এক
চৌধুরী সাহেবের একমাত্র মেয়ে আনিকা। মেয়েটা দেখতে যেমন ভাল, তেমনি লেখাপড়ায়ও ভাল ছিল। স্কুলে কোন দিন সে সেকেন্ড হয়নি। মেধা এবং রূপ দুটা জিনিস একসাথে পাওয়া খুবই কঠিন। ক্লাসে রূপ বলতে যাদের কিছু আছে তাদের আমি কোন দিন ফার্স্ট হতে দেখিনি। আবার যারা ফার্স্ট হয় তাদের রূপ বর্ণনায় আমি “ দেখতে এতটাও খারাপ না “ ছাড়া আর কিছু বলতে পারি না। আনিকা ছিল ব্যতিক্রম। রূপ আর মেধা দুটোই তার ছিল।
এ মেধাবী মেয়েটার প্রশংসা লোকে প্রায়ই করতো। চৌধুরী সাহেবের কাছেও করতো। বলতো, আপনার মেয়েটা তো লেখাপড়ায় খুবই ভাল।
কেউ আবার নালিশ নিয়ে আসতো।বলতো, মেয়েটাকে একটু কম পড়তে বলবেন। আমাদের ছেলে মেয়ে কি ফার্স্ট হবে না।
এলাকাবাসী, স্কুলের স্যার ম্যাডামের কাছে আনিকার এরকম সুনাম ছিল।
আনিকা এবার এস. এস. সি দিল। রেজাল্ট এখনও দেয়নি। তবে দিয়ে দিবে। রেজাল্ট নিয়ে কারো কোন চিন্তা হচ্ছে না। কারণ সবাই জানে সে ভালোই করবে। তার উপর এতটা ভরসা তাদের ছিল। তবে চিন্তা শুরু হল রেজাল্টের পরের কথা ভেবে। মেয়েটা একটা ভাল রেজাল্ট করলে তাকে একটা ভাল কলেজে ভর্তি করতে হবে। এলাকায় যদিও কলেজ একটা আছে, যদিও এর যথেষ্ট সুনাম মানুষ করে, যদিও আশপাশের কলেজগুলোর সাথে এর তুলনা করে একেই মানুষ ভাল কলেজ বলে, তবুও বাবার মতে মেয়েকে এ কলেজে পাঠাবেন না। পাড়া প্রতিবেশী বললেন, এত ভাল মেয়েকে এ কলেজে কেন পাঠাবেন?
তখন এ সনামধন্য কলেজের নামেও বদনাম বেরিয়ে গেল। তাদের মতে কলেজ ভাল না, ক্লাস হয়না। ভাল প্রফেসর, লেকচারার নেই। রাজনীতিও নাকি সমানে চলে।
এখন মেয়েকে কোথায় পাঠান? চৌধুরী সাহেব পড়লেন চিন্তায়।
এক ভদ্রলোক বললেন, এত ভাল ছাত্রী, তাহলে সিলেটেই ভর্তি করেন না কেন?
বাবা এ নিয়ে অনেক ভাবলেন। সিলেটে মেয়েকে পড়তে পাঠানো সহজ কথা না। বড় শহরে ঝামেলা বেশি। এত ঝামেলার মাঝে মেয়েটা কিভাবে চলবে, কোথায় থাকবে, কী খাবে? সিলেটে চৌধুরী সাহেবের আত্মীয় অনেক ছিলেন। কিন্তু আত্মীয়ের বাড়িতে থেকে তো আর পড়া হয়না। নানান ঝামেলা আছে।
তাছাড়া খরচটাও অনেক বেড়ে যাবে। এখন পাড়া দিলেই খরচ। তাই সব দিক চিন্তা করে বাবার শুধু চিন্তাই বাড়লো, ঘুম কমলো।
এদিকে আনিকার রেজাল্টও দিয়ে দিল। সে ভাল রেজাল্ট করেছে। এখন পাড়া প্রতিবেশীরা বলাবলি করছে যে আনিকা এবার নিশ্চয়ই সিলেটে ভর্তি হবে।
আনিকার এতে কিছু যায় আসে না। কারণ সে এখানেই থাক আর ভাল পড়ার জন্য সিলেটেই যাক পড়া সে সমানে চালিয়ে যেত। তার মনোবল ছিল এমনই প্রবল।
এবার তার মা তার বাবাকে বললেন, দেখ, মেয়েটাকে এবার সিলেট পাঠিয়ে দাও।
বাবা একটু বিরক্ত হয়ে বললেন, পাঠিয়ে দাও বললেই কি পাঠানো যায়?
মা প্রতিবাদ করে বললেন, এত ভাল রেজাল্ট করেছে এখানে পড়ে থাকার জন্য? ভাল ভাল ছেলে মেয়েরা সব সিলেটেই যাচ্ছে। মেয়েটার সব বান্ধবী যাচ্ছে। আর সে যাবে না?
তার কণ্ঠটা ভাঙ্গা ভাঙ্গা হয়ে গেল। তিনি আরও বললেন, চেয়েছিলাম মেয়েটাকে ডাক্তার বানাবো। এখানে পড়ে থেকে সে কী করবে?
