কশাই
[Andy Weir এর ‘The Midtown Butcher’ অবলম্বনে। অনুবাদ করতে চেয়েছিলাম কিন্তু অনুবাদটা ভাল না হওয়ায়, নিজের মত করে লিখেছি।]
অসহ্য গরম। জুন মাসের মাঝামাঝি এই সময়টা একদম বিরক্তিকর। ভ্যাঁপসা চিটচিটে বাতাস গায়ে আগুন লাগিয়ে দেয়। ক্লারা ঘামে-ভেজা রুমালটা দিয়ে নিজেকে বাতাস করছে। যদিও ফ্যান ঘুরছে হাইস্পিডে কিন্তু তার বাতাস ক্লারা’র শরীর মোটেও ছুঁয়ে যাচ্ছে না। সে ঠিক করে রেখেছে মাস শেষে একটা এয়ারকুলার কিনবেই। যদিও কষ্ট হবে খুব। কিন্তু সে কষ্টটা এই গরমের যন্ত্রণার চেয়ে অনেক কম হবে বলে মনে হয় তার।
এতক্ষণ একটা টিভি সিরিজ দেখছিল ও। যতক্ষণ চলছিল সিরিজটা ততক্ষণ তার একটুও গরম লাগেনি। শেষ হওয়ার পরপরই গুরু হয়েছে বিরক্তি। ‘নর্থ পোলে সামার, উইনটার ইউরোপে আর ক্রিসমাস নিউ ইয়র্কে কাঁটাতে পারলে ভাল হত’, ভাবে ক্লারা।
এখন নিউজ চলছে। স্থানীয় চ্যানেল। শহরের ভিতরের খবরগুলো খুব গুরুত্বের সাথে দেখানো হয়। সামান্য চুরি হলেও সেটা ব্রেকিং নিউজ হয়ে যায়।
“চলতি মাসে মোট ছয়টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। কোন হত্যারই কূলকিনারা করতে পারেনি শহর-প্রশাসন। সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার, নিহত সকলেই ছিল ছাত্রী আর তাদের সবার বয়স চব্বিশ! পুলিশের ধারনা পুরো ব্যাপারটাই পিছনে একজন কিংবা একটা গ্যাং এর হাত আছে”।
ছোট্ট এই শহরে উত্তেজনাকর কিছু ঘটেনা তেমন। মানুষ উইকেন্ডে ‘ফার্স্ট এন্ড ফিউরিয়াস’ টাইপ সিনেমা দেখে নিজেকে চাঙা রাখে। সে জন্যই শহরের সিনেমা হল গুলো খুব জমজমাট। হঠাৎ করে এই হত্যাকাণ্ড শহরকে নাড়িয়ে দেয় খানিকটা। বিচলিত হয় শহরের মানুষ। একটা ঠাণ্ডা অনুভূতি তাদের মেরুদণ্ড বয়ে নেমে যায়। এই উত্তেজনা তারা উপভোগ করে। পরপর ছয়টি হত্যাকাণ্ডে তারা কাঁতর না আনন্দিত- সেটা তাই বোঝা যায় না।
অফ করে দেয় টিভিটা ক্লারা। গত সাত দিন থেকে একই খবর। ‘ধরতে চেষ্টা করে যাচ্ছি’, ‘চেষ্টা চলছে’, ‘আমরা অনেকদূর এগিয়েছি’ এসব কথা টিভি খুললেই শোনা যাচ্ছে। কাজের কাজ কিছু হচ্ছে না।
জানালা গুলো সব খুলে দেয় ক্লারা। বাইরে সামান্য বাতাস। তাতে যদি শরীরটা ঠাণ্ডা হয় একটু! ক্লারা ঠিক করে, এবারে সে একটা এয়ারকুলার কিনবেই।
২
মূল রাস্তা থেকে অনেকটা দূরে বাড়িটা। একটা সাইডওয়ে এসে লেগেছে একেবারে দরজায়। রঙচটা দেয়ালগুলোয় শ্যাওলা জন্মে নীলাভ একটা লেবাস পড়িয়ে দিয়েছে বাড়িটাকে। ল্যাম্পপোস্টের আলো সামান্য আলোকিত করেছে জায়গাটা।
