বাসায় পেঁৗছে বুট খুলে অজু করে নামাযে দাঁড়াতেই টের পেলাম শরীরের এখানে ওখানে অনেকগুলো স্ক্রু আজ খুলে পথে ঘাটে হারিয়ে এসেছি। শরীর ভেঙে আসছিল। অ্যাশ আপু তো শুয়েই ঘুম। কিছুক্ষণ ছড়িয়ে ছিটিয়ে ঘরের উষ্ণতায় গা এলিয়ে দিয়ে গল্প করলাম। তারপরেই ডাক পড়লো ডিনারের। আন্টির দারুণ রান্না খেতে খেতে গল্পালাম। তারপরে বুঝলাম আন্টির পিচ্চিগুলাকে একটু জালানো দরকার। লেগে গেলাম ওদের সাথে 'ক্লুডো' খেলায়।
হুড়োহুড়ি মার্কা ক্লুডোয় ইমু জিতে গেল। তখন ভাবছি রুমে গিয়ে লেপের নিচে বসে মুভি দেখব তখন অ্যাশ আপুর হাঁটতে যাওয়ার প্রস্তাবনা। অত রাতে সিডনীতে রাস্তায় হাঁটার কথা চিন্তা করা যায় না। মাঝে মাঝে ইউনিভার্সিটি থেকে ফিরতে অনেক রাত হয়ে গেলেও বাসার কেউ এসে স্টেশন থেকে তুলে নিয়ে যায়। ক্যানবেরায় মানুষই নেই, পথে ঘাটে হুজ্জোতি করবে কে? তাই নিরাপদ! একমাত্র ভয়: বাইরে তখন হাড় কাঁপানো শীত। নো প্রবলেমো, সবাই শীতের বিরুদ্ধে কঠিন ব্যবস্থা নিলাম, নিজেদের চারপাশে দুর্গ তৈরি করে। আমি পড়লাম এগারো প্রস্থ পোশাক। ডাবল কোটেড, বুটেড, মোজাড, গ্লাভড, হিজাবড। তারপরে তড়িঘড়ি করে ঘর থেকে বেরুলাম বাইরের অন্ধকারে কারণ এক একজনকে কাপড়ের পাহাড়ের আড়ালে যেই কিম্ভূত লাগছিল, সেটা দেখা আমাদের সহ্যক্ষমতার বাইরে। ততক্ষণে আশে পাশের সব বাড়ির লাইট নিভে গেছে। কিন্তু পাহাড়ের মাঝ দিয়ে এঁকে বেঁকে চলা রাস্তার অনিয়মিত লাইটগুলো আছে। আর আছে অনেক দুরের পাহাড়ের গায়ে বাড়ি ঘরে জ্বলে থাকা প্রদীপের মত বাতি। দুর থেকে দেখতে কি যে সুন্দর লাগছিল! ঘুরতে ঘুরতে একটা ব্রিজের নিচে দিয়ে চলে যাওয়া সরু পথ ধরে এগুনোর সময় আসল। ওখানে ঘুটঘুটে অন্ধকার। ব্রিজের বাইরে আকাশের তারার আলোয় পথ চিনতে হল, ব্রিজের নিচে মোবাইলে ক্যামেরার ফ্লাশ জালিয়ে। মজা লাগল, সিডনীতে ঠিক এই রকম জায়গাগুলোতে দিনের বেলায় যেতেও ভয় লাগে, মদের ভাঙা বোতলের ছড়াছড়ি তাই! ওখানে জায়গাটা একদম পরিষ্কার। কখনও কেউ হেঁটেছে কি না সন্দেহ হল!
হাঁটতে হাঁটতে একটা লেইকের পাশে চলে আসলাম। লেইকের অন্য পাশে পায়ে হেঁটে যাওয়ার রাস্তার আলো দুর থেকে দেখে প্রদীপ বলে ভ্রম হয়। লেইকের স্থির পানিতে সে সারি সারি প্রদীপ মেলা অপুর্ব প্রতিবিম্ব সৃষ্টি করছে। ছবি তোলার চেষ্টা করেও পারলাম না, ক্যামেরায় তোলা ছবি দেখে কান্না পায় আর কি, কত্ত সুন্দর আসল দৃশ্যটা! গান গাওয়ার জন্য একদম পারফেক্ট পরিবেশ। ভাবও এসে গেল। কিন্তু গান গাইতে গিয়েই বিপাকে পড়লাম, এখানে রবীন্দ্র শ্রীকান্ত হেলাল দুরে থাক, বাংলা গানেরই সমঝদার নেই! কি আর করা, নিজ মনেই কিছুক্ষণ গুণ গুণ করলাম, 'সহে না যাতনা...'
তখন কোথথাও কেউ নেই। নিজেদের মধ্যে ছোট খাট একটা দেঁৗড় প্রতিযোগিতাও হয়ে গেল। দারুণ লাগল। অনেক দিন না দেঁৗড়িয়েও ভালই দেঁৗড়াতে পারলাম, কোন পেশীতে টানটুন পড়ে নি!
বাসায় ফিরতে ফিরতে দেঁৗড়া দেঁৗড়ির বদৌলতে ঠান্ডা উধাও। কিন্তু ক্লান্তি জেঁকে ধরেছে খুব করে। হাঁটতে ভালবাসি ঠিক, বিশেষত প্রিয় মানুষের সাথে... হেঁটে হেঁটে পৃথিবীর অন্য প্রান্তে চলে যেতে পারব ঠিক। কিন্তু সারা দিন কম হাঁটা হয় নি যে! হিসেব করে দেখলাম কম সে কম দশ কিলোমিটার হবে।
কাপড় পাল্টে বিছানা তৈরি করে লেপ মুড়ি দিয়ে খাবারের স্টক নিয়ে বসে গেলাম মুভি দেখতে। 'জনি কিউ'। গ্যানজেল ওয়াশিংটনের অভিনয় দেখতে দেখতে চোখের পানি নাকের পানি মিলিয়ে নিজের আস্তমেয়েত্ব আবারো প্রমান করলাম! এর পরে আবারও গভীর রাত পর্যন্ত আড্ডাবাজি, হা হা হি হি। রাত গভীর হওয়ার সাথে সাথে হিস্টেরিয়া বেড়ে গেল। তাসিন বিছানা থেকে পড়ে গেল, হাসতে হাসতে আমার পেট ব্যাথা হয়ে গেল।
(চলবে)
[ইটালিক]বি:দ্র: এই সিরিজের নামে অরিজিনালিটি নেই, কৃতজ্ঞতা স্বীকার করছি মুখফোড়ের ছড়ার। পুরো সিরিজটাই উৎসর্গ করলাম ধূসর গোধুলিকে।[/ইটালিক]
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



