somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ঝুলন্ত লাশ (ছোট গল্প)

০৬ ই ডিসেম্বর, ২০১৫ বিকাল ৪:৫৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



এ.এস.আই হামিদুর ডিউটি সেরে সন্ধ্যার দিকে থানায় ফিরলেন। তার শরীর প্রচণ্ড ক্লান্ত। ইচ্ছা করছে একটা বিছানায় টানটান হয়ে শুয়ে পড়েন। তিনি মাথার ক্যাপ খুলে একটা চেয়ার টেনে বসলেন। কড়া এক কাপ চা খেতে পারলে ক্লান্তি কিছুটা দূর হতো। কিন্তু থানার যেই চা, ফাঁসির আসামীকেও এক কাপ দিলে সে থু থু করে ফেলে দিবে।
ম্যাসেঞ্জার এসে বলল,
বড় স্যার আপনেরে ডাকে।
তিনি ক্যাপ পরে দ্রুত পায়ে ওসির রুমে ঢুকলেন। ওসি সাহেব টেবিলের উপর ঝুঁকে একটা ম্যাপ দেখছিলেন। তাকে দেখে চোখ তুলে তাকালেন।
ডিউটি থেকে ফিরলেন?
জ্বি স্যার।
শহরে আর কোন গণ্ডগোল হয়নি তো?
না স্যার।
আজ রাতটা আপনাকে একটু কষ্ট করতে হবে। নিমতলায় যেতে হবে।
কোন সমস্যা স্যার?
ওসি সাহেব থমথমে মুখে বললেন,
কিছুক্ষণ আগে থানায় খবর এসেছে, নিমতলার এক হিন্দু বাড়ির বউ জঙ্গলে গাছের ডালে ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেছে। আজ রাতটা ঐ লাশ পাহাড়া দিতে হবে। কাল সকালে সুরতহাল লিখবেন। তারপর লাশ থানায় নিয়ে আসবেন। কনস্টেবল রফিককে সাথে নিয়ে যান।
আচ্ছা, স্যার।
হামিদুর মুখে ‘আচ্ছা স্যার’ বললেও নির্দেশ শুনে তার মনটা দমে গেছে। সারাদিন ডিউটি করে এখন জঙ্গলে যেয়ে লাশ পাহারা দিতে হবে?
দুনিয়ার সব চাকরিতে টাইম টেবিল আছে, অথচ পুলিশের চাকরিতে? যখনই ডাক, তখনই বান্দা হাজির। তিনি বিরক্তমুখে চেয়ারে এসে বসলেন। বড় কর্তার হুকুম, মানতেই হবে। সামনে তার প্রমোশনের সময়। এই সময় চাকুরীর প্রতি ডেডিকেটেড ভাব না দেখালে প্রমোশনে ঝামেলা হবে। তিনি রফিকের খোঁজে বের হলেন। ছেলেটা পুলিশে নতুন জয়েন করেছে। সব কাজেই উৎসাহ। পাবলিকের সামনে বেশ গম্ভীরভাবে অকারণে রাইফেল হাত বদল করে। তার হাসি পায়। ছেলেটা ক্ষমতা উপভোগ করছে। কিন্তু ক্ষমতার আড়ালে যে যন্ত্রণা, তা এখনও টের পায়নি। কিছুদিন যাক, হাড্ডিতে দাগ লাগলে বুঝতে পারবে পুলিশের চাকুরী কাকে বলে।
রাত ন’টার দিকে তিনি রওনা হলেন। সাথে রফিক। অস্ত্র বলতে দুটো রাইফেল, একটা তিন ব্যাটারীর টর্চ।
নিমতলা জঙ্গলের কাছাকাছি এসে তিনি থমকে দাঁড়ালেন। গভীর জঙ্গল। চারদিকে গাঢ় অন্ধকার। এক হাত দূরের জিনিস দেখা যায় না। তার উপর ডিসেম্বর মাসের ঘন কুয়াশা। তিনি রফিকের দিকে তাকালেন। রফিকের মুখ শুকিয়ে গেছে। সে কয়েকবার ঢোক গিলল। ইতঃস্তত করে বলল,
স্যার, এখনই জঙ্গলের ভেতর ঢুকতে হবে? সকালে ঢুকলে হয় না?
হামিদুর গম্ভীর মুখে বললেন,
না। লাশ গায়েব হলে সমস্যা আছে। আগে লাশের অবস্থান দেখি।
তিনি মনে মনে ‘বিসমিল্লাহ’ বলে জঙ্গলের ভেতর ঢুকে পড়লেন। তার পিছনে পিছনে রফিক। কত ভিতরে ঢুকতে হবে কে জানে? কুয়াশায় টর্চের আলো বেশী দূর যাচ্ছে না।
