somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ফেরারী বিকেল

০১ লা অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৪:১৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বাংলা বর্ষপঞ্জীর ষষ্ঠ মাস, আশ্বিনের শুরু থেকেই দিনের ‘বিকেল বেলা’ টা আমাদের দৈনন্দিন জীবন থেকে হারিয়ে যেতে শুরু করে। আষাঢ়ের শেষ সপ্তাহ থেকে আহ্নিক পরিবর্তনের ফলে প্রতিদিনের দৈর্ঘ্য একটু একটু করে হ্রাস পেতে আরম্ভ করে। আশ্বিনের শুরু থেকে এই হ্রাসের গতি লক্ষণীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়। আর আশ্বিনের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে তো দিনের দৈনিক হ্রাসপ্রাপ্তি এতই দ্রুত ঘটতে থাকে যে এর সাথে তাল মিলিয়ে চলতে এতদিনের অভ্যস্ত রুটিন বিঘ্নিত হয়। যেমন, জৈষ্ঠ বা আষাঢ় মাসে মধ্যাহ্নভোজের পরে হাতে তিন থেকে চার ঘণ্টা সময় পাওয়া যায় ‘বিকেল’ আসার আগেই নিরিবিলি বসে অনেক কাজ করে নেয়ার জন্য। যাদের দিবানিদ্রার অভ্যেস রয়েছে, তারা এত কাজ করার পরেও বিকেল আসার পূর্বে ৪৫ মিনিট থেকে ঘণ্টাখানেক সময় ঘুমিয়ে নেওয়ারও সুযোগ পান। তারপর ঘুম থেকে উঠে অভ্যেসমত ‘বিকেল’ এর কাজগুলো যেমন খেলাধুলা, হাঁটাহাঁটি, জগিং, সাইক্লিং, সাঁতার কাটা, ইত্যাদি প্রাত্যহিক বা সাপ্তাহিক অনুশীলনের কর্মসমষ্টি সেরে নিতে পারেন। কিন্তু আশ্বিনের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে মধ্যাহ্নভোজের পর কোন কাজ করার জন্য হাতে মোটেই সময় থাকে না; তার আগেই বিকেল এসে পড়ে। অগ্রহায়ন আর পৌষ মাসে তো বিকেলটাকেই আর খুঁজে পাওয়া যায় না। তখন বিকেলকে খুঁজে পেতে হলে দুপুরের খাবারের পর ওঁৎ পেতে বসে থাকতে হয় খেয়াল করার জন্য যে কখন বিকেল আসে আর কখন যায়।

আজ পহেলা অক্টোবর, বাংলা সনে ষোলই আশ্বিন। আজ থেকে শুরু হলো আশ্বিনের দ্বিতীয়ার্ধ। আজ থেকে দিন খুব দ্রুত ছোট হতে থাকবে। দুপুর, বিকেল আর সন্ধ্যা একে অপরের সাথে লাগালাগি হয়ে জড়িয়ে থাকবে। গ্রামীন জীবনে পুরুষেরা দুপুরে খাবার খেয়েই হাটে যাবার প্রস্তুতি নিতে শুরু করবেন। নারীগণ ঘর-সংসার সামলে নাইতে না নাইতেই সূর্য অস্ত যাবার জন্য আকাশে লালিমা ছড়াতে শুরু করবে। কোন রকমে দুটো অন্ন মুখে গুঁজে তারা ভিজে চুলে হয়তো উঠোনে বসবেন, কিন্তু চুল শুকানোর মত রোদ আর পাবেন না। এভাবেই চোখের পলকে সন্ধ্যা নেমে আসবে। ঝিঁঝি পোকার ডাক শুরু হবে, বনে বাদারে ঝোপ ঝাড়ে জোনাক জ্বলবে। রাতের খাবারের আয়োজনে আবার তারা ব্যস্ত হয়ে পড়বেন। শহুরে জীবন যাপনে আজকাল অনেক পরিবর্তন এসেছে। শহরে এখন আর দিন ও রাতের মধ্যে কোন পার্থক্য বোঝা যায় না। শহুরে জনগণের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে অথবা সবান্ধবে দলবেঁধে রাতের খাবারের জন্য হোটেল-রেস্টুরেন্টে যায়। শুধু উন্মুক্ত আকাশটাই গ্রাম ও শহরের মধ্যে কমন ফ্যাক্টর। আকাশের চাঁদ, তারা, জ্যোৎস্না, মেঘ আর বৃষ্টি গ্রাম ও শহরের মানুষ সমভাবে দেখতে পায়, তবে গ্রামে বসে বৃষ্টিপাত দেখার একটা পৃথক সৌন্দর্য আছে। সেখানে বৃষ্টিপাত শুধু দেখারই নয়, শোনারও একটা বিষয়। এ ছাড়া গ্রামে রাতের আকাশে বাদুর, পেঁচার মত কিছু নিশাচর পাখি উড়তে দেখা যায়, শহরে যা দেখা যায় না। আবার শহরে যান্ত্রিক পাখি উড়োজাহাজ দেখা যায়, গ্রামে যা দেখা যায় না।

এখন থেকে বিকেলটাকে ঠিকমত ধরতে হলে দিবানিদ্রা চলবে না। শারদীয় কিংবা হৈমন্তিক বিকেলের যে একটা আলাদা সৌন্দর্য আছে, সেটাকে উপভোগ করতে হলে কিছুটা সময় তার জন্য আলাদা করে রাখতে হবে। অগ্রহায়ন আর পৌষে তো বিকেল একেবারেই নিরুদ্দেশ হয়ে যাবে। তখন প্রকৃ্তির কাছাকাছি থাকলে তাও হেমন্তের বৈকালিক সৌন্দর্য কিছুটা অনায়াসে চোখে পড়বে, কিন্তু নাগরিক জীবনে থাকবে শুধুই যানজট ও জনযট ঠেলে বাড়ি ফেরার তাড়া। এ তাড়ায় বিকেল সন্ধানের কোন প্রয়াস নেয়ার অবকাশ থাকে না। শরত-হেমন্তের বিকেল নিয়ে অনেকেরই অনেক কিছু করার বা ভাবার বিলাসিতা থাকতে পারে। কিন্তু বিকেলটাকেই যদি খুঁজে না পাওয়া যায়, তবে সেসব ইচ্ছে শুধু ভাবনাতেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।

