভ্যুত্থান ঘটানো হয় সেনাবাহিনীতে । আর তার ফলে মার্কিন বৃটেনের নীল নকশা অপারেশন এ্যাজাক্স সফল হয়ে যায় শতভাগ । পতনের শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত অর্থাৎ ১৯৭৯ সালের ১৬ ই জানুয়ারি পর্যন্ত দেশের নিরষ্কুশ সর্বময় ক্ষমতা ছিলো শাহের হাতে । আর তারই ইঙ্গো মার্কিন মদদ দাতারা অনবরত সমর্থন দিয়ে যাচ্ছিলো তাকে । ফলে তার পুলিশ এবং সেনাবাহিনী প্রতিদিন রাজপথে শত শত মানুষকে গুলি করে মারছিলো । অথচ ১৯৫৩ সালের পর থেকে ইরানে যে অকল্পনীয় উন্নতি হয়েছিলো তাতে জনগণের খুশি বা সন্তুষ্ট থাকার কথা ছিলো বরং তারা তা ছিলেননা ।

শাহের কতিপয় ব্যক্তিগত আচরণের অভ্যাস আর পশ্চিমা সংস্কৃতির অবাধ প্রচলন দেশের সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষকে ধীরে ধীরে বিক্ষুদ্ধ করে তোলে । আর এই বিক্ষোভই অগ্নি রূপ নেয় ১৯৭৭ সালের শেষের দিকে । তেহরান শহরে কোন পাবলিক বাসে কোন ধর্মীয় লেবাযধারী মানুষ উঠলেই কনট্রাকটর টিটকারী করে বলতো আমরা আলেম আর বেশ্যাদের বাসে চড়াই না । রাস্তায় রাস্তায় গড়ে উঠেছিল মদের দোকান । শহর এবং শহরতলীতে শত শত নাইটক্লাবে চলতো সারারাত ব্যাপী ডিস্কো পার্টির নামে মদ্যপান জুয়া আর অবাধ যৌনাচার ।

শাহ নিজেও ছিলেন পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত । তার স্ত্রী সন্তানরাও পশ্চিমা ধাচে চলতেন । শাহ এবং তার স্ত্রী সকল রাজকীয় অনুষ্ঠান ও দেশী বিদেশী সরকারী অনুষ্ঠানসমূহে পশ্চিমাদের পোশাক পড়তেন । এসব কারণে ধর্মপ্রাণ মুসলমানগণ দিনকে দিন ফুসে উঠতে থাকেন । এবং আয়াতুল্লাহ খামেনেইর ছিলেন একজন অপরিচিত ধর্মীয় ইমাম । মুসলমানদের এই মনের কষ্ট তিনি বুঝতে পেরে শিয়াদের ধর্মীয় শহর নাজাফে একটি জনসভা আহ্বান করেন । সবাইকে অবাক করে দিয়ে লক্ষ লক্ষ লোকের সমাবেশ হয় সেখানে । শাহের সরকার প্রথমে এই বিশাল সমাবেশকে মোটেই গুরুত্ব দিলেন না । কিন্তু পরিস্থিতি পাল্টাতে থাকলো দ্রুত । তেহরানের রাস্তায় বিক্ষুদ্ধ মুসলমানেরা নেমে আসলো । সংখ্যায় ছিলো তারা অগণিত । আর সেদিন ছিলো শুক্রবার । আর তারিখটি ছিলো ১৯৭৮ সালের ৮ ই সেপ্টেম্বর । প্রায় ৬০ থেকে ৭০ লাখ লোক তেহরানে জমায়েত হন । আর তখন শাহের বাহিনী বিশাল জনসমাবেশের উপর নির্বিচারে গুলি চালিয়ে অসংখ্য মানুষকে হত্যা করেন । ততখনা লোকজন ছত্রভঙ্গ হয়ে যান কিন্তু দিবসটিকে ইরানের ইতিহাসে কুখ্যাত ব্লাক ফ্রাইডে হিসেবে চিহ্নিত করা হয় ।

ব্লাক ফ্রাইডের পর তেহরানে মার্কিন দূতাবাসে কর্মরত সিআইএ এজেন্ট ওয়াশিংটন ডিসিতে সিআইএ হেড কোয়াটারে রিপোর্ট করেন যে ৮ই সেপ্টেম্বরের ঘটনার পর শাহের শাসন ক্ষমতা এতোটাই সূদৃঢ় হয়েছে যে আগামি ১০ বছরে বিরোধী পক্ষ মাথা তুলে দাড়াতে পারবে না অথচ এর মাত্র ৩ মাসের কিছু সময় পর অর্থ্যাৎ ১৬ ই জানুয়ারি ১৯৭৯ সালে মাত্র একদিনের গণ অভ্যূত্থানে শাহের পতন হয়েছিল । পরিবার পরিজন নিয়ে শাহ দেশ থেকে পালিয়ে চলেযান । ততকালিন সময় তার দীর্ঘদিনের মিত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন পযন্ত তাকে আশ্রয় দিতে অস্বীকার করেন । তিনি প্রথমে ইটালিও যান কিন্তু ইতালি তাকে অসম্মান জনকভাবে বিদায় জানান । তারপর তার বিমান উড়াল দিলো পানামার দিকে সেখানকার সরকারও তাকে গ্রহণ করেন নাই ।

