
ভর দুপুরে পুকুর দাবড়িয়ে বাড়ি ফেরা ছেলেটি এখন শান্ত, পেটে প্রচণ্ড ক্ষুধা। সেই সকালে কিছু মুড়ি হাঁতে বেড়িয়েছিল, ফিরল গোসল শেষে। বাসায় কেউ নেই, ‘মা’ হিন সংসারে যে কি জ্বালা তা ক্ষুধা লাগলে বড় বেশী টের পাওয়া যায়।
বাবাকেও খুজে পাওয়া যাচ্ছে না, হয়তো কাজে বাইরে গেছে। আগে বছর জুড়ে কাজ থাকত, বাবাও হাঁসি মুখে থাকতেন। এখন চাষাবাদ সবাই কমিয়ে করছে, কাজের বড় অভাব। তাঁর উপর নিজের জমিজমা বলতে কিছুই বাকী নেই, মায়ের অসুখের সময় সব বেঁচে দিয়েছে, এখন সম্পদ বলতেই ভাঙ্গা এই ভিটে বাড়ি আর মায়ের সবুজ কবর।
মা মারা যাবার বছর দেড়েক পার হয়েছে, সবাই বাবাকে বিয়ের কথা বলে। নতুন একটি বিয়ে করে সংসারী হতে বলে সবাই, তবে বাবা কেমন জানি বদলে গেছেন। আগের হাসিমাখা মুখটি আর দেখি না। সূর্যের সাথে পাল্লা দিয়ে বেরিয়ে যান, কাজ পেলে সূর্য ডোবার পরেই ফিরেন না হলে দুপুরে। মা কে বড় ভালবাসতেন অথবা অভাবে যেই কারনেই হোক গত দেড়টা বছর তিনি ছন্নছাড়াভাবেই চলছেন।
জানিনা আজ কখন ফিরবেন, বাসায় খাবার বলতে মাটির পাতিলে ভাত আছে। চুলাঘরটা বড় বেমানান দেখাচ্ছে, মা মারা যাবার পড় যত্ন নেবার যে কেউ নেই। প্রচণ্ড ক্ষুধায় দুইটা টমেটো পুড়ে চটকিয়ে নিলাম। অনেকের কাছেই হয়তো অখাদ্য কিন্তু আমার কাছে এটাই স্বর্গীয় খাদ্য। বরাবরই যে এমন হয় তা না, কাজ পেলে বাবা রাতে বাজার নিয়েই ফিরেন, সকালে রান্না করেই কিছু পেটে দিয়ে চলে যান। আমার জন্য সবকিছু গুছিয়ে রাখেন, কিন্তু গত তিনদিন ধরে কোন কাজ নেই তাই সব কেমন যেন গুলিয়ে যাচ্ছে।
বাবা ফিরবেন কিনা জানিনা, তাই একই থালায় কিছু ভাত নিয়ে খেতে বসলাম। কিছু ভাত বলতে সব, কারন পেট অভাব বুঝে না বুঝে ক্ষুধার জ্বালা। ভাত কিছু বেশী হয়ে গেছে, ঠিক বেশী না টমেটো চতকানোর সময় ঝালটা বেশী হয়ে গেছে। সবই পাল্টে গেছে কিন্তু পোড়া মরিচের তেজ আজও কমেনি।
এমন সময় বাবা চলে আসলেন, হাঁতে কিছুই নেই এমনকি খবার নিয়ে যাবার বাটিও না। মনে হয় খাবার নিয়ে যান নি, আর দুপুরে ফেরা মানে আজও কাজ পান নি। মুখখানা কেমন জানি শুকিয়ে গেছে, কপাল থেকে ঘাম ঝরছে। আমি ভাত রেখেই পানি আনতে গেলাম। আগে দেখতাম বাবা ফিরলেই মা পিতলের বদনাতে করে পানি দিত, বাবা তা দিয়ে মুখ ধুয়ে পানি খেত। পানি নিয়ে ফিরে দেখি বাবা আমার মাখা ভাতগুলো খেতে বসেছে। আমায় আসতে দেখে কেমন জানি লজ্জা পেল, আমি পানি রেখে হাড়ি দিকে গেলাম। বাবা ডেকে বলল, ভাত তো সব নিয়ে নিয়েছি। আমি বাবার পাশে এসে বসলাম, বাবা আমার মুখে ভাত তুলে দিল। আগেই ঝালের কারনে পানি খেয়ে পেটে ভরে গেছে কিন্ত না খেলে বাবা কষ্ট পাবে তাই খেলাম। মা কে কতো দেখেছি বাবার পাশে বসে পাখা বাতাস করতে, পানি ঢেলে দিতে। মায়ের সেই পাখাটাও নষ্ট হয়ে গেছে, আগে বাবা হাট থেকে পাখা আনত আর মা সেই পাখায় তাঁর শাড়ির আচল লাগিয়ে যে কি সুন্দর করে সেলাই করত!
বাবা আমার বানানো টমেটো চটকা দিয়ে ভাত খাচ্ছে আর আমি পাশে বসে দেখে চলেছি। আমাদের দুজনের চোখের কোণে জল। এটা কষ্টের নয় ভালোবাসার কারন আমরা কষ্ট জয় করেই বেঁচে আছি।
*মন্তব্য পড়ে মনে হয়েছে অনেকে বাবা/মা কে মৃত ভেবেছেন। বাস্তবে তারা বেঁচে আছেন এবং ভালো আছেন (যদিও মা ২০০১ সাল থেকেই অসুস্থ)। তাই লেখাটি যদি কাউকে মনকষ্টে ভোগায় তবে ক্ষমা করবেন।
আজ স্বপ্নে বাবাকে আমার টমেটো চটকা দিয়ে ভাত খেতে দেখেছি, সেটা আমার মাখানো ভাত। পরে স্বপ্ন ও কিছু বাস্তবতাকে নিয়ে সাজিয়ে লিখেছি গল্পটি।
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই নভেম্বর, ২০১৫ সকাল ১০:৪৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




