গাড়ির মধ্যে বসে ছিলেন জাহানারা ইমাম, জুরাইন গোরস্তানের বাইরে; ভেতরে অল্প কজন আত্মীয় আর বেশ কজন মুক্তিযোদ্ধা দাফন করছিলেন আজাদের মাকে। হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হলে জাহানারা ইমাম বেরিয়ে আসেন গাড়ি থেকে। তাঁর কী হয় তিনিই জানেন। তাঁর মতো স্নিগ্ধরুচি সূক্ষ্ম আচারবোধসম্পন্ন মানুষের এ রকমটা করার কথা নয় - দিনের বেলা বৃষ্টির মধ্যে গাড়ি থেকে নেমে সেধে সেধে ভেজা। জাহানারা ইমাম তা করেন। গোরস্তানের ফটকের কাছে বসে থাকা ভিক্ষুকেরা তাদের বিলাপ ও যাচনা বন্ধ করে অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখে, এক ভদ্রমহিলা অকারণে হঠাৎ আসা বৃষ্টিতে ভিজছে। কারণটা তারা আন্দাজ করতে পারে না, এবং সেটা নিয়ে গবেষণা করার আগেই তাদের নিজেদের মাথা বাঁচানোর জন্যে সচেষ্ট হতে হয়। এভাবে বৃষ্টিতে ভেজার কারণটা স্বয়ং জাহানারা ইমামও ধরতে পারেন না। শুধু আবছা একটা অনুভব, হয়তো বেহেশতের দরজা খুলে দেওয়া হয়েছে, আর শহীদেরা, তাঁর রুমীরা, আজাদেরা আকাশ থেকে পুষ্পবৃষ্টি বর্ষণ করছে। এই বৃষ্টি যেন বৃষ্টি নয়। আর এই যে সুবাসটা, না, এটা আতরের নয়, গোলাপজলের নয়, লোবানের নয়, এ হলো বেহেশ্ত থেকে নেমে আসা অপার্থিব সৌরভ। দাফন শেষ করে বাচ্চু, শাহাদত, কাজী কামাল, হ্যারিস, হাবিবুল আলম প্রমুখ ফিরে এলে জাহানারা ইমাম সংবিৎ ফিরে পান। তিনি গাড়িতে ওঠেন। তাঁর গাড়িতে কেউ কেউ লিফ্ট নেয়। গাড়িতে উঠেও এই মুক্তিযোদ্ধাদের কেউই বৃষ্টিতে ভেজার ব্যাপারটা নিয়ে কোনো কথা বলে না। কারণ তারা নিজেরাই ঘোরগ্রস্ত। কেবল তরুণ ড্রাইভার বলে, 'খালাম্মা, তোয়ালে দিব, মাথা মুছবেন নাকি?' জাহানারা ইমাম মাথা নাড়েন না-সূচক ভঙ্গিতে। গাড়ি চলতে থাকে। তিনি প্রতিটা মুক্তিযোদ্ধাকে তাদের শেষ গন্তব্যে নামিয়ে দিয়ে এলিফ্যান্ট রোডের বাসা কণিকায় ফিরে আসেন। স্মৃতির দংশন তাঁকে অস্থির করে তোলে।
আজাদের বাবার সঙ্গে জাহানারা ইমামদের পরিচয় মেছের নামে তাঁদের এক ভাগ্নের মাধ্যমে। জাহানারা ইমাম কয়েকবার গেছেন আজাদদের ফরাশগঞ্জের বাড়িতে। ইস্কাটনের বাড়িতে গেছেন অনেকবার। সঙ্গে থাকত তাঁর দুই ছেলে রুমী আর জামী। জামী তখন খুবই ছোট। রুমীর সঙ্গে খুব সহজেই বন্ধুত্ব হয়ে যায় আজাদের। এত বড় বাড়ি পেয়ে রুমী তো আনন্দে অস্থির হয়ে যেত। এই লংপ্লে রেকর্ড চালাচ্ছে, এই টেপ রেকর্ডার নিয়ে ছড়া টেপ করছে, এই আবার যাচ্ছে হরিণ দেখতে। আজাদ বলেছে রুমীকে, একটা বাঘও আনার কথা ছিল। কিনেও নাকি ফেলেছিলেন আজাদের বাবা। কিন্তু আনার পথে বাঘটা মরে যায়।
আজাদের মা খুবই পছন্দ করতেন রাঁধতে। রেঁধে মেহমানদের খাওয়াতে। বাসায় বাবুর্চি ছিল। কাজের লোকে গমগম করত বাড়িটা। তবু জাহানারা ইমামদের জন্যে নিজ হাতে নানান পদ রেঁধে তাঁদের খাওয়ানোর জন্যে তিনি উদ্বেল হয়ে উঠতেন। জাহানারা ইমাম বলতেন, 'আপা, আপনি বসেন। আমরা কি খেতে এসেছি, নাকি আপনার সাথে গল্প করতে এসেছি?' আজাদের মা হাসতেন। স্মিত স্নিগ্ধ হাসি। কথা তিনি বেশি বলতেন না। কিন্তু হাসিটা দিয়েই যেন অনেক কথা বলা হয়ে যেত। বলতেন, 'পান খান। রেকর্ডের গান শোনেন। আপনি তো দেখতে লোকে বলে সুচিত্রা সেনের মতো। সুচিত্রা সেনের সিনেমার গানের রেকর্ড আছে শোনেন। আমি আগে সিনেমা থিয়েটার দেখতাম। এখন আর দেখি না। আপনি বোন বসেন। আমি যাব আর আসব। রুমী কী খেতে পছন্দ করে? জামীর জন্য কি আলাদা কিছু রাঁধতে হবে? আপনার সাহেবকে আনেননি কেন?'
পানের একটা রেকাবি জাহানারা ইমামের সামনে রেখে আজাদের মা রান্নাঘরে চলে যেতেন। এই রেকাবিটাও ছিল যেন শিল্পকর্মের একটা অপূর্ব নিদর্শন। কত ধরনের জর্দাই না তাতে থাকত। একেকটা খোপে একেক রকম জর্দা আর তবক সাজানো। আজাদের মা বলতেন, 'এটা হলো কিমাম জর্দা, এটা হলো কস্তুরি। পাকিস্তান থেকে আনানো।' জাহানারা ইমাম তেমন পান খেতেন না। আজাদের মাকে খুশি করার জন্যে খানিকটা মুখে দিতেন।
টমি নামে আজাদদের পোষা কুকুর ছিল একটা, স্প্যানিয়েল। এসে জাহানারা ইমামের গায়ের ঘ্রাণ নিত। এই কুকুর দেখে রুমী আর জামীর শখ হলো তারা কুকুর পুষবে।
রুমীদের পোষা কুকুর মিকি মারা গেছে একাত্তরের ২৫শে মার্চের রাতে। আজ থেকে ১৪ বছর আগে! জাহানারার বুক চিরে শুধুই দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসতে চায়। রুমীর ১৪তম মৃত্যুদিনও হয়তো সামনের কোনো একটা দিন। এই সেপ্টেম্বরের ৪ তারিখ হলেও হতে পারে। রুমীর বাবা শরিফ ইমামও আজ ১৪ বছর হলো নাই।
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৭ রাত ১১:৪৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



