somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আনিসুল হক এর অসাধারণ উপন্যাস

১৫ ই জুন, ২০০৭ রাত ১২:১৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


গাড়ির মধ্যে বসে ছিলেন জাহানারা ইমাম, জুরাইন গোরস্তানের বাইরে; ভেতরে অল্প কজন আত্মীয় আর বেশ কজন মুক্তিযোদ্ধা দাফন করছিলেন আজাদের মাকে। হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হলে জাহানারা ইমাম বেরিয়ে আসেন গাড়ি থেকে। তাঁর কী হয় তিনিই জানেন। তাঁর মতো স্নিগ্ধরুচি সূক্ষ্ম আচারবোধসম্পন্ন মানুষের এ রকমটা করার কথা নয় - দিনের বেলা বৃষ্টির মধ্যে গাড়ি থেকে নেমে সেধে সেধে ভেজা। জাহানারা ইমাম তা করেন। গোরস্তানের ফটকের কাছে বসে থাকা ভিক্ষুকেরা তাদের বিলাপ ও যাচনা বন্ধ করে অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখে, এক ভদ্রমহিলা অকারণে হঠাৎ আসা বৃষ্টিতে ভিজছে। কারণটা তারা আন্দাজ করতে পারে না, এবং সেটা নিয়ে গবেষণা করার আগেই তাদের নিজেদের মাথা বাঁচানোর জন্যে সচেষ্ট হতে হয়। এভাবে বৃষ্টিতে ভেজার কারণটা স্বয়ং জাহানারা ইমামও ধরতে পারেন না। শুধু আবছা একটা অনুভব, হয়তো বেহেশতের দরজা খুলে দেওয়া হয়েছে, আর শহীদেরা, তাঁর রুমীরা, আজাদেরা আকাশ থেকে পুষ্পবৃষ্টি বর্ষণ করছে। এই বৃষ্টি যেন বৃষ্টি নয়। আর এই যে সুবাসটা, না, এটা আতরের নয়, গোলাপজলের নয়, লোবানের নয়, এ হলো বেহেশ্‌ত থেকে নেমে আসা অপার্থিব সৌরভ। দাফন শেষ করে বাচ্চু, শাহাদত, কাজী কামাল, হ্যারিস, হাবিবুল আলম প্রমুখ ফিরে এলে জাহানারা ইমাম সংবিৎ ফিরে পান। তিনি গাড়িতে ওঠেন। তাঁর গাড়িতে কেউ কেউ লিফ্‌ট নেয়। গাড়িতে উঠেও এই মুক্তিযোদ্ধাদের কেউই বৃষ্টিতে ভেজার ব্যাপারটা নিয়ে কোনো কথা বলে না। কারণ তারা নিজেরাই ঘোরগ্রস্ত। কেবল তরুণ ড্রাইভার বলে, 'খালাম্মা, তোয়ালে দিব, মাথা মুছবেন নাকি?' জাহানারা ইমাম মাথা নাড়েন না-সূচক ভঙ্গিতে। গাড়ি চলতে থাকে। তিনি প্রতিটা মুক্তিযোদ্ধাকে তাদের শেষ গন্তব্যে নামিয়ে দিয়ে এলিফ্যান্ট রোডের বাসা কণিকায় ফিরে আসেন। স্মৃতির দংশন তাঁকে অস্থির করে তোলে।
আজাদের বাবার সঙ্গে জাহানারা ইমামদের পরিচয় মেছের নামে তাঁদের এক ভাগ্নের মাধ্যমে। জাহানারা ইমাম কয়েকবার গেছেন আজাদদের ফরাশগঞ্জের বাড়িতে। ইস্কাটনের বাড়িতে গেছেন অনেকবার। সঙ্গে থাকত তাঁর দুই ছেলে রুমী আর জামী। জামী তখন খুবই ছোট। রুমীর সঙ্গে খুব সহজেই বন্ধুত্ব হয়ে যায় আজাদের। এত বড় বাড়ি পেয়ে রুমী তো আনন্দে অস্থির হয়ে যেত। এই লংপ্লে রেকর্ড চালাচ্ছে, এই টেপ রেকর্ডার নিয়ে ছড়া টেপ করছে, এই আবার যাচ্ছে হরিণ দেখতে। আজাদ বলেছে রুমীকে, একটা বাঘও আনার কথা ছিল। কিনেও নাকি ফেলেছিলেন আজাদের বাবা। কিন্তু আনার পথে বাঘটা মরে যায়।
আজাদের মা খুবই পছন্দ করতেন রাঁধতে। রেঁধে মেহমানদের খাওয়াতে। বাসায় বাবুর্চি ছিল। কাজের লোকে গমগম করত বাড়িটা। তবু জাহানারা ইমামদের জন্যে নিজ হাতে নানান পদ রেঁধে তাঁদের খাওয়ানোর জন্যে তিনি উদ্বেল হয়ে উঠতেন। জাহানারা ইমাম বলতেন, 'আপা, আপনি বসেন। আমরা কি খেতে এসেছি, নাকি আপনার সাথে গল্প করতে এসেছি?' আজাদের মা হাসতেন। স্মিত স্নিগ্ধ হাসি। কথা তিনি বেশি বলতেন না। কিন্তু হাসিটা দিয়েই যেন অনেক কথা বলা হয়ে যেত। বলতেন, 'পান খান। রেকর্ডের গান শোনেন। আপনি তো দেখতে লোকে বলে সুচিত্রা সেনের মতো। সুচিত্রা সেনের সিনেমার গানের রেকর্ড আছে শোনেন। আমি আগে সিনেমা থিয়েটার দেখতাম। এখন আর দেখি না। আপনি বোন বসেন। আমি যাব আর আসব। রুমী কী খেতে পছন্দ করে? জামীর জন্য কি আলাদা কিছু রাঁধতে হবে? আপনার সাহেবকে আনেননি কেন?'
পানের একটা রেকাবি জাহানারা ইমামের সামনে রেখে আজাদের মা রান্নাঘরে চলে যেতেন। এই রেকাবিটাও ছিল যেন শিল্পকর্মের একটা অপূর্ব নিদর্শন। কত ধরনের জর্দাই না তাতে থাকত। একেকটা খোপে একেক রকম জর্দা আর তবক সাজানো। আজাদের মা বলতেন, 'এটা হলো কিমাম জর্দা, এটা হলো কস্তুরি। পাকিস্তান থেকে আনানো।' জাহানারা ইমাম তেমন পান খেতেন না। আজাদের মাকে খুশি করার জন্যে খানিকটা মুখে দিতেন।
টমি নামে আজাদদের পোষা কুকুর ছিল একটা, স্প্যানিয়েল। এসে জাহানারা ইমামের গায়ের ঘ্রাণ নিত। এই কুকুর দেখে রুমী আর জামীর শখ হলো তারা কুকুর পুষবে।
রুমীদের পোষা কুকুর মিকি মারা গেছে একাত্তরের ২৫শে মার্চের রাতে। আজ থেকে ১৪ বছর আগে! জাহানারার বুক চিরে শুধুই দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসতে চায়। রুমীর ১৪তম মৃত্যুদিনও হয়তো সামনের কোনো একটা দিন। এই সেপ্টেম্বরের ৪ তারিখ হলেও হতে পারে। রুমীর বাবা শরিফ ইমামও আজ ১৪ বছর হলো নাই।
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৭ রাত ১১:৪৯
৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমি টুপ করে চলে আসবো