অনেকক্ষণ খোঁজাখুঁজির পর তিনি লাশের সন্ধান পেলেন।
মেয়েমানুষের লাশ। একটা তেঁতুল গাছের ডাল থেকে ঝুলছে। গলায় পরনের কাপড় দিয়ে ফাঁস লাগানো।
হামিদুর লাশের মুখে টর্চের আলো ফেললেন। তার দেহ কাঁটা দিয়ে উঠল। কালচে লাল টুকটুকে জিহ্বা বেরিয়ে আছে। মনে হয় একটু আগে রক্ত পড়েছে। মাছি ভনভন করছে। চোখ দুটো কোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে। যন্ত্রণায় সারামুখ বিকৃত।
হামিদুর তাড়াতাড়ি টর্চের আলো সরিয়ে ফেললেন। ঝোপ থেকে কি যেন একটা দৌড়ে পালাল। হয়তো শিয়াল। পুলিশের চাকুরীর সুবাদে তিনি জীবনে বহু লাশ দেখেছেন কিন্তু এমন বীভৎস লাশ আর দেখেননি।
এই শীতের রাতে এই লাশের পাশে থাকতে হবে! তার মন বিষিয়ে উঠল। তিনি বিড়বিড় করে বললেন,
শালার চাকুরী! এর চেয়ে ক্ষেত খামারে কামলাগিরি করাও ভাল ছিল।
তিনি লাশ থেকে দূরে একটা বটগাছের নিচে যেয়ে দাঁড়ালেন। ক্লান্তিতে তার পা ভেঙ্গে আসছে। তিনি গাছের গুড়িতে বসে পড়লেন। জংলী মশা তাকে জেঁকে ধরল। মোটা পোশাকের ভেতরও তিনি হুল টের পাচ্ছেন।
হঠাৎ তার হাসি পেল। লোকে বলে পুলিশের হাত অনেক লম্বা। তারা ইচ্ছা করলে মাটি খুড়েও আসামী বের করতে পারে। এখন মনে হচ্ছে মশার হুলও কম লম্বা না। এরাও মোটা পোশাক ভেদ করে পুলিশের দেহ স্পর্শ করতে পারে। মশা তাড়ানোর কাজ পেয়ে লাশের চিন্তা তার মাথা থেকে খানিকটা দূর হল।
রাত এগারটার দিকে রফিক হাই তুলতে তুলতে বলল,
স্যার, শীতে জমে যাচ্ছি। চা না খেলে আমরাই জমে লাশ হয়ে যাবো। যাই, নিমতলা বাজার থেকে একটু ঘুরে আসি। দেখি চা-টা পাওয়া যায় কিনা। আপনার জন্য আনবো স্যার?
হামিদুর মাথা কাত করে সায় দিলেন।
রফিক গলায় মাফলার পেচিয়ে টর্চ লাইটটা নিয়ে হনহন করে চলে গেল।
হামিদুর অন্ধকার গাছের গুড়িতে ঠায় বসে রইলেন। টর্চ না থাকায় তিনি মাঝে মাঝে আলো ফেলতে পারছেন না। জমাট অন্ধকার। নিজের হাতটা পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না। তার মনে হচ্ছে তিনি কবরের ভেতর বসে আছেন।
ধীরে ধীরে তার চোখ অন্ধকার সয়ে এল। তিনি ঝুলন্ত লাশের সাদা কাপড়টা দেখতে পাচ্ছেন। মুখটা দেখতে পাচ্ছেন না।
কে এই গৃহবধূ? কি যন্ত্রণা পেয়ে এমন গহীন জঙ্গলে এসে জীবন শেষ করলো? নাকি এটা কোন হত্যা? গাছে ঝুলিয়ে কেউ আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দিতে চাচ্ছে? পোস্টমর্টেম করলে সব বেরিয়ে আসবে।
তবে হত্যা বা আত্মহত্যা যাই হোক, এর পিছনে যে দায়ী তাকে এই মুহূর্তে হামিদুরের গুলি করে মারতে ইচ্ছা করছে। শালার জন্য এই কষ্ট!
হঠাৎ তার মনে হল পুরো জঙ্গলটা কেমন থম মেরে আছে। এতক্ষণ ঝিঁঝিঁ ডাকছিল। তা-ও বন্ধ হয়ে গেছে। তিনি পিঠ টান টান করে বসলেন। তার ঝিমুনী ভাব কেটে গেছে। মনে হচ্ছে কে যেন বড় বড় চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে।
