মধ্যপ্রাচ্যে যে খুব বাজে একটা খেলা চলছে, তার প্রমাণ হিসেবেই যেন সিরিয়া, ইরাকের পর অবশেষে ভেঙ্গে পড়তে যাচ্ছে আরেকটি সুপ্রাচীন ভূখণ্ডে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র ইয়েমেন। আরব বসন্তের আগে যে দেশটির কথা প্রচারমাধ্যমে তেমন আসতোই না, সেদেশে নাকি কোথা থেকে হুদি নামের এক গোষ্ঠীর উদ্ভব হয়েছে, যারা রাজধানী সানা অধিকার করে নিয়েছে। বিদ্রোহী কতৃক প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে বোমাবর্ষণের প্রেক্ষিতে দেশটির দুর্বল প্রেসিডেন্ট বন্দরনগরী এডেনে পালিয়ে গিয়ে সে শহরকে ইয়েমেন রাষ্ট্রের অস্থায়ী রাজধানী ঘোষণা করেছেন। যদিও কাল খবরে পড়লাম হুদিরা নাকি এডেনের খিড়কীর কাছে হাজির হয়ে গেছে।
এই হুদিরা কারা, আমি জানিনা। প্রচারমাধ্যম বলছে তারা ইরান সমর্থিত শিয়া বিদ্রোহী। তবে আজকাল আমি এদের কথা বিশ্বাস করা বন্ধ করেছি। ইয়েমেনে শিয়ারা কেমন সংখ্যাগরিষ্ঠ তা নিয়েই সন্দেহ করা যায়। ইয়েমেন বরাবরই সুন্নী অধ্যুষিত ভূখণ্ড। একটা সময় যারা বিশ্ববাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করতো, যাদের জন্য দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, আজ তারা নাভিশ্বাস নিচ্ছে।
ঐক্যবদ্ধ ইয়েমেনের বয়স অবশ্য বেশি নয়। ১৯৯০ সাল পর্যন্ত ইয়েমন উত্তর ও দক্ষিণে বিভক্ত ছিলো। দক্ষিণ ইয়েমেনের রাজধানী ছিলো বিখ্যাত বন্দরনগরী এডেন। দক্ষিণ ছিলো সোভিয়েত ইউনিয়নের অক্ষভুক্ত। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যাবার পর ১৯৯০ সালে দুই ইয়েমেন একত্রিত হয়। উত্তর ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট আলী আবদুল্লাহ সালেহ ঐক্যবদ্ধ ইয়েমেনের প্রথম প্রেসিডেন্ট হন। এরপর ১৯৯৪ সালে একটি গৃহযুদ্ধ হলেও সালেহর লৌহদৃঢ় নিয়ন্ত্রণে ছিলো ইয়েমেন।
এরপর আরব বসন্তে আলী আবদুল্লাহ সালেহর পতন ঘটলে অশান্ত হয়ে পড়ে ইয়েমেন। কোত্থেকে উদয় হয় হুদি শিয়া গোষ্ঠীর। আমার মনে পড়ছে লিবিয়ার কথা। ২০১১ সালে প্রথম যখন মুয়াম্মার গাদ্দাফীর বিরুদ্ধে বেনগাজী থেকে সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু হয়, সেদিন বিবিসি বাংলা থেকে মিসরাতা শহরে অবরূদ্ধ এক প্রবাসী বাংলাদেশীকে ফোন করা হয়েছিলো। সেই ব্যক্তি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলছিলেন, যাদের বিদ্রোহী বলা হচ্ছে, তারা আসলে বহিরাগত। তাদের কেউ চেনেনা। গাদ্দাফীই লিবিয়ার জনপ্রিয় শাসক।
সেই প্রবাসী বাংলাদেশীর কথাগুলো আমি আজো ভুলতে পারিনি। আমার এজন্যই সন্দেহ হয় সিরিয়া, ইরাক, তিউনিসিয়া, লিবিয়া বা ইয়েমেনে কোন বিশেষ গোষ্ঠীর নামে যে সশস্ত্র তৎপরতা চলছে, তা আসলে বহিরাগত মার্সেনারি বা ভাড়াটে সৈন্যদের কাজ।
যাহোক, ইয়েমেনের রাষ্ট্রব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ার মধ্য দিয়ে সদা বিক্ষুব্ধ মধ্যপ্রাচ্যের যে চেহারা দাঁড়ালো, তাকে এভাবেও দেখা যেতে পারে- সৌদি আরবের চতুর্দিকে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে! কিছুক্ষণ আগে সৌদি আরব আনুষ্ঠানিকভাবে ইয়েমেনের হুদিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। কয়েকদিন আগ থেকে শুনে আসছিলাম বাদশাহ সালমান ইয়েমেন লাগোয়া জিযান প্রদেশে ব্যাপক সেনা সমাবেশ করেছেন। গত পরশু সৌদি গেজেটে প্রকাশিত কিছু ছবিতে দেখলাম রাতের বেলা চপ্পল পায়ে তরুণ সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান সামরিক হেলিকপ্টারে চড়ে জিযানে মোতায়েন সেনাদল পরিদর্শন করছেন। প্রিন্স মোহাম্মদ জিযানে একটি নতুন নৌঘাঁটি প্রতিষ্ঠার ঘোষণাও দিয়েছেন।
সেই ছবিগুলো দেখেই সন্দেহ হয়েছিলো, বড় কোন সমরাভিযান না হলেও সৌদি আরব ইয়েমেনে অন্তত ছোট মাত্রায় আক্রমণ করতে যাচ্ছে। উপসাগরীয় যুদ্ধের পর সৌদি আরবের দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক যুদ্ধ এটি...!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।