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ০১ লা জুলাই, ২০২৬ সকাল ১১:১৯


আমি হাসিনা। আমি আমার স্বামী ওয়াজেদ মিয়াকে কোনদিন স্বামীর মর্যাদা দেইনি। সে জ্ঞানী হলেও আমি সবসময় তাকে বাসার কাজের লোকের চেয়ে বেশি কিছু মনে করিনি। আমি সবসময় মৃণাল কান্তি... ...বাকিটুকু পড়ুন

রুবা

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০১ লা জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:২৮




রুবার সাথে আমার বিয়েটা ওঠ ছেড়ি তোর বিয়ের মতোই হয়েছে । একদম সাধারন কোনরকম অনুষ্ঠান নাই । সেইদিন অফিসে অনেক কাজ ছিলো । চোখে তারা ফারা দেখছিলাম । বসের... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রথম .........।

লিখেছেন মায়াস্পর্শ, ০১ লা জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:৩৪


আন্ডারগ্রাউন্ড শোতে এটাই আমার প্রথম ড্রামস বাজানোর একটা মুহূর্ত।

কিছু গল্প আসলে পরিকল্পনা করে শুরু হয় না।কিছু গল্প হঠাৎ করে একটা মুহূর্ত থেকে জন্ম নেয় আর তারপর... ...বাকিটুকু পড়ুন

সমুদ্রের নীল খাম

লিখেছেন ডি এইচ তুহিন, ০১ লা জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:৪২


এই শহরে থাকি প্রায় সাতাশ-আটাশ বছর ধরে। তিন প্রেমিকার মায়া ছেড়ে যাওয়া যায় না এমন এক অদ্ভুত সুন্দর এই শহর। যার এক হাতে নদী, অন্য হাতে সমুদ্র, আর কপালে জায়গা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আওয়ামী দুঃশাসনের পতন অনিবার্য ছিল, জুলাই তো স্রেফ উছিলা মাত্র!

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ০১ লা জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৮



জুলাই নিয়ে অনেক বিতর্ক, সমালোচনা আছে। কিন্তু, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে জুলাই গণঅভ্যূত্থান না হলে আমরা দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসন থেকে মুক্তি পেতাম না। জুলাই ঘিরে যত বিতর্ক, সমালোচনাই... ...বাকিটুকু পড়ুন

×