প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কেন নোবেল পুরষ্কার পেলন না?
গত ৭ই অক্টোবর ২০১৬ইং তারিখে শান্তিতে নোবেল জয়ী হিসেবে যখন কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট হুয়ান মানুয়েল সন্তোষ এর নাম শুনতে পেলাম তখন থেকেই এই প্রশ্নটি ঘুরপাক খাচ্ছে! আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কেন শান্তিতে নোবেল পুরষ্কার পেলেন না?
বিবিসিসহ অন্যান্য সংবাদ মাধ্যেমে বেশ কয়েকদিন ধরেই দৃষ্টি রাখছিলাম কলম্বিয়ার ফর্ক বিদ্রোহীদের সাথে সে দেশের সরকারের চুক্তি বিষয়ের সংবাদটিতে! ১৯৬৪/৬৫ সাল থেকে মার্কসবাদী আদর্শে বিশ্বাসীর সে দেশের সরকারের বিরোদ্ধে বিদ্রোহ শুরু করে ফর্ক বিদ্রোহীরে। দীর্ঘ অর্ধ দশক ধরে চলা বিদ্রোহে প্রায় দুই থেকে আড়াই লাখ নিরহ মানুষ প্রাণ হারায়! দেশের অর্থনীতির উপর মারাত্মক প্রভাব পরে বিদ্রোহের ফলে!
বিদ্রোহ দমন ও শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রায় চার বছর দেশে-বিদেশে বিভিন্ন দেশের মধ্যস্ততায় আলোচনার পর কলম্বিয়া সরকার ও বিদ্রোহীদের মাঝে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়! চুক্তি স্বাক্ষরের সময় উপস্থিত ছিলেন জাতিসংঘের প্রেসিডেন্ট বান কি মুন, আমেরিকার পররাষ্ট্র মন্ত্রী জন কেরি, কিউবার প্রেসিডেন্ট ফিদেল কাস্তোসহ বিশ্ব নেতৃবৃন্দ!
একটু পেছনে ফিরে যাই! মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর ঠিক এমনি একটি চুক্তি করেছিলেন বাংলাদেশে! তিনিও প্রায় ৩০বছর ধরে চলা একটি বিদ্রোহকে রক্তপাতহীন ভাবে চুক্তির মাধ্যেমে দমন করেছিলেন(এখন আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে)! পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সাথে চুক্তিটি হয় যা পার্বত্য চুক্তি বা শান্তি চুক্তি নামে পরিচিত! স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে শান্তি বাহিনীর উক্ত বিদ্রোহের কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে মারাত্মক প্রভাব পরে! সামরিক ও বেসরকারি মিলিয়ে প্রায় ৩৫ হাজার মানুষ প্রাণ হারায়! যাদের সকলেই ছিলো বাঙ্গালি সম্প্রদায়ের! উপজাতীয় সম্প্রদায় নিয়ে গঠিত বিদ্রোহী গোষ্ঠী শান্তি বাহীনি ও উপজাতীয় সম্প্রদায়ের সাধারণ মানুষও যে এতে ক্ষতি হয়নি তা নয়! উভয় পক্ষেই ব্যাপক ক্ষয় ক্ষতি হয়েছে।
যাক, চুক্তি সম্পাদনের থেকেই আওয়ামীলীগের পক্ষ থেকে অনেকেই হাঁকডাক করতে শুরু করেছিলেন শেখ হাসিনার নোবেল পুরষ্কার নিয়ে! এখনো অনেকে এটা নিয়ে আক্ষেপ করেন!
আপাতত দৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, যে কাজের জন্য কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্টকে ২০১৬ সালে শান্তিতে নোবেল দেওয়া হলো ঠিক একই কাজ আজ থেকে ১৯ বছর আগেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা করেছেন। কিন্তু তাকে কেন নোবেল পুরষ্কার দেওয়া হল না? এটা শেখ হাসিনার প্রতি বৈষম্যেই বলা চলে!
সব কাজেরই একটা 'কিন্তু' থেকে যায়! যে কাজটি কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট করে দেখিয়েছেন সেই কাজটি শেখ হাসিনা করতে পারেননি বলেই হয়তো নোবেল পুরষ্কার শেখ হাসিনার জন্য অধরাই থেকে গেছে!