মেরুদণ্ড বেয়ে একটা শিরশিরে অনুভূতি তার সারা দেহে ছড়িয়ে পড়ল। তিনি চট করে উঠে দাঁড়ালেন। রাইফেলটা শক্ত হাতে ধরলেন। তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় অসম্ভব সচেতন হয়ে উঠেছে। তিনি আগেও লক্ষ্য করেছেন বিপদের আঁচ পেলে তার এ রকম অনুভূতি হয়।
একবার খুলনায় থাকতে বনদস্যু ধাওয়া করতে যেয়ে তাকে সুন্দরবনে ঢুকতে হয়। দস্যুদের চারপাশ দিয়ে তারা ঘিরে ফেলেন। তিনি গুলি করতে যাবেন, হঠাৎ সূক্ষ্ম শব্দে তার সারা দেহের লোম খাড়া হয়ে গেল। তিনি চট করে ঘুরে দাঁড়ালেন। বিশাল একটা সাপ গাছের ডালের সাথে পেঁচিয়ে ফণা তুলে আছে। আর এক হাত নাগালের মধ্যে আসলেই তিনি ছোবল খেতেন। সেদিন সৃষ্টিকর্তার দেয়া শক্তিশালী ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের গুণে তিনি রক্ষা পেয়েছেন।
দূরে একটা পেঁচা ডেকে উঠল। হামিদুর ফোঁস করে একটা নিঃশ্বাস ছাড়লেন। তিনি ঘামতে শুরু করেছেন। টর্চটা এই মুহূর্তে ভীষণ দরকার ছিল। কেন টর্চটা হাতছাড়া করলেন? অবশ্য না দিয়ে উপায় ছিল না। রফিক পথ খুঁজে আসতে পারতো না।
হঠাৎ তিনি স্পষ্ট শুনলেন লাশটি হিঃ হিঃ করে হাসছে এবং দুলছে।
তার সমস্ত শরীরের রক্ত হিম হয়ে গেল। গহীন জঙ্গলে সেই হাসি গাছে গাছে প্রতিধ্বনিত হয়ে যেন তাকে ব্যঙ্গ করছে।
তার মাথা চক্কর দিয়ে উঠল। তিনি টলতে টলতে পড়ে গেলেন।
কিছুক্ষণ পর রফিক চা নিয়ে এসে দেখল, হামিদুর স্যার গাছের নিচে পড়ে আছেন। সে ভাবল হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছেন।
সে নিচু গলায় ডাকল,
স্যার, ও স্যার। চা নিয়ে এসেছি, উঠেন।
এমন সময় লাশটি আবার হিঃ হিঃ করে হেসে দুলতে লাগল।
রফিক চমকে উঠল। তার হাত থেকে চায়ের মগ পড়ে গেল। প্রচণ্ড ভয়ে তার হৃৎপিণ্ডটা কাটা মুরগীর মতো লাফাচ্ছে। আবার সেই রক্ত হিম করা হাসি। তার চোখে অন্ধকার ঘনিয়ে এল।
অনেকক্ষণ পর হামিদুরের জ্ঞান ফিরল। তিনি চোখ পিট পিট করে আশে-পাশে তাকালেন। প্রচণ্ড অন্ধকার! কিছুই দেখা যাচ্ছে না। হঠাৎ তিনি নারীকণ্ঠ শুনতে পেলেন।
কি পুলিশ দাদারা....ভয় পাইছো? চা খাবা না?....আমারেও দিও।... হিঃ.... হিঃ......হিঃ.....
হামিদুর ধরফর করে রফিককে ডাকলেন। তার হুঁশ ফিরতেই বললেন, বাঁচতে চাইলে তাড়াতাড়ি চল। দৌড়াই।
রফিক ঝটপট উঠে দাঁড়াল। তারা দৌঁড় দিতে যাবে, এমন সময় হামিদুর বললেন, লাশের মুখের উপর একবার টর্চটা মারো দেখি। আমি একটা গুলি করে পালাবো।
রফিক কাঁপা কাঁপা হাতে টর্চের আলো লাশের উপর ফেলল। তারা দু’জনেই চমকে উঠল। লাশের উপর একটা নারীমূর্তি বসা। হামিদুর প্রায়ই ট্রিগার চাপতে যাচ্ছিলেন, হঠাৎ লক্ষ্য করলেন এ যে বাজারের পাঁচী পাগলী। ডালের উপর বসে হিহি করে হাসছে। তার হাসির ঠেলায় ডালটা থর থর করে কাঁপছে। সেই সাথে লাশটাও দুলছে।
রফিক দ্রুত গাছে উঠে পাগলীকে নামিয়ে আনল। তাকে আর কি বলবে- পাগল মানুষ! শেষতক সারারাত পাগলীর গান শুনে তারা লাশ পাহাড়া দিতে লাগল।
