somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

রম্য ।। মিস কল

১৫ ই মে, ২০১৪ বিকাল ৪:৩৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


বাংলাদেশের এক কবি সেলফোনকে আদর করে ডেকেছিলেন মুঠোফোন বলে । মোবাইল ফোন কিংবা মুঠোফোন যে নামে ডাকি না কেন, আমাদের হাবলুর খুব শখ একটি মোবাইল ফোন কেনার । কিন্তু মোবাইল সম্পর্কে তার জ্ঞান একেবারে শূন্যের কৌটায় । ফলে সে বেশ চিন্তাযুক্ত অবস্থায় দিন যাপন করতে লাগল ।
হাবলুর বাড়ি কক্সবাজার জেলার দূর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে মিয়ানমার সীমান্তের কাছাকাছি । সেখানে বিদ্যুৎ নেই, বিদ্যাশিক্ষা অর্জনের জন্য কোন ইস্কুলও নেই । শহুরে জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল তাদের জীবনযাত্রা । গ্রামের মানুষ সহজ সরল না হাবাগোবা ঐ বিতর্কে না গিয়ে আমাদের হাবলুকে হাবাগোবা বলাই সঙ্গত । পিতামাতার তিরোধানে সে তুর্কি সুলতানদের ভাগ্যান্বেষণে ভারতবর্ষে আগমনের মত নিজের ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় কক্সবাজার শহরে চলে আসে । হাবলুর কপাল ভাল । কিছুদিন ঘোরাঘুরি করেই সমুদ্রের তীরে একটা রেস্টুরেন্টে টেবিল বয়ের কাজ পেয়ে গেল । ধীরে ধীরে কাস্টমারদের সাথে সু-সম্পর্ক তৈরি হল তার । কাস্টমাররা হাবলুকে বেশ পছন্দও করে ।
কাস্টমাররা যখন চা পান করতে করতে মোবাইল ফোনে আলাপ করে, হাবলু তন্ময় হয়ে তাদের কথাবার্তা শুনে । সে লক্ষ্য করে অনেকে চাপাস্বরে কথা বলে, আবার কেউ কেউ কথা বলার সময় চিল্লায় । আবার অনেক লোককে দেখেছে গালাগালি করতে । সে বুঝতে পারে মোবাইল দিয়ে গালাগালিও করা যায় । এইটা একটা বেশ সুবিধা । সে মোবাইল কিনে প্রথমে তাদের গ্রামের মইত্যাকে গালাগালি করবে । মইত্যা তাকে একবার দিগম্বর করেছিল । সেকথা হাবলু আজও ভুলতে পারে নাই ।
এদিকে রেস্টুরেন্টের মালিকের কাছে হাবলুর তিন মাসের বেতনের টাকা জমা পড়ে আছে । সে মালিককে গিয়ে বলল, স্যার আমার বেতনের টাকাটা লাগব ।
মালিক জানতে চায়, এত টাকা দিয়ে কি করবি হাবলু ?
সে সলজ্জ উত্তর দেয়, মোবাইল কিনুম স্যার ।
মোবাইল কিনবি ! মালিক কিঞ্চিত আশ্চর্য হলেন । তারপর হাবলুর সব পাওনা বুঝিয়ে দিলেন । ডিউটি শেষ করে হাবলু মোবাইল ফোন কিনে নিয়ে এল । সে এখন একটি মোবাইল ফোনের গর্বিত মালিক । খুশিতে তার বুক উঁচু হয়ে গেল । সে দ্রুত নিজের খুপরিতে ফিরে আসে। মোবাইল সেট হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে ভাবতে লাগল মইত্যাকে গালাগালি করে নিলে ভাল হয় । সে সবুজ বোতাম চাপ দিয়ে কানের কাছে ধরল। তৎক্ষনাৎ শুনতে পেল একটি মিষ্টি মেয়েলি কন্ঠ । বলছে, আপনার একাউন্টে যথেষ্ট পরিমাণ টাকা নেই । আপনার একাউন্ট রিচার্জ করুন ।
বারবার এই কথা শুনতে শুনতে হাবলু বিরক্ত হয়ে ধমক দিল । এই বেটি চুপ কর । আমি আগে একটু মইত্যারে গালি দিয়া লই ।
হাবলু অপেক্ষা করতে লাগল । বুঝল মেয়েলি কন্ঠ চুপ হয়ে গেছে । সে এবার মতিকে গালাগালি শুরু করল । এই মইত্যা হারামজাদা, খানকির পোলা তুঁই তো হাবলুরে চিনস নাই । আমি এখন মোবাইল কিনছি । তরে ডেইলি গালাগালি করব । এই কুত্তার পোলা কথা কস না কেন ?
হাবলু বুঝতে পারে মতি ঘাবড়াই গেছে এ কারণে চুপ করে থাকছে । সে মনে মনে স্বস্থি পায় । সে তার এক বন্ধুর কাছে ফোন করার জন্য মোবাইল সেট আবার কানের কাছে ধরল এবং পূর্বের নারীকন্ঠ আবার শুনতে পেল । সে খুব চিন্তিত হয়ে ভাবতে লাগল কেন মেয়েটি বারবার একই কথা বলে যাচ্ছে । অগত্যা সে মালিকের শরণাপন্ন হলে মালিক জানায় মোবাইলে টাকা ভরতে হবে; না হয় কথা বলা যাবে না ।
