কতিপয় দুর্নীতিবাজ বা অধ্যাপক ড. মুহম্মদ ইউনুস সম্পর্কে কোন ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের এলার্জি থাকার কারণে পুরো জাতিকে কেন কষ্ট করতে হবে, অপবাদ ও কলঙ্কের গ্লানি বহন করতে হবে?
সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী, সচিবক ও প্রকল্প পরিচালককে পদ্মা সেতুর পরামর্শক নিয়োগে দুর্নীতির জন্য দায়ী করে প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী ও দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যানের কাছে দুটি তদন্তের তথ্য প্রমাণ প্রদান করে বিশ্বব্যাংক। এ ব্যাপারে সরকার থেকে ইতিবাচক সাড়া না পেয়ে প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী ও 'আওয়ামী লীগের ধোপা' হিসেবে পরিচিত দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান গোলাম রহমানের দিকে অভিযোগের তীর তুলে ঋণ চুক্তি বাতিল করার পর থেকেই আমাদের সরকারের নীতি নির্ধারকরা চড়াও হয়েছেন বিশ্বব্যাংকের উপর। তাদের কেউ বলছেন এটি বিশ্বব্যাংকের বিদায়ী সভাপতি রবার্ট জোয়েলিকের ব্যক্তিগত মন্তব্য; কেউ বলেছেন এর চেয়ে কম খরছে পদ্মা সেতু করা হবে; জনগণের জন্য সারপ্রাইজ রয়েছে; কেউ বলেছেন আমার বিশ্বব্যাংকে পরোয়া করিনা, একবেলা বাজার না করে পদ্মা সেতুর জন্য ফান্ড সংগ্রহ করা হবে, ছাত্রলীগ পদ্মা সেতুর ফান্ড সংগ্রহ করবে; কেউ বলেছেন বিশ্বব্যাংক দুর্নীতিগ্রস্থ প্রতিষ্ঠান; এটা কীভাবে চলে তা জানতে হবে; বিশ্বব্যাংকের অডিট রিপোর্ট তদন্ত করা প্রয়োজন; আমরা আর মানুষের কাছে হাত পাতা বা সবক শুনতে চাই না,নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে চাই ইত্যাদি ইত্যাদি। আর যারা বিশ্বব্যাংকের এসব কোন ত্রুটি খুঁজে পাননি তারা এর পেছেন খুঁজে পেয়েছেন বিশ্বব্যাকের রাজনীতি এবং সরকারের বিরুদ্ধে গভীর একটা আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র।
প্রখ্যাত গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক সৈয়দ আবুল মকসুদ লিখেছেন এই বিষয়টি নিয়ে আমাদের শীর্ষস্থানীয় তিনজন নাকি ৮২ রকমের বক্তব্য দিয়েছেন। সবগুলো আমি শুনিনি বা পত্রিকায় দেখিনি তাই উল্লেখ করতে পারলাম না।
নিজেদের টাকায়ই পদ্মা সেতু নির্মাণ করার ঘোষণা দেওয়ার পর থেকেই সরকারের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন উপসম্পাদকীয় লেখক, অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী নেতা প্রভৃতি। এই পর্বে প্রথম আট দিনে আট পেশার মানুষ নাকি ৬৪ রকম কথা বলেছেন এবং বলা অব্যাহত রেখেছেন। এই জন্য বিশ্বব্যাংকেই দায়ী করে তাদের মধ্যে কেউ কেউ পত্রিকায় উপ্সম্পাদকীয় লিখেছেন, কেউ সরকারি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলকে সাক্ষাতকার দিয়েছেন। কেউ লিখেছেন ‘পদ্মা সেতু বিতর্ক কি পূর্বপরিকল্পিত?’; কেউ লিখেছেন, পদ্মা