আরও কতজন এসেও চৌধুরী সাহেবকে ধরলেন। বললেন, সিলেটের পড়া আর এখানের পড়া অনেক তফাত। মেয়েটাকে পাঠিয়ে দিন। ভালই হবে।
অবশেষে বাবা রাজি হলেন। সিলেট গিয়ে আনিকাকে ভর্তি করলেন মহিলা কলেজে। তার থাকার জন্য ঠিক করলেন একটা প্রাইভেট হোস্টেল। থাকা খাওয়ার ভাল ব্যবস্থা আছে। বুয়া আছে, রান্না ভাল হয়। রুমের অবস্থাও ভাল। বাবা সন্তুষ্ট হয়ে মেয়েকে বিদায় দিলেন। আর মা মেয়েকে জড়িয়ে ধরে কাঁদলেন। মেয়েও কান্না আটকে রাখতে পারলো না।
প্রায় এক মাস হল আনিকা সিলেটে এসেছে। এ বড় শহরে সে মোটামুটি খাপ খাইয়ে নিয়েছে। শহরের ঝামেলা যদিও তাকে ক্লান্ত করে দেয় তবুও সে ভালই আছে। পড়ালেখায় মন দিয়েছে।
একদিন মাকে ফোন দিয়ে বলল, মা আমার তো একটা মোবাইল ফোন লাগবে। পাঁচ ছয় হাজার টাকার মাধ্যে হয়ে যাবে।
মোবাইল তার ছিল। তবে সেটায় কল আসা যাওয়া ছাড়া বেশি কিছু করা যায় না। তার হোস্টেলে wifi কানেকশন আছে। মাস শেষে এর আলাদা বিল দিতে হয়। ব্যবহার করুক আর নাই করুক। কিন্তু স্মার্টফোন না থাকায় ইন্টারনেট চালাতে পারে না। তাছাড়া আজকাল স্মার্টফোন ছাড়া কি চলে!
মা চৌধুরী সাহেবকে গিয়ে বললেন বিষয়টা। চৌধুরী সাহেব বললেন, এখনই এত দামি মোবাইল দিয়ে কী করবে? কত জায়গায় পড়তে যায়। সাথে দামি মোবাইল থাকলে সমস্যা। কোথায় কোন্ জায়গায় পড়ে যাবে, কোথায় চুরি হবে তার কি ঠিক আছে?
মার মন খারাপ করে বললেন, মেয়েটা কোন কিছুর আবদার করে না, কোন দিন মুখ ফুটে কিছু চায়নি। আজ যখন একটা জিনিস চাইল, তুমি না করছো?
বাবা বুঝলেন মায়ের মন খারাপ হয়ে গেছে। তাকে শান্তনা দিতে বললেন, ঠিক আছে। আরও কিছুদিন যাক না! কিনে দিব।
মাকে যে শান্তনা দিচ্ছেন সেটা মা ভাল করেই বুঝে গেছেন। সন্তানের আবদার পূরণ করতে না পারা আসলেই কষ্টের। মা মনকে বুঝাতে পারলেন না। মেয়ের মনও বুঝতে চাইলো না। কিন্তু সে যেন জোর করেই বুঝালো। মাকে মোবাইল কিনার জন্য কোন রকম চাপ দিতে গেলনা, যদিও সেটা সে করতে পারতো। বলল না যে, আজকাল স্মার্টফোন না হলে চলে না, যদিও বলাটা অযৌক্তিক কিছু না। মোবাইল দেননি বলে রাগও করলো না, যদিও সে অধিকারটুকু তার ছিল।
মা যখন মেয়েকে বললেন, ”কিছুদিন পরে দিচ্ছি।“ মেয়ে শুধু “আচ্ছা ঠিক আছে“ বলেই ফোনটা কেটে দিল।
কিছুদিন পর মা গেলেন মেয়েকে দেখতে। গিয়ে মেয়ের চেহারা ছবি দেখে মা কান্না আটকে রাখতে পারলেন না। খুব কাঁদলেন। মেয়েটা শহরের চাপে একেবারে শুকিয়ে গেছে। হাড়গুলা স্পষ্ট বোঝা যায়। যেন কিচ্ছু বাকি নেই। আনিকা কোন সময় মোটা ছিল না। যতটুকুই ছিল এখন তার অর্ধেক হয়ে গেছে। আনিকা কোন রকমে কান্না আটকে রাখলো। মাকে শান্তনা দিতে বলল, কেঁদনা মা। আমি তো ভালই আছি।
মা কান্নায় বিরতি দিয়ে বললেন, তুই আমাকে ছাড়া ভাল আছিস, না?
কথাটা শুনে সে আর কান্না আটকে রাখতে পারলো না। মা মেয়ে দুজনেই খুব কাঁদলেন।
হোস্টেলে থাকা খাওয়ার কোন সমস্যা নেই। রুমগুলো ঠিক কেমন তা বলতে পারব না। কারণ গার্লস হোস্টেল আমাকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। তবে শুনেছি ভালই। বুয়া আছে। তার রান্নাও ভাল। তবে একে তো আর মায়ের রান্নার সাথে তুলনা করা যেতে পারেনা। বুয়া রাঁধে পয়সার বিনিময়ে। আর মা রাঁধেন তার সন্তানের জন্য। দুটার মাঝে পার্থক্যটা অবশ্যই বিশাল হবে। তরকারিতে লবণ একটু বেশি হল না কম হল সেটা নিয়ে বুয়ার কোন মাথা ব্যথা থাকে না। কারণ সে তরকারি বুয়ার পেটে যাচ্ছে না। সেটা কে খেল না খেল, বুয়া সেটাও খেয়াল করে না।
খাওয়ার প্রতি আনিকার কোন দিন তেমন ঝোক ছিল না। রুচি কম ছিল। ওতটা খেতে পারত না। মায়ের কাছে থাকতে মাই বকা ঝকা দিয়ে দুটা খাওয়াতেন। এখন এ মমতাটা কে দিবে। টাকা সেখানে ভালোই খরচ হচ্ছে। কিন্তু টাকার বিনিময়ে মায়ের স্নেহটা তো মিলছে না।
মা একদিন মেয়ের কাছে থাকলেন। আনিকার রুমমেট কিছুদিনের জন্য বাড়িতে গেছে। পাশের বেডটা খালি পড়ে আছে। সুতরাং মায়ের থাকতে কোন অসুবিধা নেই।
পরদিন মা আনিকাকে নিয়ে গেলেন এক মোবাইলের সোরুমে। সেখানে গিয়ে মেয়েকে বার হাজার টাকা দামের একটা মোবাইল কিনে দিলেন।
মোবাইল পেয়ে আনিকার খুশির সীমা ছিল না। পরে হঠাৎ তার মনটা খারাপ হয়ে গেল। মাকে বলল, বাবা জানে?
