সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘এক জীবনে’ শেষ করে মনে হচ্ছে, বইটা নিয়ে একটা রিভিউ না লিখলে কিংবা এই বইটা আরও কয়েকজনকে না পড়িয়ে নিলে আমার পাপ হবে। কিংবা রিভিউ লেখা ইচ্ছে নয় বরং বইটা নিয়ে লেখার আমার অদম্য স্পৃহাই আমাকে কিবোর্ড ধরিয়েছে।
লিখছি যখন তখন প্রথম থেকেই শুরু করি। বইটার সাক্ষাৎ আমি পেয়েছি পুরাতন বইয়ের একটা দোকানে। গাইড, সাজেসান, টেক্সটবুক হাবিজাবি ইত্যাদির ভিড়ে গল্প-কবিতা-উপন্যাস খুঁজে পাওয়াই দায়। অনেক খুঁজে যে কয়েকটা পেলাম, তার বেশির ভাগই পড়া কিংবা ‘অপ্রিয়’ লেখকের। সুনীলের ‘সন্ধ্যার মেঘমালা’ ও ‘জীবন উৎসব’ এবং বুদ্ধদেব গুহর’ ‘একটু উষ্ণতার জন্য’- এই তিনটি কিনব বলে ঠিক করে দামাদামি করতে গেলাম। বইদুটো দেখেই দোকানদার শ্লেষের হাঁসি হাসলেন যেন, বললেন, “সুনীলের বই কেউ পড়ে? বাজারি লেখক একটা!”
আমার ওর সাথে তর্ক করার মোটেই প্রবৃত্তি ছিল না বলে শুধু না, সময়ও ছিল না- কিনে চলে এলাম।
‘এক জীবনে’ পড়ার পর(“ সন্ধ্যার মেঘমালা” আর “জীবন উৎসব” দুটোই আসলে উপন্যাস সংকলন- প্রত্যেকটিতেই আছে তিনটি করে) মনে হচ্ছে, সুনীল নিজেই দিলেন সেই দোকানদারের শ্লেষের জবাব!
আর ‘বাজারি’ লেখক? কোন লেখক বাজারি নন? যে দেশে লেখক সত্ত্বা নিয়েই বেঁচে থাকা দায়, সেদেশে দুইপাঁচটা বাজারি বই লিখলে ক্ষতিই বা কিসের? সবাই তো আর রবীন্দ্রনাথের মতো জমিদার পরিবারে জন্ম নিতে পারেন না! আর কে না জানে যে ‘শিল্প সাহিত্যকে পেশা হিসেবে না নিলে সেটা এগুতে পারে না বেশিদুর”? টেনেটুনে আর কদ্দুর যাওয়া যায়? শখের সাহিত্যিক টিকে আছে কেউ?
আর যদি ধরেই নেই, সুনীলের উপন্যাস বাজারিই তবে বলতে হবে বাংলা সাহিত্যের বাজারি অংশের মধ্যে তো বটেই এমনকি অনেক সাহিত্যিকের মাস্টারপিসের চেয়ে উন্নত সেগুলো!
সে যাই হোক, ‘এক জীবনে’ ছোট্ট একটা- মাত্র ১০০ পৃষ্ঠার- উপন্যাস। অথচ এতো এর ব্যাপ্তি কতো! কতো গভীরে যাওয়া যায় এতো অল্প পরিসরেই সেটা প্রথমের কয়েকটা পৃষ্ঠা পড়লেই বোঝা যায়! জীবনের মাঝ পথে শুরু এর পথচলা, মাঝ পথেই শেষ! কিংবা বলা যায়, সবাই আমরা মাঝপথেই শেষ হয়ে যাই! ক’জন পেরেছি ‘পারফেকসন’ অর্জন করতে জীবনের?
