আগের রাতে আড্ডাবাজির খেসারত দিতে হল ফজরের সময় ঘুম থেকে উঠতে গিয়ে। জানতাম ওই কান্ড হবে, তাই সবাই এলার্ম দিয়ে রেখেছিলাম। সকাল সোয়া ছয়টা থেকে এক একটা মোবাইলে এলার্ম বেজে উঠছে আর সবাই মিলে কোনমতে মাথা তুলে ওটা ঘরের কোনায় ছুড়ে ফেলার ব্যবস্থা করে আবার ঘুম। আধা ঘন্টা ওই করে কোন মতে উঠলাম সূর্যের সাথে পাল্লা দিতে।
ফজর পড়েই বিছানা তুলে ফেলার ব্যবস্থা করা হল। তখন বিছানায় গা এলালেই মৃতু্য অনিবার্য, সেদিন আর কোথাও ঘোরা লাগত না! হোস্ট অ্যাশ আপু বিছানায় পড়েই ঘুম। হোস্ট তুলে গালাগালি করার পরে উঠল, আমাদের নাস্তার ব্যবস্থা করল। সবাই মিলে লাঞ্চ বানিয়ে, প্যাক করে নয়টার জায়গায় দশটায় বাসা থেকে বেরুলাম। বাস স্টপে গিয়ে দেখি আর এক ঘন্টার মধ্যে বাস আসবে না। কি আর করা, হাঁটা দিলাম সবাই, দুরের বাস স্টপ থেকে বাস ধরব। পথেই একটা কৃত্রিম হৃদ। অবশ্য দেখে বুঝার উপায় নেই, অদ্ভূত সুন্দর। ওই হৃদের কাছাকাছি গিয়ে ইমু পাগল হয়ে গেল। ইমাকে আমরা ডাকি ইমু, পশু পাখি খুব পছন্দ করে বলে। ইমু বেগম স্বজাতির খোঁজ পেয়েছে, পাখির ছবি তুলতে তুলতে আমার ক্যামেরার অর্ধেক মেমরি খরচ করে ফেলল। 2 নম্বর ছবিটা ওর তোলা, ওই লেইকের ধারে। অবশ্য পাগল হওয়ার কারণ ছিল ভালই। আগের দিনের মেঘলা আকাশের পুরো উল্টো কান্ড, সকাল থেকেই স্বচ্ছ, নীল আকাশে শরতের মত দু এক টুকরো ছেঁড়া মেঘের ভেলা উড়ে বেড়াচ্ছে। একদম মন ভাল হয়ে যাওয়ার মত কান্ড কারখানা। বিশেষত আমার জন্য। আকাশ আমার মনের আয়না। ওখানে মেঘ জমলেও মনে মেঘ জমতে চায়। আর এরকম মিষ্টি রোদ গায়ে মেখে উচ্ছ্বল হয়ে যেতে পারি।
বাসে করে ক্যানবেরা সিটিতে এসে ভাবলাম ভুল জায়গায় চলে এলাম নাকি... শহরের একদম মাঝখানে এখানে সেখানে দু'তিনজন মানুষ হেলতে দুলতে ঘোরাঘুরি করছে, ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে দেখার সময় পাচ্ছে! সিডনীর সাথে এক নিমেষে তুলনা করে নিলাম। সিডনী শহরে হাজার মানুষের ভিড়ে একা হওয়া খুব সহজ। শত শত রং বেরঙের মানুষ প্রবল ব্যস্ততায় সারাক্ষণ ছুটাছুটি করছে। একজন মানুষকে পাঁচ সেকেন্ডের বেশি দেখা যায় না, তার আগেই ত্রস্তভাবে ভিড়ে মিলিয়ে যায়। এখানে মানুষ 'সিটি' কথাটারই প্রবল অপমান করছে। দোকানপাট সেই এগারোটার সময়ও বন্ধ বা মাত্র খুলছে। অবাক হয়ে শাটার টিপতে লাগলাম। ক্যানবেরার নতুন নামকরণ করলাম আমরা, 'দি ডেড সিটি'। এক এক বার মনে হচ্ছিল রাস্তার মাঝ খানে ছক কেটে কুত কুত খেলা শুরু করে দেই। পুরো সিটিতে হাঁটলাম ঘন্টা খানেক, ট্রাফিক লাইট পেলাম মোট তিনটা। রাস্তা পার হতে হতে কয়েক পাক ঘুরে নেচেও নেয়া যায়। রাউন্ড এবাউটে তেছড়া করে রাস্তা পার হলাম, যেটা সিডনীতে অকল্পনীয়। অবশ্য গাড়ি আসতেই অতিরিক্ত সতর্কতার সাথে দেঁৗড় দিচ্ছিলাম। আর যাই হোক বাবা, ক্যানবেরার মত জনমানবহীন সিটির রাস্তায় গাড়ির নিচে চাপা পড়াও বুদ্ধিমত্তার চরম অপমান!
