somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বাড়ি ফেরার কদম গাছ - 1

০১ লা নভেম্বর, ২০০৬ রাত ৩:২৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বাড়ি ফেরার বাস ধরব বলে বাসষ্টপে দাঁড়িয়ে আছি হঠাত্ দেখলাম বাতাসে কিছু একটা ঝরে পড়ছে মাথার উপরের গাছ থেকে। চারপাশে তাকিয়ে দেখলাম গোটা রাস্তা বিছিয়ে আছে সরু সরু চিরল চিরল পাপড়িতে। চিনতে না পেরে মাথার উপর তাকিয়ে চমত্কৃত হয় গেলাম। একটা কদম গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছি আর সেই গাছ ভর্তি কদম ফুল! গোটা ছেলেবেলাটা জুড়ে আছে এক কদম গাছ। এক ছোট্ট মাঠ আর সেই কদমগাছ ঘিরে এক অজানা ভয়। প্যাচপ্যাচে কাঁদা পেরিয়ে সেই কদমতলায় যাওয়া ফুল কুড়াতে। সেই মাঠে হুটোপুটি করে খেলা খটখটে শুকনো দিনে কিংবা জল-কাঁদায়। এমনই এক বর্ষায় আমার জ্বর হয় আর গলায় খুব ব্যাথা। গলা বেশ ফুলেছে আমি হাত দিয়ে বুঝতে পারি। গলায় ব্যাথা হয়েছে বললেই আম্মা আগে গলার ওপরে হাত বুলিয়ে বোঝার চেষ্টা করে ফোলা আছে কি না আর তারপর মুখ হা ঁকরিয়ে দেখে ভেতরে কিছু দেখা যায় কি না, লাল হয়ে আছে কি না। গলায় এই ব্যাথাটা মাঝে মাঝেই হয় বলে প্রাথমিক চিকিত্সাটুকু আম্মাই করে ফ্যালে। গরম জলে নুন দিয়ে গার্গল করাবে আর গরম গরম দুধ নিয়ে এসে বলবে ফু ঁদিয়ে দিয়ে খেয়ে ফেলো। এই দুটোর কোনটাই আমার পছন্দ নয়। দুধে প্রচন্ড অরুচি আর গার্গল করতে গেলেই বমি করে ফেলি কিন্তু আম্মা নাছোড়বান্দা। অগত্যা। গার্গলও করতে হয় আর গরম দুধও খেতে হয়। গলায় ব্যাথা টের পেলে এখন তাই আমি নিজেই গলায় হাত বুলিয়ে বোঝার চেষ্টা করি, টনসিল ফুলেছে কি না। আর আমি বিছানায় শুয়ে জানালা দিয়ে আকাশ দেখি। কদমগাছটা দেখি। মাঝে মধ্যেই জ্বরের ঘোরে মাথা কেমন গুলিয়ে যায়। জেগে আছি কি ঘুমিয়ে আছি বুঝতে পারি না। মনে হয় কোথাও যেন ভাসছি। গোল গো ও ও ও ল গোল হয়ে পাক খাচ্ছি। ভাসতে চাইছি না। ঐ রকম ঘোরে থাকতে চাইছি না। অথচ ফিরেও আসতে পারছি না। চোখের সামনে কি সব ভেসে বেড়ায়। কখনও গোল কখনো চৌকো । পাশাপাশি সব। রঙীন। তারা ভাসতেই থাকে। জলের মধ্যে যেন কোন বুদ্বুদ। আমার চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে। আমি যেন আরও তলিয়ে যাই। মায়ের ডাকে ঘোর কাটে। প্রচন্ড জ্বরে নাকি পুড়ে যাচ্ছে গা। গায়ে জ্বরো গন্ধ। মা ভিজে তোয়ালে দিয়ে গা মুছিয়ে দেয়। গরম ভাতের কষ্টুনি এনে দেয়। আমি খেতে পারি না। এক ঢোক খেয়েই বমি করি। মা সেই বমি পরিষ্কার করে আবারও খানিকটা কষ্টুনি খাওয়ানোর চেষ্টা করে। আমি পাশ ফিরে শুয়ে আকাশের দিকে তাকাই। কখনও আকাশ কখনও কদমগাছকে দেখি। ভাবনা আসে মনে।

এলাটিং বেলাটিং সই লো।
কি খবর আইলো?

রাজায় একটা মাইয়া চাইলো ।
কোন মাইয়া চাইলো?

