somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

জায়গা-জমি ক্রয়ে প্রতারণা এড়াতে জেনে রাখুন

১৫ ই জানুয়ারি, ২০২১ সন্ধ্যা ৬:১০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

দেশে জমি কেনা বেচা নিয়ে প্রতারণা প্রাচীনকাল থেকেই চলে আসছে। আপনি যদি জমি কেনার বিষয়ে অভিজ্ঞ না হন তবে আপনাকে ঠকাতে বিভিন্ন দালাল কিংবা বিক্রেতা ছড়িয়ে আছে। তাই চলুন জেনে নেয়া যাক জমির দাম নির্ধারণ থেকে শুরু করে বায়না ও জমি হস্তান্তর প্রত্যেকটি প্রক্রিয়ার খুঁটিনাটি।বিশেষ করে জমি বিক্রেতার মালিকানা এবং জমির বিভিন্ন দলিল ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করতে হবে; নইলে পড়তে পারেন বিপদে, এমনকি প্রতারিতও হতে পারেন । জমি কেনার প্রধান ও পূর্বশর্ত হচ্ছে, ক্রেতা হিসেবে আপনাকে সাবধান এবং সচেতন হতে হবে। হুট করে দলিলপত্রাদি যাচাই না করে জমি কেনা উচিত নয়। অনেক সময় দালালদের কথায় প্ররোচিত হয়ে জমি কিনতে গিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ার ঘটনাও অহরহ দেখা যাচ্ছে।

মালিকানা সঠিকভাবে যাচাই করুন

জমি কেনার আগে জমির মালিকানা সঠিকভাবে যাচাই করতে হবে। যে ব্যক্তি জমিটি বিক্রয় করবেন ওই জমিতে বিক্রয়কারীর জমির পূর্ণ মালিকানা আছে কি না, প্রথমে সে বিষয়টি নিশ্চিত হতে হবে। এ জন্য প্রস্তাবিত জমিটির সর্বশেষ রেকর্ডে বিক্রয়কারীর নাম উল্লেখ আছে কি না এবং সিএস, আরএসসহ অন্যান্য খতিয়ানের ক্রম মিলিয়ে দেখতে হবে। বিক্রয়ের জন্য প্রস্তাবিত জমিটি বিক্রয়কারীর দখলে থাকার বিষয়ে নিশ্চিত হতে হবে। জমিটি বিক্রেতা কী উপায়ে মালিক হলেন। তিনি উত্তরাধিকারসূত্রে মালিক নাকি ক্রয়সূত্রে মালিক তা জেনে নিতে হবে। জমিটি সরকারি কোনো সংস্থা অধিগ্রহণ করেছে কি না,খাসজমির অন্তর্ভুক্ত কি না কিংবা অর্পিত সম্পত্তি কি না তা জেনে নিতে হবে।

জমিটির মালিক কোনো আমমোক্তার বা অ্যাটর্নি নিয়োগ করেছে কি না, জেনে নিন। বিক্রেতা যদি আমমোক্তারনামার মাধ্যমে ক্ষমতা পেয়ে থাকে, এর বৈধতা যাচাই করতে হবে।

মিউটেশন বা নামজারি করা হয়েছে কি না এবং সে অনুযায়ী খতিয়ানে হস্তান্তরিত দাগের মোট জমির পরিমাণ এবং দাগের অবশিষ্ট পরিমাণ মিলিয়ে দেখতে হবে। জমিটির হালনাগাদ ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে। ভূমির কর না দেওয়ার কারণে কোনো সার্টিফিকেট মামলা আছে কি না, এ বিষয়ে খোঁজ নিতে হবে। জমিটির ওপর অন্য কোনো মামলা আছে কি না, জেনে নিতে হবে।

জমির দলিল সঠিক কিনা যাচাই করে দেখুন:

কোনো দলিল নিয়ে সন্দেহ হলে রেজিস্ট্রি অফিসে সংরক্ষণ করা দলিলের সাথে সাল মিলিয়ে দেখতে হবে। বিক্রেতার কাছ থেকে সব দলিল, বিশেষ করে ভায়া দলিল চেয়ে নিতে হবে। সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে জানতে হবে সব দলিলের ক্রমিক নম্বর, দলিল নম্বর ঠিক আছে কি না।
সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিস থেকে জমির মিউটেশন বা নামজারি সম্পর্কে খোঁজ নিতে হবে।একাধিক মালিকের ক্ষেত্রে সরেজমিনে গিয়ে স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে মূল মালিক কে, তা নির্ণয় করতে হবে।ভালো করে তারিখ, কাগজ, সিল ইত্যাদি লক্ষ্য করুন। দেখুন কোন অসংলগ্ন চোখে পড়ে কিনা।


