somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গ্রীষ্মে চৌচির প্রান্তরে

১৩ ই এপ্রিল, ২০২০ সকাল ৭:১৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


চোখ ঝলসানো সোনালী রোদের দুপুরে ক্লান্তি বিনাশে খানিকটা বিশ্রাম নেয় গণি শেখ। আম গাছের শোভন ছায়াতে আসন্ন বিদায়ী চৈত্রের উষ্ণ বাতাসের দাপট কিঞ্চিৎ কম মনে হলো তার। গামছায় গতর খাটানো ঘাম মুছে ফসলের মাঠের দিকে তাকালো। পর্যাপ্ত জলের অভাবে চৌচির মাঠের বিদীর্ণ নিঃশ্বাস জাগিয়ে তুলে তার বুকের গভীরে চিতার দহন। ধানের কচি লিকলিকে আগাজুড়ে অপুষ্টির অসুখ। বৃষ্টি দরকার । ঝমঝম বৃষ্টি ছাড়া এই মুহূর্তে তার আর কিছু চাওয়ার নেই। গণি শেখ জানে বৃষ্টির মালিক আল্লাহ্‌। তাঁর মর্জি ছাড়া বৃষ্টি কীভাবে হবে ? সে মনে মনে আল্লাহর কাছে বৃষ্টির আবেদন জানালেও সাধারণ অভিজ্ঞতায় বুঝেছে যে, বিনামেঘে বৃষ্টি হবে না। ঊর্ধ্বমুখী দৃষ্টি ফিরালে প্রচন্ড নীলাকাশ তাকে হতাশ করে।

গণি শেখের মনে পড়ল, সকালে ঘর থেকে বের হওয়ার সময় হঠাৎ দৌড়ে এসে তার হাত চেপে ধরে সাত বছরের রেশমা বায়না ধরেছিল, এক শিশি আলতার। দু’দিন পর বৈশাখি মেলা। আলতায় পা রাঙিয়ে রেশমা মেলায় যাবে। আহা, এখন থেকে মেয়েটির কী যে আনন্দ উচ্ছ্বাস ! এ পর্যন্ত গণি শেখ মেয়েটির কোনো আবদার অপূর্ণ রাখেনি। মাটি হতে দেয়নি মেয়েটির কচিমুখের আনন্দ।

গণি শেখ ঘরে ফিরে হরিচরণের মুদির দোকান থেকে কেনা আলতার শিশি লুকিয়ে রাখল রেশমার অগোচরে। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিল কিছুতেই রেশমাকে আলতার শিশিটি দেবে না। মেয়েটি মনখারাপ করলে করুক। হুজুরের কথা তো আর ফেলনা নয়। আসার পথে শফি হুজুরের কথা কয়টি এখনো তার কানে প্রতিধ্বনি তুলছে। হুজুর বলেছে, ‘মাইয়ালোকের শরীরে রঙ মাখা হারাম। তোমরা বাপ-বেটি দোজখের আগুনে জ্বলবা’।

রেশমা আলতা না পেয়ে মুখভার করে বসে আছে জলচৌকির উপর। বাপের কাছ থেকে একটা নির্দিষ্ট দূরত্বে নিজেকে সরিয়ে রেখেছে সে। গণি শেখ দেখে এই দূরত্বের মাঝখানে কেবল জমাটবদ্ধ অভিমান আর অভিমান। মেয়ের অভিমানী মুখের দিকে তাকিয়ে তার বুকের ভেতর কালবৈশাখি যেন মোচড় দিয়ে উঠে। তারপরও সে গোপনে চেপে রাখে ভেতরের তোলপাড়। মায়ের পীড়াপীড়ি সত্ত্বেও রেশমা রাতে খাবার খেল না। তার মা স্বামীর উপর উষ্মা প্রকাশ করে। বলল, ‘হাতি-ঘোড়া চাই নাই মাইয়া। এক শিশি আলতা চাইছে, তাও ভুইল্যা গেলা ! কেমুন বাপ তুমি’ ? গণি শেখ নির্লিপ্ত হয়ে থাকে। স্ত্রীর কথার কোনো জবাব দেয় না। বুঝতে পারে সিদ্ধান্তহীনতার কষ্ট অনেক বড়। সে মেয়ের কাছে এসে বলল, ‘ভাত খাইয়া ল, সকালে আইন্যা দিমু’। রেশমা জলার্দ্র চোখ নিয়ে তাকাল। বলল, ‘হাঁচা’ !

