১
বেড়িয়ে যাওয়ার কোন দরকার ছিল না, ভেতরে থাকারও কোন মানে ছিল না।
আমি এই অভ্যস্ত বাতি, ঘরদোর, বই, টিভি, ইন্টারনেট, দম বন্ধ করা মানুষদের কাছ থেকে দূরে যেতে চেয়েছিলাম, মুক্ত বাতাসে শ্বাস নিতে চেয়েছিলাম, বায়ুথলীকে পূর্ণ করতে চেয়েছিলাম মেঘলা শীতের এই দুপুরে টলটল করে হেঁটে চলা শিশুটার হাসিতে, সজনে ফুলের সাদা নির্মলতায় ধুয়ে ফেলতে চেয়েছিলাম নাগরিক জীবনের যত বিস্বাদ; প্রেম-কাম-রাজনীতি-গনতন্ত্র-স্বৈরাচার থেকে দূরে গিয়ে অবগাহন করতে চেয়েছিলাম নীল পুকুরের জলে, সাঁৎরাতে চেয়েছিলাম পাতিহাঁসদের সাথে তাদের জীবন আপন জীবন মেনে। আমি শিমুল, চালতা, জাম, মেহেগুনি, কদম, সজনে, কাশ আর হিজলের শরত-হেমন্ত ও বসন্তে দোয়েলের মতো উড়তে চেয়েছিলাম। এই বাস, ট্রাক, কারখানা, দল, নির্দল, রাজাকার, সংবাদ, সংবাদপত্র, নাম, দুর্নামকে পিছনে ফেলে হারিয়ে যেতে চেয়েছিলাম।
আমি এরমাঝে মরে যাচ্ছিলাম না।
নিয়মিত যোগ দিচ্ছিলাম রাজনৈতিক আলোচনায়, সকাল সন্ধ্যা সংবাদপত্রের সম্পাদকীয় পড়ে উগ্রে দিচ্ছিলাম দেশপ্রেম, ঈর্ষান্বিত হচ্ছিলাম দুজন যুবক যুবতীকে হাত ধরে হেঁটে যেতে দেখে, চেতনার বাতুল প্রদীপ জ্বালিয়ে মৌলবাদ আর ধর্মনিরপেক্ষতার চুল চেরা বিচার করছিলাম, ব্লগ-ফেবুতে লিখছিলাম মাতালের মতো ঝরঝর সংলাপ কাল্পনিক, টেলিভিশনে উপস্থাপিকার নাভির দিকে তাকিয়ে বাঁধ ভেঙ্গে দাঁড়িয়ে যাচ্ছিল পুরুষাঙ্গ, কবিতার চারুলতা কিংবা বনলতাকে ভেবে ফেলছিলাম দীর্ঘশ্বাস, প্রতিদিন নিয়ম মেনে ফ্যাট বর্জিত খাদ্যে পেট বোঝাই করে উগরে দিচ্ছিলাম টয়লেটে, নিষ্ফল জেনেও ক্রোধে হাত পাকিয়ে রাখছিলাম সরকারি কিংবা বিরোধীদলের কোন পশুত্বে, নারীবাদের দীক্ষিত হয়ে কাজের মেয়েটাকে করুণার, মাঝে মাঝে কামের চোখে দেখছিলাম, গভীর রাতে নিষ্পেষিত যৌনতাকে তাতাতে চটি পড়ে বের করে দিচ্ছিলাম শান্তি-শক্তি-পৌরুষ, এরপর অশক্ত ঢলেপরা লিঙ্গের মতো বিছানায় গা ভাসিয়ে দিচ্ছিলাম।
আমি মরে যাচ্ছিলাম না এভাবে। তাইতো আগেই বলে রেখেছি বাইরে যাওয়ার কোন দরকার ছিল না।
মরে না যাওয়াটাই বেঁচে থাকা নয় জেনেই বেড়িয়ে পরেছিলাম সুপারি, জাম আর বট গাছের খোঁজে, চোখজ্বালাকরা ইলেকট্রিক বাতির ছায়া থেকে গোধূলির সোনালি অন্ধকার আর নির্মলতার মাঝে। মরে না যাওয়াই শ্রেষ্ঠ কাজ নয় বুঝেই মানিক ছেড়ে দিয়েছিলাম, বিভূতির পথের পাঁচালি গাইতে গাইতে আরণ্যক হতে চেয়েছিলাম। শামসুর রাহমানের কবিতার রাজপথ পাশ কাটিয়ে রবীন্দ্রনাথের “আসা যাওয়ার পথের ধারে” দিন কাটাবার সাধ করেছিলাম। “সাতটি তারার তিমির” পুড়িয়ে ফেলে আশ্রয় নিতে চেয়েছিলাম “রূপসী বাংলার” কোন নদী ঘাসে।
২
