somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বঙ্গবন্ধু: একটি নাম- যাকে ঘৃণা করার আগে একবার থামুন

১৮ ই আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৫:৫০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



বঙ্গবন্ধু: একটি নাম- যাকে ঘৃণা করার আগে একবার থামুন[

শেখ মুজিব ইতিহাসের খলনায়ক।
জাতীয় বেইমান।
পাকিস্তান ভাঙার অপরাধী।
- এই কথাগুলো আপনি বিশ্বাস করেন?
তাহলে আজ আপনাকে একটা অনুরোধ করব- একবার শুধু থামুন।

রাগ দিয়ে নয়, আবেগ দিয়ে নয়, কোনো রাজনৈতিক দলের চোখ দিয়ে নয- একবার নিজের বিবেকের চোখ দিয়ে ভাবুন।

কেন আপনি শেখ মুজিবকে ঘৃণা করেন?
কারণ তিনি পাকিস্তান ভেঙেছিলেন?
তাহলে একটা প্রশ্ন-
আপনি কি সত্যিই আজও পাকিস্তানকে ফিরে পেতে চান?

যদি চান, তাহলে কেন?
পাকিস্তান কি আজ বাংলাদেশের চেয়ে সমৃদ্ধ?
তার সাধারণ মানুষের জীবন কি আমাদের চেয়ে ভালো?
তার অর্থনীতি কি আমাদের স্বপ্ন দেখায়?
তার রাষ্ট্রব্যবস্থা কি আমাদের কাছে আদর্শ?
নাকি পাকিস্তানের প্রতি এই মমতার ভেতরে কোথাও লুকিয়ে আছে শুধু ভারত বিরোধিতার এক অন্ধ আবেগ?

আর যদি বলেন-
“পাকিস্তান তো মুসলমানের দেশ!”

তাহলে আরও একটা প্রশ্ন করি।
পাকিস্তান কি ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত এই বাংলার মুসলমানদের সমান মর্যাদা দিয়েছিল?

আমরা মুসলমান ছিলাম।
কিন্তু আমাদের ভাষা কি সম্মান পেয়েছিল?
আমাদের সংস্কৃতি কি সম্মান পেয়েছিল?
আমাদের ভোটের রায় কি সম্মান পেয়েছিল?
আমাদের অর্থনৈতিক অধিকার কি সম্মান পেয়েছিল?

একবার ১৯৭০- এর নির্বাচনের ফলাফলের দিকে তাকান।
একটি জাতি সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়েও ক্ষমতা পেল না।

এটাই কি ছিল সেই পাকিস্তানের গণতন্ত্র?

আর তখন একজন মানুষ দাঁড়িয়ে বলেছিলেন-
“এইবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এইবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।”
হ্যাঁ, তিনি শেখ মুজিবুর রহমান।
আপনি তাঁর সব সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত নাও হতে পারেন।
তাঁর শাসনের সমালোচনা করতেই পারেন।

১৯৭২ থেকে ১৯৭৫-এর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলতেই পারেন।
বাকশাল নিয়ে বিতর্ক করতেই পারেন।
তাঁর সরকারের ব্যর্থতা, দুর্নীতি, দুর্ভিক্ষ, প্রশাসনিক দুর্বল- সবকিছুর কঠোর সমালোচনাও করতে পারেন।

এসব নিয়ে প্রশ্ন করা ইতিহাসবিরোধী নয়।
কিন্তু একজন মানুষের রাজনৈতিক ভুলের হিসাব করতে গিয়ে কি তাঁর ঐতিহাসিক ভূমিকাটাকেও মুছে ফেলবেন?
এটা কি ন্যায়বিচার?
একবার ভাবুন-

যদি ১৯৭১ না আসত, আজ আপনি কোথায় থাকতেন?
আপনার সন্তানের ভবিষ্যৎ কেমন হতো?