সকালে ঘমু থেকে উঠে মাঠে গেল না গণি শেখ। রাতে ভালো ঘুম হয়নি। সারারাত হুজুরের বলা কথাগুলো ঘুরপাক খাচ্ছিল মাথার ভেতর। সামান্য আলতার জন্যে দোজখের আগুনে পোড়ার কোনো অর্থ হয় না। এক প্রকার অন্তর্গত দ্বন্দ্বে পার করে দিয়েছে রাত। কিন্তু সকালে সম্পূর্ণ বদলে গেলো সে। মেয়ের হাতে আলতার শিশি দিয়ে বলল, ‘তোর যত মন চায় আলতা লাগা’।

আলতার শিশি হাতে নিয়ে রেশমার কচিমনের সুনির্মল হাসি তাকে ভুলিয়ে দিল হুজুরের বলা কথাগুলো। রেশমা ঘরের দাওয়ায় বসে পায়ে আলতা লাগাতে মনোযোগ দিল। গণি শেখ তাকিয়ে থাকে মেয়ের দিকে। তার মনে ভেসে উঠে কাল সকালে আলতা রাঙা পা ফেলে ফেলে মেলায় যাচ্ছে রেশমা। আলতার রঙে রাঙিয়ে যাচ্ছে পথের গাছপালা, ফসলের মাঠ। গণি শেখ দেখতে পায় গ্রীষ্মের চৌচির প্রান্তরে নেমে এসেছে আলতার মতো লাল লাল বৃষ্টি।


সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই এপ্রিল, ২০২০ সকাল ৭:১৯
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

রক্তের দাগে ধুয়ে যাওয়া আভিজাত্য: কারিনা কায়সারের বিদায় এবং আমাদের কিছু নির্মম শিক্ষা

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ১৮ ই মে, ২০২৬ বিকাল ৩:৩৯



​বাঙালি সংস্কৃতির চিরায়ত নিয়মে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মানুষ সব বৈরিতা ভুলে যায়। জানাজার খাটিয়া সামনে রেখে স্বজনরা কেবল ক্ষমা চান, চিরবিদায়ের প্রার্থনা করেন। কিন্তু গতকাল আমরা এক অভূতপূর্ব ও হাহাকারে... ...বাকিটুকু পড়ুন

মগজ ধোলাইয়ের মেশিন এবং ইংল্যান্ডের আদালতে দণ্ডিত ইমাম

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ১৮ ই মে, ২০২৬ বিকাল ৫:৩৩


"হীরক রাজার দেশে" সিনেমায় অত্যাচারী রাজা প্রজাদের ওপর অনেক অত্যাচারের পরেও যখন দেখেন প্রজারা পুরোপুরি বশ মানছে না, তখন সভা-বিজ্ঞানীকে দিয়ে একটা "যন্তর-মন্তর" ঘর তৈরি করেন। সেখানে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ড. ইউনুস শুধুমাত্র বাই বর্ন বাংলাদেশী!

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ১৮ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১০


আমেরিকার সাথে চুক্তির কথাটি আসলেই ইউনুসের উপদেষ্টাসহ তার লোকজন বলে বিএনপি ও জামাতের সাথে আলোচনা করেই চুক্তিটি হয়েছে!
বিএনপি ও জামায়েতের সাথে আলোচনা করলেই কি এই চুক্তি সঠিক হয়ে যায়?

আপনাদের বিএনপি-... ...বাকিটুকু পড়ুন

মহাজাগতিক মাস্টারপ্ল্যান ও ভূ-রাজনীতির গোলকধাঁধা: আমরা কি কোনো অদৃশ্য নকশার অংশ?

লিখেছেন গেঁয়ো ভূত, ১৮ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৩২



মানুষের ইতিহাস আসলে দুটি সমান্তরাল রেখায় চলে। একটি হলো সেই ইতিহাস যা আমাদের পাঠ্যবইয়ে পড়ানো হয় বা নিউজ চ্যানেলে দেখানো হয়। আর অন্যটি হলো সেই গোপন... ...বাকিটুকু পড়ুন

নিজেকে জানুন, নিজেকে গড়ুন

লিখেছেন মোঃ ফরিদুল ইসলাম, ১৮ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৩৭

"নিজেকে জানুন, নিজেকে গড়ুন — নীরবতা হোক আপনার শক্তির সবচেয়ে ধারালো অস্ত্র।"
সব সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব আপনার একার না। আপনি যদি বারবার বোঝান, কিন্তু কেউ বুঝতে না চায় — তাহলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×