somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ভারতবর্ষ থেকে আরব এবং পুরোবিশ্ব: কালিলা ও দিমনার উপাখ্যান।

২০ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৬ রাত ১০:০৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

খৃষ্টবর্ষের চতূর্থ শতাব্দিতে কাশ্মিরসহ হিন্দুস্থানের বিশাল অঞ্চলের রাজা ছিলেন বাদশা দাবশালিম।একসময় রাজা বুঝতে পারেন ধীরে ধীরে জনগণ তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।দেশের আইন কানুন মানতে তাদের চরম অনীহা।ফলে চিন্তিত রাজা ডেকে পাঠান দেশের প্রখ্যাত জ্ঞানী দার্শনিক বায়দাবাকে।উপদেশ দিতে বলেন দার্শনিককে।গুরু তার নিয়ম মতো গল্পে গল্পে উপদেশ দেয়া শুরু করেন।একটু শুনেই লাফিয়ে উঠেন রাজা।আত্মসম্মানে ঘা লেগেছে।মৃত্যুদন্ডাদেশ দিয়ে গুরুকে কারাগারে পাঠিয়ে দেন।কিন্তু কি মনে হতেই আবার ডেকে পাঠান গুরুকে।পুনরায় উপদেশ দিতে বলেন,গুরুর কথা আস্তে আস্তে রাজার ভাল লেগে যায়।এবার গুরুকে নির্দেশ দেন উপদেশের গল্পগুলো বই আকারে লিপিবদ্ধ করতে।এভাবেই পৃথিবী পায় সাহিত্যের অনেক বড় এক উপাদান।


পারস্য ও আরব বণিকদের সুবাদে এই সাহিত্যকর্মের সুনাম দুনিয়ায় ছড়িয়ে পরে।সর্বপ্রথম গ্রন্থটি ইরানের বিখ্যাত সম্রাট আনুশেরওয়ান (৫৩০-৫৭৮ খ্রিস্টাব্দ)-এর আদেশে ইরানী চিকিৎসক বোরজাভি হিন্দুস্থানের রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে ইরানে নিয়ে আসেন এবং পাহলাভি ভাষায় অনুবাদ করে দুইটি শৃগালের নামে গ্রন্থটির নামকরণ করেন।( কালিলা ও দিমনা।)(অধিকাংশ ইতিহাসবিদদের মতে এর প্রথম নাম ছিল পঞ্চ অধ্যায়سنسكريتية: पञ्चतन्त्र پنچاتنترا)।


খৃষ্টবর্ষের অষ্টম শতাব্দিতে আব্বাসিয়া শাসনামলে বিখ্যাত আরবি সাহিত্যিক আব্বুল্লাহ ইবনে আল মুক্বাফ্ফাعبد_الله_بن_المقفع আরবি ভাষায় অনুবাদ করেন।এবং এই অনুবাদটাই এই বইয়ের প্রাচিন মৌলরুপে বাকি আছে।
এরপর গ্রন্থটির জনপ্রিয়তা এতোই বেড়ে যায় যে,গ্রন্থটি দশম শতাব্দীতে সামানীয় শাসক আবুনাসর বিন আহমদের নির্দেশক্রমে ‘কালিলা ওয়া দিমনা' এই নাম পরিবর্তন না করে আরবী থেকে ফারসীতে অনুবাদ করানো হয় এবং কবি রোদাকী এ গ্রন্থখানা ফারসী ভাষায় কাব্যরূপ দান করেন। লাহোরের শেষ গজনবী সুলতানের প্রধানমন্ত্রী নাসর-আলাহ ইবনে মুহাম্মদ ১১৪৪ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে এ গ্রন্থ ফারসীতে অনুবাদ করেন।
কালিলা ওয়া দীমনা হাজার বছর ধরে যেভাবে শিল্প ও সাহিত্যগুণে পাঠকের সমাদর পেয়ে আসছে তা দেখে অনেক লেখকেরই সাধ জেগেছে জীব জন্তুর চরিত্রে বই লেখার।
যেমন আব্বাসি কবি শরিফ ইবনে হাব্বারিয়া লিখেছেন ‘আসসাদেহ ওয়াল বাগেম’। ঐতিহাসিক ইবনে আরব শাহ (মৃত ৮৮৪) জীব জন্তুর যবানে লিখেছেন ‘ফাকিহাতুল খুলাফা ওয়া মুফাকাহাতুজ জুরাফা’ [খলীফা ও প-িতদের হাস্যরস]।
অরিয়েন্টালিস্ট গবেষক গোল্ড জিহার বলে, ‘ইখওয়ানুছ ছফা’ নামটিও মূলত কালিলা ওয়া দিমনার ‘আলহামামাতুল মুতাওওয়াকাহ’ [কবুতর কাহনী] গল্প থেকে ধার করা।
এরপর বাংলা, ইংরেজি, ফারসি, উর্দু, ফ্রেঞ্চ, লাতিন, ইতালিক, স্প্যনিশ, স্লাভিক, জার্মানিক, পোলিশ, হিব্রু, সুরিয়ানিসহ পঞ্চাশেরও বেশী ভাষায় বইটির অনুবাদ করা হয়েছে।
আমাদের দেশের প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও গবেষক গোলাম সামদানী কোরাইশী বইটির ফারসি অনুবাদ ‘আনওয়ারে সুহাইলি’ থেকে বাংলায় অনুবাদ করেন। ১৯৬৫ সালে বাংলা একাডেমী থেকে বইটি প্রকাশিত হয়।
নিচে কালিলা ও দিমনার বিখ্যাত কিছু উক্তি দেয়া হল:
● শিষ্টতার শিখরে উড্ডয়ন বড় কঠিন, কিন্তু সেখান থেকে অধঃপতন খুব সহজ। একটি ভারী পাথরকে কাঁধে তোলা কঠিন, কিন্তু ফেলে দেয়া সহজ।