মা প্রশ্নটার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। তবুও বললেন, হ্যাঁ জানে তো।
কিন্ত মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে সে কথাটা বিশ্বাস করতে পারলো না। বলল, এত টাকা খরচ করার দরকারটা কি ছিল? তুমি টাকা কোথায় পেলে, মা?
মায়ের কাছে কোন জবাব ছিল না। তাই প্রশ্নটাকে অভারটেক করতে বললেন, এসব কথা রাখ তো। মোবাইল পছন্দ হয়েছে কি না বল।
প্রথমে মার উপর রাগ হল। বাবা মোবাইল কেনার জন্য টাকা দেননি সেটা সে বুঝলো। সম্ভবত এটা মায়ের জমানো টাকা। তাকে মোবাইল কিনতে দিয়ে দিলেন। এটা করার দরকার কী ছিল?কিছুদিন পরেই কেনা যেত।
পরে ভাবলো মায়ের মন তো। বুঝা মুশকিল।
আনিকা মাকে জড়িয়ে ধরে বলল খুব পছন্দ হয়েছে।
মা মেয়েকে মোবাইল কিনে দিয়ে বাড়ি ফিরলেন। আনিকা মাকে থাকার কথা বলল। থাকার ব্যবস্থা আছে। মা মেয়েকে নিরাশ করে চলে গেলেন।
মা চলে যাবার দুঃখ যদিও একটু ছিল। কিন্তু সেটা নতুন মোবাইল কিনার আনন্দকে মাটি করার পক্ষে যথেষ্ট ছিল না। আনিকা সারা দিন তার মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত থাকল। মোবাইলের ফাংশনগুলো ভাল ভাবে দেখে নিল। ক্যামেরা ভাল ছিল বলে অনেক ছবি তুলল। wifi কানেকশন ছিল বলে ইচ্ছামত ইন্টারনেট চালালো।
অবশেষে ভাবলো, না, এবার মোবাইল রেখে একটু পড়া উচিত। মা আসার পর থেকে তেমন পড়া হয়নি। আনিকা পড়তে বসলো ঠিকই। কিন্তু তার মন সে মোবাইলে পড়ে আছে। নতুন মোবাইল, লোভ সামলে রাখা বেস কষ্টকর ব্যপার। আনিকা কিছু পড়ে, একবার গিয়ে মোবাইলের লক খুলে একটু টিপাটিপি করে। আবার মোবাইল রেখে পড়তে বসে। এভাবে সে দিনটা গেল।
নতুন মোবাইল, আনিকা খুব আগ্রহ নিয়ে তার বান্ধবীদের দেখাল। তাদের সাথে ছবি তুলল। whats app এ একাউন্ট খুলে বান্ধবীদের সাথে ইচ্ছামত চেট করলো। আরও কত কি করলো।
মাস খানেক এভাবেই চলে গেল। নতুন মোবাইল এখনও নতুনই রয়ে গেছে। আনিকা সেটা নিয়ে কত কি করে। বাইরে গেলেও মোবাইল সঙ্গে করে নিয়ে যায়। স্যারের বাসায় গেলে সঙ্গে রাখে। কলেজে মোবাইল নেওয়া নিষিদ্ধ না। তবে ব্যবহার না করার জন্য বলা হয়েছে। সে মোবাইল নেয় ঠিকই। কিন্তু ব্যবহার করেনা। বন্ধ করে ব্যাগে রেখে দেয়।
একদিন আনিকা এক স্যারের বাসায় পড়তে গিয়েছিল। স্যারের বাসা হোস্টেল থেকে একটু দূরে ছিল। তাই রিকশা দিয়েই আসা যাওয়া করতো। তার হোস্টেলের আরেকটা মেয়েও সে স্যারের কাছে পড়তো। তার নাম ফামি। তাই দুজনে একসাথেই আসা যাওয়া করতো।
সেদিন স্যারের বাসা থেকে বেরিয়ে তারা আর রিকশা পেল না। এ রোডে CNG ও চলতো। কিন্তু তারা CNG তে বেশি ওঠতো না। কারণ প্রায়ই পিছনের তিন সিটের দুটিতে তারা বসলেও বাকি এক সিটে এসে কোন ভদ্রলোক বসে যেতেন। সেটা আনিকার ভাল লাগতো না।
আজ রিকশা পাচ্ছে না দেখে ফামি বলল, চল আজ CNG দিয়ে চলে যাই।
আনিকা বলল, একটু দাড়া না! দেখি রিকশা পাই কি না।
ফামির দাড়িয়ে দাড়িয়ে পায়ে ব্যথা হয়ে গেছে। আর দাড়াতে মন করছে না। ব্যস্ত হয়ে বলল, তুই দাড়িয়ে থাকলে থাক। আমি পারব না। আমি CNG ডাকছি।
বলে সে আর অপেক্ষা করলো না। তখনই একটা CNG ডেকে নিল। আনিকা কি আর করবে, বান্ধবীর সাথে যেতে হল। অবশ্য পিছনে তারা দুজন ছাড়া আর কেউ ছিল না। কোন ভদ্রলোক সেখানে বসেননি।
তারা হোস্টেলে ফিরল। ফামির উপর যদিও রাগ হল। কি আর করবে। CNG না পেলে সম্ভবত আরও দাড়িয়ে থাকতে হত।
হোস্টেলে ঢুকতে ঢুকতে যখন আনিকা ব্যাগে হাত দিল মোবাইল বের করার জন্য তখন হঠাৎ তার বুক ধক করে উঠলো। একি, মোবাইল হাতে আসছে না কেন! বইয়ের ফাকে কোথায় যে ঢুকেছে। আনিকা এদিক ওদিক খোঁজলো। কিন্তু মোবাইল আর হাতে আসছে না। আনিকার মনে ভয় ঢুকে গেল।
ফামি জিজ্ঞেস করলো, কিরে, কি খুঁজছিস?
