“কেমন আছো?”
ভুত দেখার মতো চমকে ওঠে ও। আমাকে এখানে আশা করেনি। আশা করবেই বা কেন? এতো বড় মেলা। ও কিনা আমাদের স্টলেই এল! নিশ্চয়ই আমাকে দেখেনি- দেখলে আসতোই না-জানি।
অনেকক্ষণ- না, অনেকক্ষণ না, কিছুক্ষণ; ওই কিছুক্ষণই আমার কাছে বিশাল সময় মনে হয়- আমার দিকে তাকিয়ে থেকে উত্তর দেয়-“ এইতো, তুমি কেমন আছো?”
“যেমন রেখেছ” বলে বই গোছাই।
“তো বই দেখবে তো?”- বলি।
আসলে হরতালের কারণে ক্রেতা নেই। আমরা মাছি মারছি। কতো আশা ছিল- বই বের করব, মানুষ পড়বে। প্রশংসা না করুক অন্তত নিন্দাতো করবে! তাও হচ্ছে না, হবে না। মাত্র আশি কবি বিক্রি হয়েছে এই বাইশ দিনে। তার মধ্যে ষাট কপিই গতকাল মানে একুশে ফেব্রুয়ারিতে! শাহিনুর অসুস্থ। তাই আমিই স্টলের বিক্রেতা এখন। কবি কাম বিক্রেতা!
“হ্যাঁ, তাই দেখতেই তো এলাম”
আমাদের লিটল ম্যাগের কয়েকটা সংখ্যা দেখালাম। কবিতার বই; গল্পের কয়েকটা। সব মিলিয়ে আঁটটা বই। অবশ্যই তার মধ্যে আমার একক কবিতার বইটাও আছে!
নেড়েচেড়ে দেখছে ও। আমার ভালো লাগছে। যদিও জানি ও কবিতা কিংবা বলতে গেলে সাহিত্য খুব একটা বোঝে না।
একটা গল্প সংকলন হাতে নিয়ে বলে, “প্রচ্ছদটা কে করেছে, সুন্দর তো?”
আমি প্রচ্ছদের ঘন নীল আর কালোর গভীরে তাকাই। এই বাইশ দিনে অন্তত একহাজার বার দেখেছি প্রচ্ছদটা কিন্তু যখনি মনোযোগ দিয়ে দেখেছি চোখ আটকে গেছে আমার যেমন যায় হটাত কোন নারীর স্তনের আভাস পেলে ওড়না কিংবা আঁচলের ছায়ায়! আমি দেখি সৃজনের করা চিত্রের দিকে। কামনাময়ী এক বুকে হাত দিয়ে শুন্যের দিকে তাকিয়ে। বুকে হাত দেয়ার যদিও কোন কারণ নেই- তাতে সুডৌল বক্ষের সামান্যই ঢাকা পড়েছে। স্তনদ্বয়ের লাল রঙে পলি জমেছে। আর তার পায়ের নিচে পরে আছে বেশ ঝাঁকড়া চুলের সুগঠিত দেহের অল্প গোঁফের যেটা খুব মনোযোগ না দিলে বোঝা যায় না- অনেকটা কালো পিঁপড়ার লাইনের মতো- এক কিশোর। বুকে তীর একটা আগুন রঙের বিধে আছে।
পটটা- প্রচ্ছদপটটা নীল, খুব নীল- আকাশ কিংবা সমদ্র যেমনটা হয়না, এমনকি বৃষ্টিতে ভেজা জামের বৃদ্ধ পাতাও না- এতো নীল। কেন নীল ব্যবহার করল সৃজন? আমার মনে অহেতুক প্রশ্নটা জাগে। জানি কোনদিন তা ওকে জিগ্যেস করব না। করলেও কিইবা উত্তর দেবে ও! বলবে, “দোস্ত, জীবনতো নীল রে। জীবনতো একটা নীল ছবি।”
এটাই কি বলবে সৃজন? কবি সৃজন? শিল্পি সৃজন? হয়তো। জীবনতো একটা নীল ছবি! ব্লু ফ্লিম!