এ.এস.আই হামিদুর ডিউটি সেরে সন্ধ্যার দিকে থানায় ফিরলেন। তার শরীর প্রচণ্ড ক্লান্ত। ইচ্ছা করছে একটা বিছানায় টানটান হয়ে শুয়ে পড়েন। তিনি মাথার ক্যাপ খুলে একটা চেয়ার টেনে বসলেন। কড়া এক কাপ চা খেতে পারলে ক্লান্তি কিছুটা দূর হতো। কিন্তু থানার যেই চা, ফাঁসির আসামীকেও এক কাপ দিলে সে থু থু করে ফেলে দিবে।
ম্যাসেঞ্জার এসে বলল,
বড় স্যার আপনেরে ডাকে।
তিনি ক্যাপ পরে দ্রুত পায়ে ওসির রুমে ঢুকলেন। ওসি সাহেব টেবিলের উপর ঝুঁকে একটা ম্যাপ দেখছিলেন। তাকে দেখে চোখ তুলে তাকালেন।
ডিউটি থেকে ফিরলেন?
জ্বি স্যার।
শহরে আর কোন গণ্ডগোল হয়নি তো?
না স্যার।
আজ রাতটা আপনাকে একটু কষ্ট করতে হবে। নিমতলায় যেতে হবে।
কোন সমস্যা স্যার?
ওসি সাহেব থমথমে মুখে বললেন,
কিছুক্ষণ আগে থানায় খবর এসেছে, নিমতলার এক হিন্দু বাড়ির বউ জঙ্গলে গাছের ডালে ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেছে। আজ রাতটা ঐ লাশ পাহাড়া দিতে হবে। কাল সকালে সুরতহাল লিখবেন। তারপর লাশ থানায় নিয়ে আসবেন। কনস্টেবল রফিককে সাথে নিয়ে যান।
আচ্ছা, স্যার।
হামিদুর মুখে ‘আচ্ছা স্যার’ বললেও নির্দেশ শুনে তার মনটা দমে গেছে। সারাদিন ডিউটি করে এখন জঙ্গলে যেয়ে লাশ পাহারা দিতে হবে?
দুনিয়ার সব চাকরিতে টাইম টেবিল আছে, অথচ পুলিশের চাকরিতে? যখনই ডাক, তখনই বান্দা হাজির। তিনি বিরক্তমুখে চেয়ারে এসে বসলেন। বড় কর্তার হুকুম, মানতেই হবে। সামনে তার প্রমোশনের সময়। এই সময় চাকুরীর প্রতি ডেডিকেটেড ভাব না দেখালে প্রমোশনে ঝামেলা হবে। তিনি রফিকের খোঁজে বের হলেন। ছেলেটা পুলিশে নতুন জয়েন করেছে। সব কাজেই উৎসাহ। পাবলিকের সামনে বেশ গম্ভীরভাবে অকারণে রাইফেল হাত বদল করে। তার হাসি পায়। ছেলেটা ক্ষমতা উপভোগ করছে। কিন্তু ক্ষমতার আড়ালে যে যন্ত্রণা, তা এখনও টের পায়নি। কিছুদিন যাক, হাড্ডিতে দাগ লাগলে বুঝতে পারবে পুলিশের চাকুরী কাকে বলে।
রাত ন’টার দিকে তিনি রওনা হলেন। সাথে রফিক। অস্ত্র বলতে দুটো রাইফেল, একটা তিন ব্যাটারীর টর্চ।
নিমতলা জঙ্গলের কাছাকাছি এসে তিনি থমকে দাঁড়ালেন। গভীর জঙ্গল। চারদিকে গাঢ় অন্ধকার। এক হাত দূরের জিনিস দেখা যায় না। তার উপর ডিসেম্বর মাসের ঘন কুয়াশা। তিনি রফিকের দিকে তাকালেন। রফিকের মুখ শুকিয়ে গেছে। সে কয়েকবার ঢোক গিলল। ইতঃস্তত করে বলল,
স্যার, এখনই জঙ্গলের ভেতর ঢুকতে হবে? সকালে ঢুকলে হয় না?
হামিদুর গম্ভীর মুখে বললেন,
না। লাশ গায়েব হলে সমস্যা আছে। আগে লাশের অবস্থান দেখি।
তিনি মনে মনে ‘বিসমিল্লাহ’ বলে জঙ্গলের ভেতর ঢুকে পড়লেন। তার পিছনে পিছনে রফিক। কত ভিতরে ঢুকতে হবে কে জানে? কুয়াশায় টর্চের আলো বেশী দূর যাচ্ছে না।
অনেকক্ষণ খোঁজাখুঁজির পর তিনি লাশের সন্ধান পেলেন।
মেয়েমানুষের লাশ। একটা তেঁতুল গাছের ডাল থেকে ঝুলছে। গলায় পরনের কাপড় দিয়ে ফাঁস লাগানো।