মেঘলা শীতের দুপুর বসন্তে চলে গেছে, দুই দিন জলবায়ুর বিশ্বাসঘাতকতায় ঝিরিঝিরি বৃষ্টির পর শীত কুয়াশাকে রেখে চলে গেছে কোন অজানায়।শীত বসন্তে চলে গেছে আজ। মেহেগুনির বাতিল পাতাগুলো ঝরে পরার সময় পায়নি তাই নতুন প্রজন্ম উঁকি দিচ্ছে না। এলোমেলো বাতাস মনে করিয়ে দিচ্ছে কোন্ ফাল্গুনের রচিত কোন কবিতা। পথের দুপাশের আবর্জনায় গজিয়ে ওঠা ধুতুরাটা মুমূর্ষু হয়ে অপেক্ষা করছে আরেক ফাল্গুনের।আমি এই নাগরিকতার বিস্বাদ আলো কিংবা অন্ধকার থেকে বের হয়ে যেতে থাকি।
বিপরীত দিক থেকে আসছে একটা বিজয় মিছিল- পেছনে বাদ্য বাজাতে বাজাতে। নাচছে দলের পাতি থেকে প্রধান কর্মী। “বুকের ভেতর তোর নাম লিকেছি, রেকেচি বাসন্তী খামে পুইরারে, ভালো করিয়া বাজাওরে দোতারা” বাজাতে থাকে বাদ্যযন্ত্রীরা।পালিয়ে যেতে জোড়ে জোড়ে পা চালাই আমি। সামনে আমার গতিরোধ করে সমাবেশ একটা। নেতা আঙ্গুলের নাচনে আসর গরম করে রাখেছেন, কেপেকেপে স্লোগান দিতে থাকে উপস্থিত জনতা। এবার নেতার মুখ দেখেই আমার বমি করতে ইচ্ছে করে, কান চিপে ধরি আমি যেন কোন শব্দ প্রবেশ করতে না পারে, ছুটতে ছুটতে চলে আসি একটা কিন্টারগার্ডেনের সামনে।
শত শত নিষ্পাপের মুখ দেখে ভুলে যাই কিছুক্ষণ আগে শোনা কুত্তাটার চীৎকার। ব্লাকবোর্ডের দিকে তাকালেই বুক জমে যায় ওদের কান্নায়, গেটের বাইরে লাইন করে বসে থাকা মূর্খ কিছু অভিভাবক দেখতে পাই। এদের হাঁসি শুনতে পেয়ে শয়তানের কথা মনে মনে পড়ে আমার। একটা নবজাতককে কোলে বসে আছে একজন সচেতন অভিভাবক। বাচ্চাটাকে বলতে ইচ্ছে করে, “যার কোলে অচেতনে ঘুমিয়ে আছো, বাছা কিছুদিন পর এই তোমায় ধরিয়ে দেবে আত্মহত্যার ট্যাবলেট, যে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে ওখানেই বেঁছে বেঁছে মুগুর ভাজবে, গোটাল গোটাল গাইড আর প্রাইভেট টিউটর গিলিয়ে খাওয়াবে তোমায়”।
এসব ভাবতে চাইনা আমি, আমার চন্দনা চাই, ময়না চাই; শালিক খুজি। এদের সাথে কোন সম্পর্ক নেই আমার।এরা মরুক- বাঁচুক, সভ্যতার চরম শিখরে উঠুক কিংবা পিছিয়ে গিয়ে কয়েকশো বছর মৌলবাদের খাদ্যে পরিণত হোক বা জন্ম দিক শত শত নিষ্প্রাণ শিশু, বিকৃত করে দিক সুন্দর গুলগুলে সম্ভবনাময় মেধাবী ছেলেটার মাথা!, আমার কিচ্ছুটি যায় আসে না।এদের সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই।সবাই আমাকে স্কেপিস্ট ভাববে? ভাবুক।
পালিয়ে আসি,পা আটকে যেতে থাকে পিচে, পাথর ঢুকে চায় জুতোর সোল ভেদ করে পায়ের পাতায়, হাঁপাতে থাকি আমি। থামিনা তবুও থামিনা। একছুটে স্কুলের সীমানা পেরিয়ে কারুকার্যময় মসজিদের পাশে! , সেখানে উদ্ধত তলোয়ার আর টুপির ভেতর হাজার হাজার নিউরনিয় শয়তান দেখে ভয়ে ছুটতে থাকি, শত শত মৌলবি আর ইঞ্জিনিয়ার-ডাক্তার- শিক্ষক- অধ্যাপক- চামার-চণ্ডাল- ভালো ছাত্র- গবেট- মোল্লা ধাওয়া করে আমাকে।আমি প্রাণ ভয়ে দৌড়াতে থাকি। পেরিয়ে যেতে থাকি দোকান- পাশার, ক্লাব, রেস্তরা, তাসের আড্ডা , সরকার, সংসদ, গণতন্ত্র।পিছনে পরে থকে শহীদ মিনার, সিনেমা হল, বেশ্যাপাড়া, রাজনৈতিক কার্যালয়, হোটেল, রেস্টহাউস, কলেজ, ডাকবাংলো, পোস্ট অফিস, ব্যাংক। আমি ছুটতে থাকি, ছুটে যেতে থাকি।
৩