বায়নানামা (বিক্রির চুক্তিপত্র) সম্পন্ন করা হলে তা রেজিস্ট্রি করতে হবে:
জমি বিক্রির জন্য জমির বায়নানামা (বিক্রির চুক্তিপত্র) সম্পন্ন করা হলে তা রেজিস্ট্রি করতে হবে। জমির বায়নানামা সম্পাদনের তারিখ থেকে এক মাসের মধ্যে বায়নাটি রেজিস্ট্রি করতে হবে। আর শর্ত অনুযায়ী বায়নার চুক্তি অনুযায়ী রেজিস্ট্রি করার সব পদ্ধতি মেনে সাব-কবলা দলিলটি সম্পাদিত হলে সম্পাদনের পর থেকে তিন মাসের মধ্যে সাব-কবলা দলিলটি রেজিস্ট্রি করাতে হবে। আইন অনুযায়ী, তিন মাস পার হয়ে গেলে রেজিস্ট্রি করা যাবে না। তবে উপযুক্ত কারণ দেখিয়ে জেলা রেজিস্ট্রারের কাছে আপিল করার সুযোগ আছে।বাংলাদেশের বাইরে দলিল সম্পাদন করা হলে দলিলটি যেদিন বাংলাদেশে পৌঁছাবে, সেই তারিখ থেকে চার মাসের মধ্যে রেজিস্ট্রি করাতে হবে।

দলিল লেখার সময় যে সকল বিষয়ে নজর রাখতে হয়:

দলিল সম্পাদনকারী তথা জমি দাতা (বিক্রেতা) আইনের দৃষ্টিতে সাবালক ও সুস্থ মস্তিষ্কে সম্পন্ন কিনা ,পুরাতন দলিল এবং নতুন দলিলের বিভিন্না জায়গা যেমন (ক) শিরোনাম (খ) সাফ কবলা (গ) বায়না পত্র ইত্যাদি খেয়াল করতে হবে৷

সংক্ষেপে যে বিষয় গুলো না জানলেই নয়

১) জরিপের মাধ্যমে প্রণীত রেকর্ড অর্থাৎ খতিয়ান ও নকশা যাচাই করতে হবে।
২) জমির তফসিল অর্থাৎ জমির মৌজা, খতিয়ান নম্বর, দাগ নম্বর উক্ত দাগে জমির মোট পরিমাণ জানতে হবে।
৩) প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সি,এস; এস,এ; আর,এস পর্চা দেখাতে হবে।
৪) বিক্রেতা ক্রয় সুত্রে ভূমির মালিক হয়ে থাকলে তার ক্রয়ের দলিল/ভায়া দলিল রেকর্ডের সঙ্গে মিল করে বিক্রেতার মালিকানা নিশ্চিত হতে হবে।
৫) বিক্রেতা উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত হলে সর্বশেষ জরিপের খতিয়ান বিক্রেতা বা তিনি যার মাধ্যমে প্রাপ্ত তার নামে অস্তিত্ব (যোগসুত্র) মিলিয়ে দেখতে হবে।
৬) জরিপ চলমান এলাকায় বিক্রেতার নিকট রক্ষিত মাঠ পর্চা যাচাই করে দেখতে হবে। যদি মাঠ পরচার মন্তব্য কলামে কিছু লেখা থাকে যেমন: মন্তব্য কলামে (AD) এভাবে লেখা থাকলে বুঝতে হবে অত্র খতিয়ানের বিরুদ্ধে তসধিক পর্যায়ে আপত্তি আছে। এরূপ জমি ক্রয়ের আগে জরিপ অফিস / ক্যাম্পে গিয়ে উক্ত জমিটির সর্বশেষ অবস্থা জেনে নিতে হবে।
৭) উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত জমি বিক্রেতার শরীকদের সঙ্গে বিক্রেতার সম্পত্তি ভাগাভাগির বণ্টন নামা (ফারায়েজ) দেখে নিতে হবে।
৮) বিক্রেতার নিকট থেকে সংগ্রহিন দলিল, খতিয়ান / পর্চা ইত্যাদি কাগজপত্র সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন ভূমি অফিসে গিয়ে তলবকারি /স্বত্বলিপি রেজিস্টারের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে।
৯) সর্বশেষ নামজারি পর্চা ডি, সি, আর খাজনা দাখিল (রসিদ) যাচাই করে দেখতে হবে। জমির খাজনা বকেয়া থাকলে এবং বকেয়া খাজনাসহ জমি ক্রয় করলে বকেয়া খাজনা পরিশোধের দায় ক্রেতার।
১০) বিবেচ্য জমিটি সার্টিফিকেট মোকদ্দমা ভুক্ত কি না, কখনও নিলাম হয়েছে কি না তা তফসিল অফিস / উপজেলা ভূমি অফিস হতে জেনে নিতে হবে। সার্টিফিকেট মামলা ভুক্ত সম্পত্তি বিক্রয় যোগ্য নয় ( সরকারি দাবি আদায় আইন ১৯১৩ এর ৭ ধারা )
১১) বিবেচ্য ভূমি খাস, পরিত্যক্ত / অর্পিত (ভি পি) , অধিগ্রহণকৃত বা অধিগ্রহণের জন্যে নোটিশকৃত কি না তা তফসিল, উপজেলা ভূমি অফিস বা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের এল এ শাখা থেকে জেনে নিতে হবে।
১২) বিবেচ্য ভূমি কোনো আদালতে মামলা মোকদ্দমা ভুক্ত কি না তা জেনে নিতে হবে। মামলা ভুক্ত জমি কেনা উচিত নয়।
১৩) বিবেচ্য জমিটি সরেজমিনে যাচাই করে এর অবস্থান নক্শার সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে
১৪) সব রেজিস্টারের অফিসে তল্লাশি দিয়ে জমির সর্বশেষ বেচা কেনার তথ্য জেনে নেয়া যেতে পারে।
১৫) জমিটি ব্যাংক / সংস্থার নিকট দায়বদ্ধ কি না।
সবশেষ যে কথাটা না বললেই নয়
অনেকে সামান্য টাকা বাঁচানোর জন্য লক্ষ-কোটি টাকার ক্ষতির সম্মুখীন হন। তাই বিশেষ অনুরোধ , যে কোন জমি ক্রয়ের পূর্বে অবশ্যই একজন আইনজীবীর পরামর্শ নিতে ভুলবেন না। না হয় আপনি ভোগান্তির শিকার হওয়ার সম্ভাবনাই বেশী। বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেই বিষয়টা শেয়ার করলাম। সিদ্ধান্ত আপনার, আইনজীবীর নিকট আগে যাবেন না পরে যাবেন!