হামিদুর লাশের মুখে টর্চের আলো ফেললেন। তার দেহ কাঁটা দিয়ে উঠল। কালচে লাল টুকটুকে জিহ্বা বেরিয়ে আছে। মনে হয় একটু আগে রক্ত পড়েছে। মাছি ভনভন করছে। চোখ দুটো কোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে। যন্ত্রণায় সারামুখ বিকৃত।
হামিদুর তাড়াতাড়ি টর্চের আলো সরিয়ে ফেললেন। ঝোপ থেকে কি যেন একটা দৌড়ে পালাল। হয়তো শিয়াল। পুলিশের চাকুরীর সুবাদে তিনি জীবনে বহু লাশ দেখেছেন কিন্তু এমন বীভৎস লাশ আর দেখেননি।
এই শীতের রাতে এই লাশের পাশে থাকতে হবে! তার মন বিষিয়ে উঠল। তিনি বিড়বিড় করে বললেন,
শালার চাকুরী! এর চেয়ে ক্ষেত খামারে কামলাগিরি করাও ভাল ছিল।
তিনি লাশ থেকে দূরে একটা বটগাছের নিচে যেয়ে দাঁড়ালেন। ক্লান্তিতে তার পা ভেঙ্গে আসছে। তিনি গাছের গুড়িতে বসে পড়লেন। জংলী মশা তাকে জেঁকে ধরল। মোটা পোশাকের ভেতরও তিনি হুল টের পাচ্ছেন।
হঠাৎ তার হাসি পেল। লোকে বলে পুলিশের হাত অনেক লম্বা। তারা ইচ্ছা করলে মাটি খুড়েও আসামী বের করতে পারে। এখন মনে হচ্ছে মশার হুলও কম লম্বা না। এরাও মোটা পোশাক ভেদ করে পুলিশের দেহ স্পর্শ করতে পারে। মশা তাড়ানোর কাজ পেয়ে লাশের চিন্তা তার মাথা থেকে খানিকটা দূর হল।
রাত এগারটার দিকে রফিক হাই তুলতে তুলতে বলল,
স্যার, শীতে জমে যাচ্ছি। চা না খেলে আমরাই জমে লাশ হয়ে যাবো। যাই, নিমতলা বাজার থেকে একটু ঘুরে আসি। দেখি চা-টা পাওয়া যায় কিনা। আপনার জন্য আনবো স্যার?
হামিদুর মাথা কাত করে সায় দিলেন।
রফিক গলায় মাফলার পেচিয়ে টর্চ লাইটটা নিয়ে হনহন করে চলে গেল।
হামিদুর অন্ধকার গাছের গুড়িতে ঠায় বসে রইলেন। টর্চ না থাকায় তিনি মাঝে মাঝে আলো ফেলতে পারছেন না। জমাট অন্ধকার। নিজের হাতটা পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না। তার মনে হচ্ছে তিনি কবরের ভেতর বসে আছেন।
ধীরে ধীরে তার চোখ অন্ধকার সয়ে এল। তিনি ঝুলন্ত লাশের সাদা কাপড়টা দেখতে পাচ্ছেন। মুখটা দেখতে পাচ্ছেন না।
কে এই গৃহবধূ? কি যন্ত্রণা পেয়ে এমন গহীন জঙ্গলে এসে জীবন শেষ করলো? নাকি এটা কোন হত্যা? গাছে ঝুলিয়ে কেউ আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দিতে চাচ্ছে? পোস্টমর্টেম করলে সব বেরিয়ে আসবে।
তবে হত্যা বা আত্মহত্যা যাই হোক, এর পিছনে যে দায়ী তাকে এই মুহূর্তে হামিদুরের গুলি করে মারতে ইচ্ছা করছে। শালার জন্য এই কষ্ট!
হঠাৎ তার মনে হল পুরো জঙ্গলটা কেমন থম মেরে আছে। এতক্ষণ ঝিঁঝিঁ ডাকছিল। তা-ও বন্ধ হয়ে গেছে। তিনি পিঠ টান টান করে বসলেন। তার ঝিমুনী ভাব কেটে গেছে। মনে হচ্ছে কে যেন বড় বড় চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে।
মেরুদণ্ড বেয়ে একটা শিরশিরে অনুভূতি তার সারা দেহে ছড়িয়ে পড়ল। তিনি চট করে উঠে দাঁড়ালেন। রাইফেলটা শক্ত হাতে ধরলেন। তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় অসম্ভব সচেতন হয়ে উঠেছে। তিনি আগেও লক্ষ্য করেছেন বিপদের আঁচ পেলে তার এ রকম অনুভূতি হয়।
