somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মুক্তিযুদ্ধে এক অনাবাসী বাঙ্গালী প্রকৌশলী ও দুই ভীনদেশির অসীম বীরত্বগাঁথা!

০২ রা সেপ্টেম্বর, ২০১৬ রাত ১১:৫২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :




***এক অনাবাসী বাঙ্গালী প্রকৌশলী এবং দুই ভীনদেশির অসীম বীরত্বগাঁথা**

MIT - ম্যাসাচুসেটস ইনিস্টিটিউটস অফ টেকনোলজি ! ১৮৬১ সালে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানটি জন্মের সূচনালগ্ন থেকেই প্রযুক্তিবিদ্যা এবং প্রকৌশলবিদ্যায় শিক্ষা ও গবেষণায় সুপরিচিত বিশ্বব্যাপী । এম আই টিতে অধ্যয়ন করা সারা বিশ্বের ইঞ্জিনিয়ারদের স্বপ্ন এবং সেই সাথে গর্ব এবং আনন্দের বিষয়ও বটে।

১৯৭১ সালে তড়িৎপ্রকোশলী রেজাউল হাসান আমাদের গর্ব হয়ে গবেষণা করছিলেন সুদূর আমেরিকার সেই এমআইটিতে। কিন্তু দূরে থাকলে কী দেশের প্রতি টান তার বিন্দুমাত্র কমে? পাকিস্তান বাহিনী যখন ২৫শে মার্চের কালরাত্রিতে ঝাঁপিয়ে পরে নিরস্ত্র বাঙ্গালীদের উপর তখন থেকেই তিনি উৎসুক হয়ে পড়েন দেশের জন্য কিছু করবার নিমিত্তে। সাথে মাহবুবুল আলম,তৈয়বুদ্দীন মাহতাব এবং খোরশেদ আলমকে নিয়ে পরিকল্পনা করতে থাকেন আমাদের মুক্তিবাহিনীকে সাহায্য করবার।

কিন্তু সুদূর আমেরিকায় বসে কীভাবে সম্ভব দেশ মাতৃকার তরে জীবন বিলিয়ে দেওয়া বীর যোদ্ধাদের সহায়তা করা?

এক সময় পেয়ে গেলেন এই প্রশ্নের উত্তর। নিজের প্রকৌশলবিদ্যাকেই তিনি কাজে লাগাতে চান দেশের স্বার্থে। পর্যাপ্ত কমিউনিকেশন ডিভাইস অর্থাৎ মুক্তিবাহিনীর আভ্যন্তরীণ যোগাযোগের জন্য ওয়াকিটকি এবং ওয়ারল্যাসের অভাবে সম্মুখযুদ্ধে খুব একটা সুবিধে করতে পারছিলনা আমাদের যোদ্ধারা। রেজাউল হাসান সিদ্ধান্ত নিলেন আমাদের যোদ্ধাদের এই অভাব পূরণের। আমেরিকায় নিজ ল্যাবে বসে ওয়াকিটকি,ওয়ারলেস বানিয়ে বাংলাদেশে পাঠাবার দুঃসাহসিক এক পরিকল্পনা করলেন তিনি।

আমেরিকান সরকার পাকিস্তানকে প্রত্যক্ষভাবে সহায়তা করছিলো এবং আমেরিকার নিয়মানুযায়ী কোনো যুদ্ধ বিধ্বস্ত এলাকায় সরকারের সহায়তা ব্যতীত ত্রাণ বিতরণ নিষিদ্ধ। তাই ধরা পরলে রেজাউলকে হয়তো ভিসা বাতিল করে পাকিস্তানেই ফেরত পাঠানো হতো এবং এদেশে আসা মাত্র পাকিস্তানী সামরিক জান্তার নির্যাতনের খড়গ নেমে আসতো তার উপর।

কিন্তু না, এসব কিছুই থামাতে পারেনি দেশপ্রেমিক রেজাউলকে। নিজে এবং আরো কয়েকজন বাঙ্গালীর সহায়তায় তিনি প্রায় তিরাশি হাজার ডলার সংগ্রহ করেন এবং তা দিয়ে দিনরাত পরিশ্রম করে তৈরি করেন ১০টি HF Communication সেট যা দিয়ে দশ হাজার মাইল দূরে পর্যন্ত কথা বলা যেত,৫০টি VHF ওয়ারলেস সেট যা দিয়ে পাঁচ মাইলের মধ্যে যোগাযোগ করা যেত এবং ৪৫০ টি ওয়াকিটকি যা দিয়ে দুই মাইলের মধ্যে যোগাযোগ করা যেত।

সব মিলিয়ে ১০৫০টি অত্যাধুনিক কমিউনিকেশন ডিভাইস যা যুদ্ধক্ষেত্র আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ছিল অত্যাবশ্যকীয়।

শুধু তৈরি করলেই তো হবে না, যুদ্ধক্ষেত্রে প্রেরণের পূর্বে প্রয়োজন এই ডিভাইসগুলোর কার্যকারিতা পরীক্ষা। এগিয়ে আসেন তার এক মার্কিনী বন্ধু,যার ফ্যাক্টরিতে বসে এগুলোকে পরীক্ষা করা হয়। সব যন্ত্র তৈরি এবং পরীক্ষার পর এবার আসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, মার্কিন গোয়েন্দাদের চোখ এড়িয়ে কীভাবে পাঠানো যায় এই যন্ত্রগুলো বাংলাদেশে।