উপন্যাসের শুরুটা বেশ নাটকীয়। লেখক নিজেই উপস্থিত থেকে কলমের যাদুতে টেনে এনেছে চরিত্রদের, এক এক করে- মনিশ, ইন্দ্রাণী, অনিন্দ্য, সুব্রত, ভাস্কর, নিশানাথ, অরবিন্দ, দেবযানী, পলা, শিখা, জীবন ডাক্তার- আরও কতো চরিত্র! এদের কেউ গাঁজাখোর, কেউবা মাতাল, কেউ ‘গুডি বয়’, কেউবা জীবনে সংগ্রাম করেও হেরে যাওয়া সৈনিক! কিন্তু সবাই সম্পর্কিত সবার সঙ্গে এক অদ্ভুত বাঁধনে, এক অদ্ভুত সম্পর্কে!
‘একটু আগে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। বাতাসে এখন তাপ নেই। সকালবেলার আলো স্পষ্ট উজ্জ্বল। পৃথিবী জেন এই মাত্র স্নান সেরে পরিচ্ছন্ন রূপসী হলো।...................................................
তিনতলার বারান্দায় দরজা খুলে ইন্দ্রাণী বাইরে এসে দাঁড়ালো। সে এখন এই পৃথিবীর এই ক্ষুদ্র অংশটুকু দেখছে। কিংবা তিনতলা থেকে সে আরও খানিকটা দূর পর্যন্ত দেখতে পায়। তাদের বাড়ির বাগানেই তো অনেক গাছপালা।
..........................................
তার ফর্সা শরীর, হলুদ শাড়ী এবং সকালের রোদ, সব মিলিয়ে একটা ম্যাজিকের সৃষ্টি হয়েছে। বলতে ইচ্ছে হয়, ‘রৌদ্রে এসে দাঁড়িয়েছে প্রতিমা
তিনতলার বারাণ্ডার রেলিং ধরে ঈষৎ ঝুঁকে ইন্দ্রাণীর এই যে দাঁড়িয়ে থাকা, আপাতত পৃথিবীতে এর চেয়ে সুন্দর দৃশ্য আর কিছু নেই। রাজপথ দিয়ে দ্রুত হেঁটে আসতে আসতে সেই দিকে চোখ পড়তেই আমার বুকটা আকস্মিক ভূমিকম্পের মোচড় খায়। দু’এক পলক আমি চোখ ফেরাতে পারি না। নিজেকে আমার মহান ও গ্লানিহীন মনে হয়। সেই মুহূর্তে আমি পৃথিবীর সমস্ত অপরাধীকে ক্ষমা করে দিতে পারি”
তারপরই ‘জীবনে’ নেমে পড়ে ইন্দ্রাণীরা! লেখক বলেন, ‘ইন্দ্রাণী তুমি ওখানেই দাঁড়িয়ে থাকো, আপাতত আমি এই কাহিনী থেকে প্রস্থান করি”
“সেই মুহূর্তে আমি পৃথিবীর সমস্ত অপরাধীকে ক্ষমা করে দিতে পারি”- এই বাক্যটা আমার এতোই ভালো লেগে গিয়েছিল তখন যে আমি ঠিক করে ফেলি, এ বই শেষ না করে আমি উঠবো না!
কাহিনীর পরোতে পরোতে রোমাঞ্চ; মনে আমিও যে জড়িয়ে যাচ্ছি, সম্পর্কের অলিগিলিতে হারিয়ে ফেলছি পথ, গাঁজা খেয়ে বকছি ভুলভাল কিংবা বর্ষার গঙ্গা পার হচ্ছি নাসিরুদ্দিন মাঝিকে নিয়ে, আকাশে জমেছে এসে কালো মেঘ, পারবো কিনা পারে পৌঁছতে এই দ্বিধায় ভুগছি কিংবা চিত্রকর ভাস্করের মতো হাসছি নিজের চিত্রকর্ম দেখে! আর অনিন্দ্যের সাথে সারারাত নভেল পড়ে পরদিন বেড়িয়ে পড়ছি অজানা কোন এডভেঞ্চারে অথবা নতুন কোন মেয়েকে ‘ফ্লাট’ করতে!
