
অনুরাধাপুরা হল শ্রীলঙ্কার একটি ঐতিহাসিক শহর
অনুরাধাপুরা হল মূলত শ্রীলঙ্কার প্রক্তন রাজধানী।শহরটি এক সময় অনুরাধাপুরা সাম্রাজ্যের অন্তর্গত ছিল। বর্তমানে অনুরাধাপুরা হল শ্রীলঙ্কার একটি গুরুত্ব পূর্ন শহর এবং পর্যটন কেন্দ্র। শহরটি উত্তর-মধ্য প্রদেশ এর অন্তর্গত এবং অনুরাধাপুরা শহরটি অনুরাধাপুরা জেলার সদর দপ্তর। শ্রীলঙ্কা সরকার বর্তমানে এই শহরকে কেন্দ্র করে পর্যটন শিল্পের বিকাশের উপর জোর দিয়েছে। আর তারই ফলে শহরটি পরিকাঠামো গত উন্নয়ন ঘটান হচ্ছে।

শহরটি শ্রীলঙ্কার একটি ঐতিহাসিক শহর। এই শহর শ্রীলঙ্কার এক সত্যতার চিহ্ন বহন করে। এই শহরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল অনুরাধাপুরা সাম্রাজ্য বা অনুরাধাপুরা সভ্যতা। এই শহরে এর আগে আরও দুটি সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছিল। তবে এই সাম্রাজ্য গুলি সম্পর্কে আগে কিছুই জানা যায়নি। এই সভ্যাতা গুলির আবিষ্কারের পর অনুরাধাপুরের গুরুত্ব অনুধাবন করেছিলেন ঐতিহাসিকরা। ঐতিহাসিকদের মতে শ্রীলঙ্কার প্রাচীন ইতিহাসের জন্য অনুরাধাপুরা এর গুরুত্ব অপরিসীম।


ক্যান্ডি হলো শ্রীলঙ্কার মধ্যাঞ্চলে অবস্থিত অন্যতম বৃহত্তম শহর। মধ্যপ্রদেশে এর অবস্থান। রাজধানী কলম্বোর পর দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর। শহরটি শ্রীলঙ্কার প্রাচীন রাজাদের সর্বশেষ রাজধানী ছিল।চা উৎপাদনকারী অঞ্চল হিসেবে পাহাড়ের পাদদেশে এই শহরটি গড়ে উঠেছে। প্রশাসনিক এবং ধর্মীয় কারণে এই শহরের সবিশেষ পরিচিতি রয়েছে। তাছাড়াও মধ্যপ্রদেশের রাজধানী ক্যান্ডি। বিশ্বের বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের কাছে অন্যতম তীর্থস্থান হিসেবেও পরিচিত এই শহরে টুথ রেলিক বা শ্রী দালাদা মালিগায়া মন্দির রয়েছে। ১৯৮৮ সালে ইউনেস্কো কর্তৃক বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের মর্যাদা লাভ করেছে শহরটি ।সর্বমোট ২৪টি ওয়ার্ড নিয়ে ক্যান্ডি শহর গঠিত।শহরের অধিকাংশ লোকই সিংহলী। তাছাড়াও, মুর, তামিল জাতিগোষ্ঠীর লোক বসবাস করেন।
শহরটি বিভিন্ন নামে পরিচিতি পেয়েছে। কিছু গবেষক মনে করেন বর্তমান ওতাপুলুয়ার কাছাকাছি কাতুবুলু নুয়ারা এই শহরের প্রকৃত নাম। কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে জনপ্রিয় নাম হচ্ছে সেনকাদাগালা বা সেনকাদাগালাপুরা যা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সেনকাদাগালা শ্রীবর্ধনা মহা নুয়ারা। এটি সংক্ষেপে মহা নুয়ারা নামে পরিচিত। লোকউপাখ্যানে কয়েকটি সম্ভাব্য উৎস থেকে এসেছে। গুহায় অবস্থানকারী সেনকান্দা নামীয় ব্রাহ্মণের নাম থেকে এই শহরের নাম উদ্ভূত। অন্য উৎসে জানা যায় যে তৃতীয় বিক্রমাবাহু’র রাণী সেনকান্দা পাথরে রঙ করে সেনকাদাগালা রেখেছিলেন। ক্যান্ডি রাজ্যও অনেক নামে পরিচিতি পেয়েছে। ঔপনিবেশিক আমলে সিংহলীজ কান্দা উদা রাতা বা কান্দা উদা পাস রাতা থেকে ইংরেজি নাম ক্যান্ডি হয়েছে। যার অর্থ দাঁড়ায় পর্বতের উপর ভূমি। পর্তুগীজরা সংক্ষেপে ক্যান্ডিয়া রেখেছিল যা রাজ্য এবং এর রাজধানী উভয় ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হতো। সিংহলী ভাষায় ক্যান্ডিকে মহা নুয়ারা নামে ডাকা হয় যার অর্থ মহান শহর বা রাজধানী। তা স্বত্ত্বেও প্রায়শই শহরটিকে নুয়ারা নামে ডাকা হয়।ঐতিহাসিক দলিল-দস্তাবেজে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ১৩৫৭-১৩৭৪ সিই সময়কালে বর্তমান শহরের উত্তরাংশে ওয়াতাপুলুয়ার কাছাকাছি গাম্পোলার রাজ্যের সম্রাট তৃতীয় বিক্রমাবাহু এ শহরের গোড়াপত্তন করেন। তিনি ওই সময়ে এর নামকরণ করেছিলেন সেনকাদাগালাপুরা।