ছুটতে ছুটতে শত শত মাইল পেরিয়ে যেতে থাকি আমি। রাস্তাটা কখনো নদী কখনো পাহাড়ের রূপ নেয়। মেঘলা শীত দুপুর বদলে যায় গ্রীষ্মে, ঘাম ঝরতে থাকে অবিরাম পাহাড় ফেটে বেরুনো কোন ঝর্ণার মতো। হঠাত মেঘ নেমে আসে, অন্ধকার নামে, ঢেকে যায় মধ্যগগণে থাকা নির্দয় সূর্যটা, আগুন জল হয়ে নেমে আসে। আমার পথ কর্দমাক্ত হয়ে যায়, পা পিছলিয়ে যেতে চায়। বিদ্যুতে পুড়িয়ে মারতে চায় আমাকে, মেঘরাজ মুক্তি চাওয়ার অপরাধে, থেমে থেমে গর্জন করে থেমে যেতে বলে।
আমি থামাই না পথচলা কোন মেঘের শাসানিতে, কোন মূর্খ সূর্যের চোখের আগুনে জ্বালিয়ে দিতে পারেনা আমার দৃষ্টি, পিছল পথ রোধ করতে পারেনা আমাকে গন্তব্য থেকে। আমি চলতে থাকি।
শীত পেরিয়ে বসন্ত আসে-আমি বসন্ত উপভোগ না করে দৌড়াতে থাকি দোয়েল, শ্যামা আর শালিকের জন্য। গ্রীষ্মবর্ষা ঘাম হয়ে বেড়িয়ে যায়।
আমি গন্তব্যে আবির্ভূত হই শরতের এক হলুদ বিকেলে।
৪
বিকেলের গাঢ় রোদ বাঁকা হয়ে পরে ডোবায় পুতে রাখা কঞ্চিতে ধ্যান করতে থাকা মাছরাঙ্গার সবুজ পালকে, ঝুপ করে নেমে পুঁটি নাকি দারিকা একটা ঠোঁটে গুজে ফুড়ুৎ করে অন্য কোন বিল, ঝিল বা পুকুরের দিকে পালিয়ে যায়। বাতাসে দাগ থেকে যায় মাছরাঙ্গাটার উড়ে যাওয়ার পথের।লাফিয়ে নিজের অস্তিত্ব জানান দিয়ে আবার হারিয়ে যায় তেলাপিয়াটা, বেজি একটা জলের ধারে এসে কি মনে করে আর পানিতে নামে না। ঢোঁড়া সাপ একটা একেবেকে দাগ কেটে এপার থেকে ওপারে যায়। বিকেলের গাঢ় রোদ গাঢ়তর হয়ে পরে ডোবায় পুতে রাখা কঞ্চিতে। জলের উপরে যেখানে রোদ পরে সেখানে চিকচিক করে সোনালি হয়ে যাওয়া সাদা ধুলি। মিইয়ে আসে সূর্যদেবের তেজ, আমি বাড়ির পথ ধরি।
পথের দুধারে ভাট গাছে সাদা সাদা ফুল এসেছে। ধুলপির গাছে পা উঁচু করে প্রছাব করে হেলতে দুলতে এগিয়ে যায় কুকুরটা। পথ শেষ হয়।
এবার নদীর ধার দিয়ে যেতে হবে খানিকক্ষণ। শরতের শেষ যৌবনের মতো নদী দুই ধারে সাজিয়ে রেখেছে কাশ ফুলে ফুলে। বালুর চরায় পানকৌড়ি একটা বসে থাকে। গরুগুলো তারিয়ে নিয়ে ফেরে বালক এক। কাল কুটকুটে দেহে লুঙ্গিটা কাছা করে পরেছে, -“হাট হাট” –গরুগুলো চেনা পথে নিজেদের গতি বাড়ায়। একটা ছাগল কোলে করে নিয়ে যায় আট’ন বছরের এক মেয়ে, ছাগিটার সাথে নাকি নিজে নিজে কথা বলে সে- বোঝা যায় না।আমি নদীর পথ ধরে বাড়ি ফিরে যাই শরতের গোধুলি বেলায়।
ওই তো খড়ের পুজ দেখা যায়, গাভীটা সারাদিন খেয়ে জাবর কাটে, বাছুরটা পাড়া বেড়াতে গেছে নিশ্চয়ই। বাড়িটাকে অন্ধকার করে আছে একথাক বাঁশে, শুকনো বাঁশপাতায় ভরে আছে উঠোনটা। বিকেলের গাঢ় রোদ নিভে গেলে, গোধূলির চঞ্চলতা থেমে এলে সীমাহীন নির্জনতা আর নির্ভার সময় নিয়ে সন্ধ্যা আসে ধীরে। গান্ডারি আর টুনটুনির আনন্দ কোলাহল এই নির্জনতার ভাগ কমিয়ে দেয় খানিক। আমি ঘরের দাওয়ায় বসে থাকি।
৫/০১/২০১৫ থেকে ৬/০১/২০১৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