“সৃজন।”
“চেননা? চেনার তো কথা?” যোগ করি আমি।
“হ্যাঁ, দেখেছিলাম বোধহয়। ওর চোখ একটা ছোট না?”
চোখের কথাটা আমার বড় বিঁধে। ওর একটা চোখ ছোট- অনেকটা ছোট। যতটা ছোট হলে মানুষ লক্ষ্য করে। মার্বেলের মতো। শাদা মার্বেল- হারিকেনের সলতের মতো মনিটা দেখলে মনে হয় নগ্ন করার ক্ষমতা আছে সেটার। ওর মার্বেল চোখের সলতের দিকে তাকিয়ে মিথ্যে কোনদিন বলতে পারিনি। মনে হয়েছে, বললেই হয়তো ও ধরে ফেলবে, হেসে ফেলবে আমার আনাড়ির মতো মিথ্যে বলার প্রচেষ্টায়।
ত্রয়ীর কথায় খারাপ লাগে আমার। আমরা কি শুধু কোন মানুষের বিকৃতিটাই মনে রাখি- বিকৃতিই কি বিকৃতের পরিচয়?
“হুম”
“ বেশ করেছে কিন্তু।” আমার সৃজনের প্রশংসা শুনে ভালো লাগে। ওর প্রথম কাজ। এতোদিন ওর ইজেলের তুলির খাদ-সমতল, আবদ্ধতা-মুক্তি, সরলতা-সাপের চলার মতো বক্রতা শুধু আমরাই দেখেছি। প্রশংসা আমরাই বলতে গেলে নিখিল, শিশির আর আমিই করেছি। নিন্দাও করেছি খুব আমরাই।
অফার গত বছরই কয়েকটা পেয়েছিল প্রচ্ছদ আঁকার। বনেনি। জিগ্যেস করলে বলত, “কি হবে!”
আমার বইয়ের প্রচ্ছদও ও করেছে। আমার সব কবিতার প্রথম পাঠক যেমন ও তেমনই প্রথম ক্রেতাও ও। আশি টাকা গুঁজে দিয়েছিল পকেটে একটা বই অটোগ্রাফসহ নিয়ে; বই প্রথম স্টলে আনার পর। ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদ করার পর ও বলেছিল, যখন আমরা- সৃজন, নিখিল, আমি চা খাচ্ছিলাম গলির দোকানে বসে; বলেছিল- বলেছিল নাকি আবৃতি করেছিলো হেলাল হাফিজের কবিতা-
“আছি।
বড্ড জানান দিতে ইচ্ছে করে।
আছি।
মনে ও মগজে গুনগুণ করে
প্রণয়ের মৌমাছি।”?
“বেশ করেছে কিন্তু” বলে ত্রয়ী।
ত্রয়ী। আমার আদ্রিতা। নক্ষত্র-দূর আকাশের যাকে মনে করতাম একসম।ওর সমসাময়িক কবিতায় ত্রয়ী হয়ে গিয়েছিলো আদ্রিতা।
সমসাময়িক? কেমন বেমানান লাগছে শব্দটা। এর চেয়ে “ওকে যখন ভালবাসতাম” বললে ভালো হতো না? সমসাময়িক কেন বললাম? আমি কি এখন স্বীকার করতে কুণ্ঠিত যে আমি ওকে ভালবাসতাম? “আমি তোমার ব্লাউজ খুলতে ভালোবাসি” মাহামদুল হকের নায়ক মনে মনে এই কথাটা বলেছিল ওর প্রেমিকাকে যে ছিল আরেকজনের প্রেম করে বিয়ে বিয়ে করা বৌ! আমিও কি শুধু ওর ব্রা’র স্ট্রাপ খুলতে ভালবাসতাম? হয়তো, হয়তো না। না হলে এতো কুণ্ঠিত হচ্ছি কেন? কেন বলছি “ওর সমসাময়িক কবিতা”! আমার কবিতার বিশুদ্ধ প্রকৃতির মতো, স্বচ্ছ নদীর জলের মতো প্রেম কি তবে শুধু যৌনতা? হয়তো। হয়তো না।
“হ্যাঁ, ও খুব সুন্দর আঁকে” জবাবে বলি।
সংকলনটা রেখে কবিতার বই একটা নেয় এবার। এটাও সংকলন। নবীন কবিদের । পাতা উল্টায়। দাম দেখছে বোধহয়। আমি নিজের অজানিতেই ফেসবুকে লগইন করি। কিছু করিনা- লাইক দেইনা, কোন স্ট্যাটাস পড়িনা, নোটিফিকেসন চেক করিনা। বের হয়ে আসি আবার।
আমার বইটা ও দেখছে না। দেখেও দেখছে না। অথচ স্পষ্ট লেখা আছে- জ্বলজ্বল করছে সৃজনের চিত্রকর্মের উপর পেনছিলকালো অক্ষরে আমার নাম। ও কি ইচ্ছা করেই করছে? আমাকে আঘাত করার জন্য?
