somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সূতির খালের হাওয়া - ৫

২৬ শে জানুয়ারি, ২০২১ সন্ধ্যা ৭:২৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



স্ত্রীর সঙ্গে টিভি সিরিজ দেখতে দেখতে রাতের খাবার খাওয়ার অভ্যাস হয়েছে করোনার কারনে ওয়ার্ক ফ্রম হোম শুরু হবার পর থেকে। ডাক্তার / ডায়েটেশিয়ানরা মানা করে টিভি দেখতে দেখতে খেতে। কিন্তু রাতের খাবার পরিমান নির্দিষ্ট থাকে, এবং হামহুম করে না খেয়ে ধীরে সুস্থে চিবিয়ে খাবার অভ্যাস রপ্ত করে ফেলেছি বলে সমস্যা হয় না। এছাড়াও, বাসায় থাকলেও সারাদিন যে যার কাজে ব্যস্ত থাকি, কাজেই রাতে টিভি সিরিজ দেখতে দেখতে খাওয়া, হাসিঠাট্টা করা আমাদের দাম্পত্য জীবনের অন্যতম অনুষঙ্গ।

দূর থেকে অ্যামেরিকার কালচার বোঝার এক অন্যতম অনুষঙ্গ হচ্ছে ওদের সিটকম, বা সিচুয়েশনাল কমেডিগুলো। ড্রামা, হিস্টোরি বেইজড সিরিজগুলির চে সিটকমে ওদের সংস্কৃতি, ওদের দৈনন্দিন জীবন, ওদের রঙ্গ রসিকতা, ওদের উৎসব, পালা পার্বণ ইত্যাদি ফুটে ওঠে আরও স্পষ্টভাবে। ব্যতিক্রম থাকতে পারে। তাছাড়া, টিভিতে হয়তো ঘটনা বাস্তবের চে' খানিকটা বাড়িয়েই দেখানো হয়। তবুও, পুরো মিথ্যার ওপর তো কিছু দাঁড়াতে পারে না।

করোনার শুরুতে দেখলাম ফ্রেন্ডস। ওটা শেষ করে ইয়াং শেলডন। এখন আছি 'হাউ আই মেট ইওর মাদার' নামের টিভি সিরিজের শেষ সিজনে। এই সিরিজটা এ নিয়ে আমার দ্বিতীয়বার দেখা। প্রথমবার, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকা অবস্থায় একা দেখেছি। এখন দেখছি স্ত্রী'র সঙ্গে। ছাত্রজীবনে সিরিজটার অনেক জোক, অনেক ক্যারেক্টারের প্রেজেন্টেশন যে মারাত্মক রেসিস্ট ছিল, বুঝি নি। এখন রাজনীতি সচেতনতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছু চোখে ধরা পড়ে, কানে লাগে, মনে বাজে।

আমার আজকের ডায়রি এই সিরিজের রেসিস্ট দিকগুলো নিয়ে অতটা না, বরং সংস্কৃতিগত ভিন্নতা আমাদের মধ্যে কতোটা প্রকট সেটা বোঝাপড়ার একটা প্রচেষ্টা।

হাউ আই মেট ইওর মাদার নিউইয়র্ক নিবাসী পাঁচ বন্ধুর জীবন নিয়ে তৈরি। তারা তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রী অর্জন শেষ করে চাকুরী জীবনে থিতু হওয়ার, আর জীবন সঙ্গী খুঁজে বের করার চেষ্টায় লিপ্ত থাকে। এরমধ্যেই তাদের জীবনের বিবিধ ঘটন - অঘটন - দুর্ঘটন নিয়ে এ সিরিজ এগোয়।

এতে দেখানো হয়, প্রধান দুই পুরুষ চরিত্রের একজন (বার্নি স্টিনসন) তাদের ওপর জনের (টেড মোসবি) বৃদ্ধ মায়ের সঙ্গে যৌন সম্পর্কে জড়ায়, (বা জড়ায় না, এটা নিয়ে বার্নি একটা ধাঁধাঁ রেখে দেয়), এবং এটা নিয়ে সারাক্ষণ তারা নিজেদের মধ্যে হাসিঠাট্টা করতে থাকে। আবার দেখা যায়, টেড নিজেও বার্নির বোনের সঙ্গে ওয়ান নাইট স্ট্যান্ডে জড়ায়, এবং এটা নিয়ে বার্নির সঙ্গে হাসিঠাট্টা করতে থাকে। আবার পরিবারের বয়স্ক সদস্যদের এমন অচ্ছুৎ, অপাংক্তেয়ভাবে টেলি সিরিজটিতে উপস্থাপন করা হয়, বাংলাদেশে বড় যে কেউ তার সঙ্গে রিলেট করতে পারবে বলে মনে হয় না। পাঁচজন প্রধান নায়ক নায়িকাদের দুজন থাকে স্বামী - স্ত্রী, আর বাকি তিনজন (দুজন ছেলে, একটি মেয়ে) ক্রমাগত নিজেদের ভেতর ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ডেট করে, ক্যাজুয়াল সেক্স করে।

