ভোর ছয়টা,দিনের প্রথম আলো আছড়ে পড়ছে পিচঢালা প্যারেড গ্রাউন্ডে।মাঠের চারপাশেই দৌড়ানোর জন্য লম্বা রাস্তা।সেখানে জনা পঞ্চাশেক বার তের বছরের বালক চারটি ভাগে ভাগ হয়ে, নিজের হাটু বুকে লাগানোর চেষ্টায় রত।কেউ পা উঠিয়ে,কেউ কুজো হয়ে,নতুবা কেউ স্বয়ং বুক টাকেই হাটুর কাছে আনার চেষ্টা করছে।
তাদের সবাই কিন্তু অভাগা,মাত্র এক সপ্তাহ হোলো।চোখের জল নাকের জল এক করে,সবাই তারা বিদায় দিয়েছে,তাদের বাবা মা দের।কি নিদারুণ কষ্ট!!!এখনো ঘুমের মাঝেই কেউ কেউ আম্মু বলে চেঁচিয়ে উঠে।অস্বাভাবিকতা নেই কোন তাতে।।।
যার গল্প বলছি,সেও এই দলের।দু সপ্তাহ হলো,ছোট ভাইটা হয়েছে।তাই মা আর আসতে পারেনি।বাবা,দাদী আর চাচা মিলে রেখে গিয়েছিল তাকে।প্রথম প্রথম ভালোই লাগছিলো ছেলেটার।বাবা স্কুল শিক্ষক হওয়ার সুবাদে ভালোই অত্যাচার করত,সারাক্ষন পড়ালিখা,কত্ত আর করা যায়।ছেলেটা ভাবলো,এই বুঝি বাচলাম।আর যন্ত্রনা পেতে হবে না।খুশি ও সে,যারপরনাই।
যেই সবার যাওয়ার সময় হল,কি যেনো একটা নেই মনে হল ছেলেটার।কেমন যেন একটা ব্যাথা,কষ্ট,চোখ বেয়ে গড়াল অশ্রু। ছয় বছর,এত বিশাল সময়,কেমনে কি!!!!আজিব!!!
কিছুক্ষন পর ক্লান্ত হয়ে পড়ল ছেলেটা,আর কত কাদা যায়।বাবা নিষ্ঠুর এর মত যখন রেখে যেতে পেরেছে,ছেলেকেও তো নিষ্ঠুর হতে হবে।যেই না ছেলেটা একটু নিষ্ঠুর হওয়ার চেষ্টা করছে,তার চেষ্টার মাঝে এসে পানি ঢেলে দিল,এক ক্লাস সিনিয়র একজন।ও,গল্পে অই লোকটার ও ভূমিকা আছে।ধরি,তার নাম সাফায়েত।একটা চেহারাও দাড় করিয়ে দেই,একটু কালো,মাথায় চুল কম।চুল কম মানে আস্তে আস্তে পড়ছে আর কি।আর মন,পরেই বলি।এই মানুষটার সাথেই কলেজে ছেলেটার প্রথম পরিচয়।অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন তিনি।ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখালেন সব,কি মধুর কথাবার্তা। কলেজের কিছুই খারাপ না,এতো পুরো বেহেশতের আঙিনা। কে জানত,সেদিন সন্ধ্যা থেকেই ছেলেটা এই মানুষটাকে হাজারটা গালি দিবে।
তো,বাবা আর চাচার প্রস্থানের পরই এই মানুষটার আগমন।ছেলেটা ভাবল,হয়ত মধুর কিছু কথা বলবে,এসেই প্রথম উক্তি,"ক্যাডেট কলেজে আসছ,খুব মজা,তাই না".ছেলেটা চিন্তা করছিল,এতে মজার কি আছে,কিন্তু চিন্তার ব্যাঘাত ঘটালো,প্রায় আধমনি একটা থাপ্পর।ছেলেটার চিন্তার মোড় ঘুরিয়ে দিলো থাপ্পরটা,এখন সে ভাবছে,"এটাই যদি হয় মজার নমুনা,তাহলে তো,জায়গাটা মজারই।"পরবর্তী উক্তি."এখন থেকে কোথাও হাসবা না"।বাহ,কি মজা,মজাই তো।।।।।।।(চলতে ইচ্ছুক
থাপ্পর টা খেয়ে ছেলেটা বুঝলো,কপালে খারাপি আছে।কি আর করা,এইভাবেই চলতে হবে।বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হল।সাফায়েত ভাইও চলে গেল।কিন্তু কি করবে ছেলেটা এখন???আশেপাশে সব অপরিচিত মুখ।পরে বুঝলো,এই বিল্ডিং টাকে নাকি হাউজ বলে।জীবনের অবিচ্ছেদ্য এক অংশ।তো,ছেলেটা দেখলো,এই হাউজেই তার মত অভাগা আছে আরও ১০ পিস।সব মিলায়া ১১।বাহহ,ভালো তো।কিন্তু মনটা ভেঙ্গে গেলো তখন,যখন দেখলো,এদের মাঝে,কিছু কিছু আবার একই কোচিং থেকে আসছে।সো,তারা পুর্বপরিচিত।আর ছেলেটা,পুরো একা।
সুতরাং সে ছোট্ট টেবিল টাতে মাথা রেখে কান্না করাটাই শ্রেয় মনে করল।এতে অবশ্য কাজের চেয়ে অকাজ টাই বেশী হল।আশেপাশের লোকজনের কাছ সেইটা হোমসিক হোমসিক টাইপ ভাবে পরিনিত হল।
অতঃপর...........................................................................................................................