অনেকক্ষণ ধরে দেখছিল লোকটা। কিছুক্ষণ আগে জানালাগুলো খুলে দিয়েছে মেয়েটা। কাজটা তাই কঠিন হবে না। কিন্তু জানালা বেয়ে উঠতে হলে শব্দ হবে। আর সেটাই চায় না সে। বিশেষ করে নিউজ চ্যানেলগুলো এতো ফলাও করে খবরটা প্রকাশের পর তার কাজটা অনেক কঠিন হয়ে গিয়েছে।
একটা খোলা জানালার নিচে এসে দাঁড়ায় সে। পানি পড়ার শব্দ শুনতে পায়। কান খাঁড়া করে থাকে। কোন ভুল করতে চায় না সে। একটা সামান্য ভুলও খেলাটা ভেস্তে দিতে পারে।
“ভুউউউ”
চমকে ওঠে লোকটা। হাতে থাকা পিস্তলটা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই যেন শব্দের দিকে চলে যায়। কুকুর! এটা আবার কোত্থেকে এলো? কোন কুকুরের কথা তো তাকে বলা হয়নি!
দেয়ালের সাথে মিশে যেতে চেষ্টা করে লোকটা। কুকুরটা কয়েকবার ভুকে এদিক সেদিক ঘুরতে ঘুরতে দৃষ্টির আড়ালে চলে যায়।
বড় একটা নিশ্বাস ছাড়ে। যা করার তাড়াতাড়ি করতে হবে। এখনও পানি পড়ার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। তারমানে এটাই সবচেয়ে ভাল সময়।
আর কিছু না ভেবে সে একতলার জানালার ভেন্টিলেটর বেয়ে উঠে যায়।
৩
শীতল পানির স্পর্শ শরীর থেকে সমস্ত ক্লান্তি দূর করে দেয় ক্লারার। বাথটপে অনেকক্ষণ ধরে আছে সে।
ডাচ এসে কখন বাথটপের পাশে দাঁড়িয়েছে বুঝতে পারেনি।
“আর কিছুক্ষণ সোনা!”
“মিউ”
ক্লারা বিড়ালটার গায়ে ঠাণ্ডা পানি ছিটিয়ে দেয়। বিড়ালটা পালিয়ে গেলে ক্লারার ঠোঁটে মুচকি হাসি ছড়িয়ে পড়ে।
হঠাৎ একটা শব্দ শুনে থেমে যায় ক্লারা! নিশ্বাস বন্ধ করে শোনার চেষ্টা করে সে। একটা পদশব্দ। এখন থেমে গেছে। আবার পদশব্দ। আবার নীরবতা।
বিড়ালটার মিউ শোনা যায় আবার। ‘মিউ’। আবার নীরবতা। পদশব্দ।
কেউ তার ঘরে এসেছে এটা বুঝতে পারে ক্লারা!
“জানালাগুলো খোলাই রেখে এসেছি কি?” ভাবে সে। “আমি একটা.........”।
খুব ছোট করে নিঃশব্দে নিশ্বাস ছাড়ে। চোর-টোর হতে পারে। কিন্তু চোর এতো তাড়াতাড়ি আসবে কেন? এখন তো কেবল রাত ন’টা। আর সে জানালাগুলো খোলা রেখে এসেছে। তাহলে তো ওর গোসলের শব্দ বাইরে থেকে শোনা যাওয়ার কথা। আর একজন কলেজ ছাত্রীর ঘরে চোরই বা কী পাবে? টিভি আর ল্যাপটপটা ছাড়া আর মূল্যবান কিছু তো তার নেই।
“টিসসস”। কাচ ভাঙার শব্দ! চমকে ওঠে ক্লারা। আবার পদশব্দ। এবারে অনেক মৃদু। বাইরে বাতাস দিয়েছে খুব। পাতা ওড়ার শব্দও শুনতে পায় ও।
“চোর?”
