somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

স্টালিন পুত্র ইয়াকভঃ নিজের ইচ্ছামত টাট্টিখানা ব্যবহারের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে শহীদ হওয়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এক মহান যোদ্ধা

১২ ই মার্চ, ২০২৬ রাত ১১:০৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



খবরটা ১৯৮০ সালে সানডে টাইমসে প্রকাশিত হবার আগে স্টালিনের পুত্র ইয়াকভের মৃত্যুর ব্যাপারে আমাদের কোন ধারণা ছিল না। জার্মান অফিসারদের হাতে আটক হবার পর তাকে কিছু ব্রিটিশ আর্মি স্টাফের সঙ্গে একই তাঁবুতে পাঠানো হয়। সেখানে সকলের একই টাট্টিখানা ব্যবহার করা লাগতো। স্টালিন পুত্রের অভ্যাস ছিল পায়খানা ব্যবহার করার পর সেটা পরিষ্কার না করেই ফিরে আসা। দুনিয়ার সবচে ক্ষমতাধর আদমির সন্তান হলেও তার এই পায়খানা নোংরা করে আসার ব্যাপারটায় ব্রিটিশ বন্দীরা প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল। তারা তাদের এই ক্ষোভের কথা ইয়াকভকে বলে। তাতে আবার ইয়াকভ পাল্টা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। কিন্তু তারা থামে না, বরং বারবার বারবার ইয়াকভের নজরে ব্যাপারটা আনে, এবং তাকে তার নোংরা করে যাওয়া টাট্টিখানা পরিষ্কার করতে বলতে থাকে। এতে করে সে আরও ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে, ঝগড়া করে, সে ঝগড়া হাতাহাতি পর্যন্ত গড়ায়। শেষমেশ ক্যাম্প কমান্ডারকে বিচারক মেনে সে এক শুনানির অনুরোধ করে। কিন্তু অহংকারী জার্মান কমান্ডার হাগামোতার মতো বিষয় নিয়ে আসর বসাতে রাজি হয় না। স্টালিন পুত্রের পক্ষে অপমান অসহনীয় লাগে। আকাশের দিকে তাকিয়ে, রাশিয়ান ভাষার সবচে বাজে গালিগুলো চিৎকার করে উচ্চারণ করতে করতে সে ক্যাম্পকে বেষ্টন করে রাখা ইলেকট্রিক তারের বেড়ার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তার দেহ, যা আর কখনো ব্রিটিশ সৈন্যদের টাট্টিখানাকে নোংরা করে নি, সেটা ঝুলে থাকে নিথর নিস্পন্দ অবস্থায়, বৈদ্যুতিক তারে।

স্টালিন পুত্র ছিল নিয়তির নির্মমতার শিকার। ইতিহাসের সাক্ষ্য অনুযায়ী স্টালিনের এই পুত্র যে নারীর গর্ভে জন্মায়, স্টালিন তাকে হত্যা করেছিল। স্টালিন পুত্র তাই এক হিসেবে ছিল ঈশ্বরপুত্র (যেহেতু তার পিতাকে সোভিয়েত রাশিয়ায় ঈশ্বরের চোখে দেখা হতো) এবং একই সঙ্গে ছিল ঈশ্বর পরিত্যাজ্য। তাকে মানুষ ভয়ও পেতো দু'কারণেঃ সে তাদেরকে আহত করতে পারত তার ক্রোধের দ্বারা (যেহেতু সে স্টালিন পুত্র) এবং তার আনুকুল্যের দ্বারা (যেহেতু সে স্টালিন পুত্র, কাজেই স্টালিন পুত্রের বন্ধুদের শাস্তি দেয়ার মাধ্যমেও তাকে শাস্তি দিতে পারে)।