এগুলো সবচে স্থূল বা মোটাদাগের প্রসঙ্গ, যা একজন ভেতো বাঙ্গালী হিসেবে আমার চোখে লেগেছে। বন্ধুবান্ধবের বাবা-মা'কে নিজের বাবা মা হিসেবেই বিবেচনা করে বড় হয়েছি। বন্ধুবান্ধব একটা আরেকটার বোনের সঙ্গে প্রেম করার চেষ্টা করে নাই তা না, কিন্তু এর ফলশ্রুতিতে "তোরে আমি ভাই ভাবছিলাম, ভাই!' এই সংলাপ সহ ঝগড়াঝাটি, হাতাহাতি হয়েছে। তারপর, হয়তো সম্পর্ক হয়েছে পারিবারিক ভাবে, বিয়েও হয়তো হয়েছে। হয়তো বলছি, কারন আমার পরিচিত সার্কেলে আমি আসলে দেখি নাই বন্ধুর বোনের দিকে সিরিয়াসলি প্রেমের নজরে কাউকে তাকাতে। আর "তোর বোন আর আমি তো ব্যাং ব্যাং করে বেড়াচ্ছি" - এই ধরনের ডায়লগ যদি এক বন্ধু আরেক বন্ধুরে রসিকতা করেও দেয়, সে রসিকতা খুনোখুনি পর্যন্ত গড়াতে পারে। একই সার্কেলে ঘুরে ফিরে ডেট করবার, ক্যাজুয়াল সেক্স করবার সংস্কৃতি এখনও চালু হয় নি বাংলাদেশে।

একটা বিষয় খেয়াল করবেন, আমি জাজ করছি না। আমি বলছি না পাশ্চাত্যের শ্বেতাঙ্গদের মধ্যে এই অভ্যাসগুলো আছে বলে তারা ভালো, বা মন্দ। আমি এটাও বলছি না যে আমাদের মূল্যবোধ তাদের চে ভিন্ন বলে আমরা মানুষ হিসেবে তাদের চে ভালো।এবং, অনেক প্রবাসী বাঙ্গালীর হয়তো মনে হতে পারে, 'কিরে ভাই, এ তো পাশ্চাত্যের মেইনস্ট্রিম কালচার না। আমি তো নিজে প্রবাসকালে চোখে এমন কিছু দেখি নাই।' হয়তো আসলেই এ অবাধ যৌন স্বাধীনতা ( জাজ করবার উদ্দেশ্যে শব্দটা ব্যবহার করছি না) আসলেই তাদের সবার মধ্যে এক পরিমান ছড়ায় নি।

কিন্তু কিছু হলেও তো আছে? নতুবা, সিটকম ইতিহাসের সবচে ব্যবসাসফল একটা সিরিজে কীভাবে এইসমস্ত গল্প প্রচারিত হয়? কেউ তো আপত্তি করে নাই। কেউ তো মামলা করে নাই তাদের নামে, সংস্কৃতি গেলো গেলো রব তুলে।

যৌন স্বাধীনতার মতই , তাদের একাংশের ভেতর ধর্মীয় মূল্যবোধ নিয়ে হাসিঠাট্টা করার প্রবণতাও হয়তো আছে।

বাক স্বাধীনতার নামে ধর্মীয় মূল্যবোধ নিয়ে টিটকারী মারা আমাদের দক্ষিণ এশিয়ার আমজনতার সংস্কৃতি নয়। আমরা অশিক্ষিত। 'মাথামোটা গরুখোর', বা 'গোমাতাভক্ত' । তাই ধর্মভীরুতা কম বেশী আছে আমাদের মধ্যে। কেউ প্র্যাকটিস করে, কেউ করে না। কিন্তু মানুষের ধর্মবিশ্বাস নিয়ে টিটকারি মারাটা আমাদের মেইনস্ট্রিম কালচার না।

একেবারেই যে কেউ টিটকারি মারত না, তা না। কেউ কেউ মারত। তবে তাদের নিয়ত থাকতো দাঙ্গা বাঁধানো। ইতিহাস সাক্ষী।

ইদানিংকালে একটা গোষ্ঠীর আকাঙ্খা, বাক স্বাধীনতার নামে আমজনতার ধর্মবিশ্বাসকে টিটকারী মারা জায়েজ করা।

