somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মুসলমানমঙ্গল - জাকির তালুকদারঃ পাঠ প্রতিক্রিয়া

০২ রা ডিসেম্বর, ২০১৭ রাত ৩:২৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



মধ্যযুগীয় বাংলার মঙ্গলকাব্যের দ্যোতনায় রাখা নামের এ বইটা পড়া শেষ হয়েছে নভেম্বর মাসের শেষ দিন, ত্রিশ তারিখ। বইটির বিষয়বস্তুর ব্যাপকতার জন্যে খানিকটা গুছিয়ে নিয়ে ফের রিভিউ লিখতে বসা।

মুসলমানমঙ্গল বইটির ব্যাকফ্ল্যাপে প্রতিশ্রুতি দেয়া আছে যে এই বই তার পাঠককে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা বাঙ্গালী আর মুসলিম - এই দুই সাংঘর্ষিক আইডেন্টিটির মধ্যে একটা বোঝাপড়ার সম্মুখীন করবে। সকল চিন্তাশীল বাঙ্গালী মুসলিমদের মতই এই ক্রাইসিসটা দীর্ঘদিন ধরে আমার নিজেরও এক ব্যক্তিগত ক্রাইসিস। জাকির তালুকদারের বইটি বিশ্বসাহিত্যকেন্দ্র লাইব্রেরী থেকে হায়ার করতে আমার দ্বিতীয়বার ভাবা লাগে নি। লেখক আমাদের বাংলাদেশের সাহিত্যাঙ্গনে মোটামুটি পরিচিত। সৈয়দ শামসুল হক সাহেব ওনার ব্যাপারে ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।

কি কারণে বইটি পাঠ, তা স্পষ্ট করলাম। এখন বলি বইটার উপজীব্য বিষয় আসলে কি, এবং কোন কনট্যাক্সটে, কোন কোন চরিত্রকে ব্যবহার করে কিভাবে লেখক তার লক্ষ্যে পৌঁছেছেন।

উপন্যাসের কাঠামো বিবেচনায় আমি এই বইটিকে খুব একটা ভালো মার্ক দেবো না এই কারণে যে - উপন্যাসের শুরুতে যে গুরুগম্ভীর একটা বর্ণনার মাধ্যমে পাঠক উপন্যাসের ভেতর প্রবেশ করে তা আর লেখক বাকি উপন্যাসে বজায় রাখতে পারেন নি। পুরো উপন্যাস বিবেচনায় এই শুরুয়াদ বরং খানিকটা আরোপিত লাগে। দুটো জায়গায় বা দুটো পর্বে জাকির তালুকদারের বইটি বিভক্ত। এক, যখন উপন্যাসের নায়ক ইউসুফ গ্রামে তার বুবুর শ্বশুরবাড়ি যায়, ঔপন্যাসিক যার নাম দিয়েছেন আত্মসমালোচনাপর্ব। এই পর্বে তিনি প্রচলিত সকল ইসলামী ধ্যানধারণাকে কচুকাটা করেছেন ইসলামের নামে। দ্বিতীয় পর্বে, যার নাম মোকাবিলাপর্ব, তাতে ইউসুফ তার শহুরে বন্ধুদের সাথে মিলে ইসলামকে রিনোভেট করার প্রকল্প হাতে নিলে তাদের ব্যাপারে সমাজের প্রতিক্রিয়া হয়ে ওঠে মুখ্য। শেষে ইউসুফকে জালিয়াতি করে ইসলামের বিরুদ্ধ পক্ষের মুরতাদ - কাফের ঘোষণা করে সক্রেটিসের মত এক ফলস বিচারের সম্মুখীন করা হয়।

যে চরিত্রগুলি উপন্যাসের সময়ে সময়ে গুরুত্বের সাথে উঠে এসেছে তারা হল - উপন্যাসের নায়ক ইউসুফ, প্রাথমিকভাবে ধর্মের প্রতি উন্নাসিক এবং উদাস এবং পরবর্তীতে পরিবর্তিত হয়ে আধুনিক ইসলামী চিন্তাবিদ হয়ে ওঠা। ইউসুফের দুলাভাই গ্রামের সামন্ততান্ত্রিক মোড়ল, গোঁড়া মুসলিম, নিজের মত করে ইসলাম বোঝা মানুষ এবং নিজ সীমানার ভেতর ইসলামী শরিয়া আইনকানুন প্রয়োগে একদম খড়গহস্ত। আছে প্রচলিত ইসলামী রীতি রেওয়াজ থেকে দূরে থাকা গ্রাম্য মৌলোভী আবদুল খালেক, ইউসুফের হিন্দু ধর্মাবলম্বী এবং দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যাওয়া এককালীন প্রেমিকা উপমা, হিন্দু ধর্মাবলম্বী বন্ধু ধীমান , যেহেতু মুসলমানের মুখে এক কালীন সনাতন ধর্মাবলম্বী জমিদারদের অত্যাচারের সমালোচনা ঠিক গ্রহণযোগ্য হয় না - বাংলাদেশের হিন্দু কমিউনিটির আচরণের ব্যাপারে খুবই ক্রিটিকাল সনাতন ধর্মাবলম্বী ধীমানের কণ্ঠ ব্যাবহার করে তাই লেখক সচ্ছন্দে হিন্দু ধর্মের ক্রিটিসিজম উপন্যাসে করেছেন। উপন্যাসে আরও আছে স্টেরিওটিপিক্যাল আমেরিকার মেয়ে লিসবেথ, যার ইসলাম নিয়ে আগ্রহের শেষ নেই। লিসকে ইসলাম শেখাতে গিয়ে ইউসুফ গোটা অ্যামেরিকাকেই যেন ইসলাম শিখিয়ে ছাড়ে। কিন্তু টিপিক্যাল যুক্তিবাদী অ্যামেরিকানদের মত করে লিস কোন তর্কে যায় না ইউসুফের সাথে। সর্বশেষ চরিত্র, খলচরিত্র, বর্তমান তথাকথিত সেকুলারপন্থীদের চেনা ছক অনুযায়ীই এক টুপী দাঁড়ি - তথা লেবাসধারী মুসলিম শামসুল হক, যে কিনা হেন দুষ্কর্ম নাই যা করে নি।