আপনি কি নিজের দেশের রাষ্ট্রপ্রধান হতে পারতেন?
সেনাবাহিনীর শীর্ষ পদে উঠতে পারতেন?
নিজের ভাষায় নিজের রাষ্ট্রের প্রশাসন চালাতে পারতেন?
বাংলাদেশের পতাকা হাতে বিশ্বমঞ্চে দাঁড়াতে পারতেন?

পাকিস্তান আমলে বাঙালিদের রাষ্ট্রীয় ও সামরিক ক্ষমতার কাঠামোয় বৈষম্য ছিল- এটা ইতিহাসের আলোচিত বাস্তবতা।
আজ আমরা যে রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে নিজেদের ভাগ্য নিজেরাই নির্ধারণ করার অধিকার দাবি করি, সেই রাষ্ট্রটা কোথা থেকে এলো?
আকাশ থেকে পড়েনি।
রক্ত দিয়ে এসেছে।
ত্যাগ দিয়ে এসেছে।
লাখো মানুষের জীবনের বিনিময়ে এসেছে।
আর সেই স্বাধীনতার রাজনৈতিক নেতৃত্বের কেন্দ্রে ছিলেন একজন মানুষ-
শেখ মুজিবুর রহমান।
তাঁকে দেবতা বানানোর দরকার নেই।
কিন্তু তাঁকে শয়তান বানানোর আগেও একটু থামুন।
কারণ ইতিহাসে কোনো মানুষই সম্পূর্ণ দেবতা নয়, আবার সম্পূর্ণ দানবও নয়।

বঙ্গবন্ধুকেও মানুষ হিসেবেই বিচার করুন।
তাঁর অর্জনকে অর্জন বলুন।
তাঁর ভুলকে ভুল বলুন।
তাঁর ব্যর্থতাকে ব্যর্থতা বলুন।

কিন্তু ১৯৭১-এর ইতিহাসকে ১৯৭৫-এর রাজনৈতিক ক্ষোভ দিয়ে মুছে ফেলবেন না।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা-
যাঁরা বলেন, “মুজিব স্বাধীনতা চাননি, তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে চেয়েছিলেন”, তাঁদের কাছেও একটা সরল প্রশ্ন আছে।
যদি তিনি কেবল পাকিস্তানের ক্ষমতা দখল করতে চাইতেন, তাহলে কেন বছরের পর বছর বাঙালির রাজনৈতিক অধিকার, স্বায়ত্তশাসন ও অর্থনৈতিক ন্যায্যতার জন্য আন্দোলন করলেন?

আর যদি তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য কিছুই না করে থাকেন, তাহলে স্বাধীনতার ইতিহাসে তাঁর নাম এত গভীরভাবে জড়িয়ে গেল কীভাবে?
ইতিহাসের বিচার আদালতের রায়ের মতো এক লাইনে হয় না।
ইতিহাস প্রশ্ন করে।
ইতিহাস প্রমাণ খোঁজে।
ইতিহাস একই মানুষের আলো এবং অন্ধকার- দুটোকেই পাশাপাশি দাঁড় করায়।

তাই বঙ্গবন্ধুকে ভালোবাসতেই হবে- এমন কোনো কথা নেই।
কিন্তু তাঁকে ঘৃণা করার আগে অন্তত নিজেকে একটা প্রশ্ন করুন-
আপনি আসলে বঙ্গবন্ধুকে ঘৃণা করছেন, নাকি ১৯৭১-কে?
আর যদি ১৯৭১-কে ঘৃণা না করেন-
তাহলে সেই স্বাধীনতার রাজনৈতিক স্থপতিকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করার যুক্তিটা কোথায়?