আনিকা বলল, মোবাইল পাচ্ছি না।
ফামি এসে আনিকার ব্যাগটা খুলে ভাল করে দেখতে লাগলো। সামনের চেন, পেছনের চেন বই খাতাগুলোর চিপা কোন কিছু বাদ দিল না। তাহলে মোবাইল গেল কোথায়?
আনিকার চোখে মুখে আতংক। ফামি ব্যাগ ভাল করে খোঁজে বলল, তুই ব্যাগে রেখেছিলি তো?
আনিকা যেন আকাশ থেকে পড়লো। ব্যাগে নেই মানে মোবাইল হারিয়েছে। আনিকা ব্যাগে ঠিকই রেখেছে। স্যারের বাসা থেকে বের হয়ে মোবাইলে সময় দেখেছে। আবার ব্যাগে রেখে দিয়েছে।
সুতরাং মোবাইল হারিয়েছে। আনিকা ব্যস্ত হয়ে ছুটে গেল সে CNG র পেছনে। কিন্তু লাভ হল না। সে CNG অনেক আগেই চলে গেছে। রাগে আনিকা ফুলে ওঠেছে।
ফামি শান্তনা দিতে বলল, রুমে চল, ভাল করে খোঁজে দেখি। হয়তো রুমেই আছে।
আনিকা রাগ করে বলল, না, রুমে থাকার কথা না।
তবুও তারা রুমে গেল। খুঁজে দেখলো। এরপর ব্যর্থ হয়ে আনিকা বলল, বলেছিলাম না, রুমে নেই। মোবাইল CNG তেই পড়েছে।
ফামি বলল, তোর কাছে মোবাইলের রিসিট, বক্স এসব আছে? থাকলে চল, মোবাইলের সোরুমে গেলে হয়তো তারা ট্রেক করতে পারবে।
আনিকা মেয়েটা খুব গুছানো ছিল। তাই মোবাইলের বক্স, রিসিট সব সে সুন্দর করে রেখেছে। সেগুলো নিয়ে দুই বান্ধবী রওনা হল।
কিন্তু কোন লাভ হলনা। সোরুমে তারা ট্রেক করতে পারে না। তারা বলল, এটা আমাদের কাজ না। আমরা শুধু মোবাইল বিক্রি করি। এক বিজ্ঞ দোকানদার বলল, মোবাইল হারিয়েছে থানায় যাও। মোবাইল ট্রেক করা তাদের কাছে কোন ব্যপার না।
আনিকা লোকটার কথায় একটু যেন ভরসা পেল। সে পুলিশ স্টেশনের দিকে রওনা হল। কিন্তু ফামি তার পিছু পিছু যেতে চাইল না। বলল, তুই এখন পুলিশের কাছে যাবি? তোর কি মাথা খারাপ হয়েছে? চল, হোস্টেলে যাই। কাল স্যারের বাসায় গিয়েও খোঁজে দেখব।
আনিকা কথাটা শুনে সন্তুষ্ট হতে পারলো না। বলল, কি বলিস, পুলিশের কাছে যাবনা কেন? সমস্যা কী?
ফামি বিরক্ত হয়ে বলল, গিয়ে কী হবে? একটা জিডি লিখে দিয়ে আসবি, শেষ। তোর মোবাইল পেয়ে যাবি?
আনিকার মন খারাপ হয়ে গেল। তবে সে পুলিশের কাছে যাবেই। ফামিকে বলল, তুই আসতে চাইলে আয়। আমি গেলাম।
ফামি সম্ভবত তার সাথে যেত। কিন্তু কথাটা শুনে সে আর যেতে চাইল না। সে হোস্টেলে ফিরলো। আনিকা গেল পুলিশ স্টেশনে।
আমাদের আবার পুলিশের উপরে ভরসা নেই। একে চোরের উপর ভরসা করতে আমরা রাজি আছি। কিন্তু পুলিশের উপর, কোন দিনও না। চুরি হলে নিয়ম হচ্ছে পুলিশকে ডাকা। কারণ চোর ধরা পুলিশের কাজ। আর এখন কারো ঘরে চুরি হলে যদি সে পুলিশকে খবর দেয় তবে মানুষ তাকে দেখে হাসে। বলে পুলিশ এনে কি করবেন? অযথা ঝামেলা বাড়িয়ে লাভ কি?
তাই ফামির আনিকার সাথে না যাওয়াটা দোষের কিছু বলা যায় না।
ফামি আনিকার সাথে গেলনা ঠিকই। তবে সে বেকার বসে থাকলো না। আনিকার উপর তার রাগও একটু ছিল। তাই সে আনিকার মাকে ফোন দিয়ে সব ঘটনা খুলে বলল। আনিকা যে সাহস দেখিয়ে পুলিশ স্টেশনে গেছে সেটাও বলল। বলল, আমি কত বললাম, আন্টি আমার কথা শুনলো না। এখন গেছে পুলিশ স্টেশনে।
মা সব ঘটনা শুনে আর মেয়ের সাহস দেখে লাফিয়ে উঠলেন। চৌধুরী সাহেবকে গিয়ে সব খুলে বললেন। বললেন, তুমি এখনই যাও। মেয়েটাকে নিয়ে আস।
চৌধুরী সাহেব সব শুনে শান্ত থাকলেন। বললেন, মেয়েটাকে সিলেট পাঠানোই ঠিক হয়নি।
চৌধুরী সাহেব সিলেটের এক ভাগ্নাকে ফোন করে সব বললেন। ভাগ্নের নাম আশরাফ। বেশ চালু মানুষ। থানার ওসির সাথে ভাল কানেকশন আছে। তিনি তাড়াতাড়ি করে থানায় গেলেন।