হঠাৎ সন্ধ্যায় শোনা খবরটার কথা খেয়াল হতেই জমে যায় ক্লারা! পুলিশ এখনও খুঁজে পায়নি খুনিকে। তাহলে কি.........
শক্ত হয়ে আসে ক্লারার শরীর। ঠাণ্ডা পানিটাকেও গরম মনে হয় ওর। ওর হাত কাঁপতে থাকে।
“কুল। কুল ক্লারা কুল” নিজেকে আশ্বস্ত করে ও। চোখ বন্ধ করে শোনার চেষ্টা করে ও। পায়ের আওয়াজটা ভারি হয়ে এসেছে এখন। তারমানে কাছে চলে এসেছে খুব।
ক্লারা একটুও শব্দ না করে উঠে দাঁড়ায় বাথটপ থেকে। ওর নিজেকে রক্ষার জন্য কিছু একটা চাই। কিছু একটা। একটা লাঠি কিংবা ছুরি। কিন্তু বাথরুমে শ্যাম্পু চিরুনি সোপকেস ছাড়া কিছুই দেখতে পায় না ও।
“আচ্ছা, আমি এতো ভয় পাচ্ছি কেন? কোন ফ্রেন্ডও হতে পারে। নিকও তো আসতে পারে”। নিক ক্লারার বয়ফ্রেন্ড। আস্ত একটা শয়তান সে। কখন কাকে কীভাবে ভয় দেখানো যায়- এই চিন্তাটা সারাক্ষণ তার মাথায় খেলা করে। কিন্তু ক্লারার খেয়াল হয়, নিক একসপ্তাহের জন্য শহরের বাইরে। মায়ের সাথে দেখা করতে গিয়েছে। ক্লারা অনবরত কাঁপতে থাকে। গ্রীষ্মের এই উত্তাল গরমেও ঠাণ্ডা লাগে তার। “কুল ক্লারা কুল”।
ক্লারা জানে তাকে কিছু একটা করতে হবে। কী করবে সে জানে না কিন্তু কিছু যে তাকে করতেই হবে, এটা সে জানে। হঠাৎ রডটা নজরে পড়ে তার। বাথটপের নিচে লুকিয়ে আছে সেটা। কোন প্রকার শব্দ না করে রডটা তুলে নেয়। শক্ত হাতে ধরে দুহাত দিয়ে।
পদশব্দটা অনেক কাছে চলে এসেছে এখন।
রডটা হাতে নিতেই একটা অদ্ভুত আত্মবিশ্বাস তার চেহারায় খেলা করে যায়। ও অন্তত ওর কিছু একটা করতে পারবে। বীণা যুদ্ধে নিজেকে সপে দেবে না। তাছাড়া ও এখনও ভেজা। স্লিপারি। “আমাকে ধরতে চাইলেও ওকে স্ট্রাগেল করতে হবে।”, ভাবে ক্লারা।
এবার একটা অবয়ব দেখতে পায় সে। বেডরুম আর বাথরুমের মধ্যে সুক্ষ যে পর্দাটা ঝুলছে তাতে স্পষ্ট একটা ছায়া ফুটে ওঠে। একটা শক্তিশালী দেহ। দুহাতের মাঝে থাকা পিস্তলটা এদিকেই তাক করা।
ক্লারার হাতে আর কয়েক সেকেন্ড সময় আছে। কয়েক সেকেন্ড শুধু। তার মধ্যেই কিছু একটা করতে হবে। না হলে আর আফসোস করারও সময় পাবে না।
এবারে লোকটাকে দেখেতে পায় ও। লোকটার চোখের উপর একটা খাঁজকাটা দাগ। চোখাচোখি হতেই শক্ত হয়ে যায় ক্লারা। হাতে ধরে থাকা রডটা নিয়ে প্রস্তুত থাকে সে। নিশ্বাস বন্ধ করে অপেক্ষা করে প্রকৃত সময়ের।
“আপনাকে এরেস্ট করা হচ্ছে ক্লারা ব্রাউন, ছয়জন তরুণীকে হত্যার অভিযোগে!” স্পষ্ট স্বরে বলে লোকটা।