উপেক্ষা আর বিশেষাধিকার, আনন্দ এবং বেদনা - ইয়াকভের মতো করে এই দুই বিপরীত মেরুর অবস্থান আর কেউ কখনো বোঝে নি; মানব অস্তিত্বের এক মেরু থেকে অপর মেরুতে পা রাখা যায় কতোটা সংক্ষিপ্ত পথে, ইয়াকভের মতো করে তা কেউ কখনো জানে নি।
তারপর, যুদ্ধের শেষদিকে সে জার্মানদের হাতে বন্দী হয়, তাকে জেলখানা ভাগ করে নিতে হয় এমন আরেক জাতির যুদ্ধবন্দীদের সঙ্গে, যারা গোড়া থেকেই তাকে দু'চোখে দেখতে পারত না। এরাই তাকে টাট্টিখানা নোংরা করার অভিযোগে অভিযুক্ত করে। এই মানুষটি, যার কাঁধে ছিল সর্বোচ্চ ক্রমের নাটুকেপনার ভার (যেহেতু সে একই সঙ্গে ছিল এক স্বর্গচ্যুত ফেরেশতা, এবং ঈশ্বরপুত্র), তাকে হাগামোতার মতো একটা বিষয়ে বিচারের সম্মুখীন করাটা কতটুকু যুক্তিযুক্ত ছিল? মানবজীবনের সর্বোচ্চ এবং সর্বনিম্নস্তরের নাটক তবে এরকম মাথায় চক্কর লাগিয়ে দেয়ার মতো কাছাকাছি?

মাথা ঘুরিয়ে দেয়ার মতো নিকটবর্তী? নৈকট্য তবে মাথাও ঘুরিয়ে দিতে পারে?

পারে। যখন উত্তর আর দক্ষিনমেরু এতোটা কাছাকাছি চলে আসে যে, তারা চাইলেই একে অপরকে স্পর্শ করতে পারে, এমতাবস্থায় পৃথিবী উধাও হয়ে যায়, আর মানুষ নিজেকে আবিষ্কার করে এমন এক শূন্যতায়, যা তার মাথা ঘুরিয়ে দেয়, সে তাল হারিয়ে পড়ে যেতে বাধ্য হয়।

যদি উপেক্ষা আর ছাড় দেয়া - উভয়ে মিলে যায়, যদি উৎকৃষ্ট আর নিকৃষ্টের মাঝে কোন তফাৎ না থাকে, যদি ঈশ্বরপুত্রকে তার হাগামোতা নিয়ে বিচারের সম্মুখীন হতে হয়, তাহলে মানুষের অস্তিত্ব তার ওজন হারিয়ে পরিণত হয় অসহনীয় ভারহীন এক বস্তুতে। যে মুহূর্তে স্টালিন পুত্র ছুটে গিয়ে বৈদ্যুতিক তারে নিজের শরীর ছুঁড়ে মারে, তখন অসহনীয় ভারহীন এক পৃথিবীর বুকে আকাশের দিকে মাথা তুলে, ইয়াকভের প্রাণহীন দেহকে ধারন করে দাঁড়িয়ে থাকা সে তারের বেড়াগুলিকে একত্রে এক সাংগীতিক স্টাফ নোটেশনের মতো লাগে। সে এমন এক পৃথিবীর বস্তু, যে পৃথিবীর মাত্রাজ্ঞান লুপ্ত হয়েছে।

স্টালিন পুত্র তার প্রাণ হারালো পায়খানার মতো একটা বিষয় নিয়ে। কিন্তু নিজের খেয়ালখুশী মতো হাগার অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে প্রাণ হারানো আদতে কোন অনর্থক মৃত্যু নয়। জার্মানির সীমানা আরও পূর্বের দিকে ঠেলে বাড়াতে গিয়ে যেসব জার্মান প্রাণ হারাল, কিংবা পশ্চিমের ওপর নিজের প্রভাব বৃদ্ধি করতে গিয়ে যে সব রুশিরা মারা পড়লো - এগুলো হচ্ছে বেকুবের মতো মারা পড়া। এসকল মৃত্যুর কোন অর্থ নেই, নেই সাধারণ গ্রহণযোগ্যতা। যুদ্ধের সামগ্রিক মূর্খতার মধ্যে স্টালিনপুত্রের মৃত্যুই একমাত্র আধ্যাত্মিক মৃত্যু।