গিয়ে দেখেন সে কলেজ পড়ুয়া মেয়ে আনিকা থানায় চিল্লাচিল্লি করছে। ওসি কন্সটেবল কেউ বাদ যায়নি। সবাইকে কথা শুনাচ্ছে। বাবারে! এমন মেয়ে আশরাফ সাহেব আর কোথাও দেখেননি। মেয়েরা থানায় যেতেই ভয় পায়। আর সে থানায় এসে পুলিশকেই কথা শুনাচ্ছে।
ঘটনা এই যে, আনিকা থানায় এসে তার মোবাইল হারানোর ঘটনাটা খুলে বলল। কিন্তু কেউ তাকে কোন পাত্তা দিল না। সবাই এমন ভাব করলো যে সে যেন এখানে ছিলই না। পরে আনিকা গিয়ে ধরলো এক অফিসারকে। সে বড় অফিসার বলে তার সব কথা শুনলো। কিন্তু এদেশের পুলিশ তো। তাদের পেছনে খরচ না করলে কাজ হবে না। এবং তিনি ভদ্রতাবশত সে কথা মুখে না বলতে পারলেও ইশারায় তা বুঝিয়ে দিলেন। আনিকার সে বুঝটুকু ছিল। বুঝতে পেরেই সে যেন তেলে বেগুনে জ্বলে উঠল। পুলিশের এমন কারবার সে কেবল সিনেমা আর নাটকেই দেখেছে। বাস্তবে দেখেনি। তাই প্রথমটা বিশ্বাস করতে পারেনি। সে তাদের অনেক কিছুই বলল। বলল, আমি মনে করতাম পুলিশ জনগণের বন্ধু। আমাদের সেবায় তারা নিয়োজিত। এটাই কি তাহলে সেবা।
আশরাফ সাহেব ত
তাড়াতাড়ি করে তাকে থামালেন। আনিকা আশরাফ সাহেবকে দেখে একটু যেন ভরসা পেল।
পুলিশের সাথে তার ভালোই যোগাযোগ ছিল। তাদের সাথে কথাবার্তা বলাও তিনি জানতেন। তিনি অফিসারকে বুঝালেন। বললেন, মেয়েটা মোবাইল হারিয়ে ফেলেছে। ছাত্রী মানুষ। একটা জিডি লেখে দিলে খুব উপকার হত।
আনিকা রাগ করে বলল, কিন্তু বাইরে যে বলল টাকা লাগবে জিডি লেখতে?
অফিসার মুচকি হেসে বললেন ওখানে গিয়ে জিডি লেখেন। টাকা লাগবে না।
তারা গেলেন। কিন্তু জিডি কীভাবে লিখতে হয় সেটা তো আনিকা জানে না। সে আশরাফ সাহেবের দিকে তাকাল। আশরাফ সাহেব বললেন, আমিও তো কোন দিন জিডি লিখিনি।
পরে দেখলেন এক লোক খাতা কলম নিয়ে বসে আছে। মানুষকে সে জিডি লিখে দেয়। কিন্তু সে আবার এর জন্য টাকা নেয়। আবার টাকার কথা ওঠায় আনিকার রাগের মাত্রাটা আরও বেড়ে গেল। সে বলল, আমি এক টাকাও ঘোষ দিতে পারব না।
আশরাফ সাহেব শান্ত গলায় বললেন, ঘোষ না। এটা ওর পারিশ্রমিক।
পরে বোধ হয় দুশ টাকা খরচ করে জিডি একটা লেখালো। আশরাফ সাহেব তাকে হোস্টেলে পৌছে দিলেন।
দুই
‘প্রথম‘ জিনিসটা আসলেই মারাত্মক। সেটা ভুলা বড়ই কঠিন, অনেক ক্ষেত্রে অসম্ভব। সেটা প্রথম প্রেম হোক আর প্রথম মোবাইল ফোনই হোক। এর বিয়োগ ব্যথাটা আসলেই মারাত্মক।
আনিকা ভাবে নি এত তারাতারি তার মোবাইলটা হারিয়ে যাবে। শহরে চলার পথে সেটা হারিয়ে যেতে পারে, খেয়াল না করলে চোরে নিতে পারে সেটা আনিকার ভাল করে জানা ছিল। এজন্য সে যথেষ্ট সতর্ক ছিল। মোবাইল বের করা ব্যাগে ঢুকানো খুব সতর্কতার সাথেই সে করতো। এর ফাকে কীভাবে যে মোবাইলটা পড়ে গেল?
তার মা এক প্রকার বিদ্রোহ করেই তাকে মোবাইল কিনে দিলেন। তাও বাবার কাছ থেকে টাকা নিলেন না। নিজের জমানো টাকা দিয়ে কিনে দিলেন। এখন মাকে সে কি বলবে? এজন্য মাকে সে এখন পর্যন্ত ফোন দেয়নি। মায়ের মুখোমুখি হওয়ার সাহসটা সে হারিয়ে ফেলেছে।
আনিকা রুমে গিয়ে বিছানার একপাশে শুয়ে পড়লো। এই যে শুয়ে পড়লো, কোন রকম নড়াচড়া নেই। কোন রকম এপাশ ওপাশ করা নেই।
বাইরে থেকে এসে ফ্রেস না হলে আনিকার স্বস্তি লাগে না। কিছু করতে ভাল লাগে না। রুমে ঢুকে প্রথমেই সে ফ্রেস হয়। কাপড়টা পাল্টায়। আজকে এর কিছুই করলো না। সে ধূলায় ভরা শরীর আর ঘামে ভিজা কাপড় নিয়ে বিছানায় পড়লো।
মনে সে মোবাইল হারানোর চিন্তা। পুরো ঘটনা সে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত বার বার মনে করছে। কখন মোবাইল পড়লো?