গালে হলো শ্রীলঙ্কার অন্যতম আরেকটি প্রধান শহর।এটি কলম্বো থেকে প্রায় ১১৯ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বাংশে অবস্থিত। দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশের প্রশাসনিক রাজধানী এবং গালে জেলার রাজধানী হিসেবে এই শহরটি মর্যাদা পেয়েছে। ষোড়শ শতকে পর্তুগীজরা এখানে আসে। তখন এটি জিমহাথিথ্থা নামে পরিচিত ছিল। তারপূর্বে চতুর্দশ শতকে বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা এই শহরটিকে ‘কালি’ নামে উল্লেখ করেছিলেন।সে সময় দ্বীপরাষ্ট্রটির প্রধান বন্দর হিসেবে এটি পরিচিতি পায়।গালে ১৫টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত।২০০৪ সালের ২৬শে ডিসেম্বর তারিখে ইন্দোনেশিয়ার উপকূল থেকে হাজার মাইল দূরে ভারত মহাসাগরে উদ্ভূত ধ্বংসাত্মক সুনামীতে শহরটি ব্যাপকভাবে আক্রান্ত হয়। কেবলমাত্র এই শহর থেকেই হাজার হাজার লোক মৃত্যুবরণ করেন।

অষ্টাদশ শতকে এই শহরের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড শীর্ষস্থানে পৌঁছে। দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পর্তুগীজদের স্থাপত্যশৈলীর উজ্জ্বল নিদর্শন ক্ষেত্র এটি। ১৬৪৯ সাল থেকে ওলন্দাজরাও এই শহরের প্রাচীরকে বিস্তৃত করেছে। গালে দূর্গ ইউনেস্কো কর্তৃক বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের আওতাভূক্ত এবং ইউরোপীয় দখলদার কর্তৃক এশিয়ায় বিশাল দুর্গ হিসেবে অদ্যাবধি অবশিষ্ট রয়েছে।অন্যান্য উল্লেখযোগ্য স্থাপনার মধ্যে প্রাকৃতিক উপত্যকা, জাতীয় নৌ যাদুঘর, সেন্ট মেরিজ ক্যাথেড্রাল, শিব মন্দির অন্যতম। তাছাড়াও, ঐতিহাসিক এবং বিলাশবহুল হোটেলও রয়েছে এখানে।ক্রিকেটের স্বর্গভূমি হিসেবেও পরিচিত এই শহরটি। পৃথিবীর অন্যতম দর্শনীয় এবং ছবিসদৃশ্য ক্রিকেট স্টেডিয়ামরূপে গালে আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামকে বিবেচনা করা হয়। সুনামীতে এই মাঠেরও ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