এগিয়ে আসেন রেজাউল হাসানের আরেক পরিচিত নিউ হ্যাম্পশায়ারের কনকর্ডে ফ্রাঙ্কলিন পিয়ার্স সেন্টারের অধ্যক্ষ ড. রবার্ট রাইস। তার প্রতিষ্ঠান থেকে ত্রাণ পাঠানোর নাম করে তিনি ব্যবস্থা করতে পারবেন এই যন্ত্রগুলো পাঠাবার। এদিকে নিজ দেশের আইনের তোয়াক্কা না করে মানবতাবাদী মার্কিন বিমান বাহিনীর এক অবসরপ্রাপ্ত অফিসার কার্ল মাইলস আমেরিকার ফ্লেচার স্কুলে এমএ তে অধ্যয়নরত বাঙ্গালী তৈয়বউদ্দীনকে শিখিয়ে দেন এই যন্ত্রগুলোর ব্যবহার।

যথারীতি মার্কিন কর্তৃপক্ষের নজর এড়িয়ে তৈয়বউদ্দীন ডক্টর রাইসের সহযোগিতায় এই যন্ত্রগুলো নিয়ে রওনা হন বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে এবং নির্বিঘ্নে বাংলাদেশ পৌঁছে জিনিসগুলো তিনি তুলে দেন জেনারেল ওসমানীর হাতে এবং মুক্তিবাহিনীদের শিখিয়ে দেন যন্ত্রগুলোর ব্যবহারবিধি।

এতগুলো কমিউনিকেশন সেট পেয়ে ওসমানী এত খুশী হয়েছিলেন যে তিনি রেজাউল হাসানকে একটি চিঠি লিখেন আনন্দ এবং ধন্যবাদ প্রকাশ করে। সেই সাথে উল্লেখ করেন তিনি রণাঙ্গনে মুক্তিবাহিনীর সাফল্যের কথা। একইসাথে রেজাউল হাসানের নিকট প্রেরণ করেন প্রয়োজনীয় জিনিসের আরো একটি তালিকা, যেগুলোও পাঠাবার ব্যবস্থা করেছিলেন রেজাউল হাসান।

যুদ্ধক্ষেত্রে রেজাউলের এই কমিউনেকশন সেটগুলো বাঁচিয়ে দিয়েছিলো বহু মুক্তিযোদ্ধাদের প্রাণ, এবং সেই সাথে তার এই সেটগুলোর কারণে রচিত হয়েছিল বহু বিজয়ের বীরত্ব গাঁথা। শুধু তাই নয়, দেশ স্বাধীন হবার পরেও প্রত্যন্ত এলাকায় প্রশাসনিক যোগাযোগের জন্য এই সেটগুলোর ব্যবহার হয়।

শ্রদ্ধা এই বাঙ্গালী প্রকৌশলীর প্রতি যিনি প্রমাণ করেছেন দেশপ্রেমই যথেষ্ট দেশের প্রতি কাজ করবার জন্য। দেশমাতৃকার টানে উদ্ধ্বুদ্ধ হয়ে যে যার অবস্থান থেকে সম্মিলিতভাবে কাজ করে গেলে সাফল্য সুনিশ্চিত। সেই সাথে শ্রদ্ধা আরেক বাঙ্গালী তৈয়বুদ্দীন, ভিনদেশী ডক্টর রাইসের প্রতি!
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা সেপ্টেম্বর, ২০১৬ রাত ১১:৫২
৫টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন লা-মাযহাবিকে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়ার কারণ কী ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২২ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ২:৩২


আজকে নতুন চারটি মুখ মন্ত্রিসভায় যুক্ত হলো। এর মধ্যে একজনকে নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে । বলছি ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শামীম কায়সার লিংকনের কথা। তিনি একজন লা মাযহাবি বা... ...বাকিটুকু পড়ুন

দেবীপ্রসাদ যাত্রা

লিখেছেন জ্যোতির্ময় ধর, ২২ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ৩:২১


আমি তখন ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র। চট্টগ্রামের মোমিন রোডের রুচিশীল বই বিপণি কথাকলির বুকশেলফে চোখ বুলাচ্ছিলাম । হঠাৎ একখানি বইয়ের ওপর এসে থমকে গেল আমার চোখ । "ক্ষুদে... ...বাকিটুকু পড়ুন

দুর্ভিক্ষের আওয়াজ কি আমরা বাংলাদেশিরা শুনতে পাচ্ছি?

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ২২ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১০:৪৩

মুচলেকা দিয়ে, গোপন সমঝোতা করে মীর জাফর কিংবা মীর কাসিমের মতো “কথিত ক্ষমতার” সিংহাসনে বসা যায় ঠিকই কিন্তু বসে বসে জনগণের সর্বনাশ দেখা ছাড়া তাদের বিশেষ কিছু করার থাকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

সম্ভাবনার বন্দি

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ২২ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১:১৮



বান্দরবান জেলা কারাগারের চারপাশে পনেরো ফুট উঁচু পাথর ও কংক্রিটের নিরেট প্রাচীর। তারও ওপরে পেঁচানো ধারালো কাঁটাতারের জাল।

বর্ষার কুয়াশাচ্ছন্ন সকালে ৩ নম্বর ব্লকের সংকীর্ণ সেলে শান্ত হয়ে বসে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঢাবিতে "মব সায়েন্স" পড়তে হলে কী কী যোগ্যতা লাগে?

লিখেছেন মাথা পাগলা, ২২ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ৮:১৮



- রাজনৈতিক সুবিধার জন্য তৌহিদী জনতার ব্যবহার করা জানতে হবে।

- রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বাহিনী চোখের সামনে থাকা সত্ত্বেও মবকে থামাতে না পারলে সেটাকে রাষ্ট্রের ব্যর্থতা না বলে "জনতার শক্তি" বলতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×