চিন্তা করছে CNG তে না উঠলেও পারতো। আর উঠলেও নামার সময় মোবাইল আছে কি না দেখে নিলেও পারতো।
মনে মনে শুধু এটা করা উচিৎ ছিল, ওটা করা ঠিক হয়নি এসবই চিন্তা করে যাচ্ছে। যত চিন্তা করছে ততই চিন্তা বাড়ছে। ততই মনটা ভারী হয়ে আসছে। ততই দুঃখটা বাড়ছে।
এপাশ ফিরে দেখলো তার বালিশটা ভিজে গেছে। এত সময় ধরে তার চোখ দিয়ে পানি পড়ছে সে এটা টেরও পায়নি। আর যখন টের পেল তখন সেটা মুছতে গেল না। টেবিল থেকে টিস্যু আনলো না।
সত্যিই বেচারির মনটা ভেঙ্গে গেছে। মোবাইল হারিয়ে যাওয়া অস্বাভাবিক কিছু না। তার সামনেও হারিয়েছে। সে হয়তো সেটা সহজভাবেই নিত। কিন্তু মোবাইল হারিয়ে যাওয়া আর প্রথম মোবাইল, সখের মোবাইল, প্রিয় মোবাইল, যে মোবাইল নিয়ে কৌতুহল এখনও অনেক রয়ে গেছে, সেটা হারানোর মাঝে পার্থক্য সত্যিই বিশাল।
সে রাতটা এভাবেই কাটলো। আনিকার রুমমেট আবার বাড়িতে গেছে। তাই সে একা এক রুমে। শান্তনা দেওয়ার মত কেউ ছিল না। চোখের পানি মুছে দেওয়ার মত কেউ ছিল না। সাধারণত রাত দশটায় খাওয়া হয়। নিচ তলায় রান্না ঘর। ডাইনিং টেবিল আছে। চাইলে সেখানে বসে খাওয়া যায়। আবার রুমেও নিয়ে আসা যায়। আনিকা খাবার আনতে গেল না। তার ভাত সেখানেই থাকলো। কেউ সেটাকে ঘুরে রাখলো না। কেউ নিয়ে তার রুমেও দিয়ে এল না। সে খাবারটুকু প্রথমে ঠান্ডা হল। পরে বাসি হল।
পরদিন হোস্টেলের সবাই মিলে আনিকাকে শান্তনা দিল। মোবাইল হারানোটা যে স্বাভাবিক সেটাও তাকে বুঝানোর চেষ্টা করলো। কেউ কেউ নিজের মোবাইল হারানোর আরও তেল মসলা লাগিয়ে তাকে শুনালো। কেউ আবার বলল, কত মোবাইল আসবে আর কত মোবাইল যাবে। এটা নিয়ে মন খারাপ করে কি লাভ আছে?
ফামি কাল যদিও আনিকার উপর রাগ করেছিল। তাই বলে বান্ধবীকে কি সে শান্তনা দিবে না? বলল, দেখ, এসব নিয়ে মন টন খারাপ করে লাভ নেই। যা হবার হয়ে গেছে। সামান্য একটা মোবাইলই তো ছিল। মন খারাপ করিস না?
আনিকা সবার শান্তনা গ্রহণ করে একটু হাসবার চেষ্টা করলো। কিন্তু সে হাসিতে কোন প্রাণ নেই, কোন অনুভূতি নেই। জোর করে হাসা যাকে বলে। সে হাসিটা তাই দেখতে খুবই খারাপ ছিল। আনিকা প্রাণ খুলে হাসতে পারতো। তার হাসিটা ভালো ছিল, সুন্দর ছিল, প্রাণবন্ত ছিল, সব প্রকার কৃত্রিমতা মুক্ত ছিল। হাসলে তার যেন মনের ভাব পুরোটাই ফুটে উঠতো।
আর আজকের হাসিটা ছিল ঠিক তার বিপরীত। মনে কষ্ট থাকলে কিভাবে হাসা যায়?
তার আত্মীয় স্বজন যেই মোবাইল হারানোর ঘটনা শুনলো সেই দুঃখ প্রকাশ করলো। বলল, আহারে! বেচারির মোবাইল হারিয়ে গেছে। শহরে সাবধানে না চললে বড় বিপদ।
এর পর যখন তারা আনিকার থানায় যাবার ঘটনা শুনলো আর গিয়ে যে ওসি কন্সটেবলকে দুটা কথা শুনিয়ে এল, তখন তারা বলাবলি করলেন, দেখ, মেয়েটার সাহস কত বড়। একা একা থানায় চলে যায়। সেখানে গিয়ে ফায়দা কিছু হবে?
কেউ বললেন, মেয়েটা কিছু বোঝে না। সোজা থানায় চলে গেল?
কেউ আবার তার সাহসের প্রসংশা করলেন। বললেন, যাই বল না কেন মেয়েটার সাহস আছে।
তার পক্ষে এমন মন্তব্যের অনেকে প্রতিবাদ করে বললেন, সাহস! এমন সাহস দিয়ে সে কি করবে? এসব উল্টা পাল্টা কাজ করে বিপদেই পড়বে।
এর কিছু অবশ্য আনিকার কানে গেল। দুঃখ তার আগে থেকেই ছিল। এখন এর উপরে একটা হতাশা চলে এসেছে। মনে মনে ভাবছে একটু বাড়াবাড়ি হয়ে গেল না! এতটা না করলেও পারতো।
কিছুদিন এভাবেই কেটে গেল। মোবাইল হারানোর ব্যথাটা ভুলে থাকার সে প্রাণপণ চেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু পারছে না। নিজেকে বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত করতে চাচ্ছে। কিন্তু এত ব্যস্ততার মাঝেও সে মোবাইলের কথা বারে বারে তার মনে পড়ছে। বন্ধু বান্ধবের আড্ডায় সে সব সময়ই একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিল। তাকে ছাড়া আড্ডা এত জমজমাট হত না। সে এখন আড্ডা ছাড়েনি। বরং আগের চেয়ে বেশিই আড্ডায় যোগ দিচ্ছে। ইচ্ছে এই যে, আড্ডার মাঝে থেকে যেন সে কষ্টটা ভুলে থাকা যায়। কিন্তু আড্ডায় বসলে বান্ধবীরা একটু পরেই বলে, কিরে, তুই কিছু বলছিস না যে?