চুক্তি স্বাক্ষরের পর তা জনগণের সামনে তুলে ধরে একটি গণভোটের আয়োজন করলেন কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট! চুক্তির বিরোধিতা যে চরম ছিলো তাও নয়! তার পরেও দীর্ঘ সময়ে চলা বিদ্রোহে নিহত স্বজনদের পরিবারের দাবির প্রেক্ষিতে সেদেশের সরকার উক্ত গণভোটের আয়োজন করে! চুক্তির পক্ষে সেদেশের সরকার সরকারি বেসরকারি মিডিয়ায় বিভিন্নভাবে প্রচার চালায়! তার পরেও সে দেশের জনগণ চুক্তির বিপক্ষে ভোট দেয়! কিন্তু কেন? চুক্তিতে বিদ্রোহীদের তেমন কোন সুযোগ সুবিধা না দিলেও একটি শর্তই সেদেশের জনগণ এর বিরুদ্ধে চলে যেতে বাধ্য হয়! দীর্ঘদিন ধরে চলা বিদ্রোহে যেসকল বিদ্রোহীরা হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত ছিলো তাদেরকে সাধারণ ক্ষমা করে দেওয়ার বিষয়টি সেদেশের জনগণ মেনে নিতে পারেননি! আর তাতেই আটকে যায় চুক্তি! অর্থাৎ গণভোটে চুক্তির বিপক্ষে রায় চলে যায়!
এবার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সময়ে করা চুক্তির বিষয়ে আলোকপাত করলে কি দেখি? তখন শান্তি বাহিনীর সাথে যে চুক্তিটি হয় তা কি বাংলাদেশের জনগণ মেনে নিয়েছিলো? তৎকালীন সময়ে প্রধান বিরোধীদল বিএনপি, জামায়তে ইসলামী, জাতীয় পার্টিসহ প্রায় সকল রাজনৈতিক দল চুক্তির বিরোধিতা করেছিলো! সারা বাংলাদেশ চুক্তির বিরোধিতা করে বিক্ষোভে ফেটে পরেছিলো! কিন্তু বন্ধুক ও ক্ষমতার জোরে তাতে কর্ণপাত করেনি তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকার! ধরে নিলাম বিরোধীদল বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা করেছে! কিন্তু যারা ঐ বিদ্রোহীদের আক্রমণে নিহত হয়েছে তাদের পরিবারের স্বজনদের জন্য কি করেছিলেন শেখ হাসিনা? বরং সশস্ত্র বিদ্রোহীদের বিভিন্ন সামরিক বেসরকারি বাহিনীতে পুনর্বাসন করেছিলেন! চুক্তিতে এমন কিছু ধারা সংযোজন করেছে যার কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙ্গালি সম্প্রদায় আজ দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে পরিনত হয়েছে! বঞ্চতি হচ্ছে তাদের সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার হতে!
চুক্তি মতে এমন কিছু প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তুলা হয়েছে যা সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক! ইতোমধ্যে হাইকোর্ট থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদকে অসাংবিধানিক বলে রায় দেওয়া হয়েছে! সরকার নিজের মান বাচানোর জন্য আপিল করে রায়টি স্থগিত করে রেখেছে!
