somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পাঠ প্রতিক্রিয়া - রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ ~ শিবনাথ শাস্ত্রী

১৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ১২:০৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বেঙ্গল রেনেসাঁ একটি বহুল আলোচিত বিষয়। পাশ্চাত্য রেনেসাঁর সঙ্গে এর একটা মৌলিক তফাৎ হল, চৌদ্দ শতকে ইতালির ফ্লোরেন্স নগরে রেনেসাঁ (রিভাইভাল বা পুনরুত্থান) – এর যে প্রথম জ্যোতি পৃথিবী চোখে দেখে, তা ছিল দীর্ঘদিনের বাইবেল শাসিত ধর্মীয় এপিস্টেম বা জ্ঞানকাণ্ডকে প্রত্যাখ্যান করে হাজার বছরের পুরনো গ্রেকো – রোমান সময়ের মানববাদী বিশ্ববিক্ষার দিকে ইউরোপের প্রত্যাবর্তন। বিপরীতে উনিশ শতকের শুরুতে যে বেঙ্গল রেনেসাঁ হয়, কোলকাতায়, তাতে বাঙ্গালীরা হাজার বছরের পুরনো কোন বাঙ্গালী সভ্যতা ও সংস্কৃতির দিকে অগ্রসর হয় না। বরং দীর্ঘদিনের মুঘল সাম্রাজ্যের অধীনতাকে পরিহার করে ইংরেজি ও পাশ্চাত্য সভ্যতা ও জ্ঞানবিজ্ঞানের প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়ে। বাংলা সাহিত্যের আদিতম নিদর্শন যদি চর্যাপদ হয়ে থাকে, তবে তার দিকে ফিরে আসলেই ১৯ শতকের বাঙ্গালীর নেয়ার মতো কিছু ছিল না। তাই ইংরেজদের সভ্যতা থেকে যা কিছু নেয়ার, নিজেদের চিন্তার জায়গাকে উন্নত করার জন্য বাঙ্গালীরা ততটুকুই গ্রহণ করেছে নিজের সাধ্যমতো।

বেঙ্গল রেনেসাঁর ওপর অসংখ্য গ্রন্থ রচিত হলেও, এই বিষয়ক সবচে গুরুত্বপূর্ণ এবং তৎ-সমসাময়িক সময়ে লেখা গ্রন্থটি হল শিবনাথ শাস্ত্রীর লেখা রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ। বইটির বিষয়ে আমার প্রথম আগ্রহ সৃষ্টি হয় ২০১৪ সালে, যখন আমি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখা সেই সময় উপন্যাসটি পড়ি। সুনীল তার ঐ ঢাউশ সাইজের উপন্যাস লেখার বীজমন্ত্র শাস্ত্রী মহাশয়ের লেখা ঐ আদি গ্রন্থ থেকে পান। কাজেই গ্রন্থটি নিয়ে আমার আগ্রহ ছিল আগে থেকেই। কিন্তু ৫ অগাস্ট ২০২৪ সালের পর, যখন বাংলা একাডেমী আগ্রহ নিয়ে বাংলার মুসলিম গণজাগরণ ও শিখা গোষ্ঠীকে নিয়ে কাজ করা শুরু করে, এবং আমার পরিচিত ইন্টেলেকচুয়াল বন্ধুবান্ধবদের সার্কেলে এই শিখা গোষ্ঠী নিয়ে আগ্রহের পুনঃজাগরণ ঘটে, তখন আমার আরও ১০০ বছর পিছিয়ে আদি বেঙ্গল রেনেসাঁর স্বরূপ জেনে, তার সঙ্গে শিখাগোষ্ঠীর একটা তুল্যমূল্য বোঝাপড়ার আগ্রহ তৈরি হয়। সে আগ্রহ থেকেই রামতনু লাহিড়ী হাতে তুলে নেয়া। বইটি পাঠ শেষ হল দিন কয় আগে। স্মৃতি থেকে বইটি পাঠের কিছু অভিজ্ঞতা টুকে রাখছি এই ব্লগে।