অনেক দেন দরবার এবং অনুনয় বিনয় করার পর মিশর তাকে সাময়িকভাবে সেই দেশে ঢোকার অনুমতি দিলেন একটি কারণে প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাতকে বোঝানো হলো যে শাহের প্রথম স্ত্রী ফৌজিয়া ছিলেন মিশরের প্রয়াত এবং ক্ষমতাচ্যুত বাদশা ফারুকের বোন । এই রাজপরিবারের প্রতি তখনো মিশরের জনগণের বেশ সহানুভুতি অবশিষ্ট ছিলো । কাজেই মিশরের রাজকণ্যার স্বামী ভিক্ষুকের মতো দেশে দেশে ঘুরে বেড়াবে সেটা মিশরবাসীর জন্য হয়তো অস্বস্তিকর একটি ব্যাপার দেখায় তাই । শাহ ফিরে এলেন কায়রোতে । এর মধ্যে তার ক্যান্সার রোগ ধরা পরে ফলে কায়রোর একটি হোটেলে তিনি মারা যান ১৯৮০ সালের ২৭ শে জুলাই যখন তার বয়স হয়েছিল মাত্র ৬০ বছর । ক্ষমতার শেষ দিক থেকে সম্রাট অতিমাত্রায় অহংকারী হয়ে পড়েছিলেন । নিজের বংশ আর রাজ রক্তের অহংকারে তিনি লোকজনকে মানুষ বলেই মনে করতেন না । এবং কথায় কথায় লোকজনকে অসম্মান করতো । দেশের সেনাবাহিনী বা বেসামরিক প্রশাসনের বড় বড় কর্মকর্তাগণের পরিবর্তে তিনি মার্কিন এবং বৃটিশ দূতাবাসের কুকুরকে বেশি মর্যাদা দিতেন । এভাবেই শাহ এর ক্ষমতা বা অধ্যায় শেষ হয় ।

তথ্যঃ নেট
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই অক্টোবর, ২০১৫ রাত ১০:৪৩
১৩টি মন্তব্য ১৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

এগারটি বছর পার হয়ে গেল…. কিছু পরিসংখ্যান নিয়ে একাদশতম বর্ষপূর্তি পোস্ট

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৮:৪১



পূর্বের বর্ষপূর্তি পোস্টের লিঙ্কঃ দশম বর্ষপূর্তি পোস্ট

সামহোয়্যরইনব্লগে গত ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৫ তারিখ রাত ১১টা ২৬ মিনিটে প্রকাশিত হয় আমার প্রথম কবিতা, বক্ষমাঝে থাকবে তুমি। বলা যায় খুব দ্রুতই, মাত্র তৃতীয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দুঃখ খচিত পতাকা আমার

লিখেছেন এম ডি মুসা, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:২৪


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পবিত্র প্রাঙ্গণে
আজ হঠাৎ কার ছায়া নামে?
কার দুঃসাহসী কালো হাত
ইতিহাসের বুকের ওপর আঁকে পরাধীনতার নাম?

যে নাম একদিন ভাষার কণ্ঠ রুদ্ধ করতে চেয়েছিল,
যে শাসন একাত্তরে ছড়িয়েছিল মৃত্যুর অন্ধকার
আজ কেন তার... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশ হতো হায়দ্রাবাদ

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:৫৫

।।হায়দারাবাদের নিজাম।।


১৯৪৭ সাল ভারতবর্ষের মুসলমানরা যখন নির্যাতনের শিকার অনেকগুলো গণহত্যা হয়েছিল দাঙ্গা হয়েছিল। ১৯৪৬ সালে বা তারও আগে এই মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ রাজনীতি শুরু করেছিল কংগ্রেসের রাজনীতি দিয়ে তিনি কংগ্রেসের... ...বাকিটুকু পড়ুন

মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ: ইসলামপন্থী, ধর্মনিরপেক্ষ, নাকি রাজনৈতিক বাস্তববাদী?

লিখেছেন Sujon Mahmud, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৩৮

মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বিতর্কিত প্রশ্নগুলোর একটি হলো—তিনি কি সত্যিই ইসলামপন্থী ছিলেন, নাকি ইসলামকে মূলত রাজনৈতিক জাতীয়তাবাদের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ডাক্তার আসিবার পূর্বে রোগীটি মারা গেলো

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:৩৩



বাংলাদেশে ডাক্তারদের অবহেলায় কি পরিমাণ প্রাণ অকালে ঝরে গিয়েছে তা কল্পনাতীত। এবং আমাদের দেশের ডাক্তার এই অপরাধে নূন্যতম অনুশোচনা বোধ করে না।

ডাক্তারদের অবহেলার কারণে দেশের পাঠ্য বই ইংরেজি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×