somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

প্রিয়জনরা ক্ষনস্থায়ী- এই আছে, এই নেই।

২২ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৬ রাত ২:৫৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

এই ছেলে দাঁড়াও। বলা যায় গুরতর কোন অপরাধ ছাড়াই নতুন স্যার আমাকে দাঁড় করালেন। আইনষ্টাইনের মত কাশফুলের জঙ্গল স্যারের মাথায়। শুকনো এইটুকুন একটা মুখ। মনে না রাখা টাইপ চেহারা। রাজ্যের সব বিতৃষ্ণা সেই চেহারায় বাসা বেঁধে আছে। তিনি চোখ দুটোকে বাজারে নতুন আসা গোল আলুর মত করে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। সেই চোখে রক্তব আঁকা-বাঁকা শিরা দেখা যাচ্ছে। ঠোঁট দুটো রাগে কাঁপছে। আমার ভয় পাওয়া উচিৎ ছিল। কিন্তু আমি একটুও ভয় পেলাম না। কারণ আমার সৎ সাহস ছিল। আমি ক্লাশরুমে মুমূর্ষ পাখিটিকে এনে অযথা হুলস্থুল কান্ড ঘটাইনি। এটাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলাম মাত্র। পাখিটাকে পাগলের মত বাঁচানোর প্রয়াস ক্লাশের মেয়েরা সহ্য করতে পারেনি। তাদের কেউ কেউ বিচার দিল।

টিফিন টাইমের সেই প্রচেষ্টার জের ধরেই স্যার আমাকে হাত বাড়াতে বললেন। আমি বাড়ালাম এবং এক দৃষ্টে স্যারের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। স্যার আমার দিকে আগুন দৃষ্টি ফেলে মেরেই গেলেন। আমার ভেতর খুব অভিমান হলো। আমি হাত সরালাম না, একটুও চোখের পানি ফেললাম না। গরম দৃষ্টিতে তার দিকে শুধু তাকিয়ে থাকলাম। সেই দৃষ্টিতে কোনো অনুশোচনা ছিলনা- ছিল হাজার প্রশ্ন আর ক্রোধ। আমার সৎ সাহস আমাকে সহ্যসীমার শেষ কিনারা পর্যন্ত পৌঁছে দিল। স্যার হার মানলেন। বোধহয় আমার আঙুল ফেটে রক্ত ঝরা তিনি সহ্য করতে পারলেন না।

কে যেন একটা রুমাল নিয়ে এগিয়ে এল। আমি অভিমানে এতই বিভোর ছিলাম যে তাকে ধাক্কা দিয়ে এক প্রকার ফেলেই দিলাম। পাগলের মত ফাটা আঙ্গুলটাকে মুখের ভেতর ঢুকিয়ে নোনা রক্ত চুষে নিতে লাগলাম। স্যার নিজের জায়গায় কাঁপতে কাঁপতে বললেন- এই ছেলে কি করো? কি করো? পাগল নাকি...?

10 মিনিটের মধ্যে ক্লাশরুমের পরিবেশ স্বাভাবিক হয়ে এলো। কিছুক্ষন পর স্যার ছুটির নোটিশ সবাইকে পড়ে শুনালেন- আগামীকাল থেকে ঈদ উপলক্ষ্যে স্কুল ছুটি।

ছুটির ঘন্টা বাজলো। সহপাঠিদের কাছ থেকে সহনাভূতি পাওয়ার তোয়াক্কা না করে- আমি ব্যাগ গুছিয়ে বেরিয়ে এলাম। রাস্তায় এসে দেখলাম- ভীড়ের শেষ মাথায় স্যার দাঁড়িয়ে আছেন। আমাকে দেখে ভীড় ঠেলে দ্রুত এগিয়ে এলেন। আমার সামনে হাঁটু গেড়ে বললেন- 'বাবা আমাকে মাপ করে দে, তোকে অনেক মেরেছি...'। কোথায় স্যারের সেই পিশাচমাখা মুখচ্ছবি? দৃষ্টিতে নেই তার কোনো ক্রোধ। সেখানে এখন অনুশোচনা। এতক্ষন যে কান্নার ঝড় আমি ভালোভাবে থামিয়ে এলাম, সেটা এখন প্রবল বেগে ফিরে এলো। আমি তাকে জড়িয়ে হাউ-মাউ করে কেঁদে একাকার। আমার অভিমান কোথায় কোন বনে হারিয়ে গেল...! তিনি বার বার আমার চোখ মুছে দিচ্ছেন, কিন্তু আমার কান্নার পানি আর শেষ হয়না। পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে কেবল বলে গেলেন- 'আহারে... পাগল ছেলে... পাগল...। হয়েছে এবার কান্না থামা। ঈদের পর তোকে আরও আদর করে দেব...।'