“ইউ বাস্টার্ড কপ” বলে রডটা দিয়ে তরুণ পুলিশটির মাথায় সজোরে আঘাত করে ক্লারা। রাস্তায় পুলিশের গাড়ির সাইরেন বেজে ওঠে।
------------------------------------------------------------
-------------------------
গল্প ২- মেয়ে দেখা
মেয়ে দেখতে যাওয়া ব্যাপারটা কেমন কেমন লাগে আমার কাছে। ঠিক মেনে নিতে পারি না। কেনাবেচার আগে গরুছাগল যেমন দেখে ক্রেতা, তেমনই মনে হয়। একেবারেই যে যাইনি তা নয়, তবে তখন নেহায়েত ছোট ছিলাম। মেয়ের চেয়ে চা-টায়ের দিকে; বিশেষ করে টা’য়ের দিকে নজর ছিল বেশি। তাছাড়া গিয়েছিলাম ছোট চাচা আর ছোট মামার জন্য মেয়ে দেখতে। ‘ভাবি চাচি’ আর ‘ভাবি মামি’কে বিচার করবো, এমন ছেলে আমি নই।
কিন্তু এবারে যেতেই হবে। খালাতো ভাইয়ের জন্য মেয়ে দেখা হচ্ছে। ছোট খালা মেয়ে দেখে দেখে শুঁকিয়ে গেলেন (এটা অবশ্য তার জন্য শাপে বর হয়েছে) অথচ মেয়ে তার কোনভাবেই পছন্দ হচ্ছে না! এপর্যন্ত এটলিস্ট বিশটা মেয়ে দেখা হয়ে গেছে। কিন্তু প্রতিবার কোন না কোন খুত বের হয়েছেই।
“মেয়েটার সব ঠিক আছে- তবে নাকটা কেমন বোঁচা!”।
“কেমন চটর চটর করে কথা বলে দেখছিস? এইরকম মেয়ে চলবে না”
“সাদা ফ্যাকফ্যাকা মেয়েটা একেবারে। মনে হয় অস্ট্রেলিয়ান বীজ দিয়ে উৎপন্ন হইছে। কৈ মেয়ের মাতো দেখলাম শ্যামলা, বাপতো আফ্রিকান, মেয়ে এমন অজি হইল কীভাবে? ঐখানে হবে না। প্রবলেম আছে।”
উপরের কমেন্টগুলো সব যে খালা করেছেন তা নয়, তবে যেই করুক না কেন তা খালার কানে গিয়ে পৌঁছেছে ঠিকই। আর নেগেটিভ কিছু খালার কানে যাওয়া মানেই মেয়ে ক্যান্সেল। তার বৌ হবে নাম্বার ওয়ান সাকিব খান আই মিন সেই মাল। ধুর খালি বাজে কথা আসে মুখে। আমি বলতে চাচ্ছি যে, খালা চান তার বৌমা হবে এমন যেন কেউ ট্যাঁরা কথা বলতে না পারে। গণ্ডা ধরা ছেলেতো আর তার নেই। একটাই সম্বল।
এদিকে আমার খালাতো ভাই সন্ধির ‘মানছে না মন কোলবালিশে পারছি না গুরু আর’ অবস্থা।
আমি বলি, “বালক, ওয়েট! সবুরে মেওয়া ফলে”।
“ধুর বাল! কতো আর ওয়েট করবো! এদিকে আমার বিছানা সপ্তাহে সপ্তাহে ওয়েট(wet) হয়ে যাচ্ছে। কেমন শুকায় গেছি দেখছিস!” বলে নিজের চেহারার দিকে নিজেই করুণার দৃষ্টিতে তাকায় সন্ধি।
বলি, “কলিকাতা হারবালের একটা শাখা পোস্ট অফিসের পিছনে আছে। একবার গেলেই পারিস”।
“তোর শালা মানসিকতা খারাপ। এদিকে আমি শুঁকিয়ে যাচ্চি!”
