somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পেশার সাথে সম্মানের সম্পর্ক

০৮ ই এপ্রিল, ২০১৫ বিকাল ৩:৩৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

কোন কাজ কখনও ছোট হয় না, ছোট হয় মানুষের মানসিকতা। আমাদের সমাজে এমন অনেক মানুষ আছেন, যারা সমাজের নানা ধরণের পেশাকে নানা ভাগে ভাগ করে থাকেন। পেশার মধ্যে সম্মান-অসম্মানের দুটি পর্যায় দাঁড় করান। যেমন, মা-বাবারা অনেক সময় তাদের সন্তানদের শিখিয়ে দেন সমাজের নিচু তলার মানুষদের সাথে বা তাদের ছেলেমেয়েদের সাথে না মিশতে (যদিও আমার মাবাবা আমাকে এমন শিক্ষা দেননি এবং অনেক মাবাবাই দেন না)। এ থেকে যারা নিম্ন আয়ের মানুষ তারাও বুঝে যান তারা নিচু তলার মানুষ, অবজ্ঞার পাত্র এবং তাদের পেশা খুব একটা সম্মানজনক নয়।

এমন আরও উদাহরণ আছে। ভাড়া নিয়ে সমস্যা হলেই রিকশাওয়ালা বা বাসের হেল্পারের গায়ে হাত তোলা (তাদের বয়স যাই হোক), শ্রমিক পেশার মানুষকে 'তুই' বলে সম্বোধন করা, কথায় কথায় গালি দেওয়া ইত্যাদি। এসব করে সমাজের তথাকথিত উঁচু তালার মানুষ বা তাদের ছেলেমেয়েরা শ্রমিক পেশার মানুষকে তাদের অধিকার, বাক স্বাধীনতা, ক্ষমতা, সম্মান ইত্যাদি সম্পর্কে একটা পরিষ্কার ধারণা দিয়ে দেন। ফলে শ্রমিক পেশার মানুষেরা সব সময় তাদের পেশা নিয়ে হীনমন্যতায় ভুগতে থাকে। তারা ভাবতে শুরু করে যে তারা আসলেই নিচু স্তরের মানুষ। যদিও তা সত্যি না। মানুষের কোন স্তর হয় না। কাজ কখনও ছোট বা বড় হয় না।

আমার প্রশ্ন হল মানুষ কেন এমনটা ভাববে? একটা সভ্য সমাজে সব মানুষ কেন অধিকারের দিক থেকে সবাইকে সমান ভাবতে পারে না? সৎ কাজের সাথে অসম্মানের ঠিক কি সম্পর্ক? সেটা কি মানবতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, নাকি না?

একবার তুরাগ সিটিং সার্ভিসে চড়ে রামপুরা থেকে বসুন্ধরা যাচ্ছি। বাসে দুইজন লোক ভাড়া নিয়ে হেল্পারের সাথে ঝগড়া লেগে গেল। ঝগড়ার এক পর্যায়ে দুইজনের মধ্যে একজন হেল্পারকে খুব বাজে একটা গালি দিল। ঐ লোক দুইজনের পেছনে আরও দুইজন লোক বসে ছিল। তারা ব্যাপারটার প্রতিবাদ করল এবং বলল, "ভাড়া নিয়ে আপনার সমস্যা থেকতেই পারে, সেটা আপনি সুন্দরভাবে বলতে পারতেন, কিন্তু আপনি একজন শ্রমিককে গালি দিতে পারেন না"। ঘটনাটা আমাকে ভাবিয়ে তুলল। আসলেই তো, নিচু স্তরের পশু থাকতে পারে, কিন্তু নিচু স্তরের মানুষ থাকতে পারে না! একজন শ্রমিক যে চুরি চামারি করে না, খেটে খেয়ে বাঁচে, তাকে অসম্মান করা অনেক বড় স্পর্ধার ব্যাপার। কারণ সে সৎ পথে রোজগার করে, অবৈধভাবে না। এমন স্পর্ধা একটা সভ্য দেশে যাতে কারও না হয়। সৎ কাজ কখনোই নিম্ন শ্রেণীর কাজ না। নিম্ন শ্রেণীর কাজ বলতে যদি কিছু থেকে থাকে তবে সেটা অসৎ পথে অর্থ উপার্জন, যা অনেক উঁচু তলার মানুষ করে থাকেন।

এবার আসি কাজ নিয়ে লজ্জা পাওয়া বা গর্ব বোধ করার বিষয়ে। আমাদের সমাজে এমন অনেক লোক আছেন যারা নিজের পেশা নিয়ে লজ্জা পান। আবার এমন অনেকে আছেন যারা মাত্রাতিরিক্ত গর্ববোধ করেন। এর কোনটাই ঠিক না। সৎ পথে অর্থ উপার্জনে লজ্জার কিছু নেই, বরং গর্বের ব্যাপার আছে। লজ্জা পাওয়া উচিৎ তাদের, যারা অসৎ পথে উপার্জন করে।