মোবাইল কিনতেই হাবলুর সব টাকা শেষ হয়ে গেছে । তার পকেট একেবারে খালি । সে মালিকের কাছ থেকে বিশটাকা অগিম নিয়ে ফ্লেক্সিলোডের দোকানে চলে এল । দোকানিকে বলল, ভাই বিশ টেকা ভরেন ।
কত নম্বর ? দোকানি জিজ্ঞেস করে ।
হাবলু আমতা আমতা করে । সে ইংরেজি বাংলা মিশিয়ে নম্বরটি বলে ।
দোকানি বলে , ঠিক আছে আপনি চলে যান, আপনার কাজ হয়ে গেছে ।
হাবলু সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল দোকানির দিকে । কারণ সে দেখেছে দোকানি বিশটাকা ক্যাশ বাক্সে ভরেছে, মোবাইলে ভরে নাই । বুঝতে পারল সে ঠকবাজের পাল্লায় পড়েছে । সে রাগান্বিত হয়ে বলে, ভাই আপনি তো টেকা ক্যাশ বাক্সে ভরেছেন মোবাইলে ভরেন নাই ।
দোকানি অবাক হয়ে তাকাল হাবলুর দিকে । ভাবল নিশ্চয় ছেলেটির স্ক্রু ঢিলা । তিনি বললেন, এই টাকা ক্যাশ বাক্স থেকে আপনার মোবাইলে চলে যাবে । চিন্তার কারণ নেই ।
হাবলু ভাবে এখন তো দূর থেকে টেলিভিশন চালানো যায় । এটাও ঐরকম কোন কেরামতি হবে । সে দাঁড়িয়ে থাকলে দোকানি জিজ্ঞেস করে, আর কিছু বলবেন ?
হাবলু বলে, আমার নম্বরটা কাগজে লিখ্যা দিবেন ?
দোকানি কাগজ কলম নিয়ে জিজ্ঞেস করে, আপনার নাম কী ?
হাবলু ।
দোকানি কাগজে হাবলু নামটি লিখে ও এর নিচে মোবাইল নম্বর লিখে হাবলুর হাতে দিল ।হাবলু খুশি মনে খুপরিতে ফিরে আসে । সে বালিশের তলা থেকে অনেক গুলো কার্ড বের করে আনে । এসব কার্ডে তার পরিচিত কাস্টমারদের নম্বর আছে । সে চিন্তা করল সবাইকে মোবাইল ক্রয়ের সংবাদটা জানানো উচিৎ । কিন্তু এতজনকে কল করতে গেলে তার সব টাকা শেষ হয়ে যাবে । সে আগেই জেনেছিল মিস কল দিলে টাকা কাঁটা যায় না । সে ভাবে মিস কলই দেবে ।
হাবলু প্রথমে বেছে বেছে সুমি আপুর নম্বরটি বের করল । সুমির নম্বরে রিং বাজছে । সুমি রিসিভ করে বলল, হ্যালো ।
হাবলু বলে, সুমি আপু আমি হাবলু । আমি মোবাইল কিনেছি । ভাবলাম আপনারে একটা মিস কল দিই । এইটা মিস কল দিলাম । পরে আপনার সাথে কথা বলব। এখন রাখি সুমি আপু ।
সুমি অনেক কষ্ট করে হাসি চেপে রেখে বলল, হে হাবলু খুব ভাল করেছিস মিস কল দিয়ে । তুঁই এভাবে মাঝে মাঝে মিস কল দিস । কেমন ।
আইচ্ছা সুমি আপু । তাহলে এখন রাখি ।
হাবলু লাইন কেটে দিল । সে সজলের নম্বরটি খুঁজতে খুঁজতে পেয়ে গেল । সজল কল রিসিভ করতেই হাবলু বলল, হ্যালো সজল ভাইয়া আমি হাবলু । শুনেন আমি একটা নতুন মোবাইল কিনেছি । ভাবলাম আপনাকে মিস কল দিয়ে খবরটা জানাই । এইটা আপনাকে মিস কল দিলাম ।
সজল হাসতে হাসতে বলল, তুঁই নাকি সুমিকেও মিস কল দিয়েছিস ?
সুমি আপু আপনাকে বলেছে ?
হে । সে তো একটু আগে আমাকে ফোন করে জানাল । আর কাকে মিস কল দিয়েছিস ?
এখনও আর কাউকে দিই নাই ।
ঠিক আছে তুঁই সবাইকে মিস কল দিতে থাক । আমি এখন রাখলাম ।
হাবলু এবার মতিন আংকেলের নম্বরে মিস কল দেয় । আরও কয়েকজনকে মিস কল দেয়ার পর সে ভাবল মিশু আপুকেও মিস কল দিয়ে খবরটা জানিয়ে দিলে ভাল হয় । কিন্তু মিশু আপুকে মিস কল দিতে গিয়ে হাবলু আবারও সে নারী কন্ঠস্বর শুনতে পেল । বলছে, আপনার একাউন্টে যথেষ্ট পরিমাণে টাকা নেই । অনুগ্রহপূর্বক আপনার একাউন্ট রিচার্জ করুন ।
হাবলু খুব অবাক হল । সে তো একটু আগে বিশ টেকা ভরেছে । তাহলে টেকাটা গেল কোথায় ? সে তো মিস কলই দিয়েছে । এখনও পর্যন্ত একটা ভাল কল করে নাই । হাবলু বুঝতে পারল এই বেটি ঠকবাজ । খালি টেকা ছাড়া আর কিছু চিনেনা । সে আবার চেষ্টা করল মিস কল দেয়ার জন্য । আবারও পূর্বের কন্ঠস্বর শুনতে পেল । হাবলু বলল, এই মাইয়া শুধু একবার কও হাবলু আমি তোমারে ভালোবাসি । তাহলে আমি আবারও বিশ টেকা ভরতে রাজী ।
পরদিন মিশু এলো রেস্টুরেন্টে । হাবলু কাপ প্লেট পরিষ্কার করে চা এনে দিল । মিশু বলল, হাবলু তুঁই তো আমাকে মিস কল দিলি না ।
হাবলু মুখভার করে জবাব দিল, আপু মিস কল দিতেও যে টেকা লাগে এইটা জানতাম না ।

সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই ডিসেম্বর, ২০১৯ রাত ১০:১৬
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কলকাতায় নিয়মিত যারা যাতায়ত করেন তারা এই প্রশ্নের মূখোমুখি হবেন প্রায়ই।

লিখেছেন ইমরান আশফাক, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১:৩৩

আচ্ছা, আপনাদের মধ্যে যারা কলকাতায় যাতায়ত করে থাকেন তারা স্হানীয়দের কাছেকি এই প্রশ্নটির মূখোমুখী হয়েছেন নিয়মিতভাবে: দেশভাগের সময় বাংলাদেশকে দেয়া হয়েছিল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ মুর্শিদাবাদ আর ভারতকে দেয়া হয়েছিলো খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনা কেন কওমী জননী হয়েছিলেন ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ রাত ২:২৯


আওয়ামী লীগ করেন এমন অনেক মানুষ বিষয়টি নিয়ে অস্বস্তি বোধ করেন। শেখ হাসিনা কেন কওমি জননী উপাধি গ্রহণ করলেন? আসলে সবাই যা বলতে চান,আওয়ামী লীগের রাজনীতি তো এমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশের চরম দারিদ্র্য নির্মূলে পাঁচ বছর মেয়াদি একটি সমন্বিত নগর পরিকল্পনা

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:১৭


প্রস্তাবিত প্রকল্প: স্বাবলম্বী বাংলাদেশ - দারিদ্র্যমুক্তির নতুন নগর

আমি যদি সরকারের দারিদ্র্য নির্মূল বিভাগের প্রধান হতাম, তাহলে আমার প্রথম লক্ষ্য হতো বাংলাদেশের চরম দারিদ্র্য সীমার নিচে বাস করা ১ কোটি ৭০... ...বাকিটুকু পড়ুন

Sajna

লিখেছেন আরমান আরজু, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:৩১



Sajna
Love is sacred;
Commences from the intense mystery of pure souls.
Has a beginning, but no end;
Here, only peace prevails.
So, love—
Solely for the sincere and the disenchanted,
Not for the pharisaic.
...বাকিটুকু পড়ুন

বিপ্লব সংহতি দিবস সফল ও সার্থক হোক.....

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:১১



আজকে নাকি বিপ্লব সংহতি দিবস। দল ক্ষমতায় থাকলে অনেক রকমের দিবস পালিত হয়। আওয়ামী লীগের সময় শেখ জামাল-কামালের বিবাহ দিবস, শিশু শহীদ শেখ রাসেলের সুন্নাতে খৎতা দিবস আরো কতো কি?... ...বাকিটুকু পড়ুন

×