বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় যাওয়ার পর থেকেই বিরোধী দলের তো বটেই সরকার দলীয় নেতাকর্মী ও দলটির কট্টর সমর্থক ছাড়া সবার কথা-বার্তা, আচার-আচরণ, কাজ-কর্ম সবকিছুতেই তারা ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাচ্ছে। ঘ্রাণ নেওয়ার শক্তি তাদের এতোই প্রখর যেকোন ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরে তো বটেই; অনেক সময় কোন ঘটনা ঘটার আগেই ষড়যন্ত্রের গন্ধ এসে তাদের নাকে স্পর্শ করে। গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকেশ্বরী মন্দিরে ভয়াবহ চুরির ঘটনায়ও সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের গন্ধ পান সাবেক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী আওয়ামী লীগ নেতা মোহাম্মদ নাসিম। ২০১১ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, যুদ্ধাপরাধের বিচার বাধাগ্রস্ত করতে মন্দিরে চুরি হয়েছে।
লন্ডন ভিত্তিক খ্যাতিমান দৈনিক "দ্যা ইকোনোমিস্ট" যখন আওয়ামী লীগের গোপন খবর প্রকাশ করে জানাল যে, ২০০৮ সালের নির্বাচনের সময় ভারতের কাছ থেকে বস্তা ভর্তি টাকা আর ট্রাক ভর্তি পরামর্শ নিয়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছে, তখন কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী নাকে এসে লাগল আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের গন্ধ। তিনি আমাদেরকে জানালেন যে, পত্রিকাটি জঙ্গি অর্থায়নে চলে এবং সরকারের বিরুদ্ধে এটি একটি ষড়যন্ত্র।
পদ্মা সেতুর পরামর্শক নিয়োগে সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী আবুল হোসেনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এনে বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকে যখন সরকারকে তা তদন্ত করতে বলা হলো তখন ষড়যন্ত্রের গন্ধ এসে আঘাত করল প্রধানমন্ত্রীর নাকে। জাতীয় সংসদের এক অধিবেশনে তিনি জানালেন যে, এটা সরকারের বিরুদ্ধে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ষড়যন্ত্র। সম্ভবত গত বছরের অক্টোবর মাসে জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়েই তিনি ঘোষণা দিলেন, একজন নোবেল বিজয়ী আছেন যার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার শখ হয়েছে, তিনি এখন সরকারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিকভাবে ষড়যন্ত্র করছেন। সরকারের সমালোচনা করায় প্রবীন আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিকুল হকের কথায় ষড়যন্ত্রের গন্ধ পেলেন তিনি। দলীয় নেতাকর্মীদের এ সভায় তিনি ঘোষণা দিলেন, একজন প্রবীন আইনজীবী আছেন যার ক্ষমতায় যাওয়ার খায়েশ হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলীয় নেত্রীর সমালোচনা করায় ভাষা সৈনিক এম এ মতিনের মধ্যেও ষড়যন্ত্রের গন্ধ পেলেন তিনি। গত বছর মে দিবস উপলক্ষে টঙ্গীর এক জনসভায় ভাষা সৈনিক এম এ মতিনের উদ্দেশ্যে তিনি বললেন, চোখ থাকতে যারা অন্ধ তাদের নিয়ে আমি আর কি বলব। অন্য একটি সমাবেশে নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে তিনি ঘোষণা দিলেন, ষড়যন্ত্র হচ্ছে, সজাগ থাকতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর এই আহ্বানের পর থেকেই নেতাকর্মীরা যে সত্যিই সতর্ক ও সজাগ থাকতে শুরু করেছে তার প্রমাণ নেত্রকোনা সদরে নেতাকর্মীদের মিছিল। গত সপ্তাহে নেত্রকোনা সদরে দলীয় নেতাকর্মীরা প্রকাশ্যে রামদা মিছিল করেছে।
