টিফিন টাইমের সেই প্রচেষ্টার জের ধরেই স্যার আমাকে হাত বাড়াতে বললেন। আমি বাড়ালাম এবং এক দৃষ্টে স্যারের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। স্যার আমার দিকে আগুন দৃষ্টি ফেলে মেরেই গেলেন। আমার ভেতর খুব অভিমান হলো। আমি হাত সরালাম না, একটুও চোখের পানি ফেললাম না। গরম দৃষ্টিতে তার দিকে শুধু তাকিয়ে থাকলাম। সেই দৃষ্টিতে কোনো অনুশোচনা ছিলনা- ছিল হাজার প্রশ্ন আর ক্রোধ। আমার সৎ সাহস আমাকে সহ্যসীমার শেষ কিনারা পর্যন্ত পৌঁছে দিল। স্যার হার মানলেন। বোধহয় আমার আঙুল ফেটে রক্ত ঝরা তিনি সহ্য করতে পারলেন না।
কে যেন একটা রুমাল নিয়ে এগিয়ে এল। আমি অভিমানে এতই বিভোর ছিলাম যে তাকে ধাক্কা দিয়ে এক প্রকার ফেলেই দিলাম। পাগলের মত ফাটা আঙ্গুলটাকে মুখের ভেতর ঢুকিয়ে নোনা রক্ত চুষে নিতে লাগলাম। স্যার নিজের জায়গায় কাঁপতে কাঁপতে বললেন- এই ছেলে কি করো? কি করো? পাগল নাকি...?
10 মিনিটের মধ্যে ক্লাশরুমের পরিবেশ স্বাভাবিক হয়ে এলো। কিছুক্ষন পর স্যার ছুটির নোটিশ সবাইকে পড়ে শুনালেন- আগামীকাল থেকে ঈদ উপলক্ষ্যে স্কুল ছুটি।
ছুটির ঘন্টা বাজলো। সহপাঠিদের কাছ থেকে সহনাভূতি পাওয়ার তোয়াক্কা না করে- আমি ব্যাগ গুছিয়ে বেরিয়ে এলাম। রাস্তায় এসে দেখলাম- ভীড়ের শেষ মাথায় স্যার দাঁড়িয়ে আছেন। আমাকে দেখে ভীড় ঠেলে দ্রুত এগিয়ে এলেন। আমার সামনে হাঁটু গেড়ে বললেন- 'বাবা আমাকে মাপ করে দে, তোকে অনেক মেরেছি...'। কোথায় স্যারের সেই পিশাচমাখা মুখচ্ছবি? দৃষ্টিতে নেই তার কোনো ক্রোধ। সেখানে এখন অনুশোচনা। এতক্ষন যে কান্নার ঝড় আমি ভালোভাবে থামিয়ে এলাম, সেটা এখন প্রবল বেগে ফিরে এলো। আমি তাকে জড়িয়ে হাউ-মাউ করে কেঁদে একাকার। আমার অভিমান কোথায় কোন বনে হারিয়ে গেল...! তিনি বার বার আমার চোখ মুছে দিচ্ছেন, কিন্তু আমার কান্নার পানি আর শেষ হয়না। পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে কেবল বলে গেলেন- 'আহারে... পাগল ছেলে... পাগল...। হয়েছে এবার কান্না থামা। ঈদের পর তোকে আরও আদর করে দেব...।'
[ পুনশ্চঃ ঈদের পর স্যারের সাথে আমার কখনো দেখা হয়নি। অনেকদিন পর শুনলাম তার নাকি ব্লাড ক্যান্সার ছিল। তিনি পৃথিবী থেকে ছুটি নিয়ে চলে গেছেন। স্যার যা করেছেন- তা নিয়ে আমার ভেতরে কোন ক্ষোভ ছিলনা। তাকে মাঝে মাঝে খুব মনে পড়ে। তার শেষ কথাগুলো আমার আজও কানে বাজে- 'আহারে... পাগল ছেলে... হয়েছে এবার কান্না থামা। ঈদের পর তোকে আরও আদর করে দেব...'। মনটা কেমন করে ওঠে। মানুষ সৃষ্টিকর্তার এক বিচিত্র চরিত্র। প্রতি মুহূর্তে তার শতরূপ। মনটা হাহাকার করে ওঠে তখনই যখন মনে হয়- প্রিয়জনরা ক্ষনস্থায়ী; এই আছে, এই নেই... ]
----------------------
[ ক্লাশ সিঙ্, 1995ইং ]
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