[ পুনশ্চঃ ঈদের পর স্যারের সাথে আমার কখনো দেখা হয়নি। অনেকদিন পর শুনলাম তার নাকি ব্লাড ক্যান্সার ছিল। তিনি পৃথিবী থেকে ছুটি নিয়ে চলে গেছেন। স্যার যা করেছেন- তা নিয়ে আমার ভেতরে কোন ক্ষোভ ছিলনা। তাকে মাঝে মাঝে খুব মনে পড়ে। তার শেষ কথাগুলো আমার আজও কানে বাজে- 'আহারে... পাগল ছেলে... হয়েছে এবার কান্না থামা। ঈদের পর তোকে আরও আদর করে দেব...'। মনটা কেমন করে ওঠে। মানুষ সৃষ্টিকর্তার এক বিচিত্র চরিত্র। প্রতি মুহূর্তে তার শতরূপ। মনটা হাহাকার করে ওঠে তখনই যখন মনে হয়- প্রিয়জনরা ক্ষনস্থায়ী; এই আছে, এই নেই... ]

----------------------
[ ক্লাশ সিঙ্, 1995ইং ]
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০
৭টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মিলাদুন্নবী: ভালোবাসার নবী, মানবতার শ্রেষ্ঠ আদর্শ

লিখেছেন জুয়েল তাজিম, ২৫ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১৮


মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্মদিন বা মিলাদুন্নবী শুধু একটি ঐতিহাসিক স্মরণদিন নয়; এটি মানবতার জন্য এক মহান আদর্শের কথা স্মরণ করার উপলক্ষ। তাঁর আগমন ছিল এমন এক... ...বাকিটুকু পড়ুন

গল্পঃ একটি পরিচ্ছন্ন শৌচাগার

লিখেছেন রাজসোহান, ২৫ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৪৮



বাড়িটা দেখতে বাড়ির মতো না, যেনো একটা ঘোষণা। দ্যাখো, আমি কে।

গেটে দুইটা সিংহ, পাথরের, মুখ হাঁ করা; সিংহ দুইটা কী পাহারা দিচ্ছে তারা নিজেরাও জানে না। ভিতরে উঠান... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মক্তব চালু করলে শিশুরা ফিরে আসবে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৬ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ২:৪২


ববি হাজ্জাজ প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী। মুসা বিন শমসেরের ছেলে। মন্ত্রী হওয়ার পর থেকে পুরো দেশ চষে বেড়াচ্ছেন। নতুন দায়িত্ব পেয়েছেন, নতুন নতুন আইডিয়া দিচ্ছেন। মনে হয়,... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাঁধনের কেন ফেমিকন লাগে !!!

লিখেছেন অপলক , ২৬ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১:৩৪



বাঁধন এখন বন্ধন মুক্ত। মিডিয়া পাড়ায় সরব উপস্থিতি। উপর মহলের ডাকে সারা দিতে হয়। কাজেই ফেমিকন লাগতেই পারে। মানে ফেমিকনের এ্যাড করা লাগতেই পারে। মিডিয়া আইকন হিসেবে জনসচেতনাতা বাড়াতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“উন্নয়নের দুর্ভিক্ষে বাংলাদেশ”

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ২৬ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৪:৫৮



বাং/লাদেশের মূর্খ জনগণ উন্নয়নের চেয়ে কথিত ফ্যাসিবাদকে বড় করে দেখেছে কিন্তু “উন্নয়নের দুর্ভিক্ষ” কি জিনিস তা দেখেনি।

দেখতে থাকুক….। আর ভাতের দুর্ভিক্ষ শুরু হলে বলে…..।

ফ্যাসিবাদ দূর করতে গিয়ে উন্নয়নই "নাই"... ...বাকিটুকু পড়ুন

×