● দুনিয়াটা লবণাক্ত পানির মতো, যতই পান করবে ততই তৃষ্ণা বাড়বে।

● চারটি জিনিসের মাঝে কখনো মিশ্রণ ঘটে না; দিন-রাত, পাপ-পুণ্য, আলো-আঁধার এবং ভালো-মন্দ।

● পানি যতই আগুনে গরম করো, তা আগুনকে এক নিমিশেই নিভিয়ে দেবে।

● যে বাক্যটা তুমি এখনো বলোনি, তুমি সে বাক্যের মালিক, যে বাক্যটি বলে ফেলেছো তুমি সে বাক্যটির দাস।

● প্রতিটি দহনেরই একটি দমন আছে; আগুনের জন্য যেমন পানি, বিষের জন্য দাওয়া, দুঃখের জন্য ধৈর্য, এশকের জন্য বিচ্ছেদ কিন্তু হিংসানামক দহনের কোনো দমন নেই।

● মানুষ নিজেকে ভালোবাসে তাই সে বেঁচে থাকতে চায়। আর অন্যকে ভালোবাসে কারণ সে নিজের জীবনকে আনন্দিত করতে চায়।

সহস্রাব্দ যাবৎ জনপ্রিয়তার শীর্ষ আসন দখল করে থাকা মাত্র ২০০ পৃষ্ঠার এই বইটি এখনো যারা পড়েননি, পড়ার আমন্ত্রণ রইলো।

সর্বশেষ এডিট : ২০ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৬ রাত ১০:১৪
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বিকাশ নূরা এবং হিরো আলমকে যারা প্রধানমন্ত্রী ভাবতেন ;)

লিখেছেন জ্যাক স্মিথ, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ২:৩২



একজন মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি, শিক্ষা-দীক্ষা থাকার চাইতেও জরুরী বিষয় হচ্ছে তার অন্তর্দৃষ্টি থাকা। অন্তর্দৃষ্টি, অন্তরচক্ষু বা জ্ঞানচক্ষু সম্পন্ন একজন ব্যক্তিকে কখনোই ধোঁকা দেওয়া বা ধোঁকায় ফেলানো সম্ভব নয় কারণ এরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাঙ্গালী কেন মুসলমান হতে পারে না?

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৫

অনারব টার্কিশ, কুর্দি আর ইরানিয়ানরা তাদের নিজ নিজ ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষন করে ও তা ধারন করেও তারা মুসলিম, পাকিস্তানের পাঞ্জাবীরাও যখন নিজেদের পাঞ্জাবী জাতি হিসেবে অহংকার করে, তখনও তারা... ...বাকিটুকু পড়ুন

গল্পঃ মোহাম্মদপুরে কখনও বিচ্ছেদ হয় না

লিখেছেন রাজসোহান, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১৪





আমার দোকানের নাম নিউ শাপলা কম্পিউটার ও ফটোস্ট্যাট। সাইনবোর্ডের শাপলা ফুলটা এঁকে দিয়েছিলো তাজমহল রোডের এক সাইনম্যান, দেখতে হয়েছিলো কচুরিপানার মতো। চৌদ্দ বছর ধরে ঝুলে আছে। রোদে রঙ উঠে... ...বাকিটুকু পড়ুন

২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা তার সাথে কিছু রুঢ় সত্য যা বদলে দিয়েছিলো দেশের রাজনীতি।

লিখেছেন অন্তর্জাল পরিব্রাজক, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:৩৪





২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা সম্পর্কে আমরা সবাই মোটামুটি জানি। এই হামলায় কারা জড়িত ছিল সেটাও আজকের দিনে অজানা নয় একমাত্র নিতান্ত দলকানা ছাড়া। তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধানমন্ডি ৩২ যারা ভেঙেছিল, আর যারা বিচার চাওয়ার পথ বন্ধ করে দিল- তারা কি একই?

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৯:৪৪



ধানমন্ডি ৩২ যারা ভেঙেছিল, আর যারা বিচার চাওয়ার পথ বন্ধ করে দিল- তারা কি একই?

ধানমন্ডি ৩২ ভাঙা হয়েছিল- কে দেখেনি, কে জানে না, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই।,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×