যারা বাক স্বাধীনতা চর্চার নামে ধর্মীয় মূল্যবোধকে টিটকারি মারা প্রমোট করতে চান, তারা খণ্ডিতভাবে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির একটা আচরনকে আমাদের সঙ্গে পরিচয় করায়ে দিচ্ছেন। উপরে টিভি সিরিজ থেকে যে উদাহরনগুলি দিলাম, একদিন তারা বাক স্বাধীনতার নামে সেগুলিও প্রমোট করা শুরু করবে আশা করি। আমাদের সাহিত্যে, সিনেমায়, সিরিজে আমাদের বন্ধুরা আমাদের মায়েদের সঙ্গে ফ্লারট করবে। আমরা আমাদের বন্ধুদের বোনেদের সঙ্গে ঘুমায়ে তাদের সঙ্গে হাসিঠাট্টা করব। ফ্রেন্ডরা মিলে অরগির আয়োজন করবো। বুড়া বাপ মা'র সঙ্গে মুখ অন্ধকার করে বছরে একবার দেখা করতে পারলে করবো, না করতে হইলে বলবো আল্লায় বাচাইসে। বুড়া আত্মীয় স্বজনরে ভাগাড়ে নিয়া ফেলব। তাদের সঙ্গে কোন আড্ডায়, আলাপচারিতায় যাওয়ার চে দৌড়ায়ে পালাতে গিয়ে গাড়ির নীচে চাপা পড়া প্রেফার করবো। তারপরই কেবল আমরা ধর্মান্ধ, অশিক্ষিত, মধ্যযুগীয় বর্বর বাঙ্গালীরা পূর্ণাঙ্গ সংস্কৃতিমনা হব। আমাদের এখনও আলোকিত হওয়া বাকি।
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে জানুয়ারি, ২০২১ রাত ৮:০৭
৬টি মন্তব্য ৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

রাত পাঁচ (নাকি সকাল!) ঘটিকায় ব্লগে আমি ও অনলাইনে আছেন!!!

লিখেছেন অজ্ঞ বালক, ০৭ ই মার্চ, ২০২১ ভোর ৬:০২

কি করা যায়? সাধারণত এরকম সময়ে নির্বাচিত ব্লগই পড়া হয়! কিন্তু আজ নির্বাচিত ব্লগ পড়তে ইচ্ছা করছে না, আসলে তার উপায়ও নেই। নির্বাচিততে শেষ আপডেট হয়েছিলো গ্যাস্ত্রিকোর ব্লগটা, ফেব্রুয়ারির বাছাই... ...বাকিটুকু পড়ুন

'যদি' কথন

লিখেছেন স্থিতধী, ০৭ ই মার্চ, ২০২১ সকাল ৭:৩৩



শর্ত, অনিশ্চয়তা, আকাঙ্খা , সম্ভাবনা, বিকল্প ভাবনা; এমন অনেক কিছুর প্রকাশবাহী একটা ছোট শব্দ “ যদি”। এই “যদি” এর শর্তে আমরা অনুপ্রাণিত হই আবার থমকেও যাই।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই তোমায়, তোমারি জন্ম শতবর্ষে ।

লিখেছেন সেলিম আনোয়ার, ০৭ ই মার্চ, ২০২১ সকাল ১১:৪৮



ভেবে ভেবে অবাক হতে হয়
কীর্তি তোমার স্বাধীন বাংলাদেশ—সারা বিশ্বের বিষ্ময়!
এমন তরো স্বপ্নের বাস্তবায়ন
কেহ আগে কী পেরেছে অথবা পারবে? পারবে না নিশ্চয়
তোমার কারণেই স্বাধীন বাংলার লাল—সবুজ পতাকা... ...বাকিটুকু পড়ুন

গল্পঃ বেলা অবেলা

লিখেছেন ইসিয়াক, ০৭ ই মার্চ, ২০২১ দুপুর ১২:৫৯

[১]
অনেকক্ষণ ধরে ডোরবেল একটানা বেজে চলেছে। বাথরুম থেকে তো জুলেখা ঠিকই শুনতে পাচ্ছেন আর কেউ শুনতে পারছে না নাকি!
তুতুল কি করছে কে জানে? এই দুপুর বেলা পড়ে পড়ে ঘুমুচ্ছে হয়তো।
আর... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইসলামী বয়ানে ৭ মার্চের ভাষণ

লিখেছেন সাইফুল ইসলাম৭১, ০৭ ই মার্চ, ২০২১ দুপুর ২:৫৮


ইসলাম শুধু একটা ধর্ম নয় বরং ঈমানদারদের জন্য একটি সর্বাঙ্গীন জীবন বিধান। তাই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণে ইসলামের কার্যকরী প্রভাব রয়েছে। আজ আমরা সেই অদেখা ভুবন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×