আনিকা এখন স্যারের বাসা প্রায়ই মিস দেয়। গেলেও তার মন যেন অন্য কোথাও আছে। পড়া যেন তার মাথায় ঢুকছে না। স্যার তাকে ভাল ছাত্রী হিসেবেই জানতেন। তাই প্রায়ই তাকে প্রশ্ন করতেন। সেও সঠিক উত্তর দিত। এবার স্যার প্রশ্ন করলে সে প্রথমে তাকে যে প্রশ্ন করা হয়েছে সেটাই বুঝতে পারে না। স্যার রাগ করে যখন বলেন, আনিকা, তোমার মন কোন দিকে?
তখন তার হুশ ফিরে। কিন্তু প্রশ্নের সঠিক উত্তর আর দিতে পারে না। সে মাথাটা নিচা করে রাখে।
সে হাসিখুশি, প্রাণবন্ত মেয়ে আনিকা কিছু দিনে যেন নীরস হয়ে গেল। কণ্ঠটা কেমন গম্ভীর হয়ে গেছে। সে হাসেনা, কারো সাথে কথা বলে না। মেয়ে জাতি সাজগোজ ছাড়া চলতে পারেনা। সৌন্দর্য চর্চা ছাড়া তাদের চলে না। আনিকাও সেটা করতো। এখন আর করে না। চুল সুন্দর করে আচঁড়ায় না, কাপড় চোপড় তেমন ভালো করে পড়ে না। আয়নার সামনে বসে আর রূপচর্চাও করে না। এইতো সেদিন তাদের কলেজে কী একটা ফাংশন ছিল। তার বান্ধবীরা শাড়ি পরে মুখে মেকাপ টেকাপ দিয়ে সেজেগুজে গেল। আনিকা প্রথমে যেতে চাচ্ছিল না। কিন্তু বান্ধবীদের চাপে যেতে হল।
কিন্তু তার সাজসজ্জায় তেমন কিছু ছিল না। তেমন কিছু বলতে কিছুই ছিল না। ভাল কাপড় তার যথেষ্ট ছিল, সাজগোজের জিনিসেরও অভাব ছিল না। সে ভাল কিছু পড়লো না। সাজলো না। চুলটা পর্যন্ত ভালো করে আচঁড়ায় নি।
মা ফোনে মেয়ের কণ্ঠ শুনেই বুঝলেন তার মেয়ে ভাল নেই। ফামিকেও মেয়ের ব্যপারে জিজ্ঞেস করলেন। ফামি আনিকার সব কথা খুলে বলল। বলল, আন্টি, মোবাইল হারানোর পর থেকে আনিকা কেমন বদলে গেছে। সারাক্ষণ মনমরা হয়ে থাকে। পড়ালেখায়ও মন দিতে পারছে না। আমি কত বুঝালাম। কত কিছু বললাম। কিন্তু কোন কাজ হল না।
মেয়ের অবস্থা শুনে মা কেঁদে কেঁদে বললেন, মেয়েটা এরকম কোন দিন ছিল না রে মা। আমার মেয়েটার কী যে হল?
ফামি তাকে শান্তনা দিতে বলল, কাঁদবেন না, আন্টি। কেঁদে কি হবে। আপনি নাহয় তাকে বাড়ি নিয়ে যান। কিছুদিন আপনার কাছে থাকলে মন ভাল হবে, ঠিক হবে।
মা ফামির কথায় একটু ভরসা পেলেন। এরপর চৌধুরী সাহেবকে পাঠালেন মেয়েকে নিয়ে আসার জন্য।
চৌধুরী সাহেব গেলেন মেয়েকে আনতে। কিন্তু মেয়ের অবস্থা দেখে এত খারাপ লাগলো! মেয়েটা একবারও মোবাইলের কথা তুলেনি। চৌধুরী সাহেবও তুললেন না। তবে এটুকু বুঝতে তার অসুবিধা হলনা যে মেয়ে তার সুখে নেই।
বাবা বললেন, চল, মা। তোকে নিয়ে যেতে এসেছি। কিছুদিন বাড়িতে থেকে আসবি।
মেয়ে রাজি হল না। কিছুতেই রাজি হল না। বলল, সামনে পরীক্ষা আসছে। এখন কিভাবে যাব?
বাবা অনেক কিছু করেও মেয়েকে নিতে পারলেন না। মেয়ে কোন মতেই রাজি হচ্ছে না। মেয়ের এমন ব্যবহার দেখে বাপের চোখে পানি এসে গেল। তার সে ছোট্ট আনিকা এমন তো ছিল না। বাপের আবদারে সে কোন দিনই না করতো না। কোন দিন মেয়েকে কোন কথা দ্বিতীয় বার বলতে হয়নি। সাধাসাধি করতে হয়নি। আজ কেন যে মেয়ে বাপের আবদার না রাখার জন্য বাপের সাথে এক প্রকার তর্ক ধরে ফেলছে!!!
চৌধুরী সাহেব মেয়ের অবস্থা বুঝতে পারলেন। এ জন্য মনে খুব কষ্ট পেলেন। কিন্তু মুখে কিছু প্রকাশ করলেন না। বাপের বুক ফেটে কান্না আসছিল। কিন্তু কাঁদলেন না। মেয়েকে বললেন, ঠিক আছে। যেতে না চাইলে থাক। আমি আজ সিলেটে আছি। তোর ফুফুর বাসায় থাকব। কিছু কাজ আছে। কাল যাবার সময় একবার উঠে যব। ভাল থাকিস, মা।
বলে চৌধুরী সাহেব বিদায় নিলেন।
পরদিন বাড়ি যাবার আগে চৌধুরী সাহেব মেয়েকে একবার দেখে আসতে গেলেন। মেয়ের মুখের দিকে চাওয়া যায় না। বাবা তখন একটা ছোট ব্যাগ মেয়ের হাতে দিলেন। ব্যাগে কী আছে বুঝা যাচ্ছে না। শেষবারের মত মেয়েকে বকে টেনে এনে বললেন, দেখ, মা, শহরে চলাচল করাটা বেশ কঠিন। কত জিনিসের মুখোমুখি হতে হয়। মোবাইল হারিয়েছে বলে এত মন খারাপ করার কী আছে? মন খারাপ করিস না। তুই মন খারাপ করলে আমাদের কি ভাল লাগে?
