somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

"ভিয়েতনাম যুদ্ধের মোড় পাল্টে দেয়া সেই ছবি, এরপর যা ঘটেছিল"

০৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ বিকাল ৪:০৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :




ফটো সাংবাদিক এডি এডামস ভিয়েতনাম যু্দ্ধের সবচেয়ে বিতর্কিত এবং আলোচিত ছবিগুলোর একটি তুলেছিলেন। ৫০ বছর আগে ভিয়েতকং গেরিলারা যখন তাদের 'টেট অফেনসিভ' শুরু করে, সেই যুদ্ধের সময়েই ঘটেছিল ঠাণ্ডা মাথায় এক ভিয়েতকং বন্দীকে গুলি করে হত্যার ঘটনা। এই একটি মাত্র ছবি কিভাবে মার্কিন জনমত ঘুরিয়ে দিয়েছিল, বিশ্ব বিবেককে নাড়া দিয়েছিল, তা নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে। কিন্তু ঠিক কিভাবে ছবিটি তোলা হয়েছিল আর কি ঘটেছিল এই ছবিটি তোলার পরে?

ভোঁতা নাকের পিস্তল থেকে গুলিটি বেরিয়ে গেছে। যে হাতে পিস্তলটি ধরা, গুলি বেরিয়ে যাওয়ার পরের মূহুর্তের ধাক্কা সামলাচ্ছে সেই হাত। আর যার মাথার খুলিতে গিয়ে গুলিটি ঢুকছে, সেই বন্দীর মুখ কুঁকড়ে যাচ্ছে গুলির আঘাতে।

ছবির ফ্রেমে বাঁ দিকে দাঁড়িয়ে এক সৈন্য। ঘটনার আকস্মিকতায় তার মুখ যেন বিকৃত হয়ে গেছে। একটা মানুষ যে মুহূর্তে মারা যাচ্ছে, ঠিক সেই মুহূর্তের এই ছবিটির দিকে তাকিয়ে অনেকের মনেই হয়তো বিচিত্র সব অনুভূতি খেলা করবে: একটা ধাক্কা, এক ধরণের মানসিক পীড়ন এবং কিছুটা অপরাধবোধ।

ব্যালিস্টিক বিশেষজ্ঞদের ধারণা এই ছবিটিতে ঠিক সেই মুহূর্তটি ধরা পড়েছে যে মুহূর্তে আসলে বুলেটটি গিয়ে ঢুকছিল লোকটির মাথায়। এই ঘটনাটি 'সায়গন এক্সিকিউশন' নামে পরিচিত।

ছবিতে যাকে গুলি করতে দেখা যাচ্ছে তিনি দক্ষিণ ভিয়েতনামের সামরিক গোয়েন্দা প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নুয়েন নক লোয়ান। আর যাকে গুলি করা হচ্ছে তিনি একটি ভিয়েতকং গেরিলা গ্রুপের নেতা নুয়েন ভ্যান লেম।

এই ছবিটি ফটোসাংবাদিক এডি এডামসকে রাতারাতি বিশ্বজোড়া খ্যাতি এনে দিয়েছিল। সারা দুনিয়ায় বিভিন্ন ভাষার সংবাদপত্রে এটি ছাপা হয়। ভিয়েতনাম যুদ্ধের নিষ্ঠুরতা এবং নৈরাজ্য এই একটি ছবিতে যেভাবে ধরা পড়েছিল, তার তুল্য আর কোন ছবি নেই।

যুদ্ধের বিরুদ্ধে মার্কিন জনমত গড়ে তুলতেও অবদান রাখে ছবিটি। ভিয়েতনাম যুদ্ধ যে আসলে জেতার নয়, সেই মনোভাব প্রবল হতে থাকে মানুষের মধ্যে।

যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের 'ডলফ ব্রিসকো সেন্টার ফর আমেরিকান হিস্টরি'তে সংরক্ষণ করা আছে এডি এডামসের অনেক আর্কাইভ ছবি, দলিল এবং চিঠিপত্র।




গুলি করার নিচে পড়ে চিৎকার করছেন নুয়েন ভ্যান লেম।

এই সেন্টারের পরিচালক বেন রাইট বলেন,একটা স্থিরচিত্রে এমন একটা ব্যাপার থাকে, যা ছবিটি যারা দেখছেন তাদেরকে খুব গভীরভাবে নাড়া দেয় এবং সেটা তাদের সঙ্গে থেকে যায় বহু বছর। "এই একই ঘটনার যে ভিডিও ফুটেজ আছে, সেটিও কিন্তু বীভৎস। কিন্তু সেটা দেখে দর্শকের মধ্যে একই ধরণের প্রতিক্রিয়া তৈরি হয় না।"

