বাহিরে ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি হচ্ছে , বারান্দায় বসে সেই বৃষ্টির দিকে একাগ্র চিত্তে তাকিয়ে আছে অবনী । রেলিঙ্গে দু এক ফোঁটা পরে গাঁয়ে ছিটকে আসছিল । হাতের উপরে তেমন দু একটি বিন্দু ঢের জায়গা করে নিয়েছে । অন্যদিন হলে হয়তো বৃষ্টি এভাবে দেখা হয় না , দেখা হলেও এতো গভীর চিন্তায় মগ্ন থাকতে হয় না । আজও বিশেষ কোন দিন নয় । তবে আজকে বিশেষদিনের আগের দিন । কাল এমন দুপুর বেলা “বউ” সেজে বসে থাকতে হবে শত শত মানুষের সামনে । ক্যামেরার ফ্ল্যাশ চোখ ঝলসে দিবে ক্ষণে ক্ষণে । ভারী গহনা , বউয়ের বেনারসি শাড়ি – ছোটবেলার শখ আজ বড্ড বেরসিকভাবে বাস্তবতার রূপ পাচ্ছে । সকালে সারা গাঁয়ে হলুদ মাখালো , গোছল দিলো ।
চিন্তায় বাঁধ সাজলো রাফি , অবনীর ছোট ভাই । ক্লাস ফোরে পড়ে ।
“আপু ছাদে চল না , আজকে শেষবারের মতো ছাদে একসাথে বৃষ্টিতে ভিজি ।”
অবনীর মা কোথা থেকে যেন দৌড়ে এলো ,
“ কাল বিয়ে আর আজকে ছাদে বউ ভিজতে যাবে । কি আবদার ? কোথাও যাবি না , ঘরে বসে থাক ।”
রাফির কথায় হয়তো অবনী রাজি হতো না কিন্তু মায়ের বারণ শুনে কেন যেন ভিজতে ইচ্ছা করছে , বিছানা হতে ওড়নাটা টুকে নিয়ে রাফির সাথে বেরিয়ে গেলো । অবনীর মা আর কিছুই বললো না , হয়তো এমনটি হতে পারে তার চিন্তাতেই ছিল না ।
ছাদে কেউই ছিল না । ওরা দুই ভাই-বোন বেশ কিছুক্ষণ বৃষ্টিতে ভিজলো । ইচ্ছা ছিল বৃষ্টির তীব্রতা কমলে ফিরে আসবে অথচ বৃষ্টির থামার কোন নাম গন্ধই নেই ।
বোনের বিয়ে উপলক্ষে ছোট ভাইয়ের আনন্দ দেখে কে । ও আরেকটু বড় হলে হয়তো বিয়ের দিনের আনন্দের মলাটের নিচে লুকিয়ে থাকা দূরে সরে যাওয়ার কষ্টটাও অনুভব করতো ।
বাসায় এসে অবনী আবার গোসল সেরে নিলো , একদিনে বেশ কয়েকবার গোছল করা হয়ে গেলো এই নিয়ে ।
ওর ঐ পুরোদিন বাসার সাথে যে অলিখিত বিচ্ছেদ ঘটতে চলছে তা চিন্তা করেই কেটে গেলো , বর নিয়ে কোন চিন্তাই ওর নেই । যেমনই হোক মানিয়ে নিবে ধরনের সিদ্ধান্ত আগেই নিয়ে রেখেছে ।
বিয়ের দিন ,
অবনীর বাবা সরকারী চাকরিজীবি হিসেবে বেশ সময় মেনে চলেন । ২ টার দিকে সবাইকে নিয়ে বাসা থেকে বের হওয়ার কথা তাই হয়েছেন । মেয়েকে পার্লার থেকে গাড়ি করে নিয়ে গেলেন ২:৩০ টার মধ্যে কমিউনিটি সেন্টারে পৌঁছে গেলেন ।
বরাবরের মতোই বর যাত্রী দেরি করে এলো , হৈ-হুল্লোড় হলো । রাফিটা দুলাভাইকে পেয়ে যেন খুশিতে আটখানা । অবনী পুতুল সেজে স্টেজে বসে আছে । হালকা বিরক্তির ছাপ চোখে মুখে স্পষ্ট ।