বইটি পড়তে গেলে সর্বপ্রথম চোখে পড়ে লেখক শিবনাথ শাস্ত্রীর বেঙ্গল রেনেসাঁ এবং তার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিবর্গের জীবনের খুঁটিনাটি তুলে আনার ব্যাপারে অনুপম মমতার পরিচয়। তিনি পারতপক্ষে ১জন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকেও বাদ দেন নি তার আলাপে। যার জীবন অন্তত ২ – ৪ লাইনও দাবী করে, তাকেও তুলে এনেছেন এই বইয়ে।

ঘটনার মধ্যে মনে দাগ কেটেছে প্রথমবারের মতো পশ্চিমবঙ্গে আইন করে সতীদাহ প্রথা রোধের প্রয়াস, কৃষ্ণনগরের রাজাদের গুণী প্রজা প্রতিপালনে ঐতিহাসিক ভূমিকা, খ্রিস্টান ধর্মের সংস্পর্শে এসে নিরাকার একেশ্বরবাদী ব্রাহ্ম সমাজের জন্ম, সেই ব্রাহ্মসমাজের দুই – তিনভাগ হয়ে যাওয়া, নীলকরদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, সিপাহী বিপ্লব, নারী শিক্ষা, বিধবাবিবাহ, ব্রাহ্মসমাজের জবাবে হিন্দু ধর্মের পুনরুত্থান ইত্যাদি। মনে হতে পারে, ঘটনা আসলে খুব বেশি কিছু ঘটে নি। কিন্তু এই সমস্ত ঘটনাই ইতিহাসের এত জগদ্দল পাথরের মতো বোঝা ঠেলে ঠেলে নির্মিত হয়েছে – যার একটিরও ঠিকঠাক মতো সমাধা হতে ১০০ বছর লেগে যাওয়ার কথা। সেখানে এইসব উন্নতিই সাধিত হয়েছে মোটাদাগে ১০০ বছরের মধ্যে।

উল্লেখযোগ্য চরিত্রাবলীর মাঝে মনে আছে ইউরোপ থেকে খ্রিস্ট ধর্মের সাথে পাশ্চাত্য সভ্যতার আলো সাথে করে নিয়ে আসা যাজক উইলিয়াম ক্যারি, হিন্দু কলেজের তরুণ শিক্ষক ডিরোজিও – যার তত্ত্বাবধানে গড়ে ওঠে ইয়াং বেঙ্গল গ্রুপ, ব্রাহ্ম সমাজের আদি প্রতিষ্ঠাতা রাজা রামমোহন রায়, রবীন্দ্রনাথের দাদা প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর ও আদি ব্রাহ্মসমাজের আচার্য মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, ব্রাহ্ম সমাজে নতুন দিশা পত্তনকারী ও আদি ব্রাহ্মসমাজের সঙ্গে ভাঙ্গন সৃষ্টিকারী কেশবচন্দ্র সেন, লেখক ও সমাজ সংস্কারক ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, কবি ঈশ্বরচন্দ্রগুপ্ত ও মাইকেল মধুসূদন দত্ত, নাট্যকার দীনবন্ধু মিত্র, সমাজ হিতৈষী কালীপ্রসন্ন সিংহ এবং বইটির মূল ব্যক্তিত্ব রামতনু লাহিড়ী স্বয়ং – যার জীবন বর্ণনার ফাঁকে ফাঁকে উঠে এসেছে গোটা বেঙ্গল রেনেসাঁর ইতিহাস।

নিঃসন্দেহে ঐ ১০০ বছরে বাঙ্গালী প্রায় ১০০০ বছরের পথ পরিক্রমা করে।

পূর্ববঙ্গের মুসলিম পাঠক হিসেবে আমার এতোটুকুই ক্ষেদ রয়ে গেছে যে, এই বই থেকে অভাগা অনগ্রসর বঙ্গীয় মুসলমান সমাজের তৎকালীন অবস্থার ব্যাপারে কিছু জানা যায় না। সম্ভবত দীর্ঘদিন মুঘল শাসনের অধীনে থাকার ক্ষেদ থেকেই শিবনাথ শাস্ত্রীর সচেতন এ সিদ্ধান্ত। না হলে ব্রাহ্মসমাজের প্রতিষ্ঠায় ইসলামিক থিওলজির প্রভাব তিনি পুরোপুরি এড়িয়ে যেতেন না, গিরিশচন্দ্র সেনের কোরআনের প্রথম বঙ্গানুবাদ, অথবা রামমোহন রায়ের পরবর্তী সময়ে ব্রাহ্মসমাজের নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় কিছুটা হলেও যে ইসলামের ছোঁয়া ছিল, তার সামান্যতম উল্লেখ না করে শিবনাথ শাস্ত্রী কিছুটা বিস্তারিত বর্ণনায় যেতেন। সর্বোপরি, বেঙ্গল রেনেসাঁরই সন্তান বেগম রোকেয়া এবং মীর মশাররফ হোসেনকে সম্পূর্ণ উহ্য রাখতেন না নিজের লেখায়।