এভাবেই কেটে গেলো দিন।নিয়মতান্ত্রিক,সময় ইত্যাদি ইত্যাদি।আসার পনের দিনের মাথায় ছেলেটার ছুটি।তার সাথে সবার।ছুটিতে নাকি দারোগাদের মত খাকী পোশাকে যেতে হবে,ওয়াও।কি মজা।আগের রাতে সবাই ব্যাস্ত তাদের খাকী তৈরীতে।তারা যে পোশাক পরবে,তার সাথে গাড় নীল রঙের একটা টুপিও ছিল।অইটার সামনে আবার সোনালী রঙের একটা লোহাও থাকত।তো,পোশাক রেডী করার সময় দেখা গেল,অই লোহাটা ছেলেটার নাই।ছেলেটা চিন্তিত চোখে রুম প্রিপেক্টকে জানাল ব্যাপারটা।উনার উক্তি,”কি? ক্যাপব্যাজ নাই!!!অইটা ছাড়া তো ছুটিতে যেতে দেওয়া হয় না।” । ছেলেটার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ল।এত্তদিন পর একটা ছুটি পেলো,তাও বোধহয় আর যাওয়া হল না।ছল ছল চোখে বিছানায় গিয়ে কাদতে আরম্ভ করল।শুধুই ভাবলো,বিধাতা এতো নিষ্ঠুর কেনো???? (চলতে ইচ্ছুক)
অত:পর,নিজের ধারনাকে নিজেই ভূল প্রমাণিত করে ছেলেটি ছুটিতে গেল।১৭ টি দিন সে মায়ের আচল থেকে দূরে।বাবার কড়া শাসন থেকে দূরে।বাড়িতে যেয়ে খুঁজে পেল তার চিরাচরিত আড্ডা,সেই মাঠ,চায়ের দোকান।কলেজ এর চিপা গলিটা আগের মতই আছে।তবুও কোথায় যেন কি একটা বদলেছে।
কিছুই বুঝলো না সে।
ভালো সময়গুলোই তাড়াতাড়ি শেষ হয়।ছেলেটির ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয় নি।একদিন দুদিন করে ছুটিও শেষ হয়ে গেলো।ফেরার পালা।যেখানে পড়ে সেখানে নাকি দারোগার মত খাকি পড়ে যেতে হয়।আসার সময় নাহয় লুকানো গেলো,কিন্তু এখন???ক্যামনে কি!!!যাই হোক,শত লজ্জা ভূলে ছেলেটি স্টেশনে গেল,পুলিশ টাইপ লুক নিয়ে।যেদিকে তাকাচ্ছে,ভূরুটা একটু কুঁচকিয়ে তাকাচ্ছে।সন্দেহ টাইপ ভাব।স্টেশনে দাঁড়িয়ে চারপাশ যখন পর্যবেক্ষণ করছে,ততক্ষনে লোকজনের কাছে সে একটা সার্কাসে পরিনত হয়েছে।সবাই তাকিয়ে আছে,আর ছেলেটা আন্দাজ করার চেষ্টা করছে,কি চলছে তাদের মনে।"ওররেব্বাপ!!এই বয়সেই পুলিশে চাকরি! "অথবা "কারে না কারে যে পুলিশ সাহেব ধরে??"ইত্যাদি ইত্যাদি। ততক্ষনে একজন অই পুলিশ সাহেবের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। অনেক দ্বিধাদ্বন্দ্বের পর,ভদ্রলোকের প্রথম জিজ্ঞাসা,"দারোয়ান ভাই,চিটাগাং এর ট্রেন টা আইবো কবে???"
ছেলেটা প্রশ্নটা বুঝতেই অনেক সময় নিয়ে নিল।কিন্তু যখন বুঝলো,ততক্ষনে সে "মাননীয় স্পীকার" হয়ে গেল।ততক্ষনে তার আগে চিন্তাগুলো নতুন রূপ নিয়েছে।তাহলে তারা ভাবছিলো,"ইশ,বেচারা এই বয়সেই দারোয়ানের চাকরি নিয়া নিছে"অথবা," হালায় গেটে না খারাইয়া এইখানে কি করে!!"
কি আর করা,মনের দু:খ মনে রেখেই সে তার গন্তব্যে রওয়ানা দিল। (চলতে ইচ্ছুক)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