বাতিটা নিভে যায় হটাত, কালো হয়ে আসে আলোকিত মেলা, নিকষ অন্ধকারে কেউ কেউ মোবাইলের আলো জ্বালে। অন্ধকার তাতে আরো প্রকট হয়ে আমাদের চোখকে উপহাস করে।
বাল্ব জ্বলে উঠে আবার। আমি তাকিয়ে ছিলাম অনির্দিষ্ট। আলো আমাকে ত্রয়ীর বুকে নিয়ে যায়। আমি স্পষ্ট দেখতে পাই ওর শাদা ঘাড়ের কালো তিলের পাশে টাইট করে বাঁধা ব্রার স্ট্রাপ যেটা এতক্ষণ ওড়নার ছায়ায় আঁধারে ঢাকা ছিল। আমি ওখানে চোখ ইচ্ছে করে রাখিনি, বিদ্যুতের হেয়ালি আমাকে সেখানে নিয়ে গেছে।
ও বোধহয় আমার দৃষ্টি বুঝতে পারে। ঠিক করে নেয় ওড়নাটা স্বাভাবিকভাবেই।
সামান্য ঝুলে পরেনি স্তন দুটো? একটু ফোলা, একটু বড়? আদুরে বাচ্চার অভিমান করা গালের মত? আমার ছুঁয়ে দিতে ইচ্ছে করে। আদর করতে ইচ্ছে করে।
পরক্ষনেই বিষক্রিয়া শুরু হয় মনে। এতো বড় কেন ওদুটো? সময় সাধিত? মেদ জমেছে? এতো তাড়াতাড়ি? কে বড় করেছে? নিজের মনের এমন অস্বাভাবিক প্রশ্নে লজ্জিত হই আমি। কেন ছয় মাসে কি নতুন কোন সম্পর্কে ও জড়িয়ে পড়তে পারেনা? আমি কি নিজেই পরিনি জড়িয়ে?
আমি খুব চাচ্ছিলাম ও অন্তত আমার বইটা একবার দেখুক, একবার নেড়ে দেখুক। কেনার দরকার নেই- একবার সূচিপত্রটা পড়ুক, প্রচ্ছদটা দেখুক।
“এটার দুটোর কতো করে?” ও গল্প আর কবিতার সংকলনের বই দুটো আমার দিকে এগিয়ে দেয়।
অকারণ একটা দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে যায়। “অকারণ?” নিজেকে শুধাই। উত্তর মেলে না।
এতো ঝুলে পড়েছে কেন ওরা? কে করেছে? নতুন প্রেমিক? কতো সুডৌল ছিল ওরা অনেকটা দুর্গা দেবীর লাল বেনারসিতে ঢাকা লোভনীয় পর্বতের মত যেন নিপুন কোন কারিগরের গড়া কিংবা কোন শিল্পীর আঁকা চিত্রকর্মের কদম ফুল। এতো কদর্য লাগছে কেন? বিকৃত। ঝুলে পরা। এই নশ্বর আর ক্ষণস্থায়ী মাংস খণ্ডের জন্যই কি আমি লিখেছিলাম- “আদ্রিতা, তোমার কদম মরুপর্বতে আমি মরিচিকাক্রান্ত হয়ে মরতে চাই!”? এই নষ্ট মাংস পিণ্ডের জন্য?