একবার খুলনায় থাকতে বনদস্যু ধাওয়া করতে যেয়ে তাকে সুন্দরবনে ঢুকতে হয়। দস্যুদের চারপাশ দিয়ে তারা ঘিরে ফেলেন। তিনি গুলি করতে যাবেন, হঠাৎ সূক্ষ্ম শব্দে তার সারা দেহের লোম খাড়া হয়ে গেল। তিনি চট করে ঘুরে দাঁড়ালেন। বিশাল একটা সাপ গাছের ডালের সাথে পেঁচিয়ে ফণা তুলে আছে। আর এক হাত নাগালের মধ্যে আসলেই তিনি ছোবল খেতেন। সেদিন সৃষ্টিকর্তার দেয়া শক্তিশালী ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের গুণে তিনি রক্ষা পেয়েছেন।
দূরে একটা পেঁচা ডেকে উঠল। হামিদুর ফোঁস করে একটা নিঃশ্বাস ছাড়লেন। তিনি ঘামতে শুরু করেছেন। টর্চটা এই মুহূর্তে ভীষণ দরকার ছিল। কেন টর্চটা হাতছাড়া করলেন? অবশ্য না দিয়ে উপায় ছিল না। রফিক পথ খুঁজে আসতে পারতো না।
হঠাৎ তিনি স্পষ্ট শুনলেন লাশটি হিঃ হিঃ করে হাসছে এবং দুলছে।
তার সমস্ত শরীরের রক্ত হিম হয়ে গেল। গহীন জঙ্গলে সেই হাসি গাছে গাছে প্রতিধ্বনিত হয়ে যেন তাকে ব্যঙ্গ করছে।
তার মাথা চক্কর দিয়ে উঠল। তিনি টলতে টলতে পড়ে গেলেন।
কিছুক্ষণ পর রফিক চা নিয়ে এসে দেখল, হামিদুর স্যার গাছের নিচে পড়ে আছেন। সে ভাবল হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছেন।
সে নিচু গলায় ডাকল,
স্যার, ও স্যার। চা নিয়ে এসেছি, উঠেন।
এমন সময় লাশটি আবার হিঃ হিঃ করে হেসে দুলতে লাগল।
রফিক চমকে উঠল। তার হাত থেকে চায়ের মগ পড়ে গেল। প্রচণ্ড ভয়ে তার হৃৎপিণ্ডটা কাটা মুরগীর মতো লাফাচ্ছে। আবার সেই রক্ত হিম করা হাসি। তার চোখে অন্ধকার ঘনিয়ে এল।
অনেকক্ষণ পর হামিদুরের জ্ঞান ফিরল। তিনি চোখ পিট পিট করে আশে-পাশে তাকালেন। প্রচণ্ড অন্ধকার! কিছুই দেখা যাচ্ছে না। হঠাৎ তিনি নারীকণ্ঠ শুনতে পেলেন।
কি পুলিশ দাদারা....ভয় পাইছো? চা খাবা না?....আমারেও দিও।... হিঃ.... হিঃ......হিঃ.....
হামিদুর ধরফর করে রফিককে ডাকলেন। তার হুঁশ ফিরতেই বললেন, বাঁচতে চাইলে তাড়াতাড়ি চল। দৌড়াই।
রফিক ঝটপট উঠে দাঁড়াল। তারা দৌঁড় দিতে যাবে, এমন সময় হামিদুর বললেন, লাশের মুখের উপর একবার টর্চটা মারো দেখি। আমি একটা গুলি করে পালাবো।
রফিক কাঁপা কাঁপা হাতে টর্চের আলো লাশের উপর ফেলল। তারা দু’জনেই চমকে উঠল। লাশের উপর একটা নারীমূর্তি বসা। হামিদুর প্রায়ই ট্রিগার চাপতে যাচ্ছিলেন, হঠাৎ লক্ষ্য করলেন এ যে বাজারের পাঁচী পাগলী। ডালের উপর বসে হিহি করে হাসছে। তার হাসির ঠেলায় ডালটা থর থর করে কাঁপছে। সেই সাথে লাশটাও দুলছে।
রফিক দ্রুত গাছে উঠে পাগলীকে নামিয়ে আনল। তাকে আর কি বলবে- পাগল মানুষ! শেষতক সারারাত পাগলীর গান শুনে তারা লাশ পাহাড়া দিতে লাগল।
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা জানুয়ারি, ২০১৬ রাত ১২:৪৫
৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

