রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের শেষ মাথায় কাটাখালি বাজার। এখান থেকে রিকশা, ভ্যান,ভুটভুটি সবই চলে মহেন্দ্রার পথে। অবশ্য রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসও চলে মহেন্দ্রার বাজার পর্যন-। তবে সেটাও সাধারণ কোন ব্যাপার নয়। এখানকার অধিবাসী ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও বিচার বিভাগের শিক্ষার্থী আলমগীর বললেন, না এসে উপায় আছে? আমাদের এই গ্রামেরই ৫০জন শিক্ষার্থী পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে। তারা প্রতিদিনই বাড়ি থেকে আসা যাওয়া করে। না আসলে চলবে?
রাজশাহীর বেলপুকুর বাইপাস পার হয়ে পূর্ব দিকে নেমে গেছে পিচ ঢালা সরু রাস-া। রাস-ার দুপাশে ঘন অড়হর গাছের সারি। একটু নিচ দিয়ে এখানে ওখানে থোকায় থোকায় ঝুলছে আম। প্রায় ৩ কিলোমিটার পার হয়ে রাস-ার ধারে একটা সাইনবোর্ডে লেখা মাহেন্দ্রা বাজার। যেন হাত বাড়িয়ে ট্রাফিকের ভঙ্গিতে নির্দেশনা দিচ্ছে পথের। বাজারের মোড়ে কয়েকটা ছোট দোকান। তবে মাঝ দিয়ে বয়ে চলা রাস-া ধরে আরো কিছুটা এগুতে হবে। দুপাশে সারি সারি আম,কাঠাল, খেজুরের গাছে থোকায় থোকায় ফল ঝুলছে। গ্রামের মানুষের মুখে জানা গেল মাহেন্দ্রা নামকরণের ইতিহাসটা। এখানে এক সময় মহেন্দ্র চৌধুরী নামের এক জমিদার বাস করতেন। তার নামানুসারেই এই গ্রামের নাম হয়েছে ‘মাহেন্দ্রা’। তবে এখন সে জমিদারের কোন চিহ্ণই আর অবশিষ্ট নেই। আড়াই হাজার ভোটারের গ্রামে হিন্দু পরিবার মাত্র একটি।
গ্রামের প্রায় শেষ প্রানে- মাহেন্দ্রা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়। বিদ্যালয়ের পুরানো ভবনের একটাতেই গড়ে উঠেছে ‘জ্ঞানের আলো পাঠাগার’। মাহেন্দ্রার ৮ যুবক মিলে তৈরি করেছেন এই পাঠাগার। প্রায় আড়াই বছর ধরে একটু একটু করে এই যুবকরা মিলে তৈরি করেছেন এই পাঠাগার। তবু শেষ পর্যন- বইয়ের সংখ্যা আড়াই শ’। এই পাঠাগারের অন্যতম স্রষ্টা ও রাজশাহী কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র দেলোয়ার বললেন, আমাদের বইয়ের সংখ্যাটা খুবই কম। কিন' এখানকার প্রায় সব পাঠকেরই সব বই পড়া। একটা নতুন বই আসলেই কাড়াকাড়ি পড়ে যায়। সেটা শেষ হলে প্রতিদিন এসে খোঁজ নেয় নতুন বই আসলো কি না।’ তবে শুরুটা এত সহজ ছিলো না।
আলমগীর বললেন, আমরা অনেকত আগ থেকেই এই স্কুলের সামনের মাঠে বসে আড্ডা দিতাম। একদিন এই আড্ডাতেই সিদ্ধান- নিলাম একটা ক্লাব করার। তবে অভিভাবকরা বাধা দিতে পারেন এ ভাবনা থেকেই সিদ্ধান- নিলাম লাইব্রেরী তৈরির। কিন' সমস্যা দেখা দিল ঘর নিয়ে। দেলোয়ার অবশ্য বলল, প্রয়োজনে রাস-ার ধারে কঞ্চির বেড়া দিয়ে ঘর তৈরি করব। তবে শেষ পর্যন- সেটা আর করা লাগলো না। প্রাইমারী স্কুলের একটা পরিত্যাক্ত ঘর পাওয়া গেল। স'ানীয় কয়েকজন অভিভাবক ও টিএনওর সহায়তায় ঘরদোর ঠিকঠাক করা হলো। নিজ নিজ বাড়ি থেকে বই এনে ৫০টি বই নিয়ে শুরু হলো ‘জ্ঞানের আলো পাঠাগার’। লাইব্রেরী তৈরি পর থেকেই নানা কথা উঠলো গ্রামে। অনেকেই বললেন, পড়াশোনা না ছাই হবে, দেখ তাসের আড্ডা হবে। তবে শেষ পর্যন- তা হয় নি। আর এর নেপথ্যে কাজ করে গেছেন এই ৮জন। সেলিম বললেন, প্রথমে গ্রামের কেউই এগিয়ে আসেনি। কয়েকবার রাজনৈতিক রং চড়িয়ে আমাদের মধ্যে বিভাজন তৈরির চেষ্টাও চলেছে। তবে এখন পরিসি'তি পাল্টে গেছে। গোটা গ্রামের কিশোর-যুবা-মুরুব্বীদের কেন্দ্রবিন্দু এখন জ্ঞানের আলো পাঠাগার।
এই ৮জনের মধ্যে দুজনের পরিচয় তো পেয়েছেন। বাকিরা হলো রাজশাহী কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী এরশাদ আল, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সেলিম রেজা, অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র পিনজুর ইসলাম, এবারের এইচএসসি পরীক্ষার্থী আতাউর রহমান, অষ্টম শ্রেণীর শিক্ষার্থী আব্দুস সালাম এবং রফিকুল ইসলাম।
বিন্দু থেকে সিন্ধু-এ স্বপ্ন নিয়েই কাজ করে চলেছে মাহেন্দ্রার এই শিক্ষার্থীরা। পাঠাগারের সদস্যরা চাঁদা তুলে বই কিনতেন। তবে সেটাকায় দুএকটা বই কেনা হয়। তাই সবাই মিলে সিদ্ধান- নিয়েছেন প্রতিমাসে প্রত্যেকে২টি করে বই দেয়ার। এদের আগ্রহ দেখে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যা্লয়ের ইংরেজী বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী ও এই গ্রামের ছেলে ইব্রাহিম বেশ কিছু বই দিয়েছেন। তবে পাঠকের আগ্রহের কাছে সে বইয়ের সংখ্যাও অপ্রতুল। আলমগীর বললেন,আমরা আমাদের পকেট খরচের টাকা জমিয়ে একটু একটু করে এই লাইব্রেরী তৈরি করেছি। আমাদের সাধ্য নেই, কিন' সাধ আছে। হোক ছোট উদ্যোগ, এখান থেকেই একটা বিশাল লাইব্রেরীর স্বপ্ন দেখি আমরা।
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই জুন, ২০০৯ সকাল ৯:৫৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