বড় হওয়া নিয়ে আমি খুব চিন্তিত। বড় হলে কতটা লম্বা হব আমি ? এই বিছানায় আর শুতে পারব? বড় হওয়া মানে তো অনেক লম্বা হওয়া? তাইলে কই দাদাজী তো অত লম্বা হয়নি? আব্বাও তো দিব্যি এই খাটেই ঘুমোয়! এই চিন্তায় আমি বেশ অস্থির হয়ে পড়ি। কিন্তু আম্মাকে জিজ্ঞেস করতে পারি না। আচ্ছা। আমি কেন আম্মাকে সব কথা বলতে পারি না? আমি চোখ বন্ধ করি। আবার ভাবনা আসে। চোখ বন্ধ করা মানেই তো রাত? তাইলে আম্মা কি করে কাজ করে আমি যখন চোখ বন্ধ করি? ঐ যে দেওয়ালের উপর বেড়ালটা চড়ে বসে আছে সে কি করে দেখতে পায়? আর ঐ যে কাকগুলো কা কা করে যাচ্ছে সমানে। তারাও কি ঘুমায় যখন আমি ঘুমাই? কোন উত্তর খুঁজে পাই না। ক্লান্ত লাগে। চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর চেষ্টা করি। চোখ চলে যায় পাশের বাগানে। মেজকাকা বাগান করেছে। বিভিন্ন গাছের সাথে সেখানে লাগিয়েছে এক হাস্নুহেনার চারা। গাছটা খুব একটা বড় হয়নি কিন্তু বেশ ঝাঁকড়া হয়ে ডালপালা ছড়িয়েছে চারপাশে। আর ফুটিয়েছে ফুল। অজস্র ফুল। গন্ধে ম ম চারিদিক। শুনেছি হাস্নুহেনার গোড়ায় নাকি সাপ থাকে। যে কোন সুগন্ধী ফুলগাছের তলায়ই নাকি সাপ এসে বাসা বাঁধে। আমি বিছানায় বসে গাছের গোড়ার সাপের বাসা খোঁজার চেষ্টা করি। কিছু চোখে পড়ে না। দাদী বলে ফুলের গন্ধে রাতে পরীরা আসে। আমাকে তাই সন্ধ্যের পরে বাগানে যেতে বারণ করেছে দাদী। আমি পরীদেরও পায়ের ছাপ খোঁজার চেষ্টা করি। দেখতে পাই না। পরী এলেই কি তার পায়ের ছাপ মেজকাকা থাকতে দেবে? সক্কালবেলায় উঠেই তো সে বাগানে। কিছু না কিছু একটা খোড়াখুড়ি তার করা চাই ই চাই। পরীদের পায়ের ছাপ কিংবা সাপের বাসার খোঁজ না পেয়ে আমি খানিক নিশ্চিন্ত বোধ করি। কিন্তু সাপ প্রাণীটা খুব বাজে । মুখের ভেতরে বিষ নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। তার গায়ে কারও পা পড়লে কিংবা তার সামনে দিয়ে কেউ গেলেই সে ফোঁস করে ওঠে আর কামড়ে দেয়। কামড়ানো মানেই তো সবটুকু বিষ ঢেলে দেওয়া। সব সাপের বিষ অত মারাত্মক হয় না বটে কিন্তু সে তো জলের সাপ। জলে থেকে থেকে ওরাও মাছের মতই হয়ে গেছে, কামড়ালেও কিছু হয় না। আমাকেই তো কামড়েছে একবার, ডান পায়ের গোড়ালীর কাছে তার দুটো দাঁতের দাগ বহুদিন ছিল। পুকুরে আব্বা জল ফেলে মাছ ধরছিল, খানিক পর পরই জায়গা বদল করছিল, প্রতিবার জাল ফেলার পরই এগিয়ে যাচ্ছিল সুবিধেজনক জায়গার খোঁজে। আমি মাছের ঝাকড়ি হাতে পেছন পেছন যাচ্ছিলাম, মাটির দিকে চোখ ছিল না। পায়ে কিছু একটা কামড়েছে টের পেয়ে তাকিয়ে দেখি সড়সড় করে পুকুরের ঢালু পার বেয়ে জলে নেমে যাচ্ছে এক সাপ, সারাগায়ে হলুদ ছোপ। চেঁচিয়ে উঠতে আব্বা ও আর সকলে যারা মাছধরা দেখছিল সবাই ছুটে এল। সক্কলেই তাই বলল, এ পানির সাপ, কামড়ালে কিসসু হয় না। সামনের বাড়ির হাসিনা বলল খব্#378;আর গোবরে পা দিবি না। কেন জানতে চাইলে বলল, গোবরে পা দিলে সাপের বিষ জ্যান্ত হয়ে ওঠে! আমি তাই উঠোনের বাইরে পা রাখিনি বহুদিন। কিন্তু ডাঙার সাপে বিষও হয় আর সে কামড়ালে গোবরে পা ও দিতে হবে, না বিষ নিজে থেকেই জ্যান্ত হয়ে উঠবে !

