১.
হুমায়ূন আহমেদের মূল প্রতিভা বাংলাদেশের মানুষদের আবেগের জায়গাগুলি ঠিকঠাক লোকেট করতে পারা, এবং তাতে যথাযথ চাড় দেয়া। আবেগী তরুণ বাঙ্গালীদের সবাই ই জোছনাবিলাসী, সবারই মনের খাহেশ জোছনারাতে ঘর ছেড়ে বিবাগি হয়ে যাওয়া। সব তরুণই চায় - তার সবচে পছন্দের যে মানুষটি, সে তাকে যেচে এসে 'রূপা'র মত ভালোবাসা নিবেদন করবে, আর সে হিমুর মত অতিপ্রাকৃত ক্ষমতায় তাকে ভালোবাসা - না বাসার মাঝামাঝি একটা জায়গায় ঝুলায়ে রাখবে। একইভাবে, তরুণীরাও নীল শাড়ি পরে - জোছনারাতে তাঁদের রুমের বারান্দা বা জানালায় গিয়ে দাঁড়ায় তাঁদের হিমুর অপেক্ষায়। হুমায়ূন আহমেদ আমাদের প্রেম করা শিখিয়েছেন। বাঙ্গালী রমণীর 'নাইট ইন শাইনিং আর্মর' -এর পোশাক বদলায়ে তার গায়ে চাপিয়েছেন হলুদ পাঞ্জাবী। তাকে হাঁটিয়েছেন খালি পায়ে। বাঙালীর ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশের এই যে একান্ত নিজস্ব একটা ভাষা তৈরি করেছেন তিনি - এর ক্রেডিট তাকে দিতেই হবে।
.
২.
হুমায়ূন আহমেদের মূল ক্ষমতা, লেখক হিসেব - চরিত্র নির্মাণ, আর সংলাপ রচনা। হিমুর কথা আগেই বললাম। মিসির আলী প্রসঙ্গে দুটো কথা বলি। মিসির আলী তুখোড় মনোবিজ্ঞানী, সঙ্গে সঙ্গে দারুণ আবেগী মানুষ। জেন ফিলসফারদের মত শীতল মস্তিষ্কে যুক্তির চাষাবাদ করে একএকটা সমস্যার জট খোলেন, আবার সহচরিত্রের দুঃখ কষ্টে তাকে আলোড়িত হতে দেখা যায় দারুণভাবে। সময়ে অসময়ে ভিজে ওঠে তার চোখ। বিজ্ঞান মিসির আলীর চিন্তায় বেগের অতিরিক্ত সঞ্চার যেমন ঘটায় নি, একই সঙ্গে ছিনিয়ে নেয় নি তার আবেগও।
হুমায়ূনএর ক্যাচি, আহ্লাদি, ঈষৎ রহস্যের অবগুণ্ঠনে ঢাকা ডায়লগের ব্যাবহার তার নায়িকাদের প্রেমে পড়তে আমাদের বাধ্য করে। প্রেমিকার বিয়ে হয়ে যাচ্ছে, বেকার প্রেমিক শূন্য পকেটে হেঁটে বেড়াচ্ছে ঢাকা শহরের সড়কপথে, অলিতে গলিতে - এইরকম স্যাড প্লট, আর ছ্যাঁক খাওয়া চরিত্রের সঙ্গে ইন্সট্যান্ট কানেক্ট করতে পারবে, বাংলার মাটিতে এরকম প্রেমিকপুরুষশুমারি করলে আজকেই মিনিমাম পঞ্চাশ লাখ পাবেন।
.
৩.
হুমায়ূন আহমেদের মূল প্যারাডক্স হইল, তার লেখার প্লট পরে আর মাথায় থাকে না। আমি পরিণত বয়সেও গভীর রাতে তার উপন্যাস পড়তে পড়তে চোখের পানি ফেলসি। আবার সকালবেলায় ঘুম থেকে উঠে আসলেই মনে করতে পারি নাই, উপন্যাসের প্লট ছিল কি।
.
৪.
হুমায়ূন আহমেদকে আমরা, যারা সাহিত্যের নাক উঁচা পাঠক, তারা কেন পছন্দ করি না, সেটা ভেঙ্গে বলি। কারন আমরা জানি, আমাদের পক্ষে হুমায়ূন আহমেদ হওয়া সম্ভব না। চেষ্টা করলে একজন বুদ্ধিবৃত্তিক লেখক হওয়া সম্ভব। কোদাল দিয়ে মাটি কোপানোর মত ধৈর্য নিয়ে, দিনের পর দিন কাগজ কলম হাতে বসে থাকলে একদিন না একদিন ইলিয়াসের খোয়াবনামা, আজিজুল হকের আগুনপাখি, অথবা শহিদুল জহিরের জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতার কাছাকাছি একটা কিছু লেখা সম্ভব। কিন্তু হুমায়ূন আহমেদের মত লেখা সম্ভব না। ইন্টেলেকচুয়াল হওয়া যায়। স্পন্টানিয়াস হওয়া যায় না। লেখালিখিতে স্পন্টানিয়াস আরও হওয়া যায় না, যদি না ঈশ্বরপ্রদত্ত মেধা থাকে। কবিগুরু তো সাধে বলেন নাই - সহজ কথা কইতে আমায় কহো যে, সহজ কথা যায় না বলা সহজে।
.
৫.
একজন লেখক হয়েও হুমায়ূন আহমেদ যে ক্রেজটা বাংলার মাটিতে সৃষ্টি করসিলেন, এটা অকল্পনীয়। সৈয়দ হক সাহেব জীবদ্দশায় তো হুমায়ূন আহমেদকে কম অপছন্দ করেন নাই। সুযোগ পাইলেই খোঁচা মারসেন এই বলে যে - আপনি গুনে গুনে পাঁচ ফর্মাতেই বই কীভাবে শেষ করেন হুমায়ূন? (হুমায়ূন আহমেদো বুদ্ধিদীপ্তভাবে উত্তর করতেন - যেভাবে আপনারা চৌদ্দ লাইনে সনেট লেখেন, সেইভাবে)। হুমায়ূন আহমেদের লাশ যখন শহীদ মিনারে আনা হয়, মূলমঞ্চে তার কফিনে কাঁধ দিতে নিজে থেকেই আগিয়ে গিয়েছিলেন সৈয়দ হক। মরেও জিতলেন হুমায়ূন।
.
৬.
হুমায়ূন আহমেদের মত কেউ লেখার চেষ্টা কইরেন না, এটা বলেই আমার হুমায়ূন আহমেদের জন্মবার্ষিকীর শ্রদ্ধাঞ্জলী শেষ করি। হুমায়ূন আহমেদের মত লেখা সম্ভব না। আর যদি পারেনও, লাভ নাই। লোকে দিনের শেষে হুমায়ূনের লেখাই পড়বে। তার জেরক্স কপির না।
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই নভেম্বর, ২০২০ দুপুর ২:০২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