আসলে সিটিটাতে অল্প কিছু সংখ্যক মানুষ থাকে, কারণ এই শহরটা শান্ত, সুন্দর আর সরকারী ভবনে ভরে রাখার জন্য সরকার সচেতন চেষ্টা করছে।
শপিং সেন্টারে ঢুকেই টাসকি খেলাম। একে তো পিচ্চি দ্যা গ্রেইট, তার উপর দাম হাঁকিয়ে বসেছে সিডনীর তিনগুণ। দোকানে মানুষ জনও নাই একদম। ধুস! স্টার বাকসের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তাসিন হঠাৎ স্বপ্নীল হয়ে উঠল 'মক্কা'র কথা ভেবে। সবচেয়ে মজার কফি নাকি। আমি বললাম, তাই নাকি, খাই নাই কখনও। তাসিনের মুখ দেখার মত হল, 'কি বল এসব? মককা খাও নাই? দ্যাটস ইট, আস আমার সাথে...' একটা বড় সড় সাইজের মককা কফি কিনে আমার হাতে ধরিয়ে দিল। ভাল বুদ্ধি পাওয়া গেল, এর পর থেকে যাই দেখি তাই তাসিনকে শুনিয়ে বলি, কখনও খাই নাই!
শহরে হাঁটাহাটি করার সময় সিনেমা হলের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় পাইরেটস অফ ক্যারিবিয়ানের পোস্টার দেখে সবাই ছিহনেমা দেখার ইচ্ছা প্রকাশ করল। আমি পড়লাম বিপাকে। মাত্র গত সপ্তাহে মীরার সাথে গিয়ে এত্তগুলো ডলার খরচায় দেখে আসলাম মুভিটা! অন্য কি মুভি আছে দেখতে গিয়ে তীব্র বিবমিষা হল, 'লিটল ম্যান' আর 'মাই সুপার এক্স গার্লফ্রেন্ড'! ইম্পসিবল! আমাকে টাকা দিলেও আমি ওই মুভি দেখার যন্ত্রনাময় অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাব না। আমাকে বিতৃষ্ণ করার জন্য বিজ্ঞাপনগুলোই যথেষ্ট ছিল। গণভোটে পাইরেটস অফ ক্যারিবিয়ান বিজিত হল। আমি বুক পাথর চেপে মানিব্যাগের টাকা গুণা শুরু করতেই অ্যাশ আপু বিশেষ ঘোষণাটা দিল। ও, ক্যানবেরায় আমাদের মেজবান হিসেবে আমাদের মুভির টিকেট কিনে দিতে চায়। কড়া নিষেধ, 'কেউ না করতে পারবা না, আমি কিচ্ছু শুনতে চাই না। নো বাড়াবাড়ি।' বাঁচলাম, না করব কেন? আমারে পাগলে পায় নাই!
আবারও জনি ডেপের মুগ্ধকর অভিনয় দেখলাম। শেষটুকু একেবারেই অপ্রত্যাশিত ছিল, রাতে ঘুমুতে যাওয়ার আগেও কিছুক্ষণ তা নিয়ে গবেষণা চলল। সিনেমা হল থেকে বেরিয়ে টের পেলাম ক্ষুধায় পেট চো চো করছে। ভিতরে ঢুকার সময় এক গাদা চিপস আর চকলেট কিনে নিয়েছিলাম কিন্তু তিন ঘন্টা ধরে ডেভি জোনসের ধমক খেয়ে ওগুলো হজম হয়ে গেছে। আমরা তখন পার্লামেন্ট হাউজের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া কৃত্রিম হৃদের খোঁজে বেরুলাম, ওটার পাশে বসে খাব।
(চলবে)
[ইটালিক]বি:দ্র: এই সিরিজের নামে অরিজিনালিটি নেই, কৃতজ্ঞতা স্বীকার করছি মুখফোড়ের ছড়ার। পুরো সিরিজটাই উৎসর্গ করলাম ধূসর গোধুলিকে।[/ইটালিক]
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