বাবা চোখের পানি আটকে রাখতে পারলেন না। ভাঙ্গা ভাঙ্গা কণ্ঠে বললেন, ভালো হয়ে চলিস। খাওয়া দাওয়া, পড়ালেখা সব ঠিক রাখিস। তুইই তো আমার সব। তোকে নিয়েই আমার যত চিন্তা।
মেয়েও ভিজা চোখে বাবাকে বিদায় দিল।
রুমে ফিরে বাবার দিয়ে যাওয়া সে ব্যাগটা খুলল। খুলে যা দেখলো তার জন্য সে সম্ভবত প্রস্তুত ছিল না। আশাও করেনি। দেখলো বাবা তাকে একটা মোবাইল, মানে স্মার্টফোন দিয়ে গেছেন। সেটা তার আগেরটার মতই। ভালো।
চৌধুরী সাহেব মেয়ের কষ্ট দেখতে না পেরে তাকে মোবাইল একটা কিনে দিলেন।
মেয়ে মোবাইল পেয়ে খুশি হল ঠিকই। বাবার তার প্রতি এত চিন্তা, এত টান, এত ভালবাসা, এত স্নেহ দেখে মেয়ে কেঁদে ফেলল। বাবা তাকে নিয়ে এত আশা করেন, এত স্বপ্ন দেখেন। আর সে সামান্য এক মোবাইল হারিয়েছে বলে সে স্বপ্নটাকে মাটি করে দিচ্ছিল। মনে মনে নিজের উপর বেশ রাগ হল।
নতুন মোবাইল পেয়ে খুশি সে হয়েছিল। নতুন মোবাইলের প্রতি তার আগ্রহও অনেক ছিল। তবে মনে মনে শুধু বলল, এটা সামান্য একটা মোবাইল। এর জন্য আর যাই হোক আমি কোন দিন মন খারাপ করবো না। দুঃখ পাব না।
এভাবে আস্তে আস্তে আনিকা আবার স্বাভাবিক হয়ে গেল। শীতের শেষে যেমন পাতা ঝড়া গাছগুলো আবার সজীব হয়ে যায়, পানি পেয়ে যেমন আবার প্রাণ ফিরে পায় তেমনি আনিকাও আস্তে আস্তে আবার আগের সে আনিকা হয়ে গেল। আবার তার মুখে হাসি ফুটে ওঠেছে। সে মনমরা ভাবটা কেটে গেছে। পড়ালেখায় মন দিয়েছে। এখন আড্ডায় বসলে সেই যেন আড্ডা জমিয়ে তুলে।
এভাবে দিন যায়, মাস যায়। এমনি করে প্রায় এক বছর হতে চলেছে। সে হারিয়ে যাওয়া মোবাইলের কথা যদিও সে ভুলতে পারেনি। কিন্তু সেটার কথা মনে হলে সে একটু মুচকি হাসে। সেটা পাওয়ার জন্য যে সে একা একা থানা পর্যন্ত গিয়েছিল আর থানায় ঘোষ চাওয়ায় সেখানে সে যে চিল্লাচিল্লি করেছিল তা ভেবে এখন সে হেসেই খুন হয়। মাঝে মাঝে আশরাফ সাহেবকে নিয়ে যে জিডিটা লিখেছিল তার কপিটা সে বের করে দেখে। ভাবে হয়তো এখনো সেটা থানার ফাইলগুলোর চিপায় পড়ে আছে।
একদিন আশরাফ সাহেবের কাছে থানা থেকে ফোন এল। ওই অফিসার তার পরিচিত। বলল, আপনি মোবাইল হারানো নিয়ে একটা জিডি করেছিলেন না?
আশরাফ সাহেব আগ্রহ নিয়ে বললেন, হ্যাঁ, করেছিলাম তো।
অফিসার বলল, আমরা এর সন্ধান পেয়েছি। আপনার কাছে মোবাইলের কাগজপত্র থাকলে আজই থানায় চলে আসেন।
তিনি কথাটা শুনে যেন আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেছেন। এক বছর হতে চলেছে। সে মোবাইলের আশা সবাই ছেড়ে দিয়েছিল। আনিকাও কোনদিন এ ব্যপারে তাকে কিছু জিজ্ঞেস করেনি।
অবশেষে সে মোবাইলের সন্ধান মিলল। আশরাফ সাহেব সময় নষ্ট না করে আনিকাকে নিয়ে থানায় গেলেন। কাগজ পত্র সব দেখিয়ে অবশেষে সে মোবাইল হাতে পেল। পুলিশ জানালো এক CNG ড্রাইভার নাকি সেটা বিক্রি করেছে।
যাই হোক, পাওয়া গেল। ওইদিন সে সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিল বলেই আজ সে মোবাইলটা পেল। তাকে একটা মানুষও বলেনি যে, তুমি যা করেছো ঠিকই করেছ। বরং সে এ কান্ডের জন্য বকা খেয়েছে। অবশেষে সেসব লোকেদের মুখের উপর সে একটা জবাব দিতে পেরেছে।
আনিকা মেয়েটা সত্যিই অসাধারণ। সব দিক দিয়েই সে চালু ছিল। তার রূপ ছিল, গুণ ছিল, হাল না ছাড়ার সে মনোবলটা ছিল। তার মধ্যে সে সাহসটুকু ছিল যেটা সম্ভবত অনেক ছেলের মাঝেই পাওয়া যাবে না। তবে একটু অভিজ্ঞতার অভাব ছিল। যার কারণে নিজেকে সে সামলাতে পারেনি। কিন্তু সেটা কিছু সময়ের জন্যই। পরে ঠিকই নিজের ভুল সে বুঝতে পেরেছে। যত দিন যাবে অভিজ্ঞতার মাত্রাটা তত বাড়বে। তাই এ নিয়ে চিন্তার কোন কারণ আমি দেখিনা। আশা করি দুআ করি, তার সে মনোবলটুকু যেন আটুট থাকে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