সেতু-চ্যালেঞ্জ দেশের জন্য সুযোগ’ আবার কেউ লিখেছেন- পদ্মা সেতুতে বিশ্বব্যাংকের ঋণ বাতিল হওয়ায় দেশের মহাসর্বনাশ হয়ে গেছে, দেশের ভাবমূর্তি একেবারে তলানিতে এসে ঠেকেছে-কথাটি ঠিক নয়। বিশ্বব্যাংকের ঋণের পেছনে যে বড় রাজনীতি আছে,তাও ভুলে গেলে চলবে না ; কেউ লিখেছেন বিশ্বব্যাংক প্রতিষ্ঠার পর বিশ্বের কোন কোন দেশে এটি দারিদ্র্য দূর করতে পেরেছে,তা একটা গবেষণার বিষয় হতে পারে; কেউ বললেন, এটি একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান।আমাদের তাই নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে এবং এ ধরনের প্রতিষ্ঠানকে না বলতে শিখতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি।
এই কথাগুলো তখনই লিখতে ও বলতে শুরু করেছেন এমন 'চাটুকার' ও 'অয়েলবাজ'রা, দুর্নীতির অভিযোগে বিশ্বব্যাংক যখন ঋণ চুক্তি বাতিল করল। এর আগে তারা কোথায় ছিলেন? বিশ্বব্যাংকের এমন ত্রুটি ও রাজনীতির কথা উল্লেখ করে ঋণ চুক্তি করার সময় বা আগেই কেন তারা প্রতিবাদ করলেন না? বিষয়টা কি কারও বাড়িতে চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে উত্তম মধ্যম খাওয়ার পর; ঐ বাড়িওয়ালা ভালো নয়, তার কোন জিনিস আমি নেব না -এই ঘটনার মতো নয়?
বিশ্বব্যাংকের ঋণ চুক্তি বাতিলের পেছনে 'বিশ্বব্যাংকের দুর্নীতি', 'সরকারের বিরুদ্ধে গভীর একটা আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র' ইত্যাদির পাশাপাশি আরও একটা বিষয় খুঁজে পেয়েছেন তারা। বাংলাদেশে 'গরীবের রক্তচোষা' ও বিশ্বের কয়েকটি দেশে গিয়ে 'হোয়াইট ওয়াইন-স্যান্ডউইচ-চিপস' খাওয়ার জন্য শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়া অধ্যাপক ড. মুহম্মদ ইউনুস সম্পর্কে যার বা যাদের 'এলার্জি' আছে তারা খুঁজে পেয়েছেন এটা ঐ 'নোবেল বিজয়ীর ষড়যন্ত্র'। এই ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করে সরকারের পতন ঘটিয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার শখ করেছেন। অধ্যাপক ড. মুহম্মদ ইউনুস সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি এলার্জি আছে যার তিনি ৮-৯ মাস আগে জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়েই এমন মন্তব্য করেছেন।
গত ৩০ জুন, ২০১২ সন্ধ্যা ৭ টায় বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল বাংলা ভিশনে একটা টক শো দেখছিলাম। সেখানে সরকার দলীয় এমপি গোলাম মাওলা রনি পদ্মা সেতুর ঋণ চুক্তি বাতিলের জন্য মোটামুটি সরাসরিই অধ্যাপক ড. মুহম্মদ ইউনুসকে দায়ী করে বক্তব্য দিচ্ছিলেন। এই বিষয়ের সাথে অধ্যাপক ড. মুহম্মদ ইউনুসকে জড়ানো একজন জনপ্রতিনিধির উচিত কিনা এক দর্শকের এমন প্রশ্নে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে আমতা আমতা করে ভিন্ন দিকে মোর নেওয়ার চেষ্টা করেছেন।