রেলের কালো বিড়ালের এপিএস তাকে (কালো বিড়ালকে) ঘোষ দেওয়ার জন্য ৭০ লাখ টাকা নিয়ে বিজিপির হাতে ধরা পড়লে কালো বিড়াল ঘোষণা দিল এটা আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। আবুল হোসেনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এনে বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকে তৃতীয় বারের মতো তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পরও সরকারে পক্ষ থেকে কোন ব্যবস্থা না নেওয়ায় বিশ্বব্যাংক যখন পদ্মা সেতুর চুক্তি বাতিল করলে, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এর মধ্যে সরকারের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাংকের বিদায়ী সভাপতি রবার্ট জোয়েলিকের ব্যক্তিগত ষড়যন্ত্র খুঁজে পেলেন। তিনি ঘোষণা দিলেন, এটি বিশ্বব্যাংকের মন্তব্য নয়। এটি বিশ্বব্যাংকের বিদায়ী সভাপতি রবার্ট জোয়েলিকের ব্যক্তিগত মন্তব্য।’
বিশ্বব্যাংকের এই চুক্তি বাতিলের পেছনে কোন যড়যন্ত্র আছে এমন একটা গন্ধ এসে নাকে আঘাত না করে নাকের খুব কাছ দিয়ে চলে যাওয়ায় কোন যড়যন্ত্র আছে কিনা তা খোঁজার জন্য ৪ জুলাই, ২০১২ প্রধানমন্ত্রী জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে ঘোষণা দিলেন, বিশ্বব্যাংক যেখানে এক পয়সাও ছাড় দেয়নি, সেখানে তারা দুর্নীতির কথা নিয়ে এলো,এর পেছনে কে আছে,কারা আছে।কী উদ্দেশ্য আছে,সেগুলো একটু খতিয়ে দেখা দরকার।
বিশ্বব্যাংকের বরাত দিয়ে পদ্মা সেতুর বিষয়ে দুর্নীতি নিয়ে রিপোর্ট করায়এর মধ্যে ষড়যন্ত্রের গন্ধ পেলেন সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী আবুল হোসেন। বিষয়টিকে তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র উল্লেখ করে 'প্রথম আলো'র বিরুদ্ধে মামলা করার হুমকিও দিলেন তিনি।
কিছুদিন আগে বিরোধী দলীয় নেত্রী সৌদি আরব সফরে গেলে সেখানেও ষড়যন্ত্রের গন্ধ এসে নাকে আঘাত না করে নাকের খুব কাছ দিয়ে চলে যাওয়ায় আওয়ামী লীগের একজন নেতা ঘোষণা দিলেন, বিরোধী দলীয় নেত্রী সৌদি আরবে কোন ধরনের ষড়যন্ত্র করতে গেছেন তা খতিয়ে দেখা হবে।
আশুলিয়ায় শ্রমিক অসন্তোষের জের ধরে সংঘর্ষেও এটাকে সরকারের বিরুদ্ধে বিএনপির ষড়যন্ত্রের গন্ধ খুঁজে পেয়েছেন বন ও পরিবেশ মন্ত্রী।
বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে গত বুধবার এইচআরডব্লিউ’র প্রতিবেদন প্রকাশ করলে এর মধ্যে সরকারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের গন্ধ খুঁজে পেয়েছেন সরকারের নীতি নির্ধারকরা। এই প্রতিবেদনের সরকারের বিরুদ্ধে কি কি কারণে যড়যন্ত্রের গন্ধ তারা পেয়েছেন তা এর প্রতিক্রিয়ায় তারা প্রকাশ করেছেন।
আইন প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম যে গন্ধটি পেয়েছেন তা হলো ‘যারা দেশকে অকার্যকর করতে চায়,এইচআরডব্লিউ’র প্রতিবেদনের সঙ্গে তাদের যোগসূত্র রয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচানো ও দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার জন্য এসব অভিযোগ তোলা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যে গন্ধটি পেয়েছে তা হলো এ ধরনের অভিযোগ সরকারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র ও অপপ্রচারের অংশ।