কী ঘটেছিল সেদিন:
১৯৬৮ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ভিয়েতনামের সায়গনের রাস্তায় এই ছবিটি তুলেছিলেন এডি এডামস। পিপলস আর্মি এবং ভিয়েতকং গেরিলারা টেট অফেনসিভ শুরু করার দুদিন পরের ঘটনা সেটি। সেদিন আসলে ঠিক কী ঘটেছিল, তার পুরোটা এই ছবি দেখে বোঝা সম্ভব নয়।

'টেট অফেনসিভ' ছিল কমিউনিষ্ট গেরিলাদের এক আকস্মিক অভিযান। অনেকগুলো শহর টার্গেট করে একযোগে হঠাৎ এই আক্রমণ চালানো হয়। দক্ষিণ ভিয়েতনামের বাহিনী এবং মার্কিন বাহিনী রীতিমত হতবুদ্ধি হয়ে পড়ে এই হামলার মুখে।

সায়গনের রাস্তায় রাস্তায় চলছিল খন্ড লড়াই। দক্ষিণ ভিয়েতনামের বাহিনী ভিয়েতকং গেরিলাদের একটি গ্রুপের নেতা নুয়েন ভ্যান লেমকে একটি গণকবরের পাশ থেকে আটক করে। সেই গণকবরে ছিল ৩০ জন বেসামরিক মানুষের লাশ।

লেমকে যখন সেনারা ধরে নিয়ে যাচ্ছে, তখন এডি এডামস তার ক্যামেরা হাতে তাদের অনুসরণ করেন। তাকে নিয়ে যাওয়া হয় ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নুয়েন নক লোয়ানের জীপের কাছে।

ব্রিগেডিয়ার লোয়ান দাঁড়িয়ে ছিলেন লেমের পাশে। এরপর তিনি তার পিস্তলটি লেমের দিকে তাক করেন।

"আমি ভেবেছিলাম হয়তো লেমকে ভয় দেখানোর জন্যই তিনি পিস্তল তুলেছেন। তাই আমি স্বাভাবিকভাবেই আমার ক্যামেরা দিয়ে ছবিটা তুলি", পরবর্তীকালে বলেছিলেন এডি এডামস।

বলা হয়ে থাকে লেম নাকি ব্রিগেডিয়ার লোয়ানের এক বন্ধুর স্ত্রীসহ ছয়জনকে খুন করেছিলেন।

ব্রিগেডিয়ার লোয়ান তাক করা পিস্তলের ট্রিগার টানলেন। "যদি আপনি দ্বিধা করেন, যদি আপনি আপনার দায়িত্ব পালন না করেন, তাহলে সৈন্যরা আপনাকে মানবে না", নিজের কাজের পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেছিলেন তিনি।

'টেট অফেনসিভ' শুরু হওয়ার প্রথম ৭২ ঘণ্টায় ব্রিগেডিয়ার লোয়ান খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় ছিলেন। সায়গনের যেন পতন না হয়, সেজন্যে তিনি সৈন্যদের উজ্জীবিত করার চেষ্টা করছিলেন।

এডি এডামস বলেছিলেন, এই ঘটনার পর তাৎক্ষণিকভাবে তার মনে হয়েছিল ব্রিগেডিয়ার লোয়ান একজন ঠাণ্ডা মাথার হত্যাকারী। তবে ভিয়েতনামের বেশ কিছু এলাকা তার সঙ্গে ঘুরে বেড়ানোর পর এডি এডামস তার মনোভাব বদলান।

ভিয়েতনাম থেকে পাঠানো এক লেখায় তিনি বলেছিলেন, ব্রিগেডিয়ার লোয়ান ছিলেন সেই সময়ের ভিয়েতনামের সৃষ্টি।

এই ছবির জন্য পরের বছর পুলিৎজার পুরস্কার পান এডি এডামস। এই ছবির জন্য প্রচুর প্রশংসা কুড়ালেও সারা জীবন এটির স্মৃতি তাকে তাড়া করে ফিরেছে।

"একজন মানুষ আরেক মানুষকে হত্যা করছে, আর এই ছবি দেখিয়ে আমি অর্থ পাচ্ছি", দুঃখ করে তিনি বলেছিলেন।