“আরে, বললে না তো এ দুটোর দাম কতো!”
ত্রয়ীর দিকে তাকাই। অবাক চোখে দেখছে আমায়। আমি দেখি আমার সামনে নগ্ন ত্রয়ী দাঁড়িয়ে আছে! কদর্য ত্রয়ী। ৪০ পেরুনো মহিলার মতো ঝুলে আছে স্তনদ্বয়! মেদ জমে ভুরি নেমেছে! জ্বলে গেছে মুখের চামড়া; চামড়ার অন্তরালের শিরা উপশিরা দেখতে পাচ্ছি।
আমি যেন এক শয়তানীর দিকে তাকিয়ে যার চোখে বিস্ময় কিংবা জিঘাংসা! অভিশপ্ত! চোখ দুটোতে মৃত্যু দেখা যাচ্ছে যেন। যেন আমি সৃজনের প্রচ্ছদে আঁকা সেই বিদ্ধ বালক কিংবা কিশোর যার ঝাঁকড়া চুল আর ও কামনাময়ী শঙ্খিনী- বুকে হাত দিয়ে অকারণ লজ্জা ঢাকায় ব্যস্ত!
“তুই যা এখান থেকে মাগি! কুত্তার বাচ্চা!” নিজের কণ্ঠকে আমি নিজেই চিনতে পারিনা! আমি বলছি? আমি বলেছি? ত্রয়ী অবাক তাকিয়ে।বিবর্ণ। ফ্যাকাসে। আশেপাশে থাকা ছেলেমেয়েরা দেখছে আমাদের। আমি নিজের গলা চিপে ধরি। দুই হাত দিয়ে চিপে ধরি যেন আমার সরতন্ত্রি আর না কাঁপে, অনুরণন না তোলে জিহ্বা। কিন্তু হাতের বাঁধা না মেনে আমার কণ্ঠস্বর বলে যায়, “শুয়োরের বাচ্চা, এখনো যাসনি। যা, নইলে কেটে ফেলব কিন্তু!” আমার গলাটা ছিঁড়ে ফেলতে ইচ্ছে করে। ওর উপর আমার কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। স্বচালিত যন্ত্র যেন কিংবা তা হয়ে গেছে হৃদপিণ্ডের মতো অনৈচ্ছিক কোন পেশি। ধারাল কর্কশ নখের জ্বালা অনুভব করি আমি। ছিঁড়ে ফেলব সব। সব।
“শুয়োরের বাচ্চা যা!”
কোথা থেকে নিখিল দৌড়ে এসে গলা থেকে হাত ছাড়িয়ে নেয়। জড়িয়ে ধরে আমায়। আমি ওর কাঁধে মাথা রাখি। ও আমার চুলে মাথায় মায়ের মতো হাত বুলিয়ে দেয়, আদর করে। ওর শাদা সার্ট আমার নখে লেগে থাকা রক্তে লাল হয়ে যায়। রক্তিম হয়ে যায়। ঝরঝর করে কেঁদে ফেলি আমি। এতো কান্না আমার মধ্যে ছিল!
আমি খুব চাচ্ছিলাম ত্রয়ী, “আমার আদ্রিতা”- অন্তত আমার বইটা একবার দেখুক। কেনার দরকার নেই- একবার ও সূচিপত্রটা পড়ুক, প্রচ্ছদটা দেখুক।
সৃজন একবার বলেছিল- না বলেনি, আবৃতি করেছিলো হাত নেড়ে, গলা কাঁপিয়ে- আশেপাশে কোন দেয়াল না থাকলেও গমগম শুনেছিলাম আমরা-
“আছি।
বড্ড জানান দিতে ইচ্ছে করে।
আছি।
মনে ও মগজে গুনগুণ করে
প্রণয়ের মৌমাছি।”
21st February 2015 to 22nd February 2015
8.00 pm- 12.45 pm

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