কখনো মনে হচ্ছিলো, আমি মনিশের মতো স্বার্থপর হয়েই থাকতে চাই আজীবন, মুক্তি পেতে চাই বন্ধন থেকে, উপার্জন করতে চাই সম্মান জোর করে হলেও। আবার কখনো জীবন ডাক্তারের মতো নিরাসক্ত হতে ইচ্ছে হয়!, ইচ্ছে করে গঙ্গার তীরে, ভাসমান ঢেউয়ের মতো কিংবা শ্যাওলার মতো ভেসে চলি এপার থেকে ওপারে!
এভাবে জড়াতে জড়াতে কখন যে চলে এলাম শেষ প্রান্তে বুঝতেই পারলাম না। শেষ করে বুঝলাম শেষ হয়েছে! “বড় একটা নিশ্বাস ফেলার আগে, পৃথিবীর সব মানুষের মতনই ভাবলেন, জীবনটা যদি গোড়া থেকে আর একবার শুরু করা যেত!” শুরু করার বাসনা নিয়েই শেষ!
বইটা নিয়ে একটা রিভিউ দেখলাম রকমারিতে। জান্নাতুল নায়েম পিয়াল নামের কেউ লিখেছেনঃ “উদ্দাম তারুণ্যের গল্প নয়। তারপরও যৌবনের যৌনতার যৌনতার কথা বারবার এসেছে। কিন্তু শুনতে খারাপ লাগলেও সত্য যে, সেই যৌনতার প্রকাশভঙ্গি ছিল একেবারেই সস্তা। অহেতুক যৌন সুড়সুড়িমূলক কথাবার্তা দিয়ে উপন্যাসের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মোড়ান। কেন লেখক এমনটা করেছেন তা জানি না”।
তিনি “সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যাস থেকে যে এক্সপেক্টেসান থাকে তা এই উপন্যাসটি পড়ে পুরন হয়নি বলে” সন্তুষ্ট নন!
কিন্তু আমি সত্যিই আরেকবার উপন্যাসটি ঘেঁটেঘুঁটেও কোথাও যৌন সুড়সুড়িমূলক কিছু খুঁজে পেলাম না। হ্যাঁ যৌনতা নিয়ে কথা বলা হয়েছে, তা প্রয়োজনের বাইরে একফোঁটাও নয়। আরেকটা জিনিস তিনি কিছুটা ঘোলা করে রেখেছেন সেটা হোল ““উদ্দাম তারুণ্যের গল্প নয়” এটা বলে। এটা উদ্দাম তারুণ্যের গল্প না হলেও তারুণ্যেরই গল্প! আর তরুণদের যৌন ফ্যান্টাসি সম্পর্কে আমরা সবাই জানি। যেটা বাস্তব সেটা গল্প-উপন্যাসে লিখলে কেন যৌন সুড়সুড়িমূলক হবে বুঝতে পারলাম না।
যে যাই হোক, আমার কাছে অসাধারণ লেগেছে পুরো গল্পটাই। খাঁটি। নিখুঁত এবং সৎ।
বইয়ের নামঃ এক জীবনে
লেখকঃ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
মুল্যঃ ১২৫
প্রকাশনিঃ আজকাল
রকমারি লিংকঃ Click This Link
নীলক্ষেত লিংকঃ Click This Link
চর্বিতচর্বণ হবে জানি, তবুও বলছি, বইয়ের সঙ্গে থাকলে হালকা হয়ে আসে বোঝা, জীবনের। প্রাণখুলে নিশ্বাস নেয়া যায় হাঁসফাঁশ ব্যস্ততার মধ্যেও। আমরা যেন বইয়ের সাথেই থাকি- এটাই কাম্য।
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই আগস্ট, ২০১৫ রাত ১১:২৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