গতপরশু সন্ধ্যা ৭ টায়ও একই চ্যানেলের টক শো দেখছিলাম। সেখানে উত্তর বঙ্গ থেকে একজন দর্শক এবার এই ঘটনার জন্য অধ্যাপক ড. মুহম্মদ ইউনুসকে দায়ী করে বলেছেন আমাদের ব্যর্থতা আছে মানি; কিন্তু এই ঘটনা ড. মুহম্মদ ইউনুসের কারণেই। তিনি চেষ্টা করলেইতো এর সমাধান করতে পারেন এমন মন্তব্য করে ঐ দর্শক এই বিষয়ে আলোচক সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা জনাব হোসেন জিল্লুর রহমানের কাছে তাঁর মতামত জানতে চেয়েছেন। আলোচক শুধু বলেছেন তিনি(অধ্যাপক ড. মুহম্মদ ইউনুস) তো অতিমানবীয় কেউ নন; তাছাড়া বিশ্বব্যাংক তার নিজস্ব সিস্টেমের মাধ্যমেই চলে।
বছরে ৩-৪ বার বিদ্যুত ও জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে জনগণের জীবন অতিষ্ঠ, ওষ্ঠাগত ও দুর্বিষহ করে তোলার পর আমাদের গলায় আরও একবার ছুরি চলানোর চেষ্টায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছে সরকার। আর সরকারের সাথে তাল মিলিয়ে যাচ্ছেন কিছু সুবিধাভোগীরা। এই সেতুর ফান্ড সংগ্রহ করার জন্য কেউ কেউ জনগণের গলায় আরেক দফা ছুরি চালানোর জন্য প্রস্তাবও দিয়েছেন। মোবাইলের প্রতি কলে ২৫ পয়সা সারচার্জ কেটে নেওয়ারও প্রস্তাব করেছেন। কেউ কেউ ইতোমধ্যে ফান্ড সংগ্রহের জন্য মাঠেও নেমেছেন বলেই শোনা যাচ্ছে।
গতপরশু বাংলাদেশ চতুর্থ শ্রেণী সরকারি কর্মচারী সমিতি,সচিবালয় চতুর্থ শ্রেণী কর্মচারী সমিতি,সচিবালয় কর্মকর্তা-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ, অফিস সহকারী সমিতি এবং বাংলাদেশ সচিবালয় স্টেনো টাইপিস্ট সমিতির নেতারা পদ্মা সেতুর জন্য তাদের একদিনের বেতন সেতু প্রকল্প তহবিলে জমা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। খুব ভালো কথা। এসব সংগঠনের নেতারা নামে বেনামে কত ধরনের উৎস থেকে আয় করেন তার হিসেব তো আমার মতো সাধারণ একজন নাগরিকের(দুঃখিত নাগরিক নই প্রজা) পক্ষে কখনোই জানা সম্ভব নয়; তবে বিভিন্ন জনের মুখে শোনা যায় বিভিন্ন উৎস থেকে আয়ের কাছে নাকি তাদের বেতন কিছুইনা। সুতরাং তারা একদিনের কেন পুরো মাসের বেতন দিয়ে দিলেও তাদের কোন সমস্যা হবে বলে মনে হয়না।
কিন্তু দেশের সব পেশাজীবীদের কমপক্ষে একদিনের বেতন পদ্মা সেতু প্রকল্প তহবিলে জমা দেওয়ারও আহবান করেছেন তারা।
আজ যারা আমাদের উপর বিভিন্ন ভাবে সার চার্জ বা অন্য কোনো নামে চার্জের বোঝা চাপানোর চেষ্টা করছেন বা সরকারকে তেল দেওয়ার জন্য যেসব সুবিধাবাদী গ্রুপ আজ সরকারের সাথে সুর মিলিয়ে পদ্মা সেতুর তহবিল সংগ্রহের জন্য এদেশের মানুষের উপর কোন বোঝা চাপিয়ে দেওয়ার আহ্বান করছেন, একদিনের বেতন জমা দেওয়ার জন্য আহ্বান করছেন; তারা কি জানে আমার মতো সাধারণ মানুষ যারা অসৎ উপরি আয় করতে ইচ্ছুক নন, মাসের পুরো বেতনটা দিয়েই মাস পাড়ি দিতে কেমন হিমশিম খেতে হয় তাঁদের?
এই পদ্মা সেতুর এই সমস্যার জন্য দায়ী কারা? আমরা সাধারণ মানুষ নাকি অন্য কেউ?
