somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

শাহাজাদা সেলিম

২১ শে এপ্রিল, ২০১৭ সন্ধ্যা ৬:২৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


প্রথম সেলিম বা ইয়াভুল সুলতান সেলিম ডাকনাম ইয়াভুজ ছিলেন প্রথম উসমানীয় খলিফা এবং নবম উসমানীয় সুলতান। ১৫১২ থেকে ১৫২০ সাল পর্যন্ত উসমানীয় সুলতান ছিলেন।সাম্রাজ্যের ব্যাপক বিস্তৃতির জন্য তার শাসনামল পরিচিত। ১৫১৬ থেকে ১৫১৭ সাল পর্যন্ত চলমান যুদ্ধে উসমানীয়রা মিশরের মামলুক সালতানাত জয় করে নেয়। এর ফলে লেভান্ট, হেজাজ, তিহামাহ ও মিশর উসমানীয়দের অধিকারে আসে। তিনি ১৫১৭ সালে খাদেমুল হারামাইন শরিফাইন উপাধি ধারণ করেন। মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল জয় এবং একীভূত করার মাধ্যমে সেলিম মক্কা ও মদিনার রক্ষক হয়ে উঠেন।মধ্যপ্রাচ্যে সেলিমের রাজ্যবিস্তারের ফলে সাম্রাজ্যের সম্প্রাসরণ নীতিতে পরিবর্তন আসে। সেলিমের পূর্বে সাম্রাজ্য মূলত বলকান এবং এশিয়া মাইনরে কেন্দ্রীভূত ছিল।সুলতান দ্বিতীয় বায়েজীদের সন্তান শাহজাদা সেলিম ১৪৭০ সালে আমাসিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। সেলিমের মা গুলবাহার খাতুন ছিলেন মারাশের দুলকাদির বাইলিকের শাহজাদী।সেলিমের পিতা সুলতান দ্বিতীয় বায়েজীদ তার পুত্র শাহজাদা আহমেদকে যুবরাজ মনোনীত করেছিলেন। সেলিম এতে অসন্তুষ্ট হয়ে বিদ্রোহ করেন। সেলিম তার পিতাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে সক্ষম হন এবং ১৫১২ সালে মসনদে বসেন। তার নির্দেশে ভাইদের হত্যা করা হয়েছিল।১৪৯৪ সালে সেলিম প্রথম মেনিল গিরাইয়ের কন্যা আয়েশা হাফসা সুলতানকে বিয়ে করেন।


১৬শ শতাব্দির উসমানীয় অনুচিত্রে চালদিরানের যুদ্ধের একটি দৃশ্য
শাহ ইসমাইল পারস্য সাফাভি সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করে ইরানে সুন্নি মতাদর্শের পরিবর্তে দ্বাদশবাদি শিয়া মতাদর্শ রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠা করেন। ইসমাইল ১৫১০ সাল নাগাদ ইরান, আজারবাইজান,দক্ষিণ দাগেস্তান, মেসোপটেমিয়া, আর্মেনিয়া, খোরাসান, পূর্ব আনাতোলিয়াসহ বিভিন্ন স্থান জয় করেন। ইসমাইল তার সুন্নি প্রতিবেশীদের জন্য হুমকি হয়ে উঠেছিলেন এবং ১৫১১ সালে তিনি আনাতোলিয়ায় সংঘটিত শাহকুলু বিদ্রোহে মদদ দেন।ইতিপূর্বে উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তপ্ত চিঠি চালাচালির পর উসমানীয় সাম্রাজ্যে শিয়া মতবাদের বিস্তারের কারণে সেলিম ১৫১৪ সালে সাফাভিদের উপর আক্রমণ করেন। ১৫১৪ সালে চালদিরানের যুদ্ধে সেলিমের কাছে ইসমাইল পরাজিত হন।ইসমাইলের বাহিনী উত্তমরূপে প্রস্তুতি নিলেও উসমানীয়রা কামান, মাস্কেটের মত আধুনিক প্রযুক্তিগত সক্ষমতার কারণে যুদ্ধক্ষেত্রে সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল। ৫ই সেপ্টেম্বর সেলিম বিজয়ী হিসেবে রাজধানী তাবরিজে প্রবেশ করেন ।মামলুকদের পরাজিত করে সেলিম মামলুক সালতানাতকে উসমানীয় সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেন। তার ফলে মিশর, সিরিয়া, ফিলিস্তিন, লেভান্ট, হেজাজ, তিহামাহ উসমানীয় সাম্রাজ্যের অংশ হয়। ইতিপূর্বে মামলুক শাসনের অধীনে থাকা মক্কা এবং মদিনা উসমানীয় সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। মক্কা এবং মদিনার শাসনভার লাভ করার পর সেলিম খাদেমুল হারামাইন শরিফাইন উপাধি ধারণ করেন।মিশর ও মক্কা এবং মদিনা জয়ের পর সেলিম আব্বাসীয় খলিফা তৃতীয় আল মুতাওয়াক্কিলের কাছ থেকে খলিফা পদ গ্রহণ করেন। ১২৬১ সালের পর থেকে আব্বাসীয় খলিফারা মিশরে অবস্থান করতেন এবং আনুষ্ঠানিক খলিফা ছিলেন।


