রবীন্দ্রনাথ ছবি আঁকা শুরু করেছিলেন বয়স ৬০ বছর পার করবার পর। সেই বয়সে এসে, তার ভাষায়, তিনি 'দেখার আনন্দ' খুঁজে পেয়েছিলেন। আমিও দেখি। আনন্দ পাই আর না পাই, দেখি। আগে, রাস্তায় হাতে বই থাকতো। জ্যামে থাকলে, সময় কাজে লাগাতে পড়া শুরু করতাম। এখন জীবাণুর ভয়ে বই হাতে ক্যারি করি না রাস্তায়। তাই, সময় কাজে লাগানোর জন্যে খুঁটায়ে খুঁটায়ে দেখি চারপাশ। ইন্টারেস্টিং চরিত্র খুঁজি। প্লট খুঁজি।
আজ যেমন দেখলাম মুরগি। বাসাবো কদমতলার মোড়ের একটু আগে, রাস্তার ওপর বসা কাঁচাবাজারে।
দেখলাম, মুরগির ঝাঁকার ভেতরে বন্দী অনেক মুরগি। তারা নায়লন দড়ির নেটের নীচে যে বন্দী জীবন, তাকে উপভোগ করছে না। হুটোপুটি করছে। ডানা ঝাপটাচ্ছে। বের হয়ে আসতে চাচ্ছে। আগেও দেখেছি এসব। তারা ডানা ঝাপটায়, বের হয়ে আসতে চায়। তবে পারে না। পরে, ভগ্নমনোরথে উপরের জালির মধ্য দিয়ে মাথা বের করে জুলুজুলু চোখে তাকায়ে থাকে। আস্তে আস্তে কোঁক কোঁক করে। ঝিমায়।
আজকে, একই রকম ইনডিফরেন্স নিয়ে, জ্যামে বসে, তাকায়ে ছিলাম মুরগির ঝাঁকার দিকে।
একটা বিপ্লবী মুরগি অসাধ্য সাধন করলো। উপরের নেটের মাঝখানে যে জালি, সে কোন একভাবে, মেসি বা ম্যারাদোনা যেভাবে প্রতিপক্ষকে কাটায়, ঠিক সেভাবে অন্য মুরগিদের কাটায়ে সেই জালি দিয়ে লাফ দিয়ে বের হয়ে এলো। অন্যান্য মুরগির মাথার উপর লাফায়ে লাফায়ে এসে দাঁড়ালো একদম ঝাঁকার পেরিফেরিতে।
এরপর বাকি থাকে একটা মাত্র ঝাঁপ। তাইলেই মুক্তি। অন্তত অন্যের টেবিলে খাবার হিসেবে পরিবেশিত হওয়ার সম্ভাব্যতা - একটু হইলেও হ্রাস পাওয়া।
আমি স্থির তাকায়ে আছি মুরগির দিকে।
মুরগি কি আমার দিকে তাকালো একবার?
বোঝা যায় না।
মুরগি যখন সোজা তাকায়, তখন তো সে ডানে আর বামে দেখে। আমারে দেখতে হইলে তো ওর মুখ অন্যদিক থাকতে হবে, তাই না?
যাই হোক, কথা হইল মুরগির লাফ দেয়া। মুরগি লাফ দিবে কিনা। মুরগি মুক্তির পথ বেছে নিবে কিনা। আমি মনে মনে গুনগুনিয়ে উঠলাম - 'মুক্তির মন্দির সোপান তলে...' ইত্যাদি ইত্যাদি।
আশেপাশের সবজি বিক্রেতারা হইহই করে উঠলো - ঐ (অমুক বা তমুক) তোর মুরগি ছুটলো।
মুরগি - লাফ দেয় না কেন?
রিকশাওয়ালারা জ্যামের মধ্যে রইরই করে উঠলো - ঐ (অমুক বা তমুক) তোর মুরগি গেল রে...
মুরগি দাঁড়ায়ে আছে গ্রীবা উঁচু করে। মুরগি লাফ দিলো না।
মুরগিওয়ালা নিকটেই কোথাও ছিল। পায়ে পায়ে হেঁটে এসে ক্যাঁক করে ওর গলা ধরে ছুঁড়ে দিলো খাঁচার ভিতর। বিপ্লবের পরিসমাপ্তি।
আমি খাঁচার ভিতর মনোযোগ দিয়ে তাকাইলাম। মুরগিটাকে আর অন্য মুরগিদের থেকে আলাদা করতে পারলাম না।
আমার মনে হইলো, কতোবার, কতো কতোবার - এই মুরগির মতই, আমার কম্ফোরট জোনের কিনারে এসে দাঁড়াইসি, আর ভেবেছি - কাজ সমাপ্ত। শেষ লাফটা দিই নাই দৌড়াতে থাকি নাই ক্রমাগত, প্যাশনের পথে, মুক্তির পথে। সেই পথে - যেই পথে আমার একটা একান্ত ব্যক্তিগত পরিচয়ে অস্তিমান হয়ে ওঠার সম্ভাবনা। একটা গান , একটা বই, একটা শর্টফিল্ম, একটা রিসার্চ আর্টিকেলের কাজ শেষ করে চিত হয়ে পড়ে আরাম করসি পরের ৬ মাস। ফেইট তারপর আমাকে ঘাড়ে ধরে মিডিওক্রিটির খাঁচায় ভরে দিসে।
মুরগি পারলো না, আমার তো পারা উচিৎ। বা, আমাদের।
জ্যাম ছাড়লো। আমি শেষবারের মত ব্যার্থ বিপ্লবী মুরগিটাকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করে, ভগ্ন মনোরথে ফের গুনগুনিয়ে উঠলাম -
খাঁচার ভেতর অচিন মুরগি কেমনে আসে যায়...
হায়।
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই নভেম্বর, ২০২০ রাত ৮:৩০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