আমার কিন্তু তাকে দেখে রামপাঁঠার মতই চর্বিওয়ালা মনে হয়। সারাদিন বাপের দোকানে বসে থাকে। ওর কাজ হল খাওয়া, দোকানে যাওয়া আর ঘুমানো। ইনপুট আছে আউটগোয়িং নেই। বিছানা তো ওয়েট হবেই!
প্রতিবার মেয়ে দেখে আসে আর বলে, “ভাই, সেই রে। আম্মা রাজি হইলে হয়!”
কিন্তু খালার আর পছন্দ হয় না। বেচারার দুর্দিনও আর ঘোঁচে না।
এবারে খালা ঠিক করেছেন, আমাকেও সাথে নিয়ে যাবেন মেয়ে দেখতে। বাধ্য হয়ে বললাম, “উকে”।
মেয়ে আমি প্রচুর দেখি, ‘প্রাণ ভরিয়ে তৃষা হরিয়ে’ দেখি, রাস্তার মোড়ে বিড়ি ফুঁকতে ফুঁকতে দেখি, যানবাহনে কোথাও যেতে যেতে দেখি, রেস্টুরেন্টে খেতে খেতে দেখি, ল্যাপুতে চোখ লাগিয়ে দেখি, আর ঘুমের ঘোরে স্বপ্নে দেখি। কিন্তু আগেই বলেছি এই আনুষ্ঠানিক দেখাদেখি আমার খারাপ লাগে। তাছাড়া আমি নিজের জন্য দেখে অভ্যস্ত, হঠাৎ করে অন্যের জন্য দেখাটা কঠিন ব্যাপার। তার চেয়ে কঠিন হবে, মেয়ে যদি আমার পছন্দ হয় আর ভাই তাকে বিয়ে করে ফেলে- সেটা দেখা। ভাই যখন বৌ নিয়ে আমার চোখের সামনে দিয়ে রঙ্গ করে হেঁটে যাবে, আমার তখন ‘ফেটে’ যাবে!
২
আমাদের বারান্দায় বসতে দেয়া হয়েছে। এসেছি খালা, সন্ধি আর আমি। আসার সময় খালা বলে দিয়েছেন, “যা বলার আমি বলব, তোরা শুধু চুপ করে শুনবি”।
আমি বলেছি, “আচ্ছা”।
সন্ধি বলেছে, “কেন আমি মেয়ের সাথে আলাদা কথা বলব না?”।
খালা তেঁতে গিয়ে বললেন, “আমি যেটা বলছি সেটা করবি, বেশরমের বাচ্চা!”
আমিও বলেছি, “বেশরমের বাচ্চা”!
বারান্দাটা থেকে পাশের বিশাল খোলামাঠটা দেখা যায়। মাঠের শেষে একটা বিশাল বট আর অশথ গাছ জড়াজড়ি করে আছে। এখন বিকেল হয়ে এসেছে। শীতবিকেলের সূর্য বাঁকা হয়ে আমাদের শরীর ধুয়ে দিয়ে যাচ্ছে।
কিছুক্ষণ পর চায়ের ট্রে নিয়ে মেয়ে এলো। এনালগ যুগের স্টাইল। প্রথমে দিল খালাকে। তারপর আমি পেলাম, তারপর সন্ধি।
আমার মনে হচ্ছে কাঁপছে পৃথিবীটা। হাত থেকে হয়তো চায়ের কাপটা পড়ে যাবে এখুনি। টাল সামলে চুমুক দিয়ে আবার তাকালাম মেয়েটার দিকে।
হ্যাঁ। এখন সূর্যের ডুবে যাওয়া উচিৎ। অন্ধকার নামুক একটু। এতো আলোয় এই জোনাকির আলোর মত মেয়েকে মানায় না। আমার ইচ্ছে হল ঢেকে দেই চাঁদরে সূর্যটা। চোখ নিচে নামিয়ে রেখেছে। আমার দিকে তাকালে আমি নিশ্চিত ডুবে যাব অথৈ চোখে।
সন্ধিও অবাক চোখে তাকিয়ে আছে। আমি মনে মনে বললাম, “আল্লাহ, তুমি যদি থাক তাইলে যেন সন্ধির সাথে ওর সন্ধি বিচ্ছেদ হয়”। একবার ভাবলাম বলি, “আর আমার সাথে যেন সমাস গঠন করে”। কিন্তু নিজের কাছে নিজেই লজ্জিত হলাম।
কিন্তু খালার চোখ দেখি কুঁচকে গেছে। মেয়েদের চোখে অন্য মেয়েকে আহামরি কিছু লাগে না নিশ্চয়ই। তা সে মোনালিসা হলেও। না হলে খালা ওভাবে তাকাবেন কেন? তিনি চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন, “চা কে বানিয়েছে? তুমি?”