সেলিম ১৫২০ সালে ৫৫ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। দীর্ঘকাল ঘোড়ায় চেপে অভিযানের ফলে সিরপেন্স নামক চামড়ার ইনফেকশনে তার মৃত্যু হয় এমনটা আনুষ্ঠানিকভাবে বলা হলেও কিছু ইতিহাসবিদের মতে তিনি ক্যান্সার বা তার চিকিৎসকের দ্বারা বিষপ্রয়োগে মারা যান।কিছু ইতিহাসবিদের মতে সেলিমের মৃত্যুর সময় সাম্রাজ্যে যে প্লেগ দেখা দিয়েছিল তিনি তাতে আক্রান্ত হয়েছিলেন।সেলিমের উপাধি ছিল মালিক উল বারেইন, ওয়া খাকান উল বাহরাইন, ওয়া কাসির উল জাইশাইন, ওয়া খাদিমুল হারামাইন অর্থাৎ দুই ভূখন্ডের ইউরোপ এবং এশিয়ার বাদশাহ, দুই সমুদ্রের,ভূমধ্যসাগর এবং ভারত মহাসাগর খাগান, দুই বাহিনীর বিজেতা ইউরোপীয় ও সাফাভি সেনাবাহিনী, এবং দুই পবিত্র মসজিদের মক্কা ও মদিনা সেবক।


প্রথম সেলিমের মাজার

ইয়াভুজ সেলিম মসজিদ
অনেক মতানুযায়ী সেলিম উগ্র মেজাজের ব্যক্তি ছিলেন। লর্ড কিনরোস তার রচিত উসমানীয় ইতিহাসে লিখেছেন যে সুলতান সেলিমের দরবারে প্রচুর সুযোগ ছিল এবং উচ্চপদস্থ অফিসে সবসময় অসংখ্য আবেদন জমা হত।সেলিম কঠোর পরিশ্রমী এবং অন্যতম সফল ও সম্মানিত উসমানীয় সুলতান ছিলেন। স্বল্প সময়ের শাসনকালে তিনি ব্যাপক সাফল্য লাভ করেছিলেন। অনেক ইতিহাসের মতে তিনি তার পুত্র সুলাইমানের অধীনে সাম্রাজ্যের সর্বো‌চ্চ সমৃদ্ধির জন্য সাম্রাজ্যকে প্রস্তুত করে দিয়েছিলেন।সেলিম তুর্কি এব ফার্সি ভাষার একজন কবি ছিলেন। মাহলাস সেলিমি ছদ্মনামে তিনি কবিতা লিখতেন। একটি কবিতায় তিনি লিখেছেন।দুইজন সুফির জন্য একটি গালিচা যথেষ্ট, কিন্তু দুইজন বাদশাহর জন্য পৃথিবী যথেষ্ট বড় নয়।