(লেখাটি মিলান কুণ্ডেরার অমর উপন্যাস অস্তিত্বের অসহনীয় ভারহীনতা (দা আনবিয়ারেবল লাইটনেস অফ বিয়িং) এর ষষ্ঠ পরিচ্ছদের একটি অংশ। উপন্যাসটি আমার অনুবাদ করা শেষ, ভাষা সম্পাদনা করতে গিয়ে এই অংশটুকু, ভাবলাম আমার ব্লগের পাঠকদের উদ্দেশ্যে শেয়ার করি। কুণ্ডেরা এখানে সকল রকমের যুদ্ধের সামগ্রিক অসাড়তার অসাধারণ সমালোচনা করেছেন।)
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই মার্চ, ২০২৬ রাত ১১:১২
৫টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আওয়ামী লীগ ও আমরা কেনো ক্ষমা চাইবো‼️আমরা’তো বিচার করে শাস্তি নিশ্চিত করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ॥

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ৩০ শে এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ১০:১৫



লাল বদরদের আমরা কেন কোনোদিন বিশ্বাস করবো না, পছন্দ করতে পারবো না, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রচন্ড ঘৃণা করবো, তার একটা ভালো উদাহরণ এই স্ক্রীনশটটা।

সব মানুষ একই রাজনৈতিক আদর্শে... ...বাকিটুকু পড়ুন

তুরস্ক-কেন্দ্রিক ভূরাজনৈতিক প্রভাব ও কাদের মোল্লাদের প্রেতাত্মার পুনরুত্থান

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ৩০ শে এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ১০:৩১


বিএনপির মহাসচিব ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, "বাংলাদেশ থেকে জামাতকে রাজনৈতিকভাবে নির্মূল করতে কাজ করতে হবে"। "নির্মূল" শব্দটি সম্পূর্ণভাবে দূর করার অর্থে ব্যবহৃত হয়। যেমন, কলেরা বা ম্যালেরিয়া নির্মূল করা, কিংবা... ...বাকিটুকু পড়ুন

পানির ক্যানভাসে ডুবন্ত শহর

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ৩০ শে এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ১১:২৯



প্রতিবেদক: আশরাফুল ইসলাম
স্থান: প্রবর্তক মোড়, চট্টগ্রাম
সময়: সকাল ১০টা ৩০ মিনিট


ক্যামেরার লাল বাতিটা জ্বলছে। লেন্সের ওপর বৃষ্টির ছোট ছোট কণাগুলো অবাধ্য হয়ে জমছে। আমি মাইক্রোফোনটা শক্ত করে ধরে লেন্সের দিকে তাকালাম।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিপদ

লিখেছেন রূপক বিধৌত সাধু, ৩০ শে এপ্রিল, ২০২৬ বিকাল ৪:০৫


বিপদ নাকি একা আসে না—দলবল নিয়ে চারদিক থেকে ঘিরে ধরে। প্রবাদটির বাস্তব এবং কদর্যরূপ যেন এখন মৃণালের জীবনেই ফুটে উঠেছে। মাত্র মাসখানেক আগে বাবাহারা হলো। পিতৃশোক কাটার আগেই আবার নতুন... ...বাকিটুকু পড়ুন

নগর দর্পন

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ৩০ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ৯:৫১



১. মিরপুর ডিওএইচএস থেকে কুড়িল বিশ্বরোড যাওয়ার পথে ফ্লাইওভারের ওপর এক অনাকাঙ্ক্ষিত দৃশ্য। এক ভদ্রলোকের প্রায় ৪৮ লাখ টাকার ঝকঝকে সেডান হাইব্রিড গাড়ির পেছনে এক বাইক রাইডার ধাক্কা দিয়ে স্ক্র্যাচ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×