অন্যদিকে চুক্তির বিরোধিতা করে এখনো আন্দোলন করে আসছে পার্বত্য চট্টগ্রামের বেশ কয়েকটি স্থানীয় সংগঠন! অপরদিকে চুক্তির দিনই জনসংহতি সমিতির একাংশ(বর্তমান ইউপিডিএফ) চুক্তির বিরোধিতা শুরু করে। এখনো বিরোধিতা করে আসছে! আবার জনসংহতি সমিতি তাদের শান্তি বাহিনীর(সশস্ত্র) একটি অংশকে এখনো সক্রিয় রেখেছে! শুধু তাই নয় চুক্তির পূর্বে পার্বত্য চট্টগ্রামে যে অবস্থা বিরাজ করছিলো এখনো সেই অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে তাও বলা যাবে না! হত্যা, অপহরণ, চাঁদাবাজি, ছিনতাই এখনো সেখানকার নিত্যদিনের ঘটনা! সরকারের পক্ষ থেকে চুক্তি মোতাবেক সবগুলো শর্ত বাস্তব করার পরেও সশস্ত্র বিদ্রোহী গ্রুপগুলো অস্ত্র ভাণ্ডার দিনের পর দিন বৃদ্ধি করে চলছে! বিভিন্ন সময়ে অস্ত্র উদ্ধার ও সন্ত্রাসীদের সাথে সামরিক বাহিনীর গুলি বিনিময়ের ঘটনা তাই প্রমাণ করে।
আরেকটি বিষয় উল্লেখ্য যে, কলম্বিয়ার ফর্ক বিদ্রোহীরা বিদ্রোহ করেছিলো দেশের শাসন ব্যাবস্থার পরিবর্তন করে বামপন্থী মার্কসবাদী শাসন প্রতিষ্ঠা করতে! অন্যদিকে, পার্বত্য চট্টগ্রামে যে সংঘাত হয়েছিল তা বিদ্রোহ নয় বরং বিচ্ছিন্নবাদ! তারা বাংলাদেশকে টুকরো করে কথিত জুম্মল্যাণ্ড গঠন করতে চেয়েছিলো! যা কোন রাজনৈতক সংকট ছিলো না!
যেখানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চুক্তি বাস্তবায়ন করেও নোবেল পায়নি সেখানে কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট সন্তোষ চুক্তি করে তা বাতিল হওয়ার পরও কেন বা কিভাবে শান্তিতে নোবেল পেল তা বুঝাটা কঠিন নয়! সন্তোষ দীর্ঘ প্রক্রিয়ার পর যেমন চুক্তিতে উপনীত হয়েছে একই ভাবে দেশের জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন দেখিয়েছেন!
এদিকে কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট ও বিদ্রোহী নেতা উভয়ের সেদেশের জনগণের রায়কে সম্মান দেখিয়ে বলেছেন আমরা শান্তি প্রক্রিয়ার আলোচনা অব্যাহত রাখবো! এ থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, চুক্তির যেসব শর্ত নিয়ে সেদেশের জনগণের আপত্তি আছে তা উভয় পক্ষ আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করবে যা সেদেশের জনগণের সমর্থন নিয়েই বাস্তবায়িত হবে! তাই বলা যায় দীর্ঘ দিনের বিদ্রোহ দমন করে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট যে প্রচেষ্টা করে যাচ্ছে তার সঠিক মূল্যায়ন করতে নোবেল কমিটি কোন ভুল করেনি! একজন যোগ্য ব্যাক্তিকেই ২০১৬ সালের শান্তিতে নোবেল পুরষ্কারের জন্য বেছে নিয়েছেন! এজন্য নোবেল কমিটিকে ধন্যবাদ জানাই!
অপরদিকে অত্যন্ত দুঃখের সাথে বলতে হয় আমাদের আজকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শান্তির জন্য যে চুক্তি করেছিলেন তা শান্তি তো বয়ে আনেই নি বরং নানামুখী সমস্যার জন্ম দিয়েছে নিরাপত্তা ও ভূমি হারানোর আশংকায় ঠেলে দিয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রায় আট লাখ হতদরিদ্র বাঙ্গালি সম্প্রদায়ের জনগণকে! শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে অশান্তির বীজ তৈরি করে দিয়েছে জনগণকে! আশা করি জনগণের রায় নিয়ে উক্ত চুক্তি বাতিল করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নতুন করে উদ্যোগ গ্রহণ করবেন! যার ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী শান্তি ফিরে আসবে বলে মনে করি! তখন নোবেল দেওয়ার দাবিতে কোন চাটুকারদের রাস্তায় নামতে হবে না! যোগ্য ব্যাক্তি হিসেবেই নোবেল কমিটি আপানাকে (প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা) শান্তিতে নোবেল দেওয়ার জন্য বেছে নিবেন বলে আশা রাখি!
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই অক্টোবর, ২০১৬ সন্ধ্যা ৭:৫১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