ও আচ্ছা , বরের নাম কৌশিক । কোন একটা ভার্সিটির লেকচারার যেন । ভদ্রলোকের মুখে কৃত্তিম হাসি , দেখেই বোঝা যায় । কিছুক্ষণের মধ্যেই কাজী তার কাজ সম্পন্ন করে চলে গেলেন । বিয়ে হয়ে যাওয়ার পরে বর আর কনেকে পাশাপাশি বসানো হলো ।
চারদিকে হাসির ধ্বনি । এরপর “ফটোসেশন” শুরু , একেরপর এক দল স্টেজে উঠছে ছবি তুলছে ।
এক ফাঁকে কৌশিকের ছোটবোন শিরিণ কি কাজে ফটোগ্রাফারকে ডেকে অন্য জায়গায় নিয়ে গেলো । স্টেজে যারা ছবি তুলতে উঠেছিল তারা মন বেজার করে আবার নেমে গেলো ।
অবনীর হাতে টোকা দিয়ে কৌশিক ডাকলো
“ কেমন লাগছে আপনার ?”
এমনেই বেশ বিরক্ত ছিল অবনী তার উপর এমন বেখাপ্পা প্রশ্ন শুনে ক্ষেপেই গেলো – মুখের কথার দাড়া না বুঝিয়ে চোখের চাহনী দিয়েই বুঝিয়ে দিলো কি বলতে চাচ্ছে ।
কৌশিক মৃদ্যু হেসে উঠলো ।
“ শুনুন , আপনার যতটুকু বিরক্ত লাগছে আমার তার থেকে কম লাগছে না । হাতে সময় কম , আমার বোন ফটোগ্রাফার মশাইকে দূরে সরিয়ে নিয়ে গেছে যেন স্টেজ ফাঁকা থাকে আর আমি আপনার সাথে কথা বলতে পারি । আমার ইচ্ছা আপনাকে নিয়ে আমি এখন থেকে এখন পগারপাড় হবো । আমার বেশ কয়েকজন বন্ধু আছে ওরা সাহায্য করবে । আপনার বান্ধবীদের তেমন সুবিধার মনে হয় নি এজন্য ওদের জানায় নি । স্টেজের ঠিক পিছনে একটা দরজা আছে ঐ দরজা দিয়ে ই বিল্ডিং থেকে বের হওয়ার একটা ব্যবস্থা আছে । সেন্টারের লোকের সাথে আগেই কথা বলা আছে । আর ও-প্রান্তে আমার বন্ধুরা গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করবে । আমি একা পালাতে পারছি না আপনাকে নিয়েই যেতে হবে । আপনি রাজী ?”
এই পরিস্থিতিতে কি উত্তর দিবে ঠিক বুঝে উঠতে পারছিল না অবনী । বেশ ঘোলাটে অবস্থা ।
“মৌনতা সম্মতির লক্ষ্মণ ।” বলেই কাকে যেন ফোন করলো কৌশিক । এরপরেই হলে ঠিক মাঝখানেই কি যেন গোলমাল শুরু হলো , সবাই দৌড়ে ওদিকেই যেতে লাগলো পরিস্থিতি দেখার জন্য । এই ফাঁকে অবনীকে সাথে করে কৌশিক আর কৌশিকের ছোট বোণ শিরিণ পিছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেলো । বেশ দ্রুতই ঘটলো ঘটনাটা ।
হঠাৎ অবনীর ওর মা-বাবার কথা মনে পড়ে – তারা কি ভাববে বা দুঃশ্চিন্তা করবে ।
“ আপনার ছোট ভাই আপনার মা-বাবাকে সব জানাবে চিন্তা করার কিছু নেই । আর আমার ছোট বোনের দায়িত্ব এইদিকটা সামাল দেয়া ।”
ছোটবেলার বন্ধু ধ্রুব এর গাড়িতে উঠলো ওরা ।