পলোন্নারুয়া শ্রীলঙ্কার উত্তর কেন্দ্রীয় প্রদেশের পলোন্নারুয়া জেলার প্রধান শহর। কাদুরুয়েলা এলাকা হল পলোন্নারুয়ার নতুন শহর এবং পলোন্নারুয়ার অন্য অংশ পলোন্নারুয়া রাজ্যের রাজকীয় প্রাচীন শহর হিসেবে রয়ে গেছে।শ্রীলঙ্কার দ্বিতীয় প্রাচীনতম রাজ্য পলোন্নারুয়াকে প্রথম রাজধানী ঘোষণা করেছিলেন রাজা বিজায়াবাহু আই, যিনি ১০৭০ সালে চোল আগ্রাসকদের পরাজিত করেছিলেন এবং স্থানীয় নেতা হিসেবে দেশকে একত্র করেছিলেন।
বর্তমানে রাষ্ট্রপতি মৈত্রীপাল সিরিসেনার অধীনে পলোন্নারুয়া জাগরণ নামে পরিচিত একটি প্রধান উন্নয়ন প্রকল্পে নতুন পলোন্নারুয়ার উন্নয়ন কাজ চলছে। এই প্রকল্পে পলোন্নারুয়ার সড়ক, বিদ্যুৎ, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিবেশসহ সকল সেক্টরের উন্নয়নের মাধ্যমে ব্যাপকভাবে সকল সেক্টরের উন্নয়নে হবে।চোলারা রাজধানী পলোন্নারুয়ায় স্থানান্তরিত করেছিল কারণ তারা দেখেছিল যে এটি শ্রীলঙ্কার সেরা উর্বর জমি,নিগরিল ভ্যালানডু বা অসম্ভব উর্বর জমি, নামে পরিচিত ছিল এবং এর নাম ছিল পলোন্নারুয়া-জাননাথা মঙ্গলম। মহাভেলী নদী এর মধ্য দিয়ে সমুদ্রের দিকে প্রবাহিত হয়েছে। বিজায়াবাহু আইয়ের বিজয়, পলোন্নারুয়ার হিরো,যা প্রকৃতপক্ষে পারকরামবাহু আই নামক ঐতিহাসিক বইয়ে স্থান পেয়েছেI এটি তার রাজত্ব ছিল যা পলোন্নারুয়ার স্বর্ণযুগ হিসেবে বিবেচিত।
রাজ্যের পৃষ্ঠপোষকতায় বাণিজ্য এবং কৃষির প্রবৃদ্ধি ঘটে, রাজা বৃষ্টির পানি অপব্যয়ের ব্যাপারে কঠোর ছিলেন এবং সবটুকুই ভূমির উন্নয়নের কাজে ব্যবহার করা হতো। এই কারণে, অনুরাধপুরা যুগের তুলনায় অনেক উন্নত সেচ ব্যবস্থা পারকরামবাহুর রাজত্বকালে নির্মিত হয়েছিল - যা বর্তমানকালেও দেশের পূর্বদিকে শুষ্ক মৌসুমে ধান চাষের জন্য প্রয়োজনীয় পানি সরবরাহ করে। তার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ছিল পারক্রম সমুদ্র। পলোন্নারুয়া রাজত্ব রাজা পারকরামবাহুর রাজত্বের সময় যা স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিল।তার প্রত্যক্ষ উত্তরাধিকারী, নিসানকামাল্লা ১ বাদে পলোন্নারুয়ার অন্যান্য সমস্ত রাজারা সামান্য দুর্বলচিত্ত ছিল এবং তাদের শুধুমাত্র নিজস্ব আদালতের মধ্যে লড়াই করার প্রবণতা ছিল। তারা আরও শক্তিশালী দক্ষিণ ভারতীয় রাজ্যের সাথে ঘনিষ্ঠ বিবাহগত সম্পর্ক গড়ে তুলতে শুরু করে যতক্ষণ না তা স্থানীয় রাজকীয় বংশধরদের ছাপিয়ে যায়। তার ফলে ১২১৪ খ্রিস্টাব্দে আরাকাক্রভরতি রাজবংশের রাজা কালিঙ্গা মাঘ আক্রমণ করেছিলেন যিনি জাফনা রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ।

সিগিরিয়া হচ্ছে শ্রীলংকার একটি অপূর্ব সুন্দর গুহামন্দির। ছয়শত ফুট উঁচু এক পাথর কেটে দুর্ভেদ্য প্রাসাদ বানিয়েছেন এক রাজা। প্রাসাদ অনেকটা মৌচাকের চাকের মতো। এই পাথর সিগিরিয়া রক নামে ভুবন বিখ্যাত। সিগিরিয়া রকের আরেক নাম লায়ন রক। এটি বৌদ্ধমন্দির হিসেবে চৌদ্দ শতক পর্যন্ত ব্যবহৃত হতো।সিগিরিয়া দুর্গের পাথরের প্রবেশপথটি একটি বিশাল সিংহমূর্তির মতো। সিংহমূর্তির অনেকখানি এখনো টিকে আছে। প্রাগৈতিহাসিক এই গুহাটি খ্রীস্টপুর্ব ৫০০ শতাব্দী থেকেই সাধু সন্যাসীদের আশ্রম হিসেবে ব্যবহৃত হত। শোনা যায় দক্ষিণ ভারতীয় রাজা কাশ্যপ কোন যুদ্ধে পড়াজিত হয়ে ৪৯৫ খ্রীস্টাব্দ নাগাদ এই স্থানে আশ্রয় নেন এবং সুরক্ষিত একটি দূর্গ গড়ে তোলেন। পরবর্তীতে এটি বৌদ্ধদের মঠে পরিণত হয়। বর্তমানে এটি শ্রীলংকার একটি আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র এবং বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান।
তথ্যসূত্রঃ ইন্টারনেট।
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই জানুয়ারি, ২০১৯ সকাল ৯:৫৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