কী ঘটেছিল ব্রিগেডিয়ার লোয়ানের ভাগ্যে:
এডি এডামস এবং ব্রিগেডিয়ার লোয়ানের মধ্যে যোগাযোগ অক্ষুন্ন ছিল আরও বহু বছর। ভিয়েতনাম যুদ্ধের শেষের দিকে ব্রিগেডিয়ার লোয়ান পালিয়ে যান যুক্তরাষ্ট্রে। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর মার্কিন ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ তাকে ফেরত পাঠাতে চেয়েছিল বিখ্যাত এই ছবিটির কারণেই। তারা এডি এডামসে অনুরোধ করেছিলেন ব্রিগেডিয়ার লোয়ানের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে। কিন্তু এডি এডামস উল্টো ব্রিগেডিয়ার লোয়ানের পক্ষে সাক্ষ্য দেন।

তবে শেষ পর্যন্ত ব্রিগেডিয়ার লোয়ানকে যুক্তরাষ্ট্রে থাকার অনুমতি দেয়া হয়। তিনি ওয়াশিংটন ডিসি-তে ভিয়েতনামী খাবারের একটি রেস্টুরেন্ট খোলেন।

তবে অতীত তাকে ছাড়েনি। তার বিগত দিনের ইতিহাস জানাজানি হওয়ার পর রেস্টুরেন্ট ব্যবসা মার খায়। অনেকে নাকি তার রেস্টুরেন্টের টয়লেটে তার বিরুদ্ধে আজে বাজে কথা লিখে আসতো।

এপি বার্তা সংস্থায় সেসময় এডি এডামসের ফটো এডিটর ছিলেন হল বুয়েল। তিনি বলেন, এই একটি ছবি পুরো ভিয়েতনাম যু্দ্ধের নিষ্ঠুরতাকে ধরে রেখেছে।

"যে কোন প্রতীকের মতোই এই একটি ছবি আসলে অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যত সব যুদ্ধের বর্বরতাকে মূর্ত করে রেখেছে।"
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আইনের ঊর্ধ্বে কেউ না - সরকারের পদক্ষেপ প্রশংসনীয়

লিখেছেন মাথা পাগলা, ০১ লা অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ২:৪৫




মিরপুর-১ রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগের ঘটনায় ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে এমপি পদ থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়া সরকারের একটি সময়োপযোগী ও প্রশংসনীয় পদক্ষেপ বলেই মনে করি। তবে পদত্যাগের নির্দেশের... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফেরারী বিকেল

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ০১ লা অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৪:১৫

বাংলা বর্ষপঞ্জীর ষষ্ঠ মাস, আশ্বিনের শুরু থেকেই দিনের ‘বিকেল বেলা’ টা আমাদের দৈনন্দিন জীবন থেকে হারিয়ে যেতে শুরু করে। আষাঢ়ের শেষ সপ্তাহ থেকে আহ্নিক পরিবর্তনের ফলে প্রতিদিনের দৈর্ঘ্য একটু একটু... ...বাকিটুকু পড়ুন

অন্ধকারের রসায়নবিদ, Case File 02 — সিউলের অসমাপ্ত গুলি

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০১ লা অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:৫৯


লেখকের নোট:
এই গল্পটি ১৯৭৪ সালের দক্ষিণ কোরিয়ার একটি ঐতিহাসিক হত্যাচেষ্টার ঘটনাকে পটভূমি হিসেবে নিয়ে নির্মিত সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম থ্রিলার। ঐতিহাসিক ব্যক্তি ও ঘটনার পাশাপাশি প্রফেসর রেহান আশরাফ, তাঁর পরিকল্পনা,... ...বাকিটুকু পড়ুন

নেভার গিভ আপ!!!: দেশের সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারদের পিছনে বিনিয়োগ করুন, প্রধানমন্ত্রী!

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০২ রা অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১২:৪৩

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
আসসালামু আলাইকুম। আজ আমার খুব খুশির দিন হওয়ার কথা ছিলো। ব্রিটিশ একটি ভার্সিটিতে ৩য় বারের মতো মেন্টর হিসেবে সিলেক্টেড হয়েছি। এই আনন্দে বন্ধু-বান্ধব, পরিবার-পরিজনদের নিয়ে পার্টি দেওয়ার কথা ছিলো।... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার মহাজাগতিক ভাবনাকে এআই আমার সেরা পোষ্ট হিসাবে সাব্যস্ত করেছে

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ০২ রা অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৩:১২



মহাজাগতিক ভাবনা

মহাজগতের প্রথমের পূর্ব অবস্থান শূন্য। কারণ প্রথমের পূর্ব অবস্থান শূন্যই হয়ে থাকে।শূন্য অবস্থানে সীমাদাতা না থাকায় তাতে যা হবে তা’ অসীম হবে।সকল অসীম একত্রে মিলে এক হবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×