মাসখানেক আগে যে কোন একটা ইলেকট্রনিক পন্য কেনার জন্য একটা নামকরা ইলেক্ট্রনিক পন্যের শোরুমে গেলাম। শোরুমে আমার এক কলেজ ফ্রেন্ড এর সাথে দেখা হয়ে গেল। ভাবলাম সেও কিছু কিনতে এসেছে। কথার একপর্যায়ে জানলাম সে ঐ শোরুমের একজন সেলসম্যান। খেয়াল করেছিলাম, আমি যখন শোরুমে ঢুকছিলাম তখন সে আমাকে দেখে একটু নার্ভাস হয়ে পড়েছিল, যেই নার্ভাসনেস আমি শোরুম থেকে বের হওয়ার আগ পর্যন্ত ছিল। ওর সাথে কথা বলতে গিয়েই আমি ব্যাপারটা ধরতে পারি। বুঝলাম সে লজ্জাবোধ করছে। আমি তাকে সেলসম্যান হিসেবে দেখে ফেলেছি এবং হয়তো সে ভাবছে আমি তাকে নিয়ে অন্যদের সাথে হাসি ঠাট্টা করব। আমার কাছে পুরো ব্যাপারটাই খুব খারাপ লাগল।

সেলসম্যানের চাকরি মানে তো সৎ পথে অর্থ উপার্জন, এখানে লজ্জা পাওয়ার কি আছে? বরং তার তো বুক ফুলিয়ে বলা উচিৎ যে সে অসৎ পথে অর্থ উপার্জন করে না। আর উন্নত দেশগুলোতে অনেক কোটিপতির ছেলেও পড়াশোনার পাশাপাশি সেলসম্যানের কাজ করে, তারা তো লজ্জা পায় না! বরং লজ্জা পাওয়া উচিৎ আমাদের মত মানুষের, যারা বয়স হওয়ার পরও বাপের হোটেলে বসে বসে খায়, কিছুই করতে পারে না। আমি লজ্জিত, সত্যিই লজ্জিত। আমি লজ্জিত সেই সব মানুষের জন্য যারা সৎ পেশাকে সম্মান করতে জানে না। যাদের কারণে পরিশ্রমী মানুষকে তাদের পেশা নিয়ে লজ্জা পেতে হয়।

লেখা- ইয়াসীন মারুফ
শখের লেখক ও গবেষক
ফেইসবুক আইডিঃ https://www.facebook.com/yeasinmaruf
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই এপ্রিল, ২০১৫ বিকাল ৩:৩৭
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

চট্টগ্রাম বন্দরঃ জাতীয় স্বার্থ, দক্ষতা ও ডিপি ওয়ার্ল্ড.....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:৪৮

চট্টগ্রাম বন্দরঃ জাতীয় স্বার্থ, দক্ষতা ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি....

বন্দর শুধু রাজস্ব আয়ের প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ প্রতিযোগিতার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামহোয়্যারইন ব্লগের সেরা ব্লগার

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১১:০৮



আমাদের দেশে যে কোনো ক্রিটিক্যাল সময়ে লক্ষ্য করা যায় কোনো না কোনো পণ্যের অভাব লেগে গিয়েছে। কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ, ভোজ্য তৈল এমনকি রিলিফ গায়েব হয়ে যায়। বন্যায় আক্রান্ত বন্যায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

তৌহিদি জনতা কবে দেশ রক্ষায় আন্দোলনে নামবে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:০১


আলহামদুলিল্লাহ। তৌহিদি জনতার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সুনামগঞ্জে মেয়েদের একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচ বন্ধ করা গেছে। ইসলামের দৃষ্টিতে মেয়েদের খেলাধুলা নিষিদ্ধ এবং অশ্লীল কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়। সুনামগঞ্জের মাটিতে এমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কি আসলেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

লিখেছেন অন্তর্জাল পরিব্রাজক, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৮:৪৪



“রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন “, “মূর্খের দেশে আবার কীসের বিশ্ববিদ্যালয়” – এসব প্রচারণা আমাদের দেশে অনেকদিন ধরেই হয়ে আসছে। বিশেষ করে ফেসবুকে আকছারই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১৯৭১ঃ নদী-নালায় ভেসে থাকা স্বদেশের কান্নাঃ শহীদদের প্রতি নিবেদিত একটি কাব্যগাথা জাতির রক্ত, অশ্রু ও স্বাধীনতার অমর ইতিহাস

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:০৫


পঁচিশে মার্চ ১৯৭১
রাত্রি তখন গভীর, নগরীর বাতিগুলো
যেন অনাগত বিপদের সামনে অসহায়
ঢাকার আকাশে হঠাৎ গর্জে উঠল কামান
ট্যাংকের চাকার নিচে কেঁপে উঠল রাজপথ
গুলি ছুটে গেল মানুষের ঘুমন্ত জানালায়
আগুন ছড়িয়ে পড়ল... ...বাকিটুকু পড়ুন

×