মনে রাখবেন-
স্বাধীনতা এমন এক সম্পদ, যার মূল্য সবচেয়ে বেশি বোঝে সে-ই, যে স্বাধীন নয়।
আজ আমরা স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক।
নিজের পতাকা আছে।
নিজের মানচিত্র আছে।
নিজের ভাষায় রাষ্ট্রের সঙ্গে কথা বলার অধিকার আছে।

এই স্বাধীনতার ইতিহাসে বঙ্গবন্ধুর নাম মুছে ফেলতে চাইলে ইতিহাসের বই থেকে শুধু একটি নাম কাটতে হবে না-
মুছে ফেলতে হবে ১৯৭১-এর একটি বিশাল অধ্যায়।
তাই ঘৃণা করার আগে একবার থামুন।
দলীয় স্লোগান থামান।
অন্ধ আবেগ থামান।
পাকিস্তানপ্রেম কিংবা ভারতবিদ্বেষ—দুটোকেই এক পাশে রাখুন।

তারপর নিজেকে প্রশ্ন করুন-
“যে মানুষটির রাজনৈতিক ভুলের সমালোচনা আমি করতে পারছি স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে, সেই স্বাধীন বাংলাদেশটা আমি পেলাম কীভাবে?”
উত্তরটা হয়তো আপনার পছন্দ হবে না।
কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন সত্যগুলোই অনেক সময় আমাদের সবচেয়ে বেশি অস্বস্তিতে ফেলে।

বঙ্গবন্ধুকে দেবতা বানাবেন না।
আবার খলনায়কও বানাবেন না।
তাঁকে ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড় করান।
আলো-অন্ধকার দুটোই দেখুন।
তারপর বিচার করুন।

কারণ ইতিহাস কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়।
ইতিহাস আমাদের সবার।
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৫:৫৩
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

নির্ভীক অভিযাত্রা

লিখেছেন আকিব হাসান জাভেদ, ১৭ ই আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৩৩

আমি চলি ঐ প্রান্তে,
যেখানে অসৎ থেকে মানুষ হয়েছে সৎ।
আমি চলি উড়ে উড়ে,
ডানাহীন পাখির মতো,
যেখানে দুর্বলতাকে জয় করে
হয়েছে দুঃসাহস।
আমি চলি শক্তির সাথে,
দেহ যায় না ঝুঁকে।
করি না প্রণাম,
করি না চাটুকারিতা আর... ...বাকিটুকু পড়ুন

চুপ - একদম চুপ

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ১৭ ই আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৫৭



আমরা শুধু চুপ থাকবো -
আমাদের কথা বলার মুখ নেই
আমাদের দেখার মতো চোখ নেই
আমাদের শোনার মতো কান নেই
মনে হয়, মনে হয় -
আমাদের হাত-পাও নেই।

আমাদের বিবেক নেই
আমাদের চিন্তা-চেতনাও নেই
আমরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

তবুও বেঁচে আছি

লিখেছেন সালমান মাহফুজ, ১৭ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ৯:১৫

এই নিথর নগ্ন শরীরের প্রতিটা পল্লবের করুণ আর্তচিৎকার
পৃথিবীর মাটি ভেদ করে কোনদিনও
ওই মৃত কানে পৌঁছাবে না
আমি জেনে গেছি ।

বিপন্ন আকাশের গায়ে লেপ্টে থাকা
দেবতাদের প্রতারণার ফাঁদ আর মিথ্যা প্রলোভনের গল্পগুলি
আমার শুনতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

জুলাই মিউজিয়ামঃ স্মৃতির বিরুদ্ধে বিস্মৃতির লড়াই....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১৭ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:৫৩



জুলাই মিউজিয়ামঃ স্মৃতির বিরুদ্ধে বিস্মৃতির লড়াই....

১৫ আগস্ট আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে গিয়েছিলাম জুলাই মিউজিয়ামে। সেখানে গিয়ে মনে হলো- এটি শুধু একটি জাদুঘর নয়; এটি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের এক ভয়াবহ অধ্যায়ের বিরুদ্ধে... ...বাকিটুকু পড়ুন

হিজিবিজি নদী চলে মন উদাসের দেশে !

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৮ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:০২





হিজিবিজি নদী চলে মন উদাসের দেশে !

...................................................................
মানচিত্রের আঁকাবাঁকা রেখায় তারে পাবেনা,
সে নদী তো চেনা কোনো ঠিকানায় যাবে না।
তার কোনো কূল নেই, নেই কোনো ঘাট,
সে বয়ে চলে একা, বুক জুড়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×