দ্রুত অপসৃয়মান হলেও, মধ্যাহ্ন পরবর্তী এই নাতিদীর্ঘ সময়টার প্রতি আমার ভীষণ মায়া। আমার খুব ভাল লাগা একটি সময়। কখনো কিছু লিখে, কখনো গান শুনে, নয়তো দৈবচয়নের ভিত্তিতে কোন বই কিংবা কোন ইলেক্ট্রনিক লেখালেখি পড়ে- এসব করেই আমার কাটে এসব হ্রস্ব বিকেলগুলো। জানালাটার পর্দা সরানো থাকলে মেঘের আনাগোনা কিংবা পাখির ওড়াউড়ি দেখতেও ভাল লাগে। অনেক সময় ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতেই দেখি, এক চিলতে সোনালী রোদটুকু খুব দ্রুতই ম্লান হয়ে যাচ্ছে, গাছের ছায়াগুলো দীর্ঘতর হচ্ছে। সূর্য মামার কিসের যেন তাড়া! দেখতে দেখতে দীপ্যমান সূর্যটা কমলা রঙ ধারণ করে ঝুপ করে ওপারে ডুব দেয়। আমার ভাললাগা ভাবনাগুলোতেও অকস্মাৎ ঘটে যবনিকাপাত। ধীরে ধীরে নেমে আসে আঁধার, গ্রামীন জনপদে কুয়াশাচ্ছাদিত হয়ে। পাখিরা তাদের শেষ আধারটুকু খেয়ে নেয়, যৌথ সুরে দিনের শেষ গানটুকু গেয়ে নেয়। আমি ফিরে যাই আমার জাগতিক রুটিনে।

ঢাকা
১৬ আশ্বিন, ১৪৩৩
০১ অক্টোবর ২০২৬
বিকেল চারটা চার।
শব্দ সংখ্যাঃ ৬৪০।

একই বিষয়ে আলোকপাত করা আমার কিছু পুরনো পোস্টঃহেমন্তের কথা

কবিতাঃ হেমন্তের দিনগুলো



সর্বশেষ এডিট : ০১ লা অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৫১
৫টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

হারানো আকাশে আমার ক্যানভাসে

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ৩০ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১৫

হারানো আকাশে আমার ক্যানভাসে
.........................................................................



সেই জগতে আমার ছিলো আঁকিবুকি চকখড়িতে,
মন ভেসে যেত মেঘের ভেলায় সোনালী সেই দিনগুলিতে।
একটা সকাল, একটা বিকেল গোল্লাছুটের ধুলোবালি,
চিবুড়ি আর লুকোচুরি খেলা, স্মৃতির পাতা নয়কো খালি।

সুনীল... ...বাকিটুকু পড়ুন

৩৬ জুলাইয়ের আন্দোলনে কোটি কোটি মানুষকে টাকা দেওয়া হয়েছিলো?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ৩০ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২৩

গানঃ হাল্লাজের কাপড়
গানের লিংকঃ https://on.soundcloud.com/Vctd83PVm40VJ64T16



১) ৩৬ জুলাইয়ের আন্দোলনকে অনেকে আম্রেকিয়া আর শিবিরের প্ররোচনায় হয়েছে বলে প্রচার করেন। আমার প্রশ্ন, আম্রিক্যা ও শিবির কাউকে কাউকে হয়তো 'ভাড়া' করে থাকতে পারে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

দুটি হাসিখুশি গল্প: ফাজিল কানাডিয়ান ও মহা সিরিয়াস কানাডিয়ান

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ০১ লা অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১২:৩৩


হুমায়ূন আহমেদের একটা গল্প ছিল তাদের মাকে নিয়ে। তাদের মেঝ ভাই জাফর ইকবাল তখন আমেরিকার নিউ ইয়র্ক শহরে থাকেন। তাদের মা ছেলের কাছে বেড়াতে গিয়েছেন। বিকেলে তিনি একা একা... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রশ্নের আগুন যুক্তির মহাযাত্রা :প্রজ্ঞার জয়ধ্বনি বিজ্ঞান ও যুক্তির মহাকাব্য ২য় পর্ব ।

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ০১ লা অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৩:০৮


আদিতে ছিল প্রশ্ন
অন্ধকার আকাশের তলে দাঁড়িয়ে মানুষ
চেয়ে দেখেছিল নক্ষত্রের দিকে
মনে তার জেগেছিল বিস্ময়
কে জ্বালালো এই দীপ
কেন ঘোরে পৃথিবী, কেন নামে বৃষ্টি
কেন জন্ম, কেন মৃত্যু
কেন এই অনন্ত চলা?
উত্তর ছিল না হাতে
ছিল... ...বাকিটুকু পড়ুন

হাফপ্যান্ট ফুলপ্যান্টের দেশে

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০১ লা অক্টোবর, ২০২৬ ভোর ৪:২৮


বাংলাদেশে যারা সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখতে ভালোবাসেন, তারা সাধারণত খুব নিরীহ বিষয় পছন্দ করেন। এর একটা কারণও আছে। বেশিরভাগ মানুষই অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক এড়িয়ে চলতে চান। এমন কোনো বিষয় নিয়ে লেখা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×