যাক, তবুও আমি ধন্যবাদ দিই শাস্ত্রী মহাশয়কে তার এই সেমিনাল কিতাব রচনার জন্য। অপেক্ষাকৃত সহজ ভাষায়, দরদ নিয়ে, এবং তৎকালীন সময়ে পারস্পারিক মুখোমুখি হওয়া বিভিন্ন আন্দোলন (যেমন ব্রাহ্মসমাজ বনাম হিন্দুসমাজ) এর কোনটার প্রতিও বিশেষ পক্ষপাত না দেখিয়ে ফ্যাক্টগুলো অ্যাজ ইট ইজ – উপস্থাপনের জন্য।

সর্বশেষ এডিট : ২০ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ১০:০৯
৫টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

নস্টালজিক

লিখেছেন সামিয়া, ১৬ ই মার্চ, ২০২৬ রাত ৩:৩৩



আমার ঘরটা এখন আর আগের মতো লাগে না। দরজার লক নষ্ট, বন্ধ করলেও পুরোপুরি বন্ধ হয় না, আধখোলা হয়ে থাকে। বুকশেলফে ধুলো জমে আছে, ড্রেসিং টেবিলের পর্দাটা এলোমেলোভাবে ঝুলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্বপ্ন যখন মাঝপথে থেমে যায়: ঢাকার জলপথ ও এক থমকে যাওয়া সম্ভাবনার গল্প

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ১৬ ই মার্চ, ২০২৬ সকাল ৮:২৫

ঢাকার যানজট নিয়ে আমরা অভিযোগ করি না এমন দিন বোধহয় ক্যালেন্ডারে খুঁজে পাওয়া যাবে না। অথচ এই যানজট নিরসনের চাবিকাঠি আমাদের হাতের নাগালেই ছিল—আমাদের নদীগুলো। সম্প্রতি বিআইডব্লিউটিএ ঘোষণা করেছে যে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

কেন আমি ইরানের বিরুদ্ধে-২

লিখেছেন অর্ক, ১৬ ই মার্চ, ২০২৬ দুপুর ১:১৪



ইরান বিশ্বসভ্যতার জন্য এক অভিশাপ, এক কলঙ্ক। কাঠমোল্লারা ক্ষমতা পেলে একটি রাষ্ট্রের যে কি পরিণতি হয়, তার জ্বাজ্জল্যমান উদাহরণ ইরান। সম্পূর্ণরূপে অসভ্য বর্বর অসুস্থ রাষ্ট্র গড়ে উঠেছে সেখানে। যেখানে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভাগাভাগি

লিখেছেন সাইফুলসাইফসাই, ১৬ ই মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৩:৩৭

ভাগাভাগি
সাইফুল ইসলাম সাঈফ

এলাকায় এক ইফতার মাহফিল-এ
দাওয়াত পাই আর যথাসময় চলে যাই।
অনেক মানুষ পড়ছে দোয়া দুরুদ
ঘনিয়ে আসছে রোজা ভাঙার সময়।

তখন সবার সামনে বিলিয়ে দিচ্ছে বিরিয়ানি
আমার ভাবনা- হয়ত কেউ ভাবছে
যদি একসাথে খাওয়া... ...বাকিটুকু পড়ুন

২০২৩ এ ওয়াকআউট করেছিলেন, ২০২৬ এ তিনিই ঢাবির ভিসি ।

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৬ ই মার্চ, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২২


২০২৩ সাল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সভা চলছে। একজন শিক্ষক দাঁড়িয়ে বললেন, হলগুলোতে ছাত্রলীগের গেস্টরুম নির্যাতন বন্ধ করতে হবে। কথাটা শেষ হতে না হতেই তৎকালীন ভিসি জবাব দিলেন, "গেস্টরুম কালচার... ...বাকিটুকু পড়ুন

×