গল্প কথক হিসেবে এই উপন্যাসটিতে আমি জাকির তালুকদারকে খুব বেশী নম্বর দিতে রাজি নই, কিন্তু তার বইটাকে যদি একটি তুলনামূলক রিসার্চ হিসেবে ধরা হয়ে থাকে তবে তাতে তিনি এ প্লাস সহ পাশ করবেন। প্রচুর তথ্য উপাত্য ঘেঁটে ক্রমানুযায়ী তিনি সারা বিশ্বে ইসলাম ছড়িয়ে পড়ার ইতিহাস সাজিয়েছেন। যে সব ইস্যু টাচ করা হয়েছে বা প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়েছে -

১। মুসলিমপ্রধান এক অজ পাড়া গাঁ এর বিভিন্ন স্তরের মানুষের মধ্যে সম্পর্কের ডায়নামিকস।
২। প্রাচীন আরবিয় জীবন ব্যাবস্থা। আরবদের গোত্রপ্রথা, তাঁদের প্রাচীন দেব - দেবীরা।
৩। আবদুল ওহাব এবং মুসলিম বিশ্বে ওহাবি আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ার ইতিহাস।
৪। কওমি মাদ্রাসার ডায়নামিক্স।
৫। ইসলামে গান - বাজনা - ছবি আঁকার ব্যাপারে প্রচলিত ফতোয়ার বাইরে একটা ধর্মীয় দৃষ্টিকোণের মদদপুষ্ট ফতোয়া বের করা।
৬। জাল হাদিসের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, সূত্রপাত ইত্যাদি।
৭। ইসলামিক খেলাফাত, খোলাফায়ে রাশেদিনের প্রথম তিন খলিফার ব্যাপারে অতি সমালোচনার দৃষ্টিতে তাকানো এবং অলমোস্ট তাঁদের ক্যারেক্টার অ্যাসাসিনেশন।
৮। সাহাবি হজরত মুয়াবিয়ার রাজত্বকাল।
৯। রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিসসালামের বহুবিবাহের ব্যাখ্যা।
১০। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমকালীন খেলাফত আন্দোলন।
১১। ভারতীয় উপমহাদেশে সূফীবাদের সম্প্রসারণ।
১২। কেউ কাউকে জোর করে মুরতাদ ঘোষণা করতে পারে, নাকি মুরতাদ স্বঘোষণার ব্যাপার?
১৩। জামায়াতে ইসলামীর জন্ম, মওদুদীর রাজনীতির ব্যাখ্যা।
১৪। এলেম বলতে কি কেবল ধর্মীয় জ্ঞান, নাকি জীবনের প্রয়োজনে যেকোনো জ্ঞান?
১৫। চরমপন্থীর লক্ষণ নিয়ে মিশরের ইসলামী তাত্ত্বিক ডঃ ইউসুফ আল কারজাভির ব্যাখ্যা।
১৬। ত্রিশ - চল্লিশ দশকের বাংলার মুসলিম সাহিত্য সমাজ ও শিখা গোষ্ঠী।
১৭। ফিকাহ শাস্ত্রের উদ্ভব ও পরিণতি।
১৮। মুসলমানদের জন্যে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের কামনা, ব্রিটিশ শাসিত ভারতে - পূর্ববঙ্গের কৃষক সমাজের এই স্বপ্ন কি সাম্প্রদায়িকতা ছিল?
১৯। ভারত - পাকিস্তান - বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িকতা/ দাঙ্গার ইতিহাস।
২০। বঙ্কিম - শরৎচন্দ্রের লেখায় সাম্প্রদায়িকতা
২১। অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের সাথে রসুল সঃ এঁর আচরণ কেমন ছিল?
২২। ইসলামে নারীদের অবস্থান এবং ইসলামিক ফেমিনিজম।
২৩। হুদাইবিয়ার সন্ধির তাৎপর্য।
২৪। দাজ্জালের আগমন
২৫। মুসলমান আর অ্যামেরিকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের তিক্ততার কার্যকারণ।

