somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

শৈশবের ডাব চুরি, হাঁস কান্ড আর শেওলা জমা স্মৃতির দিনগুলো

২১ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ৯:২০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


ন​ব্বইয়ের দশক বা দুইয়ের দশকের শুরুর সেই দিনগুলোর কথা মনে হলে বুকটা কেমন যেন এক অদ্ভুত নস্টালজিয়ায় ভরে ওঠে। তখন জীবনটা কত সহজ ছিল! দায়িত্ব বলতে ছিল কেবল স্কুল আর পরীক্ষা। পরীক্ষা শেষ হলেই ব্যাগ গুছিয়ে ছুটতাম নানা জায়গায় বেড়াতে। এর মধ্যে আমার সবচেয়ে প্রিয় একটা জায়গা ছিল—বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজের সামনের ফোর কোয়ার্টার।

হাসিনা ফুফুর কোয়ার্টার ও নিপু আপার বাসা

​সেখানে থাকতেন আমাদের হাসিনা ফুফু (বাবার বড় ফুফুর মেয়ে)। পরীক্ষা শেষ কিংবা স্কুল বন্ধ থাকলেই আমি ছুটে যেতাম তার বাসায়। ফুফুর কোয়ার্টারের বাসাটা সবসময় গমগম করত মানুষে। শেরেবাংলা মেডিকেলে চিকিৎসা নিতে আসা দূর-দূরান্তের রোগী আর আত্মীয়-স্বজনে ভরপুর থাকত সেই ঘর। হাসপাতালের বেডে তো সবার জায়গা হয় না, তাই রোগীর সঙ্গে আসা অনেক স্বজনই রাত কাটাতেন ফুফুর বাসায়।

​ফুফুর বাসায় গেলে আমাদের ঘুমানোর ব্যবস্থা হতো একটু সামনেই, নিপু আপুর বাসায়। বর্তমান যে ৩০ গোডাউনের রোডটা, স্টেডিয়ামের পাশ দিয়ে চলে গেছে—সেখানেই ছিল সেই বাসা। প্রতিদিন রাতে খাওয়া-দাওয়া সেরে আমি আর ফুফুর বড় ছেলে অপু ভাইয়া গল্প করতে করতে নিপু আপুর বাসায় ঘুমাতে যেতাম। অপু ভাইয়া আমার চেয়ে বয়সে সামান্য একটু বড় ছিল (আহা, ভাইয়া আজ আর আমাদের মাঝে নেই)।

​সেই রাতে হাঁটার সময় একটা ছোট্ট নারিকেল গাছ ছিল ওয়ালের পাশে। হঠাৎ অপু ভাইয়া বলে বসল, "সোহেল, নারিকেল চুরি করবি?" এই কথা শুনতেই আমার কেন যেন ভীষণ হাসি পেত। ও যখন ওয়াল টপকে ডাব পাড়তে গেল, ঠিক তখনই খটখট শব্দ হতেই আমি খিলখিল করে হেসে দিলাম! আমার হাসিতে তো ভাইয়া আমার ওপর বেজায় ক্ষেপে গেল। কষ্ট করে একটা ডাব পেরে নিয়ে এসে নিপু আপুর বাসায় কেটে খাওয়ার সময় আমাকে এক ফোঁটাও দিল না! উল্টো ধমক দিয়ে বলল, "তোকে তো দেবো না, তুই আরও বিপদে ফেলতি। তোর জন্য অল্পের জন্য ধরা খাইনি!" আজ ভাবলে সেই ছোটবেলার ভাইয়ার ওপর করা রাগ আর মধুর স্মৃতির কথা ভেবে হাসি পায়।

ভিসিআর দেখার শখ আর সেই বিখ্যাত ‘হাঁস কান্ড’

​আরেকটি ঘটনা হয়তো ২০০০ বা ১৯৯৮ সালের দিকে ঘটেছিল। তখন আমাদের এলাকার কিশোর মনগুলোতে ভিসিআর-এর নেশা চেপে বসেছিল। ফিতাওয়ালা ক্যাসেটের সেই ভিসিআর আর একটা কালার টিভি গ্রামগঞ্জে ভাড়া করে মুভি দেখার ধুম পড়েছিল। বন্ধুরা মিলে সবাই বুদ্ধি করলাম, আমরাও একটা ভিসিআর শো করব। কিন্তু ভিসিআর ও টিভির তখনকার দিনে ভাড়া ছিল ৫০ থেকে ৬০, কিংবা ১০০ টাকার মতো। এত টাকা পাব কোথায়?

​মাথায় এক অদ্ভুত ও মারাত্মক ‘আইডিয়া’ এলো—হাঁস চুরি করে বিক্রি করব, আর সেই টাকা দিয়ে ভিসিআর দেখব!

