৭.৩
খাওয়ার টেবিলে উল্টোদিকের চেয়ারে রানু বসা, কিছু বলছে না। মুখ নিচু করে খেয়ে যাচ্ছে বিজু। চোখ তুলে তাকাতে বার দুয়েক চোখাচোখি হয়ে যায়, রানু ওর খাওয়া দেখছে। সে খেতে বসেছে, রানু কাছে বসে আছে, এই ঘটনা শেষ কবে ঘটেছিলো?
একসঙ্গে খেতে বসা আজকাল হয় না। দু'জনে সারাদিন অফিসে, দুপুরে একসঙ্গে খাওয়ার প্রশ্ন নেই। বিজু ফিরতে ফিরতে রানুর রাতের খাওয়া হয়ে যায়।
ফুলটুসের খাওয়া টিভির সামনে বসে, কার্টুনের চাটনি না হলে খাবার মুখে রোচে না তার। বিজুর জন্যে টেবিলে খাবার দেওয়া থাকে। ইচ্ছে হলে গরম করে নেয়, নাহলে ওভাবেই খেয়ে নেয়। অবশিষ্ট খাবারগুলো ফ্রিজে তুলে রাখার দায়িত্ব তার।
এক রাতে মাংসের বাটিটা তুলে রাখতে ভুলে গিয়েছিলো। পরদিন শনিবার, ছুটির দিন। ঘুম থেকে উঠে দেখে রানু কী যেন ¯েপ্র দিয়ে ঘষে ঘষে কার্পেটের একটা দাগ তোলার চেষ্টা করছে। ফুলটুস কিছু একটা ফেলেছে কার্পেটে।
বিজুকে দেখতে পেয়ে রানু গলায় কিছু বাড়তি ঝাঁঝ মিশিয়ে বলে, কাল রাতে মাংসের তরকারিটা তুলে রাখতে কী হয়েছিলো? গন্ধ হয়ে গেছে। ওই মাংসই খেয়ো, আমি আর রান্না করতে পারবো না। ঘরের একটা কিছু তোমাকে দিয়ে হয় না। সব কাজ আমাকে একা হাতে করতে হবে? বাঁদী পেয়েছো?
অভিযোগ। অভিযোগের বিবরণ। সিদ্ধান্ত। আনুষঙ্গিক আরো অভিযোগ। প্রশ্ন। এবং আরো প্রশ্ন। পর পর কি এগুলো সব সাজানো ছিলো?
হাঃ, গুড মর্নিং অ্যান্ড ওয়েলকাম টু আ নিউ ডে।
সবদিন এরকম ভুল হয় না, কাল ভুলে গেলো কী করে? মনে পড়েছিলো, আগের রাতে সে বাসায় খায়ইনি, বাইরে খেয়ে এসেছিলো। অফিসে দেরি হয়ে যাচ্ছিলো বলে বাইরে থেকে খাবার আনিয়ে খেয়ে নিয়েছিলো। ফিরতে ফিরতে সাড়ে দশটা, রানু-ফুলটুস তখন ঘুমিয়ে গেছে। টেবিলের খাবার তোলা আর হয়নি।
ব্যাখ্যা দেওয়া যেতো, কিন্তু চেঁচামেচি দিয়ে দিন শুরু করা তার পছন্দ নয়। পরে দেখেছে, কোথায় কী? তরকারিটা মোটেই নষ্ট হয়নি। নাকের কাছে নিয়ে শুঁকে দেখলো, গরম করে খেয়ে খারাপ কিছু বুঝলো না। খেয়ে পেটের গণ্ডগোল হয়নি। রানুকেও খেতে দেখেছিলো। তাহলে? বিজুর কাছে উত্তর নেই।
কোনো কোনোদিন ফ্রিজ থেকে খাবার বের করে নিজেই গরম করে টেবিলে বসে যায় সে একা একা। 'আই অ্যাম অলরেডি গন... সাম ডে ইউ আর গনা ইট ইয়োর লাঞ্চ বাই ইয়োরসেলফ্...।'
একা বসে খাওয়ার মধ্যে এক ধরনের ভিখিরি-ভিখিরি ব্যাপার আছে। ছোটোবেলায় তাদের বাড়িতে দেখেছে, দুপুরে কোনো ভিখারি খাবার চাইলে মা কাঁসার থালায় করে ভাত-তরকারি সাজিয়ে দিতো, সঙ্গে কাঁসার গ্লাসে পানি। ওই কাঁসার বাসনগুলো ভিখারিদের জন্যেই নির্দিষ্ট করা ছিলো।
বিজু কতোদিন দেখেছে, দরজার সামনে বসা ভিখারি একা একা খেয়ে যাচ্ছে। খেতে খেতে বাঁ হাতে গ্লাস ধরে এঁটো ডান হাতের কব্জি গ্লাসের তলায় ঠেকিয়ে ঢক ঢক করে অনেকটা পানি খাচ্ছে। গ্লাস নামিয়ে রেখে ভিখারি আবার ভাত খেতে শুরু করতো, তার উদাস চোখ তাকিয়ে থাকতো কোন অনির্দিষ্টের দিকে।
রানু জিজ্ঞেস করে, রান্না ভালো হয়েছে?
হ্যাঁ।
জিজ্ঞেস না করলে তো বলতে না। খুশি করার জন্যে বলছো?
অনেকে আগ বাড়িয়ে রান্না ভালো হয়েছে বলতে পারে। বিজু কেন যে পারে না! তার ধারণা, খাওয়ার ধরণ দেখেই বোঝার কথা রান্নাটা সে পছন্দ করে খাচ্ছে, নাকি শুধু গিলে যাচ্ছে! মুখ ফুটে বলতে হবে? নিজের বউকেও? অন্য মানুষের বাড়িতে হলে আলাদা কথা।
রানুর কথায় বলে, খুশি করার জন্যে বলবো কেন? সত্যি, তাই বলছি।
আরেকটু মাংস নাও। মাছভাজা দিই একটা?
বিজু চোখ তুলে রানুকে দেখে। আস্তে আস্তে বলে, একটা কথা বলবো রানু?
জিজ্ঞাসা চোখে নিয়ে তাকায় রানু, কী কথা?
ম্লান হেসে বিজু বলে, জানো এই যে তুমি এখন সামনে বসে আছো, আমার খেতে খুব অস্বস্তি হচ্ছে।
নার্ভাস একটা হাসি ফোটে রানুর মুখে। বলে, আমি থাকলে অস্বস্তি হবে কেন?
না, অনেকদিন অভ্যাস নেই তো! একা একা খেতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি।
একটু চুপ করে থাকে রানু। চোখ নামিয়ে ডান হাতের একটা আঙুল দিয়ে টেবিলে কিছু একটা খুঁটছিলো। শ্বাস ফেলে অস্পষ্ট করে বলে, আমাদের সম্পর্কটা কোথায় এসে দাঁড়ালো, বলো তো!
আমিও তাই ভাবি, রানু। মনে হয়, এরকম হওয়ার কথা ছিলো না। খুব ভেবে দেখলে কিন্তু সত্যিকারের বড়ো কারণও কিছু পাওয়া যাবে না। তবু এটাই সত্যি এখন।
আমি তাহলে উঠে যাই?
তোমাকে উঠে যেতে কিন্তু বলিনি রানু। ভুল বুঝো না, কথাটা বলা দরকার মনে হলো, তাই বলা।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