অন্ধকারের আলোকবর্তিকা

লিখেছেন স্প্যানকড, ১১ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৬




একটা দেশ যখন শিক্ষিত চাপাবাজ, ক্ষমতার দরবারে নতজানু বুদ্ধিজীবী এবং মুখোশধারী ডাকাতদের হাতে পড়ে, তখন সেই দেশ আর মানচিত্রে থাকা একটি ভূখণ্ড থাকে না, হয়ে যায় আলীবাবার চল্লিশ চোরের... ...বাকিটুকু পড়ুন

মৃত্যুর আগে কি মানুষ টের পায়, সে মারা যাচ্ছে!

লিখেছেন রাজীব নুর, ১১ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৫৭



মৃত্যুর কয়েক মুহুর্ত আগে, টের পাওয়া যায়- মরে যাচ্ছি।
সময় শেষ। তবে সবাই বুঝতে পারে না। কেউ কেউ বুঝতে পারে। আমার বাবা একদিন মাকে বলল, আমার দোষ ত্রুটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

সে আমার এআইনোক্কিও

লিখেছেন শায়মা, ১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১২:৪৪


এক জীবনে কত কিছু দেখা হয় কত কিছু জানা হয় মানুষের! আসলেই কত অজানারে! লেখক শংকরের এই নামে একটি বই আছে। কবিগুরুর আছে কবিতা কত অজানারে জানাইলে তুমি,... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্লগ সাইটের জন্য ডোমেইন নাম সাজেস্ট করুন

লিখেছেন ইফতেখার ভূইয়া, ১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ভোর ৪:৫৫


বাংলায় ব্লগিং করার জন্য একটি ওয়েব সাইট তৈরী করতে চাচ্ছি। আপাতত মূল উদ্দেশ্য হলো সামুতে লিখা আমার সবগুলো পোস্ট ধীরে ধীরে সাইটটিতে আর্কাইভ করে রাখা। সামুতে অনেকে নিবেদিত প্রাণ ব্লগার... ...বাকিটুকু পড়ুন

মানুষ গত কয়েক বছর ধরে অতিমাত্রায় স্বার্থপর হয়ে গেছে! আগেই কি ভালো ছিলাম?

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:৫৬



মানুষ গত কয়েক বছর ধরে অতিমাত্রায় আত্মকেন্দ্রিক বা স্বার্থপর হয়ে যাচ্ছে! আগে এমনটা দেখা গেলেও গত কয়েক বছর এটা অতি বেশিমাত্রায় দেখা যাচ্ছে। কেন??

দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা বেশি খারাপ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×