ইনভিক্টাস একটা মুভি। তবে আমি সচরাচর মুভি রিভিউ করছিনা। আমি কিছু কথা শেয়ার করবো যা এই মুভিটা দেখে আমার সচেতন মনে ভিষনভাবে সারা জাগিয়েছে।
২০১২ পর্যন্ত যে কারনে দেখিনি
ম্যাট ডেমন কে খুবই অপছন্দ করি যে কারনে ২০০৯ সালে ইনভিক্টাস মুক্তি পেলেও এতোদিন দেখিনি। তবে ক্লিন্ট ইস্টউডের ছবি কখনোই বাদ দেইনা। কি কারনে জানি এই লোকটাকে আমার বস মনে হয়। ছোটবেলায় দেখা তার অভিনিত দ্যা গুড, দ্যা ব্যাড আন্ড দ্যা আগলি দেখার পর থেকেই এই লোকটি সম্পর্কে আমার প্রচন্ড আগ্রহ। গত কয়েকদিনে আমি তার গ্রান টরিনো, চ্যান্জেলিং দেখার পর ভাবলাম ইনভিক্টাসটাও দেখে নেই। আর আবিষ্কার করলাম নেতৃত্বের ও একটা জাতিকে ইউনাইটেড করার এক চরম শৈল্পিক প্রকাশ হয়েছে এই মুভিতে। মরগান ফ্রিম্যানের ভক্ত নয় এমন লোক পৃথিবীতে পাওয়া খুবই কস্টকর। তাই আর দেরি না করে দেখে নিলাম মুভিটি।
ইনভিক্টাস:
এটি একটি ল্যাটিন শব্দ যার অর্থ অপরাজেয়, অপরাজিত। ইংলিশে Unconquered, undefeated.
ছবিটি মূলত জন কারলিনের লিখিত Playing the Enemy: Nelson Mandela and the Game That Changed a Nation বইটির উপর বেইজ করে নির্মিত।
নেলসন ম্যান্ডেলা তখন সবে মাত্র সাউথ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট হয়েছেন। চরম বিশৃংখল পরিস্থিতি। সাদাদের হাতে শত শত বছর নিগৃহিত হবার পর অবশেষে কালোদের মুক্তি মিলেছে। বিষয়টা এমন যে কালোরা তখন গোটা পৃথিবীটাই হাতের মুঠোয় কব্জা করে ফেলেছে। সাদা-কালোতে পুরা দেশটাই দুইভাগে বিভক্ত। নেলসন তার প্রথম অফিস করার দিনে সব সাদারা চাকরী ছেড়ে চলে যাচ্ছিলো। কারন তাদের ধারনা ছিলো ম্যান্ডেলা তাদের সবাইকে ছাঁটাই করবেন। কিন্তু তিনি তা করেন নি। তাদেরকে রোজকার মতো কাজ করার কথাই জানিয়ে দিলেন। প্রেসিডেন্টের অফিসে তার প্রথম কাজটাই ছিলো এটা।
পরে ম্যান্ডেলা একটি রাগবি ম্যাচ দেখতে স্টেডিয়ামে গেলেন। গিয়ে তার জিবনের সবচেয়ে বড় চ্যালন্জের একটা রুঢ় বহিপ্রকাশ দেখলেন। দেখলেন সব কালো দর্শকদের কেউই নিজের দেশকে সাপোর্ট করছে না। এবং তিনি যে আশংকা করছিলেন তা আবারো বড় চ্যালেন্জ হয়ে তার সামনে আসলো। কালোদের মনে এখনো আ্যাপর্ঠিডের ক্ষত রয়ে গেছে। তাই তার সবচেয়ে বড় চ্যালেন্জ সাদা কালো ইউনিটি তৈরি করা। ঐ খেলায় স্প্রীংবকরা ইংলিশদের সাথে হেরে যায়। ম্যান্ডেলা স্প্রীংবক ক্যাপ্টেন ফ্রান্সিস (ম্যাট ডেমন) কে চায়ের নিমন্ত্রন করলেন। নিজ হাতে রাগবি ক্যাপ্টেন কে চা বানিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন টিম সদস্যের কিভাবে তুমি প্রেরনা দাও? কথোপকথনের খানিকটা নিচে দিয়ে দিলাম
Nelson Mandela: How do you inspire your team to do their best?
Francois Pienaar: By example. I've always thought to lead by example, sir.
Nelson Mandela: Well, that is right. That is exactly right. But how do we get them to be better then they think they CAN be? That is very difficult, I find. Inspiration, perhaps. How do we inspire ourselves to greatness when nothing less will do? How do we inspire everyone around us? I sometimes think it is by using the work of others.
