somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মুক্তি

২৩ শে নভেম্বর, ২০১৭ রাত ৯:৫০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

দু’টি বিপরিতধর্মী ঘটনা একি সাথে ঘটলো। একদিকে নবজাতক শিশুর প্রথম চিৎকার আর অদূরেই কোথাও বোমা বিস্ফোরনের শব্দ। বিস্ফোরনের আওয়াজে ঢাকা পড়ে শিশুটি’র চিৎকার, ঠিক যেমন তার মায়ের উৎকন্ঠা আর ভীতি’র নিচে চাপা পড়ে মা হবার আনন্দ। শরনার্থী শিবিরে আশ্রয় নেওয়া মানুষগুলো’র জন্যতো যেন এটাই নিয়ম।

শিশুটি বেড়ে ওঠে ধ্বংসস্তুপের মাঝে, যেখানে বাতাসে শুধু হতাশা, বিষাদ আর ঘৃণা বাস করে। তার নাম রাখা হয় হারুন। হারুনের বাবা তার সন্তানের মুখ দেখতে পারেননি, সৈন্য’রা তাকে শরণার্থী শিবির থেকে নিয়ে গিয়েছিল। সে আর ফিরে আসেনি।

হারুন বেড়ে ওঠে এক দুর্বল শিশু হিসেবে, দেখতে ছোটখাটো হওয়ায় তার উপর অত্যাচার করাটাকে অন্যরা নিজেদের অধিকার হিসেবে নিয়েছিল। তার জীবনকে আরো একটু দুঃসহ করে দিতেই একদিন তার মা মারা যায়। অনেক দিন ধরে অনেক অসুখে ভুগে বেঁচে ছিলেন তিনি, এবার পৃথিবীর সব জ্বালা-যন্ত্রণা শেষ করে একেবারে চলে গেলেন। হারুনকে দেখার আর কেউ রইলো না। একা একা পুরো শিবিরে ঘুরে বেড়াতে লাগলো সে; কেউ কিছু বলার নেই, কেউ নেই যে মাথায় হাত বুলিয়ে একটু সান্ত্বনা দেবে। শরণার্থী শিবিরে তার মত শিশু অগণিত, নিজেদেরকে বাঁচিয়ে রাখতে ব্যস্ত মানুষগুলোর সময় কোথায় ওর সাথে কথা বলার।

এমনি সময় শিবিরের সবচে’ রহস্যময় লোকটি’র সাথে পরিচয় হলো হারুনের। তাকে সবাই চেনে জাহেদ চাচা বলে, তিনি কারো সাতে-পাঁচে নেই; কারো সাথে কথা বলতেও খুব একটা দেখা যায় না। এই লোক যখন একদিন হারুনকে ডেকে কথা বললেন, হারুনের তখন বিশ্বাসই হতে চায়ননি। উনি হারুনের সম্পর্কে অনেক কথা জিজ্ঞাসা করলেন, তার পরিবারের কথা জিজ্ঞাসা করলেন, সব শুনে দুঃখ পেলেন। হারুনকে আদর করে কিছু ক্যান্ডি দিলেন। হারুনের কাছে প্রথমে সব স্বপ্নের মত লাগছিলো। যে সারা জীবন ভালবাসার কাঙ্গাল হয়ে ছিলো, যার সাথে কেউ কখনো মিষ্টি ভাষায় একটা কথাও বলেনি, তাকে যখন কেউ একটু আদর দেয়, তখন এমন লাগাটাই স্বাভাবিক।

হারুন এরপর থেকে প্রায় সারাদিনই জাহেদ চাচার কাছে পড়ে থাকতো। তিনি তাকে কত রকমের গল্প বলতেন, স্বাধীনতার গল্প, প্রজাপতির গল্প, ঘুড়ি উড়াবার গল্প; এইসব গল্প শুনে শুনে হারুন যখন নিজের কথা ভেবে হতাশ হয়ে যেতো, তিনি তখন তাকে আবার উৎসাহ যোগাতেন, আর বলতেন, “আমাদের দেশে আবার শান্তি আনতে হবে, আবার এই দেশকে মুক্ত করতে হবে। আর তার জন্য এই দেশের শত্রুদের খতম করে দিতে হবে।”

সব শুনে হারুনের মনে প্রতিহিংসা জেগে উঠতো। একদিন এমনি এক মুহুর্তে তিনি তাকে বললেন, “যুদ্ধে যাবি?”