যাওয়ার সময় শিরিণ বললো – “ মনে রাখিস কিন্তু”। কৌশিক মৃদ্যু হেসে সায় দিলো । গাড়ি চলতে শুরু করলো ।
“ আচ্ছা , আমরা কক্সবাজার যাবো । তবে সবার আগে ওর মানে ধ্রুবর বাসায় যাবো । আমি এই শেরওয়ানিটা আর বইতে পারছি না , ক্রিম কালারের এই জিনিস আমার কালো শরীরে মানাচ্ছে না । চুরি করে পড়েছি মনে হচ্ছে ।”
কিঞ্চিৎ হাসির রেখা অবনীর ঠোঁটে দেখা গেলো ।
ও বলতে লাগলো – “ আপনি যা পড়ে আছেন বেশ অবাক হচ্ছি এই জিনিস পড়ে আপনি চলা ফেরা করছিলেন । আপনার জামার লাগেজ গাড়িতেই আছে । এই কাজও আপনার ছোট ভাইয়ের ।”
ছোটভাইটার সাথে আসার আগে দেখা করে আসা উচিত ছিল । যতো ছোট ভেবেছিলাম ততো ছোট নয় রাফি । এসব চিন্তা করে চোখের কোনে ঈষৎ পানি চলে এলো ।
কক্সবাজার যাওয়ার জন্য প্লেনের টিকেট আগেই কাটা ছিল । ঘন্টাখানেকের মধ্যেই ওরা কক্সবাজার হোটেলেও পৌঁছে গেলো ।
কত দ্রুত যে সব কিছু ঘটলো , ওদিকটার কি খবর জানার ইচ্ছা জাগছিল কিন্তু এই রোমাঞ্চই বেশি প্রভাব বিস্তার করছে অবনীর ভিতরে । কৌশিক মানুষটাকে আরো জানতে ইচ্ছা করছে ।
কৌশিক কি কাজে যেন বাহিরে গিয়েছিল , ফিরে এসে দরজা বন্ধ করতেই অবনী যেন গুটিয়ে গেলো । কৌশিকের চোখ এড়ায় নি এই আচরণ ।
“ ভয় পাবেন না , আপনাকে না জানা পর্যন্ত আপনাকে ছোঁব না ।”
কিছুক্ষণের বিরতি নিয়ে আবার বললো – “আপনার উপর দিয়ে যথেষ্ট ধকল গিয়েছে আপনি ঘুমোতে পারেন ।”
“ এতো আগে ঘুমিয়ে অভ্যাস নেই । ঘুম আসবে না এখন ।”
“ ও , ভালো কথা আপনার কিছু জিনিস এনেছি ।” বলেই নিজের লাগেজের ভিতরে কি যেন খুঁজতে লাগলো কৌশিক । একটি শাড়ির বাক্স বের করলো , আর আরেকটি নীল কি ধরনের বাক্স যেন । শাড়ির বাক্স এগিয়ে দিলো অবনীকে , আর ঐ নীল বাক্স থেকে অপরাজিতা ফুলের মালা বের করলো ।
“আপনি যদি আপত্তি না করেন এগুলো পরে কি এখন একটু বেরুতে পারবেন ? আমার জানামতে এটা আপনার শখের লিস্টে বেশ মোটা হরফেই লিখা ছিল । ”
এইবার অবনী অবাক হলো না , ঐ রাফির কাজই বোধ হয় আবার । কৌশিকের সাথে ভালোই সখ্যতা হয়েছে ।
তখন রাত প্রায় ১০ টার মতো বাজে , দুইজন খালি পায়ে হাঁটছে তীর ঘেষে । একজনের পরনে কালো শার্ট – প্যান্ট আরেকজনের খোপায় অপরাজিতা আর পরনে আবছা নীল রঙের শাড়ি । এতো বাতাসেও শাড়ির বেশ নিয়ন্ত্রণই রেখেছে অবনী ।
হঠার কি মনে করে যেন অবনী হালকা হাসছিল , সেই হাসি দেখে কৌশিকও হেসে দিলো । শুরুটা বেশ ভালোই হলো ……………………….

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