এরকম ছোট আরও বেশ কিছু ইস্যু নিয়ে আলোচনা করেছেন তিনি। আমার কাছে আলোচনাটা প্রাসঙ্গিক মনে হলেও তার কিছু কিছু অভিমতের সাথে আমি একদমই সহমত পোষণ করতে পারি নি। বিশেষত আমাদের প্রথম তিন খলিফার চরিত্রহননই করা হয়েছে উপন্যাসটির প্রথম দিকে। দ্বিতীয়ত, তার দেয়া রেফারেন্স বইয়ের তালিকায় প্রথম নামটি ছিল মুফতি শফি সাহেব (র) এঁর তাফসিরে মা'আরেফুল কুরআন, আবার একই সাথে ইনি বায়জিদ আহমেদ পন্নিকে একজন প্রধান ধর্ম সংস্কারক মনে করেন , তার পাশ্চাত্য সভ্যতাকে দাজ্জালের সাথে তুলনা করা বইটাও প্রাসঙ্গিক করার চেষ্টা করা হয়। এইধরনের দ্বিমুখী অবস্থান নেয়াটা পূর্বের কোন মতলব তৈরি করা না থাকলে কোন সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষের পক্ষে সম্ভব না। তৃতীয়ত - বাঙ্গালী বনাম মুসলিম আইডেন্টিটির লড়াইটাও সেভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারেন নি লেখক। কাহিনির নির্মিতিতে দুর্বলতা আছে।

তবুও, বইটির সফলতা হয়তো এখানেই যে - বইটা দেশের সচেতন যেকোনো নাগরিক / পাঠককে ভাবাবে। পৃথিবী জুড়েই এখন সাম্প্রদায়িকতা। আগেও ছিল, আগে বলতে সৃষ্টির ইতিহাসের প্রায় শুরু থেকে। এখন আরও বেড়েছে। সাম্প্রদায়িকতা নাই - বলে চুপ করে জেদ ধরে বসে থাকলে হবে না। যেকোনো সমস্যা সমাধানের প্রথম পদক্ষেপ হচ্ছে আগে স্বীকার করে নিতে হবে যে সমস্যাটা আমাদের সমাজে এক্সিস্ট করে। তারপরেই না সমাধান। এই সাবকন্টিনেন্ট সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদ - আগেও ছিল , এখনও আছে, কিন্তু কিভাবে আছে - কে তার ফলভোগী আর কে মারা যাচ্ছে নেতাদের হুকুমে - এসব তথ্য আজ খুব দরকার।

এই বইয়ের জন্যে এ পর্যন্তই। পরবর্তী বই - Stephanie Garber - Caraval.


সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই মার্চ, ২০২১ সকাল ১১:৫৫
৮টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বৃষ্টি দিনের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৭ ই আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:০৫



টিভি বা পত্রপত্রিকায় আবহাওয়া'র খবর নিয়ে নিউজ হয়-
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টি ও বজ্রবৃষ্টির প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে। একই সঙ্গে কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারী থেকে অতিভারী বর্ষণের পূর্বাভাস... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইন দ্যা শ্যাডোস অব ইল্যুশন

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৭ ই আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৫৮



রাজধানীর নিঝুম আবাসিক এলাকার তিনতলা ফ্ল্যাটের শোবার ঘরটি তখন ক্রাইম সিন টেপে ঘেরা। ধুলো জমে থাকা এয়ার কন্ডিশনারের শব্দের মাঝে বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে রক্তের হালকা সোঁদা গন্ধ।

পিবিআই ইনভেস্টিগেশন... ...বাকিটুকু পড়ুন

‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’-এর খসড়া লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের ভেটিং-সাপেক্ষে চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা।

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৭ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ৮:১০


‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’-এর খসড়া লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের ভেটিং-সাপেক্ষে চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা।

গুমের অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এছাড়া ভুক্তভোগীকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

মস্তিষ্ক কাজ করার আগেই যখন উত্তর চলে আসে

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৮ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:০৭


মস্তিষ্ক কাজ করার আগেই যখন উত্তর চলে আসে

একসময় কোনো প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে মানুষকে ভাবতে হতো। বই খুলতে হতো, লাইব্রেরিতে যেতে হতো, কারও সঙ্গে আলোচনা করতে হতো, ভুল... ...বাকিটুকু পড়ুন

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্বাবস্থার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ-পর্ব ৪

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ০৮ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ২:১৬


বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ: মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর রেমিট্যান্স কৃষিভিত্তিক শিল্পায়ন ও টেকসই উন্নয়নের বিকল্প কৌশল
একটি অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক ফিজিবিলিটি স্টাডি ।
একটি ধারাবাহিক গবেষনামুলক পোস্ট
[link|https://www.somewhereinblog.net/blog/ali2016/3039397|১ম পর্বে থাকা গবেষনাটির পটভুমির লিংক – পর্ব... ...বাকিটুকু পড়ুন

×