somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

শুভ জন্মদিন গুরু

২৮ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ রাত ১:২৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

১৯৭৩ সালের ঘটনা। সন্ধ্যা সাতটার কনসার্ট, অথচ মানুষ এসে বসে আছে সেই বিকেল পাঁচটা থেকে কিন্তু শিল্পী-কলাকুশলীদের টিকিরও দেখা নেই। এমনিতে আমাদের দেশে টিকিট কেটে যারা কনসার্ট দেখতে আসেন সময়মতো শিল্পীর দেখা না পেলে তারাই সেখানে কেয়ামত ঘটিয়ে দেন কিন্তু সেদিনের অবস্থা ছিল একেবারেই উল্টো। কনসার্ট কখন শুরু হবে তা নিয়ে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটের মাঠে প্রায় ত্রিশ হাজার জনতার সে কী তীব্র অপেক্ষা, কিন্তু তাদের কারো মধ্যে শিল্পীর প্রতি একরত্তিও অভিযোগ নেই। রাত সাড়ে আটটায় খবর এলো এয়ারপোর্ট থেকে শিল্পী এরমধ্যেই রওয়ানা হয়ে গেছেন কনসার্টের উদ্দেশ্যে, কলাকুশলীরা রওয়ানা দিয়েছেন তারও আগে। খানিক বাদেই স্টেজে উঠলেন হাবলু ভাই। ব্যায়ামবিদের মতো মাসলওয়ালা শরীর। স্টেজে উঠেই হাবলু তার সেই বিখ্যাত ড্রাম বাজানো শুরু করলেন। মিনিটখানেক পরেই উত্তেজনার বশে নিজের টি-শার্টও ছিড়ে ফেললেন হাবলু। এরমধ্যেই সবার কাছে খবর চলে এসেছে, চলে এসেছেন শিল্পী।

সারা মাঠের জনতার মুখে তখন একই রব 'গাউসুল আজম, হু! হা!' 'গাউসুল আজম, হু! হা!'। মুহুর্তেই তাদের সেই গণরবে গরম হয়ে উঠল গোটা প্রাঙ্গণ। এরমধ্যেই খালি পায়ে দর্শকদের মাঝ থেকে দৌড়ে এসে স্টেজে উঠলেন তিনি। শুরু করলেন তার সেই বিখ্যাত গাণ 'এতো সুন্দর দুনিয়ায় কিছুই রবে না গো, হায় আল্লাহ! হায় আল্লাহ! রে'

এতোক্ষনে কারো নিশ্চয়ই আর বুঝতে বাকী নেই যে সেদিনের সেই মানুষটিই আমাদের পপসম্রাট, গুরু আজম খান।

পুরো নাম মোহাম্মদ মাহবুবুল হক খান হলেও এই নামে কখনোই তিনি পরিচিত হননি, সারা দেশের মানুষের কাছে তিনি আজম ভাই কিংবা গুরু নামেই সর্বাধিক পরিচিত। উনসত্তরের গণঅভ্যুথানে যেমন ক্রান্তি শিল্পীগোষ্ঠীর হয়ে গণসঙ্গীত গেয়েছেন, তেমনি দেশের প্রয়োজনে সশস্ত্রভাবে যোগ দিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে কখনো সুবিধা নেয়া তো দূরে থাক, মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেটটিও নেননি কোনদিন।

দেশবরেণ্য এই শিল্পীর ছিলনা কোনো উচ্চতর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, পড়ালেখার পাট চুকিয়েছিলেন এইচএসসি পাস করেই। কোন যন্ত্রসঙ্গীত বাজানো তো দূরে থাক সঙ্গীতের উপর তালিমও নেননি কোনদিন। তার প্রতিটি গানের রচয়িতা তিনি নিজেই,অথচ কোন গানই তাকে লিখে রেখে সুর করতে হয়নি। যখনই সমাজের কোন অসঙ্গতি দেখেছেন অথবা কোনকিছু দেখে ভালো লেগেছে ওমনি সেটা নিয়ে গান বেঁধেছেন। তার গাওয়া 'রেল লাইনের ওই বস্তিতে' গানটি লিখেছিলেন ১৯৭৪ সালে। দুর্ভিক্ষে সারা দেশ তখন টালমাটাল। না খেয়ে প্রতিদিন মারা যাচ্ছে অগণিত মানুষ। গান গেয়ে যে টাকা পেতেন তা অকাতরেই বিলিয়ে দিতেন গরীব-দুঃখীদের মাঝে। নিজে যুদ্ধ করে স্বাধীন করা দেশের এমন পরিণতি দেখে আর ঠিক থাকতে পারলেন না। লিখে ফেললেন গানটি। পরবর্তীতে গানটি সারাদেশে দারুন জনপ্রিয় হয়।