“যাবো, যাবো” বলে লাফিয়ে ওঠে হারুন।

“না, তুই বড় বেশি ছোট, তোকে দিয়ে হবে না”, বলে মাথা নাড়েন জাহেদ চাচা। শুনে হারুন ব্যাকুল হয়ে তাকে রাজি করাতে শুরু করে। শেষ পর্যন্ত তিনি যেন অনেক অনিচ্ছা সত্ত্বেও রাজি হলেন। বললেন, “ঠিক আছে, তোকে আগামি শনিবার একখানে নিয়ে যাবো। আর এই কথা যেন কেউ না জানে।”

হারুন কাউকে না বলার কথা দেয়। অবশেষে বহু প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে হারুনের সেই শনিবার আসে। সেদিন খুব ভোর রাতে তারা দু’জন শিবির থেকে লুকিয়ে বের হয়। ভয়ে হারুনের জান বের হয়ে যাবার যোগার। এক বার যদি ওরা ধরা পড়ে যায় তাহলে শিবিরের প্রহরী তাদের গুলি করে মারবে। অনেক পথ চলার পর, অনেক কাদা-মাটি ডিঙ্গিয়ে অবশেষে তারা একটা ভাঙ্গা বাড়িতে পৌঁছায়।

বাইরে থেকে একদম পরিতক্ত্য মনে হচ্ছিলো বাড়িটা, কিন্তু তারা সামনে দাঁড়াতেই কোত্থেকে যেন একটা লোক এসে ওদের ভেতরে নিয়ে যায়। যেন সে জানতোই তারা আসবে।

ভেতরে ঢোকার পর হারুনের চোখ বিস্ময়ে কপালে উঠে যায়। এ সে কোথায় আসলো? মনে হচ্ছে গোলা-বারুদের কারখানা। এখানে তার মত আরো অনেক ছেলে কাজ করছিলো। তার একটু কেমন জানি লাগলো। তার মনোভাব বুঝতে পেরেই জাহেদ চাচাতাকে বোঝাতে শুরু করলেন যে এরা সবাই দেশের জন্য যুদ্ধ করতে এসেছে। সবাই দেশকে মুক্ত করতে চায়।

এখানে শুরু হল হারুনের নতুন জীবন। তাকে অমানুষিক পরিশ্রম করতে হতো, খুব খারাপ খাবার খেতে পেত সে, মাঝে মাঝে তাকে মারধোরও করা হতো। সে সব সয়ে নিতো একদিন মুক্ত দেশে থাকার আশায়।

- ৬মাস পর –

গেরিলা বাহিনী অতিরিক্ত সেনাশিবিরে হামলা চালায়। এতে শিবিরে সেনা’রা অনেকে মারা পড়লেও শেষ পর্যন্ত তারা রুখে দাঁড়াতে সফল হয়। টিকতে না পেরে গেরিলা’রা পিছু হটে যায়। ওরা পালিয়ে যাবার পর রণাঙ্গনে তাদের ক’জন সঙ্গীকে মরে পড়ে থাকতে দেখা গেলো। এদের মধ্যে একটা পিচ্চি ছেলে কে বড় বেশি চোখে লাগছে। বুলেট তার বুক এফোঁড়-ওফোঁড় করে গেছে। তারপরও নিজের সমান রাইফেলটা ও এখনো একহাতে শক্ত করে ধরে রেখেছে। চোখ দু’টি আকাশের পানে খোলা। যেনো ঐ আকাশকে তার মুক্তি’র খবর জানাচ্ছে।
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে জুলাই, ২০১৮ রাত ৯:৪৫
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×