- প্রথমে বিশ্বব্যাংকের অভিযোগ ছিল তিনজন ব্যক্তি- সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী, সচিবক ও প্রকল্প পরিচালক এর দিকে।
- কিন্তু তাদেরকে রক্ষার চেষ্টার জন্য অভিযোগের তীর এখন - প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী ও দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যা এর দিকে যা বিশ্বব্যাংক তাদের বিবৃতিতে প্রত্যক্ষভাবে উল্লেখ করেছে।
উল্লিখিত ব্যক্তিরা যদি সবাই 'সততার সনদ' এর অধিকারী হয়ে থাকেন এবং এই ঘটনা যদি অধ্যাপক ড. মুহম্মদ ইউনুসের কারণেই হয়ে থাকে তবে এর জন্যও দায়ী কে? কে বা কারা অধ্যাপক ড. মুহম্মদ ইউনুসকে 'গরীবের রক্ত চোষা', 'সুদ খোর' ইত্যাদি বিশেষণে বিশেষিত করে তাকে হেনস্তা করে গ্রামীণ ব্যাংক ছাড়া করেছে? আমরা সাধারণ নাগিক(দুঃখিত প্রজা) নাকি অন্য কেউ? যদি পদ্মা সেতু কেলেঙ্কারির নায়ক অধ্যাপক ড. মুহম্মদ ইউনুসই হয়ে থাকেন, তাহলে যে ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ তাঁকে হেনস্তা করেছেন একমাত্র সে বা তারাই কি এর জন্য দায়ী নয়?
যেসব সুবিধাবাদী গ্রুপ সরকারকে তেল দেওয়ার জন্য আমার মতো সাধারণ মানুষের উপর সারচার্জ চাপিয়ে দেওয়ার পক্ষে সাফাই গাইছেন বা একদিনের বেতন পদ্মা সেতুর ফান্ডে জমা দেওয়ার আহ্বান করছেন -তারা সরকারকে কেন বলছেন না যে, দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে বিশ্বব্যাংকের সাথে এর সমাধান করুন? অথবা কোন ব্যক্তি সম্পর্কে যার/যাদের এলার্জি আছে তাকে/তাদেরকে কেন বলা হচ্ছেনা যে, ঐ ব্যক্তি সম্পর্কে এলার্জি দূর করে বিষয়টি মিটিয়ে ফেলুন?
সারচার্জ বা অন্য কোন অতিরিক্ত কর দিয়ে অথবা পদ্মা সেতুর ফান্ডে একদিনের বেতন জমা দিয়ে দেশের মানুষ তাঁদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কেন কষ্ট করবেন ঐসব দুর্নীতিবাজদের জন্য বা তাদের বাঁচানোর জন্য অথবা কোন ব্যক্তি সম্পর্কে কারও এলার্জি থাকার কারণে তার একঘেঁয়েমির জন্য? নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তির জন্য পুরো জাতিকে কেন এই অপবাদ ও কলঙ্কের গ্লানি বহন করতে হবে?
বিঃ দ্রঃ জমিদারি প্রথার মতো প্রশাসনকে প্রয়োগ করে বা দলীয় নেতাকর্মী বিশেষ করে ছাত্রলীগকে মাঠে নামিয়ে পদ্মা সেতুর জন্য আমাদেরকে চাঁদা দিতে বাধ্য করলেও তার সবটুকুই পদ্মা সেতুর ফান্ডে জমা হবে এই নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারেন? প্রথমে ছিলেন তিনজন এখন আরও বড় তিনজন যোগ হয়ে মোট হয়েছেন ৬ জন । সুতরাং সারচার্জ বা চাঁদার মাধ্যমে পদ্মা সেতুর ফান্ড তৈরি সম্ভব হলে বা বাস্তবায়নে কোন দুর্নীতি হবেনা এমন নিশ্চয়তাও কি দিতে পারেন কেউ?
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই জুলাই, ২০১২ সকাল ১১:৪০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