সারা পৃথিবীতে পপ সঙ্গীতকারদের ধারে কাছে তার ভক্তরা ঘেঁষারও সুযোগ পান না অথচ আমার জানামতে আজম খানই সারা পৃথিবীতে একমাত্র পপ সঙ্গীতশিল্পী যিনি নিজে বাজার করতেন, এলাকার সকল কাজেকর্মে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতেন, একবার তো স্যান্ডো গেঞ্জি আর লুঙ্গি পরেই টেলিভিশনে গোটা একটা ইন্টারভিউ দিয়ে দিলেন।

আজম খান বাংলাকে ভালবাসতেন অন্তর দিয়ে। সেই অস্থির সময়ে সবাই যখন ইংরেজির দিকে ঝুকছে তখন তিনি ঝুকেছেন বাংলার দিকে। নিজের ব্যান্ডটির নামও ছিল একেবারে খাটি বাংলায়, 'উচ্চারণ'।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর যুবকেরা যখন ক্রমাগত হতাশার পথে নিমজ্জিত হয়ে যাচ্ছিল তখন এই আজম খানই তাদের সংগঠিত করে সংস্কৃতি চর্চায় উদ্বুদ্ধ করে তোলেন। এই তরুণরাই তাকে গুরু নাম দেয়, যদিও শেষ পর্যন্ত তিনি হয়ে ওঠেন সারা বাংলার সঙ্গীত জগতের অবিসংবাদিত গুরু।

আজকে তোমার জন্মদিনে গুরু তোমার প্রতি রইলো গভীর শ্রদ্ধাভরা ভালোবাসা।

সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ রাত ১:২৯
৫টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

=আয় সখিরা ফিরে যাই মেয়ে বেলা=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১৯ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:৪৯


যাবি নাকি তোরা সখি
আমার সাথে মেয়েবেলা;
যেখানটাতে বসতো যে রোজ
কানামাছি বউছি খেলা।

ভাইবোনেরা রোজ বিকেলে
মাঠে হতাম সমবেত,
ডাংগুলি আর গোল্লাছুটে
বিকেল-খেলায় কেটে যেত।

খেলার আসর উঠোনজুড়ে
তোরাও কী খেলতি এমন?
করলে স্মরণ অতীতের দিন
বুকে লাগে কেমন কেমন।

আয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমি মাস্টার্স পাস করে ড্রাইভিং পেশা বেছে নিয়েছি

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:৪৩


পিংক বাস সার্ভিসের একজন নারী চালক, নাম রাবেয়া খাতুন। তিনি মাস্টার্স পাশ করে বাস চালাচ্ছেন। খবরটা পড়ে অনেকেই বাহবা দিচ্ছেন, কেউ কেউ বলছেন বাংলাদেশ এমন প্রতিভাকে ধরে রাখার যোগ্য... ...বাকিটুকু পড়ুন

একটি মেয়ের দৌড়াদৌড়ি ও একটি মায়ের অপেক্ষা

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৮:১৭

একটি মেয়ের দৌড়াদৌড়ি ও একটি মায়ের অপেক্ষা

মঙ্গলবার রাত ১০টা ২৭ মিনিট। গুলশানের একটি হাসপাতালে থেমে গেল ব্যারিস্টার তৌফিক নেওয়াজের হৃদয়- দীর্ঘদিনের অসুস্থতার পর।

আর ঠিক তখন, শহরের অন্য প্রান্তে, মুন্সিগঞ্জ... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিকাশ নূরা এবং হিরো আলমকে যারা প্রধানমন্ত্রী ভাবতেন ;)

লিখেছেন জ্যাক স্মিথ, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ২:৩২



একজন মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি, শিক্ষা-দীক্ষা থাকার চাইতেও জরুরী বিষয় হচ্ছে তার অন্তর্দৃষ্টি থাকা। অন্তর্দৃষ্টি, অন্তরচক্ষু বা জ্ঞানচক্ষু সম্পন্ন একজন ব্যক্তিকে কখনোই ধোঁকা দেওয়া বা ধোঁকায় ফেলানো সম্ভব নয় কারণ এরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাঙ্গালী কেন মুসলমান হতে পারে না?

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৫

অনারব টার্কিশ, কুর্দি আর ইরানিয়ানরা তাদের নিজ নিজ ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষন করে ও তা ধারন করেও তারা মুসলিম, পাকিস্তানের পাঞ্জাবীরাও যখন নিজেদের পাঞ্জাবী জাতি হিসেবে অহংকার করে, তখনও তারা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×