​যে কথা সেই কাজ। পরিকল্পনা করার ঠিক পরের দিনই আমাদের বাসার পাশেই এক চাচির বাড়ি থেকে অপারেশন শুরু করলাম। চাচির ভাইয়ের জমিতেই তারা থাকতেন। ওনার মেয়ের নাম রানু ছিল বলে সবাই তাকে ‘রানুর মা’ বলে ডাকত। তার একটা তাজা ডিম পাড়া হাঁস আমরা সুযোগ বুঝে হাতসাফাই করলাম।

​চুরি করা সেই ডিম পাড়া হাঁস নিয়ে আমরা দলবে বেঁধে চলে গেলাম রূপাতলী থেকে কালেজিরা হাটে। সে যুগে একটা ডিম পাড়া হাঁস আমরা মাত্র ৪০ টাকায় বিক্রি করে ফেললাম! কিন্তু বিক্রি করে আর রক্ষা হলো কই? হাঁস বিক্রি করতে না করতেই এলাকায় হৈচৈ পড়ে গেল—"হাঁস কই? হাঁস খুঁজে পাওয়া যায় না!" ডিম পাড়া হাঁস গায়েব হওয়ার পর এলাকায় কাণ্ড শুরু হলো। শেষ পর্যন্ত সালিশি বসল এবং আমরা যারা এই চুরির সাথে জড়িত ছিলাম, সবার নাম ফাঁস হয়ে গেল।

​অভিভাবকরা যখন জানতে পারলেন, তখন আমাদের মানসম্মান বাঁচাতে তারা নিজেরাই এগিয়ে এলেন। আমরা হাঁসটি বিক্রি করেছিলাম মাত্র ৪০ টাকায়, কিন্তু সালিশে ভর্তুকি দিয়ে সেই হাঁসের দাম মেটাতে হলো ৩০০ টাকা! তৎকালীন সময়ে ৩০০ টাকা অনেক বড় অংকের টাকা ছিল।

মায়ের ভালোবাসা ও কাঞ্চির মাইর

​বাড়ি ফিরতেই শুরু হলো আমার জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় ‘শাল্ডিং’ বা মাইর। আম্মার হাতে ধরা পড়তেই তুনির কঞ্চি দিয়ে জমপেশ পিটুনি শুরু হলো। পিঠের ছাল তোলার জোগাড়! হাত বেঁধে বসিয়ে রাখা হয়েছিল ঘরে।

​তবে সেই শাস্তি আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। আম্মার সেই কঠোর শাসনের পর মা আমাকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন এবং বুঝিয়ে বলেছিলেন। সেদিন থেকে তওবা করেছিলাম—জীবনে আর কখনো এই ধরনের দুষ্টুমি বা চুরির পথে পা বাড়াবো না।

​আজ এত বছর পর যখন সেই পুরোনো কোয়ার্টার, ৩০ গোডাউনের রাস্তা, অপু ভাইয়ার ডাব চুরি কিংবা হাঁস কান্ডের কথা মনে হয়, তখন মনে হয় শৈশবের সেই দিনগুলোই ছিল জীবনের সবচেয়ে দামি সোনাঝরা দিন।
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ৯:২০
৪টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

অবশেষে শেষ হলো! কিন্তু তিনি ফিরবেন কবে?

লিখেছেন ঋণাত্মক শূণ্য, ২০ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ১০:৩৫

আমি সর্ব প্রথম আগ্রহ নিয়ে ফুটবল ওয়ার্ল্ডকাপ দেখেছিলাম ১৯৯৮ তে। তখন আমি ক্লাস ৮এর ছাত্র।



আমার বড় ভাইয়ের তখন ফ্রান্সে যাবার কথা আমার আম্মার এক আত্মীয়ার বরের ব্যবসা ছিলো ফ্রান্সে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

অহনার কীর্তিকলাপ, কিংবা পাগলামি, কিংবা ভালোবাসা

লিখেছেন সোনাবীজ; অথবা ধুলোবালিছাই, ২১ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ১:২১

অহনা খুব জ্বালাতন করতো, অর্থাৎ খুব জ্বালাত,
বা বিরক্ত করতো আমাকে, যেমন, হঠাৎ হঠাৎ মাঝরাতে
মোবাইলে কল করে বলতো, ‘তুই যে ঘুমিয়েছিস, ঘুমানোর
আগে কি আমার কথা ভেবেছিস? বল, কতবার ভেবেছিস?
তাহলে একবার... ...বাকিটুকু পড়ুন

FIFA বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬ এর ফাইনাল খেলা নিয়ে আমার সামান্য কিছু কথা

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ২১ শে জুলাই, ২০২৬ সকাল ৯:২৮

গতকালের FIFA বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬ এর ফাইনাল খেলায় মেসি অত্যন্ত নিষ্প্রভ ছিলেন। দর্শকদের তাকে মাঠে খুঁজতে হয়েছে, তিনি তার চিরাচরিত স্বভাব অনুযায়ী এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে, মাঠের সর্বকোণে বল... ...বাকিটুকু পড়ুন

চেতনা, ৭১ , পাকিস্তান ঘৃনা ও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট।

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ২১ শে জুলাই, ২০২৬ সকাল ১০:০৫


যুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত বাংলাদেশ ও যুদ্ধবিধ্বস্ত ভিয়েতনাম দুটো দেশের অর্থনৈতিক যাত্রা শুরু হয় প্রায় একই সময়ে কিন্তু তুলনামূলক ভিয়েতনামের চেয়ে বাংলাদেশের অবস্থান অনেক ক্ষেত্রে ভালো ছিল। বাংলাদেশে ছিল অনেক ভারী... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকে আমার মন ভালো নেই

লিখেছেন সামিয়া, ২১ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১:০৯



দুঃখের সময়ে নানান মানুষের কথা মনে পড়ে। খুব কাছের মানুষের কথা মনে পড়ে আবার অনেক দূরের মানুষের কথাও মনে পড়ে। রক্তের আপন মানুষের কথা তো মনে পড়েই তবু একদিন কীভাবে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×