- এম টি উল্যাহ, আইনজীবী
[email protected]
facebook.com/mohammad.toriqueullah
01733 594 270
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই জানুয়ারি, ২০২১ সন্ধ্যা ৬:১০
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

তেল গ‍্যাস অনুসন্ধান আর বিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে, সুদি মহাজন আর খাম্বা/কার্ড সরকারের মিথ্যাচারের জবাব॥

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ২৯ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৮:১৮



২০০৮-২০২৪ এই ১৬ বছরকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন "chronicle of shoddy gas exploration" - মানে গ্যাস অনুসন্ধানের ধীরগতির ইতিহাস।

২০০৮-২০২৪ এর মূল চিত্র

< Between 2008 and 2024, bureaucratic interference... ...বাকিটুকু পড়ুন

জীবননগর

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৯ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৪:৪১



গ্রাম দেখতে কোলাহলের বাইরে গিয়ে দেখি-
কোথাও নেই একরত্তি গ্রাম!
বিলুপ্ত হয়েছে যাবতীয় সবুজ সুন্দর;
সর্বত্র বিস্তার লাভ করেছে কংক্রিটের বন!
ভ্রমণক্লান্তিতে খুব তৃষ্ণার্ত হয়ে-
জলপানাঙ্ক্ষা জানাতেই পেলাম... ...বাকিটুকু পড়ুন

চাকরির বন্যা আসার আগেই চাকরির বাজারে খরা!

লিখেছেন মাথা পাগলা, ২৯ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৪৬



জুলাইয়ের পর বলা হয়েছিল দেশে নাকি চাকরির বন্যা বয়ে যাবে। অর্থনীতি ঘুরে দাড়াবে, ২০৩০ সালের মধ্যে আমরা অর্থনীতিতে মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনামকে ছাড়িয়ে যাবো। ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিও হবে।

দেশে এমনিতেই কর্মসংস্থানের অবস্থা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা কি তাহলে গুহা যুগে ফেরত যাচ্ছি?

লিখেছেন জ্যাক স্মিথ, ৩০ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:৫০



বিশ্ব যেখানে উন্নতির প্রতিযোগিতা করছে, কীভাবে জীবনমান আরও উন্নত এবং সহজ করা যায় তা নিয়ে চিন্তাভাবনা করছে আর আমরা ঠিক তার উল্টো পথে হাঁটছি। চারদিকে ভয়াবহ অবস্থা!! চাঁদাবাজি, খুন,... ...বাকিটুকু পড়ুন

।। রাশিয়ার মতো বাংলাদেশে হামলা করুক ভারত।।

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ৩০ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৯:১২


আমি আজ পর্যন্ত আম্লিগে কোন ভালোমানুষ খুঁজে পাইনি। আম্লিগ মানেই ইয়ের বাচ্চা। আম্লিগ মননে মগজে ধর্ষক, লুন্ঠনকারী, দেশদ্রোহী ও পাচারকারী। এদের মাঝে কোন কালেই কোন ভালোমানুষ ছিলোনা বর্তমানেও নেই... ...বাকিটুকু পড়ুন

×