সেলিমের পোর্ট্রে‌ট মিনিয়েচার

মিশরে সেলিম
লোদিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সেলিম মুঘল সম্রাট বাবরকে সহায়তা করার জন্য গোলন্দাজ বিশারদ উস্তাদ আলি কুলি, ম্যাচলক বিশারদ মুস্তাফা রুমি এবং আরো অনেক উসমানীয় তুর্কিকে প্রেরণ করেছিলেন। প্রযুক্তিগত সুবিধার কারণে বাবর ইবরাহিম লোদির তুলনামূলক বৃহৎ বাহিনীকে পানিপথের যুদ্ধে পরাজিত করতে সক্ষম হন।

সেলিমের দরবার
আধুনিক যুগে এসে ১৯১৪ সালে তুর্কি নৌবাহিনীর কাছে হস্তান্তরের পর জার্মান যুদ্ধজাহাজ এসএমএস গোবেন এর নাম বদলে ইয়াভুজ সুলতান সেলিম রাখা হয়।আর বসফরাসের উপর তৃতীয় সেতুর নাম ইয়াভুজ সুলতান সেলিম সেতু।

তথ্যসূত্র http://www.shsu.edu/~his_ncp/Turkey2.html
http://web.archive.org/web/20070929100539/http://www.sevgi.k12.tr/~ottomanempire/ingosmanli/Sultans/yavuz_sultan_selim_biography.htm
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে এপ্রিল, ২০১৭ সন্ধ্যা ৬:২৩
৯টি মন্তব্য ৯টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মার্কিন সেনা কর্মকর্তা কর্মকর্তার মেজর নিদাল্ল হাসানের মৃত্যুদণ্ড.....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ২:৩২



নিদাল হাসান (পুরো নাম: নিদাল মালিক হাসান) হলেন মার্কিন সামরিক বাহিনীর একজন সাবেক মেজর এবং মনোরোগ বিশেষজ্ঞ (Psychiatrist)।

২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের ফোর্ট হুড সামরিক ঘাঁটিতে সংগঠিত এক... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপার ফিরে আসার পদ্ধতি কি?

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:২৩



আপা কেন ভারতে বেড়াতে গেলেন সেটা সবাই জানে। আগামী ডিসেম্বরে আপা দেশে ফিরে আসার আগ্রহের কথা জানিয়েছেন সেটাও সবাই জানে। আপা কিভাবে দেশ থেকে রাষ্ট্রীয় সফরে ভারতে গেলেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কি আসলেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

লিখেছেন অন্তর্জাল পরিব্রাজক, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৮:৪৪



“রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন “, “মূর্খের দেশে আবার কীসের বিশ্ববিদ্যালয়” – এসব প্রচারণা আমাদের দেশে অনেকদিন ধরেই হয়ে আসছে। বিশেষ করে ফেসবুকে আকছারই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১৯৭১ঃ নদী-নালায় ভেসে থাকা স্বদেশের কান্নাঃ শহীদদের প্রতি নিবেদিত একটি কাব্যগাথা জাতির রক্ত, অশ্রু ও স্বাধীনতার অমর ইতিহাস

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:০৫


পঁচিশে মার্চ ১৯৭১
রাত্রি তখন গভীর, নগরীর বাতিগুলো
যেন অনাগত বিপদের সামনে অসহায়
ঢাকার আকাশে হঠাৎ গর্জে উঠল কামান
ট্যাংকের চাকার নিচে কেঁপে উঠল রাজপথ
গুলি ছুটে গেল মানুষের ঘুমন্ত জানালায়
আগুন ছড়িয়ে পড়ল... ...বাকিটুকু পড়ুন

শরিয়াতন্ত্রের নিষ্ঠুরতা, ধর্মীয় উগ্রবাদ ও নৈতিক দেউলিয়াপনা

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ১১ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১২:৪৭


পৃথিবীজুড়ে মুসলমানদের প্রতি ঘৃণা বাড়ছে। এই বিদ্বেষ শুধু ইসরায়েল বা তার পৃষ্ঠপোষক ডানপন্থী দেশগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। কানাডার মতো তুলনামূলকভাবে মধ্যপন্থী এবং ফিলিস্তিনের প্রতি জোরালো রাজনৈতিক সমর্থন থাকা আয়ারল্যান্ডের মতো... ...বাকিটুকু পড়ুন

×