ফুটপাথের ধার ঘেষে লাগানো হয়েছিল বোধ হয় কোন এককালে, সে বেড়ে উঠেছে সোজা কিন্তু নিজেকে মেলতে পারেনি পুরো। ফুটপাথ পেরিয়ে ঐ বিশাল সাদা পুলিশবাড়ির জাফরিকাটা দেওয়াল। সেই পুলিশবাড়িতে প্রচুর গাছ। বেশ বড় এক আঙিনা জুড়ে বিশাল বিশাল সব গাছ। দেখে বুঝতে পারি অনেক পুরনো গাছ এক একটা। দেওয়ালের ধার ঘেষে সব বড় বড় গাছ যারা তাদের ডালপালা ছড়িয়েছে চারপাশে। আর কদমগাছটা তাই জায়গা না পেয়ে নিজেকে ছড়িয়েছে রাস্তার উপরে। আধখানা চাঁদের মত কিংবা আধখানা তরমুজ। কদমের পাতাগুলো যেন একটু ছোট ? আমার সেই কদমের পাতাগুলো তো আরও বড় ছিল! নিজের মনেই হেসে ফেললাম ফিক করে। সচকিত হয়ে চারপাশে তাকাই, কেউ দেখছে না তো? নিশ্চিন্ত হই দেখে যে এই দুপুর রোদে খুব কম লোকই আছে আর তারা সবাই ভুঁরু কুচকে রাস্তার দিকেই দেখছে কাঙ্খিত বাসটি আসছে কি না। রোজ যেমন আমি দেখি। আমি যে ঘাড় উঁচিয়ে কদমগাছ দেখছি সেদিকে কারও চোখ নেই। ওমা! ঠিক কদমগাছটার পেছনে পুলিশবাড়ির দেওয়ালের ভেতর এক বিশাল কাঠালীচাঁপার গাছ! কাঠালীচাঁপার গাছ এত বড় হয়? আর তাতে ফুল ও ফুটে আছে। তবে কেন সবাই বলে শুধু বসন্তকালেই ফুল ফোটে?

(চলবে)
প্রথম প্রকাশ -- শারদীয়া আই পত্রিকা-2006
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা নভেম্বর, ২০০৬ রাত ২:০৪
১২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আররিজস বা ত্রুটি বিশিষ্ট মুসলিম দল পথভ্রষ্ট

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ২২ শে এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ৮:০৫



সূরাঃ ১০ ইউনুস, ১০০ নং আয়াতের অনুবাদ-
১০০। আল্লাহর অনুমতি ব্যতীত ঈমান আনা কারো সাধ্য নহে এবং যারা বুঝে না আল্লাহ তাদেরকে আররিজস (ত্রুটি/কলংক) যুক্ত করেন।

* তিহাত্তর দলে বিভক্ত... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার একশততম পোস্ট!

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২২ শে এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ১১:১৮



আমার একশততম পোস্ট!

আজ আমার লেখকজীবনের এক ছোট্ট কিন্তু হৃদয়ের গভীরে দাগ কাটা দিন- সামহোয়্যারইন ব্লগ এ আমার একশততম পোস্ট। সংখ্যার হিসেবে হয়তো ১০০ খুব বড় কিছু নয়।... ...বাকিটুকু পড়ুন

সংসদের বায়না : ৩০ সেট গয়না

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ২২ শে এপ্রিল, ২০২৬ দুপুর ১:১৪

একসময় এই প্রবাদটি খুব প্রচলিত ছিল, এমনকি পণ্ডিত মহলেও এটি নিয়ে ঠাট্টা-মশকরা করা হতো।
সময় বদলে গেছে; যমুনা নদী দিয়ে বহু জল বয়ে গিয়ে সাগরে মিশেছে।



বাস্তবতার নিরিখে আমাদের সমাজে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফুল ট্যাঙ্ক স্বপ্ন

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ২২ শে এপ্রিল, ২০২৬ বিকাল ৫:৩৬



শহরের সকালগুলো এখন আর আগের মতো নয়। সূর্য ওঠার আগেই পেট্রোল পাম্পের সামনে লম্বা লাইন পড়ে যায়। সেই লাইনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকে রিদম—একটি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, আর জীবনের বাস্তবতায় আটকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশি দৃষ্টিতে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন ও ভারতের হিন্দুরাষ্ট্র হয়ে ওঠার প্রচেষ্টা

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ২৩ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১:০৬


কাল থেকে দুই ধাপে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন শুরু হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি ভারতের কেন্দ্রীয় শাসনক্ষমতা ও মতাদর্শ দ্বারা যেমন প্রভাবিত, তেমনি এর প্রতিক্রিয়া বাংলাদেশেও প্রতিফলিত হয়। ভারতে যখন হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তাবাদী... ...বাকিটুকু পড়ুন

×