স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট শামসুল হক টুকু যে গন্ধটি পেয়েছেন তা হলো যখন সরকার যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে,তখনই এ ধরনের অপপ্রচার কেন—সেটা বুঝতে হবে।
রেলের কালো বিড়াল বর্তমানে দফতরবিহীনমন্ত্রী যে গন্ধটি পেয়েছে তা হলো, এইচআরডব্লিউর এই প্রতিবেদন সরকারের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র ও দুরভিসন্ধিমূলক। সরকার যখন যুদ্ধাপরাধের বিচার কাজে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন তারা আন্তর্জাতিকভাবে স্নায়ুচাপ সৃষ্টি করে ব্যর্থ হয়ে এখন আমাদের দেশের মাটিতে এসে কথা বলতে শুরু করেছে।
গতপরশু শনিবার পুরাতন একটা গন্ধ স্বরাস্ট্রমন্ত্রী অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুনের নাকে নতুন ভাবে লেগেছে। তার নাকে যে গন্ধটি লেগেছে তা হলো দেশে যুদ্ধাপরাধীর বিচার চলছে। এ বিচার বানচালের জন্য বিএনপি-জামায়াতের চক্রান্ত করছে।
একই দিনে (গতপরশু শনিবার) রেলের কালো বিড়াল বর্তমানে দফতরবিহীনমন্ত্রী ঘোষণা দিলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধের চেষ্টা, পদ্মা সেতুর চুক্তি বাতিল করা এবং এইচআরডব্লিউ’র প্রতিবেদন একই সূত্রে গাঁথা।
তাছাড়া রাজনৈতিক এমন কি অরাজনৈতিক যে কোন সংগঠনের যে কোন ধরনের মানব বন্ধন, বিক্ষোভ সমাবেশ, পদ যাত্রা, অবস্থান ধর্মঘট ইত্যাদি কর্মসূচি থেকেও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নাকে এসে সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের গন্ধ লাগার অজস্র উদাহরণ পাওয়া যাবে জাতীয় দৈনিক গুলোতে খুঁজলে।
কোন কোন পর্যায়ের ষড়যন্ত্রের গন্ধ আওয়ামী লীগের নাকে এসে লাগছে সে কথা গতপরশু শনিবার আমরা জানতে পারলাম আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলামের কাছ থেকে। ঐদিন সুপ্রিম কোর্টে বাংলাদেশ সরকারি আইন কর্মকর্তা অ্যাসোসিয়েশনের এক মতবিনিময় সভায় যোগ দিয়ে তিনি সব কিছুই স্পষ্ট করলেন। তিনি বললেন, “দেশি বিদেশি অনেক ষড়যন্ত্রের মধ্য দিয়ে আমরা সামনে এগিয়ে যাচ্ছি। ষড়যন্ত্রের নেটওয়ার্ক আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌঁছেছে।”
দীর্ঘ নাটকের পর গতপরশু তানজিম আহমেদ সোহেল তাজের পদত্যাগ পত্র গ্রহণ করেছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার। রাজনীতি থেকেও অবসর নিলেন গতকাল। এখন অপেক্ষায় আছি আওয়ামী লীগের নেতাদের মুখ থেকে কখন যেন শুনতে হয়,
"সোহেল তাজের পদত্যাগ আওয়ামী লীগকে দুর্বল করার দেশি বিদেশি একটি ষড়যন্ত্র"; "সোহেল তাজ আমেরিকায় থাকেন, তিনি তাই বাংলাদেশের উন্নয়ন চান না। একারণেই পদ্মাসেতুর নির্মাণ কাজ বিলম্বিত করার যড়যন্ত্র হিসেবেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।" অথবা "যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধের চেষ্টা, পদ্মা সেতুর চুক্তি বাতিল করা, এইচআরডব্লিউ’র প্রতিবেদন এবং সোহেল তাজের পদত্যাগ একই সূত্রে গাঁথা।"
এই ধরনের বক্তব্যের প্রত্যাশা কি একেবারেই অযৌক্তিক?
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই জুলাই, ২০১২ সকাল ১১:৫৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