পরে তিনি একটি কবিতার কথা স্মরন করেন যা তাকে কারাগারের অন্ধকার জীবনের ২৭ টি বছর অনুপ্রেরনা জুগিয়েছে। সেই কবিতাটি আসলে উইলিয়াম আরনেস্ট হেনলির লেখা 'ইনৈক্টাস' কবিতা।
সামনে ১৯৯৫ সালে রাগবি বিশ্বকাপের আয়োজক দেশ সাউথ আফ্রিকা। আর তিনি এটাকেই নিলেন জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার উপযুক্ত ইভেন্ট হিসেবে। একা একটি মানুষ অসাধরন বুদ্ধিমত্তা ও পরিশ্রম দিয়ে জয় করলেন স্প্রীংবক টিমের সব সদস্যের হৃদয়। এবং কালোদের মাঝেও ঐক্যবদ্ধ হবার ডারুন এক দৃস্ঠান্ত স্থাপন করলেন। টিভির সামনে সাদা কালো সবাই মিলে সাউথ আফ্রিকার জয়ের জন্য প্রার্থনা করছে। একে একে অসাধরন খেলা খেলে অপ্রত্যাশিত ভাবে রাগবী বিশ্বকাপ জয় করে নেয় সাউথ আফ্রিকা।১৫-১২ গোলের এক অসাধারন বিজয় ছিনিয়ে নিল সাউথ আফ্রিকা।
ম্যান্ডেলা মাঠে তার দল ও দর্শকদের অভিনন্দন জানিয়ে যখন নিজ গাড়ীতে করে ফিরছিলেন তখন দেখলেন ভেদাভেদ ভুলে সাদা-কালো সবাই মিলে আনন্দ উৎসব করছে। আর তিনি তার সেই অনুপ্রেরনাদায়ক কবিতাটি আওড়াচ্ছিলেন
I am the master of my fate:
I am the captain of my soul.
আমি কেনো এই মুভি নিয়ে কথা বলছি
এই এই মুভিটা নিয়ে কথা বলছি কারন এই মুভিতে ডেখানো হয়েছে কিভাবে একটা বিভক্ত জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে হয়। কিভাবে দুশমনকে বন্ধু বানানো সম্ভব হয়। কিভাবে ব্যাক্তি স্বার্থ আর দলীয় স্বারথের উর্ধে উঠে জাতীয় স্বার্থ রক্খা করা যায়। কিভাবে ঘৃনাকে ভালোবাসায় পরিবর্টন করা সম্ভবপর হয়ে উঠে। কিভাবে একজন মানুষ নিজের স্ত্রী, পুত্র ও স্বজনদের থেকে দেশকে প্রাধান্য দেয়। কিভাবে সে বলতে পারে আমার পরিবার অনেক বিশাল, ৪২ মিলিয়ন।
এই মুভিটা যাদের দেখার জন্য রিকমেন্ড করছি
আমি যখন ছবিটা শেষ করছিলাম তখন সর্ব প্রথম যে কথাটা মনে হয়েছিলো সেটা হচ্ছে। শফিক রেহমানের একটা ফিল্ম সোসাইটি আছে আ্যাকডেমী ফিল্ম সোসাইটি ওখানে দুজন গুরুত্বপূর্ন দর্শক খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনাকে ২ কাপ গরম কফি দিয়ে বসিয়ে ছবিটা দেখানো উচিত।
আমার শিক্ষা
আমার একটা জন্য শিক্ষা হচ্ছে সারা পৃথিবী জুড়ে যেখানে ডিভাইড এন্ড রুল করা হচ্ছে সেখানে ম্যান্ডেলা প্রমান করে দিলেন ইউনিটি ইজ পাওয়ার। ভক্তিতে, শ্রদ্ধায় আবারো স্বীকার করলাম নেলসন ম্যান্ডেলা একজন অসাধরন বিপ্লবী।
ছবিটার শেষে একটা দারুন গান আছে নাইন থাউসেন্ড ডেইজ বা ৯০০০ দিন। ম্যান্ডেলার জিবনের কারাগারে কাঠানো ২৭ বছরের উপর অসাধারন এই গানটি এখানে। শুনলে অনেক ইনস্পায়রেশান পাবেন।
ইনভিক্টাস মূলত উইলিয়াম আর্নেস্ট হেনলির একটা কবিতা যেটা ম্যান্ডেলা নিজে জেলের ভেতরে বসে বসে আবৃত্তি করতেন।
ইনভিক্টাস মুভির স্মরনীয় কোট গুলো পাবেন এখানে।
মূল বইয়ের রচয়িতা জন কারলিন সম্পর্কে জানতে এখানে ক্লিক করুন।
(মুভি নিয়ে এখানে অনেক বর বড় বসেরা লিখেন। ফিফা, নাফিস ভাই, আসিফ ভাই সহ অন্যদের মুভি জ্ঞানের সাথে দয়া করে আমাকে তুলনা করবেন না। কারন তাদের তুলনায় আমি একটা বালি কনা মাত্র।)
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১২ বিকাল ৪:০১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