“হ্যাঁ”
“চিনি হয়নি ঠিকমতো” বললেন খালা।
আমারও মনে হল, সত্যিই তো, চিনি একটু কম লাগছে। আসলে ও এতোই মিষ্টি যে, ওর উপস্থিতি চিনির অভাব মিটিয়ে দিয়েছে। একচুয়ালি শি ইজ হানি!
“আপনার ছেলেকে দেখে ভাবলাম, ওর বোধহয় ডায়াবেটিস আছে। তাই চিনি কম দিয়েছি চায়ে”।
খালার মুখ থমথমে হয়ে গেল আর আমি হা। সন্ধি একটু মোটা বটে, তাই বলে ওকে দেখে কেউ ডায়াবেটিকসের রোগী ভাববে এতোটা মোটা ও নয়। আমি বুঝতে পারছি খালা অতিরিক্ত গ্যাসভর্তি বেলুনের মত হয়ে গেছেন এখন। পটাশ করে ফেটে যেতে পারেন।
“না না। চাটা সুন্দর হয়েছে তো” সন্ধি মাথা নিচু করে মুখে লজ্জার লিপস্টিক মেখে বলে।
আমি বলি, “হ্যাঁ, সুন্দর হয়েছে চা’টা”।
বলেই তাকাই খালার দিকে। তিনি সরু চোখে মেয়ের দিকে তাকিয়ে আছেন। আমারও ইচ্ছে করছে খালার মত চোখ লাগিয়ে দেখতে। কিন্তু কেমন বাঁধো বাঁধো ঠেকছে। অথচ দেখার জন্যই এসেছি।
খালা আরও কিছু আনুসাঙ্গিক প্রশ্ন করলেন। আমি কানের ব্যবহার মোটেও করছিলাম না। তাই শুনতে পারিনি কী বলছিলেন তিনি। স্বামী নয়নানন্দ হয়ে গিয়েছিলাম খানিকের জন্য। দেখিয়া তার মুখ/ ধুকপুক করে বুক...... না না থাক। কবিতা লেখা আমার কর্ম নয়।
ফেরার সময় খালা বললেন, “মেয়েটা কথা বলে বেশি! তাই না? কী বলিস?”
আমি বললাম, “খালি বেশি না। বাঁচালই বলা যায় একপ্রকার”।
খালা বললেন, “চলবে না। সন্ধির সাথে মানাবে না”।
সন্ধি বলল, “কেন? আমার তো খারাপ লাগে নাই!”
বললাম, “কাউয়ার ঠোঁটে শবরী কলা আর বানরের গলায় মুক্তার মালা; দুটোই মানায় না!”
“কাউয়া কে আমি না ও?”
“তুই কাউয়া কেন হবি? তুই কার্তিক। গণেশের মায়ের পেটের ভাই!”
৩
পরদিন বেহুদা ঘুরতে ঘুরতে নিজেকে মেয়েটির বাড়ির সামনে আবিষ্কার করলাম! ওর নাম যেন কী? পরে সন্ধির কাছ থেকে জেনে নিতে হবে।
৩০/১২/২০১৫
হ্যাপি নিউ ইয়ার
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা জানুয়ারি, ২০১৬ দুপুর ১২:৪৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




